kalerkantho

রবিবার। ৪ ডিসেম্বর ২০১৬। ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৩ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


থেমে গেল পায়ের আওয়াজ

নওশাদ জামিল   

২৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



থেমে গেল পায়ের আওয়াজ

ছবি : নাসির আলী মামুন/ফটোজিয়াম

এক জনপদের কথা ঘুরেফিরে আসত তাঁর রচনায়—জলেশ্বরী। নদীঘেরা সেই অঞ্চলটি ছিল সৈয়দ শামসুল হকের কল্পনারাজ্য।

এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, ‘জলেশ্বরী আমার কল্পিত একটি অঞ্চল। তবে অবশ্যই সেটা আমার গ্রাম। আমার জন্মস্থান কুড়িগ্রাম। ’ কুড়িগ্রামের মানুষ, আবহ; কুড়িগ্রামের শীত-গ্রীষ্ম, দারিদ্র্য, নদীভাঙন সব কিছুকে জাদুর কলমে তুলে ধরতেন সৈয়দ শামসুল হক। বস্তুত এই জলেশ্বরী বাংলাদেশেরই এক অবয়ব। কী কবিতায়, কী গল্পে, উপন্যাস বা নাটকে—সৈয়দ শামসুল হক জয়গান গেয়েছেন সেই কল্পরাজ্যের। সেই জলেশ্বরীর জাদুকর আর নেই। ফুসফুসের ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে গতকাল মঙ্গলবার বিকেল ৫টা ২৬ মিনিটে রাজধানীর ইউনাইটেড হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়।

সৈয়দ হক তাঁর কালজয়ী এক কবিতায় বলেছিলেন, ‘এ বড় দারুণ বাজি, তারে কই বড় বাজিকর/যে তার রুমাল নাড়ে পরানের গহীন ভিতর। ’ বাংলা সাহিত্যের সেরা জাদুকরদের অন্যতম তিনি, যিনি প্রাণের গভীরে রুমাল নাড়তে পারেন! এই জাদুকর প্রায় সত্তর বছর ধরে শিল্প-সাহিত্যের নানা শাখায় ছিলেন সদা সক্রিয়। চিকিৎসাধীন অবস্থায়ও থামেনি তাঁর জাদুর কলম। শেষ দিকে কলম ধরতে পারতেন না কর্কট যন্ত্রণায়, কিন্তু সহধর্মিণী আনোয়ারা সৈয়দ হকের অনুলিখনে তিনি ছিলেন সক্রিয়। অবশেষে গতকাল বিকেলে থেমে গেল তাঁর জাদুর কলম। সাহিত্যের সব শাখা-প্রশাখায় বীরদর্পে বিচরণকারী সৈয়দ শামসুল হকের বয়স হয়েছিল ৮১ বছর। তিনি স্ত্রী, এক ছেলে ও এক মেয়ে রেখে গেছেন। তাঁর স্ত্রী আনোয়ারা সৈয়দ হকও লেখক এবং পেশায় মনোরোগ চিকিৎসক।

বরেণ্য এ লেখকের মৃত্যুর খবর জানার সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশের শিল্প-সাহিত্যাঙ্গনে নেমে আসে শোকের ছায়া। রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গভীর শোক প্রকাশ করেছেন।

আজ বুধবার সকাল ১১টায় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে সবার শ্রদ্ধা-ভালোবাসায় সিক্ত হবেন সব্যসাচী এ লেখক। পরে শেষ ঘুমে শায়িত হবেন নিজের জেলা কুড়িগ্রামে, যে মাটিতে ৮১ বসন্ত আগে তাঁর জন্ম হয়েছিল। গতকাল রাতে হাসপাতাল থেকে সৈয়দ হকের মরদেহ তাঁর গুলশানের বাসায় নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে লাশের গোসল শেষে প্রথম জানাজাও হয়। পরে রাতে কফিন রাখা হয় হাসপাতালের হিমঘরে।

আজ শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য সকাল ১০টায় কফিন নিয়ে যাওয়া হবে বাংলা একোডেমি প্রাঙ্গণে। ১৯৬৬ সালে মাত্র ২৯ বছর বয়সে বাংলা একাডেমি পুরস্কার পেয়েছিলেন তিনি। পরে বাংলা একাডেমি থেকে সকাল ১১টায় সৈয়দ হকের কফিন নিয়ে যাওয়া হবে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে। সেখানে সর্বস্তরের মানুষ শেষবারের মতো বিদায় জানাবে তাঁকে।

