kalerkantho

শুক্রবার । ৯ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৮ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন

প্রথম বিতর্কে পাল্লা ভারী হিলারির

সাবেদ সাথী, নিউ ইয়র্ক   

২৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



প্রথম বিতর্কে পাল্লা ভারী হিলারির

যুক্তরাষ্ট্রের লং আইল্যান্ডে হফস্ট্রা ইউনিভার্সিটিতে গত সোমবার সন্ধ্যায় বিতর্ক শুরুর আগে হাত মেলান ডোনাল্ড ট্রাম্প ও হিলারি ক্লিনটন। ছবি : এএফপি

৯০ মিনিটের কথার লড়াই ‘আইনজীবী’ আর ‘বিক্রেতা’র। এই আইনজীবী মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রার্থী হিলারি ক্লিনটন।

আর বিক্রেতা তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী রিপাবলিকান পার্টির প্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্প।    

এই দুই বিতার্কিকের তির্যক প্রশ্ন, উত্তরের পর পাল্টা প্রশ্ন, যুক্তির পর পাল্টা যুক্তি উপস্থাপনে জমে ওঠে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন-পূর্ব প্রথম টেলিভিশন বিতর্ক। শেষে দেখা গেল জয়ের পাল্লা হেলে পড়েছে উকিলের দিকে। অর্থাৎ সিএনএন/ওআরসির এক জরিপে বিতর্ক দেখা দর্শকের ৬২ শতাংশ হিলারি আর ২৭ শতাংশ ট্রাম্পকে জয়ী বলে রায় দিয়েছে।

সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটন সিনেটর বা ফার্স্ট লেডি হওয়ারও আগে আইনজীবী ছিলেন। আর বিক্রেতা ট্রাম্প মূলত ব্যবসায়ী। তা পণ্য হোক, সেবা বা বিনোদন।

বিতর্কের শুরুর দিকে হিলারির অস্বাচ্ছন্দ্য বা ইতস্তত করার বিষয়টি নজর এড়ায়নি সাংবাদিকদের। তবে খুব দ্রুতই নিজেকে গুছিয়ে নেন তিনি। দৃঢ়, জোরালো, আত্মবিশ্বাসী হিলারি অবশ্য এর জন্য কম প্রস্তুতি নেননি। যদিও বাস্তবতা হলো, ট্রাম্পের বিকৃত, বিদ্রূপাত্মক আক্রমণ, কথার মাঝে গলা তুলে ফোড়ন কাটার যে স্বভাব, তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে মেলে ধরা কোনো ধরনের প্রস্তুতি নিয়ে সম্ভব নয়। বিতর্কে হিলারির প্রথম জয় এখানেই। তিনি নিজেকে হারিয়ে ফেলেননি। যে অভিজ্ঞতাকে হিলারির প্রধান অস্ত্র বলে তুলে ধরা হয়েছিল, তারই ছটা দেখা গেছে পুরো ৯০ মিনিট।

বিতর্কে দুই প্রার্থী কথা বলেছেন কর থেকে শুরু করে কাজের ক্ষেত্র তৈরি, পরমাণু বোমা থেকে শুরু করে সাধারণ আমেরিকানদের হাতে অস্ত্র থাকার অধিকার, হিস্পানিক থেকে কৃষ্ণাঙ্গ, জাতীয় নিরাপত্তা থেকে শুরু করে ইসলামিক স্টেটের (আইএস) ব্যাপ্তি নিয়ে। বাদ পড়েনি ইরাক যুদ্ধ, ইরান প্রসঙ্গ, রাশিয়ার হস্তক্ষেপ, এমনকি চীনের বাণিজ্যও।

তবে ট্রাম্পের অপ্রস্তুত থাকার বিষয়টি বারবারই নজরে আসছিল। চোখে পড়ে হিলারির প্রস্তুত থাকার বিষয়টিও। এ নিয়ে মঞ্চেও আলোচনা হয়। কথার একপর্যায়ে হিলারি ট্রাম্পকে লক্ষ করে বলেন, ‘আপনি বিতর্কে আমার প্রস্তুতি নিয়ে কথা বলতে চাইছেন। আমি আপনাকে জানাতে চাই, আরেকটি বিষয় নিয়েও প্রস্তুত হচ্ছি আমি। তা হলো প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালনের। ’

