kalerkantho

শুক্রবার । ২ ডিসেম্বর ২০১৬। ১৮ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ১ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


হিলারি ও ট্রাম্পের সত্য-মিথ্যা

কালের কণ্ঠ ডেস্ক   

২৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



হিলারি ও ট্রাম্পের সত্য-মিথ্যা

বিতর্কমঞ্চে দাঁড়িয়ে যখন চরম উত্তেজনায় যুক্তি আর পাল্টা যুক্তি সাজাচ্ছিলেন ডেমোক্র্যাট প্রার্থী হিলারি ক্লিনটন ও রিপাবলিকান প্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্প, তখন তাঁদের বক্তব্যের সত্যাসত্য যাচাইয়ে ব্যস্ত সময় পার করেন সাংবাদিকরা। তাঁদের বক্তব্যের সত্যতা যাচাইয়ে সিএনএন, নিউ ইয়র্ক টাইমসের মতো পত্রিকা গঠন করে সত্যতা যাচাই দল।

সাংবাদিক, গবেষক, সম্পাদকদের নিয়ে এই দল গঠিত। নানা প্রসঙ্গ নিয়ে কথা বলেছেন তাঁরা। তবে বক্তব্যে তথ্যের বিকৃতি বেশি ঘটিয়েছেন ট্রাম্প। হিলারি মঞ্চ থেকেই বেশ কয়েকবার সত্যতা যাচাই দলের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। তাঁদের দেওয়া বেশ কিছু তথ্যের পরিপ্রেক্ষিতে সত্যতা যাচাই দলের মতামত এখানে তুলে দেওয়া হলো।

পররাষ্ট্রনীতি ও জাতীয় নিরাপত্তা : ট্রাম্প বলেন, প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর থেকে হিলারি জঙ্গিগোষ্ঠী ইসলামিক স্টেটের সঙ্গে লড়াই করছেন।

এ তথ্য সঠিক নয়। কারণ আইএস গঠিত হয়েছে আল-কায়েদা ভেঙে। আর আল-কায়েদার জন্ম হয় ২০০৩ সালে ইরাকে প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেনের পতনের পর যে শূন্যতা সৃষ্টি হয় তার প্রেক্ষাপটে। আল-কায়েদা দুর্বল হয়ে পড়ে প্রেসিডেন্ট  বারাক ওবামার প্রথম মেয়াদেই। ধারণা করা হয়, আইএসের জন্ম ২০১৪ সালে। সে সময় হিলারি পররাষ্ট্রমন্ত্রীর পদে ছিলেন না।

ট্রাম্প আরো দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরাক থেকে সেনা প্রত্যাহার না করলে আইএসের জন্মই হতো না। তাঁর এই দাবি গ্রহণ বা নাকচ—দুটোই অসম্ভব।

এ ছাড়া ইরাক দখলের কথাই কিছুদিন আগে ট্রাম্প বলেছিলেন। দেশটির তেলসম্পদ ব্যবহারের বিষয়টি তখন তাঁর বক্তব্যে আসে। যদিও বিষয়টি আন্তর্জাতিক আইনে অবৈধ।

অন্যদিকে রাশিয়া ও প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন সাইবার হামলা চালিয়েছেন বলে অভিযোগ করেছেন হিলারি। তাঁর দাবি হয়তো মিথ্যা নয়। তবে যুক্তরাষ্ট্র আনুষ্ঠানিকভাবে এখনো এ বিষয়টি নিয়ে কোনো মন্তব্য করেনি।

এ ছাড়া ন্যাটো প্রসঙ্গে ট্রাম্প বলেন, এই জোটের বেশির ভাগ দেশই সংকটের সময় পূর্ণ অংশগ্রহণ করে না বলেই ন্যাটো ব্যর্থ হচ্ছে। তাঁর এই বক্তব্যটিকে অবশ্য সঠিক বলে মন্তব্য করেন সত্যতা যাচাই কমিটি। তবে ন্যাটো ব্যর্থ হচ্ছে এর সঙ্গে একমত নয় তারা। ২০০৩ সালে আফগানিস্তানে আল-কায়েদাবিরোধী লড়াইয়ে ন্যাটোর পূর্ণ অংশগ্রহণ ছিল। তারা ওই লড়াই সম্পন্নও করেছে।

ট্রাম্প ইরাক যুদ্ধের বিরোধী ছিলেন বলে যে দাবি তিনি করেছেন তাও ধোপে টেকেনি। ওই সময় নানা সাক্ষাৎকারে তিনি ইরাক যুদ্ধের প্রতি তাঁর সমর্থনের কথা জানিয়েছিলেন।

এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের কাছে পরমাণু অস্ত্রের সঠিক হিসাব এবং ইরানের পরমাণু চুক্তির পূর্ণ বিবরণ নেই বলে দাবি করেছেন ট্রাম্প। এ ক্ষেত্রেও তিনি ভুল করছেন। কোটি কোটি ডলার ব্যয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পরমাণু অস্ত্র হিসাবের কাজ চলছে। তিনি দাবি করেন, ইরানকে যুক্তরাষ্ট্র ১৭০ কোটি ডলার দিয়েছে। এটি সত্য। তবে এই অর্থ ইরানেরই। দেশটিতে ইসলামিক বিপ্লবের আগে সামরিক সরঞ্জাম চুক্তি হয়েছিল যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে, যা তাদের কখনোই সরবরাহ করা হয়নি।

