kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ৮ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৭ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


তাঁর ভাষাতেই জেগে ওঠে দুলে ওঠে নেচে ওঠে বাংলাদেশ

নাসির উদ্দীন ইউসুফ   

২৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



তাঁর ভাষাতেই জেগে ওঠে দুলে ওঠে নেচে ওঠে বাংলাদেশ

সৈয়দ শামসুল হকের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে আমাদের শিল্প-ইতিহাসে একটি সোনালি অধ্যায়ের অবসান হলো। পঞ্চাশের দশকের এই কবি ছয় দশকের বেশি সময় বাংলা সাহিত্য ও নাটককে শাসন করেছেন।

তাঁর অনুকরণীয় ভাষা বাংলা সাহিত্যের সর্বকালের সেরা লেখকদের একজন হিসেবে তাঁর আসন নির্দিষ্ট করেছে।

পঞ্চাশ-ষাট ও সত্তরের দশকের কবি-সাহিত্যিকদের ওপর ত্রিশের দশকের কল্লোল যুগের ভাষারীতি, সাহিত্যরীতির সুনির্দিষ্ট প্রভাব লক্ষণীয়। কিন্তু সৈয়দ হক এ প্রভাব থেকে নিজেকে মুক্ত করে স্বকীয় একটি রীতির উদ্ভাবন ঘটিয়েছেন। কবিতার পাশাপাশি নাটক, গল্প, উপন্যাস, চলচ্চিত্র ও সংগীত রচনায় তাঁর সৃষ্টিশীলতা পাঠক ও রসগ্রহীতাদের দশকের পর দশক মুগ্ধ করে রেখেছে।

ব্যক্তি সৈয়দ শামসুল হককে হয়তো অনেকেই ভুলে যাবেন; কিন্তু সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হক কখনোই এ জাতির স্মৃতি থেকে বিস্মৃত হবেন না। তিনি উদ্যাপিত হবেন তাঁরই রচিত কবিতা, নাটক ও গানে; বাংলাদেশে প্রায় প্রতি সন্ধ্যায় নবীনকালের কোনো এক আবৃত্তিশিল্পী, অভিনেতা অথবা সংগীতশিল্পীর কণ্ঠে, অভিনয়ে। ব্যক্তির জীবনাবসানের মধ্য দিয়ে হয়তো জীবনের সমাপ্তি হয়; কিন্তু কবির কোনো মৃত্যু হয় না।

লন্ডনে যখন সৈয়দ হকের চিকিৎসা চলছিল তখন আমি সেখানে যাই। সেখানে তাঁর সঙ্গে কয়েক দিন সময় কাটানোর সুযোগ হয় আমার। আমি তাঁর রুগ্ণ শরীর দেখে ব্যথিত হয়েছিলাম। কিন্তু তাঁর আলাপচারিতায় জীবন উদ্যাপনের যে উৎসাহ ও আগ্রহ আমি লক্ষ করেছি, তা আমাকে যুগপৎ আনন্দিত ও বিস্মিত করেছে। দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু নিশ্চিত জেনেও তিনি অবিরত লিখে গেছেন। এই ভগ্ন শরীর নিয়ে তিনি উইলিয়াম শেকসপিয়ারের ‘হ্যামলেট’র অসামান্য অনুবাদ সম্পন্ন করেছেন; ‘শেষ যোদ্ধা’ নামে নতুন একটি নাটক লেখা শুরু করেছিলেন; শতাধিক কবিতা তিনি রচনা করেছেন। রুগ্ণতার কাছে হার মানেননি কবি। কবিতার কাছে আত্মসমর্পণ করেছেন।

প্রিয় কবি-নাট্যকার সৈয়দ শামসুল হকের ৮০তম জন্মজয়ন্তী গত বছরের ২৭ ডিসেম্বর আমরা সাড়ম্বরে উদ্যাপন করি। শংসাবচন লেখার দায়িত্ব পড়ে আমার ওপর। হয়তো আমারই দুর্বল রচনা। তাঁর জন্মদিনে জাতীয় নাট্যশালার মূল মঞ্চে আয়োজিত সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে সঞ্জীব পুরোহিতকৃত কাঠ-খোদাই কারুশিল্পে উত্কীর্ণ শংসাবচন কবির উদ্দেশে পাঠ করা হয়। গভীর মনোযোগের সঙ্গে কবি তা শোনেন। রচয়িতা হিসেবে আজ আমি গৌরব বোধ করছি!

প্রিয় কবিবিয়োগের এই ক্ষণে সেই শংসাবচনটিতে আবার চোখ বুলিয়ে নিতে চাই।

‘সে এক কবি জন্মেছিল এই বাংলায়

হেমন্তের সোনালি রোদ গায়ে মেখে

তারপর কত গ্রীষ্ম বর্ষা শরৎ হেমন্ত

শীত বসন্ত পার হয়ে সেই কবি

দুহাতে সৃষ্টি করছে অবিরল

অমর সব কাব্য’

সেই কবি আর কেউ নন, আমাদেরই সৈয়দ শামসুল হক। তাঁর হাতে বাংলা নাটক পেয়েছে নতুন ভাষা, বীরঙ্গনার দীর্ঘশ্বাসে ভারী হয়ে ওঠে বাংলাদেশ, নূরলদীনের পুনর্জন্ম হয় এই বাংলায়। বাঙালি জাতিসত্তার বিশাল দিগন্তপানে সচেতন দৃষ্টিপাতে তিনি জানান যে ‘আমি তো এসেছি চর্যাপদের অক্ষরগুলো থেকে আমি তো এসেছি জয় বাংলা বজ্রকণ্ঠ থেকে। ’ সহসাই আমরা বাঙালি পরিচয়ে গৌরব বোধ করি এবং এ কথা আমাদের অন্তর্গত হয়ে যায় যে আমরা এ কালের হোমারের মুখোমুখি, মুগ্ধতার রেশ কাটে না বোধের।

শিল্প-সাহিত্যে নতুন কালের হে স্রষ্টা, তোমার শিল্পসৃষ্টির উল্লাসে মাতোয়ারা এ জনপদের মানুষের প্রণতি গ্রহণ করো। তোমার ভাষাতেই তো জেগে ওঠে, দুলে ওঠে, নেচে ওঠে বাংলাদেশ। তোমাকে অভিবাদন।

 

লেখক : নাট্য ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব

 


মন্তব্য