জোহরের নামাজের পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় মসজিদে আরেক দফা জানাজা শেষে সৈয়দ হককে নিয়ে যাওয়া হবে কুড়িগ্রামে। শেষ ইচ্ছা অনুযায়ী কুড়িগ্রাম সরকারি কলেজ প্রাঙ্গণে তাঁকে সমাহিত করা হবে। গত বছর নভেম্বরে কলেজ চত্বরে আয়োজিত এক গুণীজন সংবর্ধনা ও সাহিত্যকথন অনুষ্ঠানে তিনি তাঁর এই শেষ ইচ্ছার কথা জানান। কলেজ কর্তৃপক্ষ ওই সময়ই সরকারের অনুমোদন নিয়ে লেখকের ইচ্ছার প্রতি সম্মান জানানোর সিদ্ধান্ত নেয়।

ফুসফুসে ক্যান্সার আক্রান্ত সব্যসাচী লেখক চিকিৎসার জন্য এপ্রিলে লন্ডন যান। সেখানে রয়্যাল মার্সেডন হাসপাতালে তাঁর শরীরে ছয়টি কেমোথেরাপি দেওয়া হয়। চিকিৎসা ব্যর্থ হওয়ায় ১ সেপ্টেম্বর সৈয়দ হক দেশে ফিরে আসেন। ৩ সেপ্টেম্বর থেকে তাঁর শরীরে দ্বিতীয় পর্যায়ে ছয়টি কেমোথেরাপি প্রদানের সিদ্ধান্ত নেন ইউনাইটেড হাসপাতালের চিকিৎসকরা। সেখানেই চলছিল তাঁর চিকিৎসা। গত ১০ সেপ্টেম্বর হাসপাতালে তাঁকে দেখতে যান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এ সময় প্রধানমন্ত্রী তাঁর চিকিৎসার পুরো ব্যয়ভার নেওয়ার ঘোষণা দেন। গত সোমবার দুপুরে সৈয়দ হকের শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাঁকে আইসিইউতে নেওয়া হয়। গতকাল মঙ্গলবার ভোর থেকে কৃত্রিম উপায়ে তাঁকে শ্বাসপ্রশ্বাস দেওয়া শুরু হয়। বিকেলে তিনি মারা যান।

বয়স যখন এগারো কী বারো, তখন টাইফয়েডে শয্যাশায়ী কিশোর সৈয়দ শামসুল হক বাড়ির পাশের সজনে গাছে বসা লাল টুকটুকে পাখি দেখে কী এক অব্যক্ত বেদনাতেই লিখেছিলেন কবিতা। সেই শুরু। সেই কবিতার প্রথম দুটি পঙিক্ত হলো : ‘আমার ঘরে জানালার পাশে গাছ রহিয়াছে/তাহার উপরে দু’টি লাল পাখি বসিয়া আছে। ’ বারো বছরের ওই কিশোরই পরে বাংলা সাহিত্যে আবির্ভূত হন শক্তিমান লেখক হিসেবে।

সৃজনশীলতার সব শাখায় সৈয়দ শামসুল হকের ছিল অবাধ চলন। কবিতা, গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ, নাটক, চিত্রকলা, সংগীত, অনুবাদ, সমালোচনাসহ সৃজনশীলতার প্রতিটি শাখায় তিনি বিচরণ করেছেন বীরদর্পে। নতুন প্রকাশভঙ্গির বাসনায় তিনি চষে বেড়িয়েছেন সাহিত্যের প্রতিটি শাখা-প্রশাখা। সৈয়দ হকের ওই ভাষা অন্বেষার দেখা মেলে তাঁর কবিতায়। এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, ‘কবিতাই হলো আমার লেখালেখির নাভি। মূল কেন্দ্র। পরে তা ছড়িয়েছে অন্য শাখায়। এর মধ্য দিয়ে জীবনকে দেখার ভঙ্গি, ব্যাখ্যার নিজস্ব ভাষা তৈরি করতে চেয়েছি। ’

