kalerkantho

শুক্রবার । ৯ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৮ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


তোমায় নতুন করে পাব বলে

হাসান আজিজুল হক   

২৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



তোমায় নতুন করে পাব বলে

এখন আমার মনে হচ্ছে, তাঁকে জিজ্ঞেস করি—জোয়াল নামল ঘাড় থেকে? একদিন তিনি আমাকে বলেছিলেন, সাহিত্য সৃষ্টিকে তিনি সার ধরে নিয়েছেন। আর তাঁর কোনো কাজ নেই।

চাকরি করবেন না, ব্যবসা করবেন না, কোনো খুঁটোতেই বাঁধা থাকবেন না। চিরকাল লেখার এই জোয়ালকেই তিনি কাঁধে বহন করবেন। ঘাড় থেকে তাঁর জোয়াল নামল কি না—তা জানার আমাদের কোনো উপায় নেই। উত্তর মিলবে না। তবে এটা ঠিক কথা, যেটা তিনি বলেছিলেন প্রকারান্তরে ঠিক তাই ঘটল।

আত্মশক্তিতে পূর্ণ আস্থা নিয়ে এই কয়েক দিন আগে লন্ডনের হাসপাতাল থেকে তিনি আমাকে টেলিফোন করেছিলেন। সাধারণত চিরকাল আমি তাঁকে টেলিফোন করে এসেছি। তিনি কোনো নির্দিষ্ট প্রয়োজন ছাড়া বা কাজের কথা ছাড়া গল্পগুজব করার জন্য আমাকে টেলিফোন করেননি। এর ব্যত্যয় ঘটল দিন কয়েক আগে। তখন আমি জানি যে তিনি চিকিৎসার জন্য সস্ত্রীক লন্ডনে গেছেন। সে খবরটা উনি যেদিন গেছেন সেদিনই আমি পেয়েছি। তার কদিন পরে খাবার পরে একটু বিশ্রাম নিচ্ছিলাম। আন্দাজ বেলা ৩টা হবে। আমার মোবাইলে একটা কল এলো। তারপর সেই চিরপরিচিত কণ্ঠ, ‘হাসান আমি জ্যেষ্ঠ বলছি। ’ আমি তাঁকে জ্যেষ্ঠ বলে ডাকতাম। আমি শুয়ে ছিলাম, ওঁর কণ্ঠ টের পেতেই তড়াক করে বসে পড়লাম। কী বলব বুঝতে পারছিলাম না। কিন্তু উনিই শুরু করলেন, ‘খবর কী আপনাদের?’ আমি খুবই আশ্চর্য হয়ে বললাম, ‘আমরা তো গোটা দেশ আপনার খবর জানার জন্য উত্সুক হয়ে আছি। আপনি কেমন আছেন বলুন?’ ‘হ্যাঁ হাসান কী আর বলব? লড়ে যাচ্ছি, মনোবল ভেঙে পড়েনি। ’ আমি বললাম, ‘আমরা কামনা করছি সুস্থ হয়ে নিজেদের মানুষের মধ্যে ফিরে আসুন। আপনার সঙ্গে আর কথা বলব না। আনোয়ারাকে দিন। ’

সৈয়দ আনোয়ারা হকের সঙ্গে কথা বলে তাঁর রোগের বিশদ বিবরণ পাওয়া গেল। ক্যান্সার ধরা পড়েছে ফুসফুসে, খবরটা অবশ্য আগেই কাগজে এসেছিল। ক্যান্সার সম্বন্ধে এখন আমরা সবাই কিছু না কিছু জানি। অল্প দু-একটি ক্যান্সার সময়মতো চিকিৎসা করতে পারলে কিংবা অপারেশন করলে বেঁচে থাকার স্থায়িত্ব একটু বাড়ে। আর এখন কিছু ক্যান্সার পুরোপুরি নিরাময়ও হয়ে যায়। কিন্তু ফুসফুস ক্যান্সার যে সব থেকে মারাত্মক সেটাও এখন জানা গেছে। চিকিৎসকরা এখনো নিরাময়ের কোনো উপায় বের করতে পারেননি।