নির্বাচনী প্রচারের একসময় ট্রাম্প বলেছিলেন, হিলারিকে ঠিক প্রেসিডেন্টের মতো ‘দেখায় না’। বিতর্কে প্রসঙ্গটি টানেন সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী। জবাবে ট্রাম্প দাবি করেন, তিনি হিলারির দর্শনধারী নিয়ে কথা বলেননি, তিনি বলেছেন এ দায়িত্ব পালনের ‘শারীরিক সক্ষমতা’ হিলারির নেই। ট্রাম্পের এ অভিযোগ লুফে নেন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার ঘনিষ্ঠ সহযোগী। হিলারি ট্রাম্পকে বলেন, ১১২টি দেশ সফর, শান্তিচুক্তি-অস্ত্রবিরতির আলোচনা, পুরো বিশ্বে দেশের জন্য নতুন সুযোগ খোঁজা অথবা কংগ্রেস কমিটির টানা ১১ ঘণ্টা জিজ্ঞাসাবাদ মোকাবিলার পর যেন ট্রাম্প তাঁর সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তিনি আরো বলেন, তিনি (ট্রাম্প) এখন দর্শন থেকে সক্ষমতায় নেমেছেন। অথচ এই লোকই একসময় নারীদের শুয়োর, কুকুর, উন্নাসিক বলে গালি দিয়েছেন।

কর প্রদান প্রসঙ্গ এলে ট্রাম্প জানান, হিলারি তাঁর ৩০ লাখ মুছে ফেলা ই-মেইল প্রকাশ করলে তিনিও তাঁর করের হিসাব দেবেন। পররাষ্ট্রমন্ত্রী থাকাকালে হিলারি সরকারি সার্ভার ব্যবহার না করে ই-মেইল চালাচালির জন্য ব্যক্তিগত সার্ভার ব্যবহার করেন। বিষয়টি নিয়ে এফবিআই তদন্ত শেষে হিলারির বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ না আনলেও গোপনীয় নথি ব্যবহারে তাঁর গাফিলতি ছিল বলে মন্তব্য করে।

ট্রাম্প বল হিলারির কোর্টে ঠেলে দিলে সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী স্পষ্টভাবে বিষয়টি নিয়ে দুঃখ প্রকাশ করে এর দায় নিতে রাজি আছেন বলে জানান। একই সঙ্গে অভিযোগ করেন, ট্রাম্প তাঁর করের প্রসঙ্গটি লুকাতে চাইছেন। ট্রাম্প ধনীদের কর কমাতে আগ্রহী বলেও মন্তব্য করেন তিনি। ধনকুবের ক্যাসিনো ব্যবসায়ী বিষয়টি মেনেও নেন। তাঁর যুক্তি, ধনীরা চাইলেই বিনিয়োগের মাধ্যমে জাতির জন্য ভালো কিছু করতে পারেন। এ প্রসঙ্গ টেনেই হিলারি বলেন, সাধারণ শ্রমজীবী মানুষের জন্য ট্রাম্প মোটেও মঙ্গলজনক হবেন না। কারণ ‘যেকোনো কিছুর বিনিময়ে ব্যবসা করতে চান তিনি। ’ হিলারি দাবি করেন, কর্মক্ষেত্র তৈরির বিষয়ে ট্রাম্প যে পরিকল্পনা দিয়েছেন তা বাস্তবায়িত হলে ৩৫ লাখ আমেরিকান চাকরি হারাবে।

সন্ত্রাসবাদ প্রসঙ্গে হিলারি বলেন, ইসলামী সন্ত্রাসবাদ নির্মূলে মুসলমানদের পাশে নিয়েই এগোতে চান তিনি। আর সন্ত্রাস নির্মূলই হবে তাঁর প্রধান লক্ষ্য। তবে ট্রাম্প সরাসরি এ প্রশ্নের জবাব দেননি। তিনি বলেন, এ বিষয়ে তিনি আগে বহুবার কথা বলেছেন। তাঁর অবস্থানে কোনো পরিবর্তন আসেনি।