সৈয়দ শামসুল হকের জন্ম ১৯৩৫ সালের ২৭ ডিসেম্বর কুড়িগ্রাম শহরের থানাপাড়ায়। বাবা সিদ্দিক হুসাইন, মা হালিমা খাতুন। বাবা চাইতেন ছেলে ডাক্তার হোক। কিন্তু তিনি ওই চাপ এড়াতে ১৯৫১ সালে ভারতের মুম্বাইয়ে পালিয়ে যান। সেখানে বছরখানেক একটি সিনেমা প্রোডাকশন হাউসে সহকারী হিসেবে কাজ করেন। এরপর দেশে ফিরে নিজের ইচ্ছাতেই ভর্তি হন জগন্নাথ কলেজের মানবিক শাখায়। ১৯৫৪ সালে তিনি ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে। তবে কিছুদিন পরেই পড়াশোনায় ইস্তফা দেন। এর পরই প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম উপন্যাস ‘দেয়ালের দেশ’। বাবার মৃত্যুর পর ১৯৫৬-৫৭ সালে বেশ অর্থকষ্টে পড়ে যান সৈয়দ হক। ওই সময় টাকার জন্যই তিনি শুরু করেন চলচ্চিত্রের চিত্রনাট্য রচনা। ১৯৫৭ থেকে ১৯৭০ সাল পর্যন্ত সৈয়দ হক ৩০টির মতো চলচ্চিত্রের চিত্রনাট্য রচনা করেন। তাঁর লেখা ‘মাটির পাহাড়’, ‘তোমার আমার’, ‘রাজা এল শহরে’, ‘শীত বিকেল’, ‘সুতরাং’, ‘কাগজের নৌকা’ ইত্যাদি চলচ্চিত্র দর্শকপ্রিয় হয়। সৈয়দ হক চলচ্চিত্রের জন্য গানও রচনা করেন। ‘এমন মজা হয় না গায়ে সোনার গয়না’, ‘এই যে আকাশ এই যে বাতাস’, ‘তুমি আসবে বলে কাছে ডাকবে বলে’, ‘হায়রে মানুষ রঙিন ফানুস’, ‘তোরা দেখ দেখ দেখরে চাহিয়া’ ইত্যাদি গান সমৃদ্ধ করে বাংলা চলচ্চিত্রকে। তবে চলচ্চিত্র অঙ্গনে ব্যস্ততার মধ্যেও থেমে থাকেনি সৈয়দ শামসুল হকের কবিতা কিংবা ছোট গল্প রচনা। ১৯৬১ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর কাব্যগ্রন্থ ‘একদা এক রাজ্যে’। ১৯৫৪ থেকে ১৯৬৭ সাল পর্যন্ত লেখা তাঁর ছোট গল্পগুলোর মধ্যে রয়েছে ‘তাস’, ‘শীত বিকেল’, ‘রক্ত গোলাপ’ প্রভৃতি। সৈয়দ হকের উপন্যাসের মধ্যে রয়েছে ‘এক মহিলার ছবি’, ‘অনুপম দিন’, ‘সীমানা ছাড়িয়ে’, ‘নীল দংশন’, ‘স্মৃতিমেধ’, ‘মৃগয়া’, ‘এক যুবকের ছায়াপথ’, ‘বনবালা কিছু টাকা ধার নিয়েছিল’, ‘ত্রাহি’, ‘তুমি সেই তরবারি’, ‘কয়েকটি মানুষের সোনালী যৌবন’, ‘নির্বাসিতা’, ‘খেলারাম খেলে যা’, ‘মেঘ ও মেশিন’, ‘ইহা মানুষ’, ‘বালিকার চন্দ্রযান’, ‘আয়না বিবির পালা’ প্রভৃতি। সৈয়দ হকের লেখা কাব্যগ্রন্থগুলোর মধ্যে ‘বৈশাখে রচিত পংক্তিমালা’, ‘বিরতিহীন উৎসব’, ‘প্রতিধ্বনিগণ’, ‘পরানের গহীন ভিতর’ উল্লেখযোগ্য।