অর্থনীতি : ট্রাম্প দাবি করেন, ব্যবসার স্বার্থে চীন তাদের মুদ্রার অবমূল্যায়ন করছে। এটি অতি পুরনো একটি অভিযোগ। অতীতে কাজটি চীন করেছে। তবে বর্তমানেও তারা এটি অব্যাহত রেখেছে, এমন কোনো প্রমাণ নেই। জার্মান কম্পানি ফোর্ড যুক্তরাষ্ট্র ছেড়ে যাচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি। তবে ওই কম্পানির পক্ষ থেকে ট্রাম্পের এ দাবি প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে।

কর : হিলারি দাবি করেন, ট্রাম্প ট্যাক্স দিলে কেন্দ্রের ওপর থেকে চাপ কমত। তিনি কোনো কর পরিশোধ করেননি। তবে হিলারির ওই দাবির যথার্থতা পায়নি কমিটি।

কর্মসংস্থান : বিতর্কে হিলারি বলেন, তাঁর অর্থনৈতিক পরিকল্পনায় ?এক কোটি কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। কিন্তু ট্রাম্পের পরিকল্পনায় ৩৫ লাখ কর্মসংস্থানের সুযোগ হারিয়ে যাবে।

তবে বিশ্লেষকরা জানিয়েছেন, অর্থনীতির গতিশীলতার কারণেই ৭০ লাখ কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। হিলারি উদ্যোগ নিলে আরো ৩৫ লাখ কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে।

অক্সফোর্ড ইকোনমিকসের আরেকটি বিশ্লেষণ বলছে, হিলারির অর্থনৈতিক পরিকল্পনার বাস্তবায়ন হলে ২০২১ সালে দুই লাখ বাড়তি কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা সম্ভব। কিন্তু ট্রাম্পের পরিকল্পনায় ৪০ লাখ চাকরির সুযোগ হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই হিলারির বক্তব্য সত্য। তবে এতে তথ্যগত কিছু বিভ্রান্তি রয়েছে।

ট্রান্স-প্যাসিফিক পার্টনারশিপ : ট্রাম্পের অভিযোগ, বাণিজ্যচুক্তি ট্রান্স-প্যাসিফিক পার্টনারশিপ (টিপিপি) অনুমোদন করতে চেয়েছিলেন হিলারি। জবাবে হিলারি বলেন, তিনি আশা করেছিলেন এটি ভালো চুক্তি হবে। কিন্তু চুক্তি নিয়ে আলোচনার সময় তিনি বুঝেছেন, এটি ততটা ভালো নয়। চুক্তির দায়ভারও তাঁর নয়।

সিএনএনের রাজনৈতিক বিশ্লেষণ বলছে, ২০১২ সালে টিপিপি চুক্তির পক্ষে বক্তব্য দিয়েছেন হিলারি। কিন্তু ২০১৫ সালে এসে তিনি টিপিপির প্রতি নেতিবাচক মনোভাব পোষণ করেন। ওই সময় হিলারি এটাও বলেন, নির্বাচিত হলে তিনি টিপিপি প্রত্যাখ্যান করবেন। অর্থাৎ ট্রাম্পের অভিযোগের আংশিক সত্য। হিলারি টিপিপির পক্ষে ছিলেন। কিন্তু এ কথা কখনো বলেননি যে তিনি সেটি অনুমোদন করবেন।

হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হবে ট্রাম্প-হিলারির : এদিকে হিলারি ও ট্রাম্পের লড়াইটা শেষ পর্যন্ত সমানে সমানে ঠেকবে বলে মনে করছে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মতামত-জরিপ বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান ফাইভ থার্টি এইট। প্রতিষ্ঠানটির এডিটর ইন চিফ ও শীর্ষস্থানীয় রাজনীতি বিশ্লেষক নেট সিলভারের মতে, শেষ পর্যন্ত কে মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হবেন তা যথার্থভাবে বলাটা কঠিন হয়ে পড়েছে।

উল্লেখ্য, ২০০৮ সালের মার্কিন নির্বাচনের ফলাফলের ব্যাপারে যথার্থ আভাস দিয়ে খ্যাতি অর্জন করে ফাইভ থার্টি এইট। সে বছর যুক্তরাষ্ট্রের ৫০টি অঙ্গরাজ্য নিয়ে দেওয়া প্রতিষ্ঠানটির আভাসের ৪৯টিই যথার্থ হয়েছিল। পরে ২০১২ সালেও তাদের জরিপ ফলাফলের আভাসের ক্ষেত্রে যথার্থ ভূমিকা পালন করে।

ব্রিটিশ দৈনিক দি ইনডিপেনডেন্ট জানায়, ফাইভ থার্টি এইটের নতুন জরিপে দেখা গেছে, প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জয়ের ক্ষেত্রে ট্রাম্পের সম্ভাবনা ৪৮.৫ শতাংশ। আর সেই সম্ভাবনার দিক দিয়ে সামান্যই এগিয়ে রয়েছেন হিলারি। তাঁর জয়ী হওয়ার সম্ভাবনা ৫১.৫ শতাংশ।


মন্তব্য