সৈয়দ শামসুল হক নীরোগ স্বাস্থ্যের অধিকারী ছিলেন। কখনো কখনো কোনো অসুখে-বিসুখে ভুগেছিলেন বলে জানি না। যতকাল বেঁচে ছিলেন, নিরলস কাজ করেছেন। তাঁর লেখক জীবন গত শতাব্দীর পাঁচের দশকের মাঝামাঝি শুরু হয়েছিল। আর এই ব্যক্তিগত কর্মযজ্ঞে নিজেকে আহুতি দিয়েছিলেন। এ লেখক-জীবন অর্ধশতাব্দীরও বেশি একভাবে সক্রিয় ছিল। কোনো লেখাতে অযত্নের ছাপ নাই, অমনোযোগিতার ছাপ নাই, আলস্যের লক্ষণ নাই। প্রায়ই একই মানসম্পন্ন তাঁর সমগ্র রচনা। সবার আগে তিনি কবি, সেটা তিনি নিজেই বলতেন। একটা সময় ছিল শামসুর রাহমান, সৈয়দ শামসুল হক বা আল মাহমুদ—কবি হিসেবে এঁদের নামই সর্বজন পরিচিত ছিল। সৈয়দের ব্যক্তিত্বের আবরণটাকে খুব কঠিন বলে মনে হয়। তিনি কখনো কখনো নিষ্ঠুর উক্তি কারো প্রতি করেছেন। আমার সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল, তখন একমাত্র যে টেলিভিশন ছিল বিটিভি আরকি, সেখানে একদিন তাঁকে দেখেছিলাম। কথাবার্তায় মনে হয়েছিল শ্লেষ আর বিদ্রূপে ভরা তাঁর কথাবার্তা। তিনি টেলিভিশনে প্রচুর কাজ করেছেন তা আমরা সবাই জানি। এই সেদিন পর্যন্ত লন্ডন থেকে ফিরে আসার পর টেলিভিশনে একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠানে উপস্থাপকের কাজ করলেন। অনেক গুরুত্বপূর্ণ মানুষ সেখানে উপস্থিত ছিলেন। সেখানে রোগ দুর্বলতার কোনো লক্ষণই দেখা যায়নি। কিসের তৈরি ছিলেন এই মানুষটি—আমি আশ্চর্য হয়ে ভাবি। এমন সদা প্রস্তুত মানুষ আমি আর দেখিনি। পোশাক-পরিচ্ছদে একটা নিজস্ব বৈশিষ্ট্য তাঁর ছিল। সেই বিশিষ্টতা চোখে পড়ত। জীবনযাপনে যেমন নিয়মতান্ত্রিকতা ছিল, তেমনি কিছুটা বিলাসিতাও ছিল। হৃদয়ের মাপটা অনেক বড় ছিল। অনেক সময় তাঁকে নির্দয়, কঠিন হৃদয়ের মানুষ বলে অনেকে ভেবেছেন। সত্যি বলতে কি, আমিও একসময় তাই ভাবতাম। পরে দেখেছি খোলটাই শক্ত, ভেতরে প্রচুর জল এবং বোঝাই যেত মানবিকতায় পরিপূর্ণ। সেই স্নেহপ্রবণ মানুষটিকে আমি পরে খুব কাছ থেকে দেখেছি। সত্যি কথা যে তিনি নির্বোধ সংস্কৃতিচর্চা—সে সাহিত্যই হোক আর সংগীতই হোক আর চিত্রকলায় হোক—সহ্য করতে পারতেন না। সরাসরি অনেক সময় কটু মন্তব্য করতেন, আমার ভাগ্যেও তা ঘটেছিল। মনে আছে, তাঁর কয়েকটি আচরণের নিন্দা আমি তাঁর সামনেই করেছিলাম। তিনি চুপ করেই থেকেছেন বটে, তিনি আমার কথাটাকে মেনে নিলেও মনে নেননি। দুবার তিনি আলোচনা সভা বা স্মরণসভা বা অন্য কোনো অনুষ্ঠান থেকে সোজা বেরিয়ে গিয়েছিলেন। এখন এসব কথা সম্পূর্ণ অবান্তর। নিজের ভেতরের দিকে চেয়ে দেখছি, সেখানে বিশাল একটা শূন্যতা। এই যে মানুষটি, যিনি অগ্রগণ্য কবি, অগ্রগণ্য ঔপন্যাসিক, গল্পকার, নতুন ধারার কাব্যনাট্যের রচয়িতা, অনুবাদক—এই সমস্ত শাখাতেই অনবদ্য রচনার সম্ভার আমাদের হাতে তুলে দিয়েছেন। তার অনেক কিছু স্থায়ী হবে। কবিতার তো কথাই নেই। সেই ‘বৈশাখে রচিত পংক্তিমালা’ থেকে এ পর্যন্ত যেসব কবিতা রচনা করেছেন, ধাপে ধাপে নিজেকে মহাজন গতেযঃপন্থা সেই পথে অনুসরণ করে এই পৃথিবী, তাঁর ভালোবাসার বাংলাদেশ ত্যাগ করে গিয়েছেন। তা আমরা চিরকাল মনে রাখব।

 

লেখক : কথাসাহিত্যিক

অনুলিখন : রোকন রাকিব


মন্তব্য