ইরাক যুদ্ধে ট্রাম্পের সমর্থন ছিল বলে দাবি করেন হিলারি। ট্রাম্প শোনামাত্র তা নাকচ করে দেন। উঠে আসে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকে যুক্তরাষ্ট্রের সার্ভারে সাইবার হামলা চালানোর বিষয়ে ট্রাম্পের আহ্বান।

পরমাণু বোমা ট্রাম্পের হাতে নিরাপদ নয় বলেও মন্তব্য করেন হিলারি। তবে নানা বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে একমত হন দুই প্রার্থী। উঠে আসে কৃষ্ণাঙ্গ ও হিস্পানিক প্রসঙ্গ। এ সময় ট্রাম্প বলেন, আমেরিকায় এ দুই গোষ্ঠী নরকের মধ্যে বাস করছে। তাদের সুযোগ-সুবিধা অপ্রতুল, এমনকি বাঁচার অধিকারও নেই। হিলারি অবশ্য এ সময় ট্রাম্পের অতীত মন্তব্যের কথা দর্শকদের স্মরণ করিয়ে দেন।

কথা আসে ট্রাম্পের মেজাজ নিয়েও। ট্রাম্প বলেন, জয়ী হওয়ার মতো মেজাজ তাঁর আছে। তিনি এ মেজাজকেই তাঁর সবচেয়ে বড় সম্পদ বলে মনে করেন।

তবে মেজাজ দিয়ে দর্শকদের মোহিত করতে পারেননি ট্রাম্প। দুই প্রার্থীর প্রথম টেলিভিশন বিতর্ক শেষে হিলারিকে বিজয়ী বলছে অধিকাংশ দর্শক। সিএনএন/ওআরসির এক জরিপে বিতর্ক দেখা দর্শকের ৬২ শতাংশ হিলারি আর ২৭ শতাংশ ট্রাম্পকে জয়ী বলে রায় দিয়েছে। নিউ ইয়র্কের হেম্পস্টেডে হফস্ট্রা বিশ্ববিদ্যালয়ে ট্রাম্প ও হিলারির মধ্যে ৯০ মিনিটের মুখোমুখি বিতর্ক হয়। বিতর্ক শেষ হওয়ার ঘণ্টাখানেকের মধ্যে ৫২১ দর্শকের মধ্যে জরিপ চালায় সিএনএন/ওআরসি। এতে অংশ নেওয়া দুই-তৃতীয়াংশ নিবন্ধিত ভোটার জানিয়েছে, হিলারি তাঁর বক্তব্য ট্রাম্পের চেয়ে ভালোভাবে উপস্থাপন করতে পেরেছেন। হিলারি ও ট্রাম্পের এ টেলিভিশন বিতর্ক ১০ কোটি দর্শক সরাসরি দেখেছে বলে বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

সিএনএন জানিয়েছে, জরিপে দেখা গেছে, হিলারি-ট্রাম্পের বিতর্ক দেখতে আগ্রহী বেশির ভাগ দর্শকই ছিল ডেমোক্র্যাট দলের সমর্থক। তবে জরিপে অংশ নেওয়া ৪৭ শতাংশ ভোটার জানিয়েছে, এই বিতর্ক ভোটে কোনো প্রভাব ফেলবে না। অন্যদিকে ৩৪ শতাংশ বলছে, বিতর্ক শেষে তারা হিলারিকে পছন্দ করা শুরু করেছে। ১৭ শতাংশের সমর্থন ট্রাম্পের দিকে ঘুরেছে।

পুরো বিতর্ক দেখেছে এমন ভোটারদের ৬২ শতাংশ বলছে, পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে হিলারিকে ট্রাম্পের চেয়ে বেশি দক্ষ বলে মনে হেয়েছে। এ ক্ষেত্রে ট্রাম্পের পক্ষে সমর্থন মাত্র ৩৫ শতাংশ।

পরবর্তী বিতর্ক অনুষ্ঠিত হবে আগামী ৯ অক্টোবর সেন্ট লুইজের ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ে।


মন্তব্য