বাংলা মঞ্চ নাটকেও শক্তিমান এক পুরুষ হিসেবে নিজের লেখনীর প্রমাণ দিয়েছেন সৈয়দ হক। এ পর্যন্ত প্রকাশিত ২৫টি নাটকে তিনি ফুটিয়ে তুলেছেন এমন শিল্পশস্যরাজি, যা বাংলা নাটকের অবিচ্ছেদ্য অংশ। বিশেষত কাব্যনাটক রচনায় তিনি আধুনিক বাংলা ভাষায় দ্বিতীয়রহিত। মুক্তিযুদ্ধনির্ভর ‘পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়’ মুক্তিযুদ্ধের দলিল হিসেবেই পরিগণিত। এ নাটকটিতে দেখা যায়, চারদিকে মুক্তিযুদ্ধের দামামা। উদ্বেগ-উত্তেজনা ছোট-বড় সবার মধ্যে। গ্রামের নারী-পুরুষ এসেছে মাতব্বরের কাছে। তাদের চোখে-মুখে উৎকণ্ঠা। মাতব্বর পাকিস্তানি বাহিনীর ওপর ভরসা রাখতে গিয়ে বলেন, গত রাতেই পাকিস্তানি এক ক্যাপ্টেনের সঙ্গে দেখা হয়েছে তাঁর। সহজ-সরল গ্রামবাসী সহজে আশ্বস্ত হতে পারে না মাতব্বরের কথায়। এভাবে নানা ঘটনার ঘনঘটায় এগিয়ে যায় নাটকের কাহিনী। একসময় ঘর থেকে বের হন মাতব্বরের মেয়ে। সবার সামনে বলেন, বাবা জোর করে তাঁকে ওই রাতে ক্যাপ্টেনের হাতে তুলে দিয়েছিলেন। পরে সেই বীরাঙ্গনা আত্মাহুতি দেন। অবশ্য নিস্তার মেলেনি রাজাকার মাতব্বরের। নিজের পাইকের হাতেই নির্মমভাবে মারা পড়েন তিনি। এ সময় পাইক বলেন, ‘আপনার কোনো ইমান ছিল না। ’ এ ছাড়া কাব্যনাটক ‘নূরলদীনের সারা জীবন’ তাঁকে শুধু খ্যাতিই দেয়নি, বাংলা নাট্যাঙ্গনে অমর করে রাখবে। ‘আবার নূরলদীন একদিন আসিবে বাংলায়,/আবার নূরলদীন একদিন কালপূর্ণিমায় এসে দিবে ডাক—/জাগো বাহে, কোনঠে সবায়...। ’ সৈয়দ শামসুল হকের অসাধারণ কাব্যনাটক ‘নূরলদীনের সারা জীবন’-এর সংলাপ এটি। এ পঙিক্ত এখনো মানুষের মুখে মুখে ফেরে। নাট্যমঞ্চ থেকে রাজপথ—জীবনের সর্বত্র জেগে ওঠার এক মন্ত্র যেন এটি। সৈয়দ হকের লেখা অন্যান্য নাটকের মধ্যে রয়েছে ‘গণনায়ক’, ‘ঈর্ষা’, ‘নারীগণ’, ‘উত্তরবংশ’ ইত্যাদি।

অগণিত পাঠকের ভালোবাসার পাশাপাশি দেশের সব প্রধান পুরস্কারই নিজের অর্জনের খাতায় জমা করেছেন সৈয়দ শামসুল হক। উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হলো বাংলা একাডেমি পদক, একুশে পদক, স্বাধীনতা পদক, আদমজী সাহিত্য পুরস্কার, পদাবলী কবিতা পুরস্কার, জাতীয় কবিতা পুরস্কার প্রভৃতি।

রাষ্ট্রপতির শোক : এক শোকবার্তায় রাষ্ট্রপতি বলেন, সৈয়দ শামসুল হক বাংলা সাহিত্যের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। সাহিত্যের সর্বক্ষেত্রে তাঁর নন্দিত বিচরণ বাংলার সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে তাঁকে অমর করে রাখবে।

প্রধানমন্ত্রীর শোক : প্রধানমন্ত্রীর প্রেসসচিব ইহসানুল করিম টেলিফোনে রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থাকে (বাসস) জানান, যুক্তরাষ্ট্র সফরের শেষ পর্যায়ে বর্তমানে ওয়াশিংটন ডিসিতে অবস্থানরত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গভীর শোক নিয়ে এই খবর শুনেছেন।

প্রেসসচিব জানান, সৈয়দ শামসুল হককে জাতির বিবেক হিসেবে অভিহিত করেছেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেছেন, ‘দেশ এমন একজন লেখককে হারাল যিনি ছিলেন সত্যের প্রতি সমর্পিত। ’

প্রধানমন্ত্রী সৈয়দ শামসুল হকের শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান।

শোকে স্তব্ধ সবাই : সব্যসাচী লেখকের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছে বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক সংগঠন। এগুলোর মধ্যে রয়েছে বাংলা একাডেমি, শিল্পকলা একাডেমি, জাতীয় জাদুঘর, জাতীয় কবিতা পরিষদ, জাসদ, উদীচী, বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাতীয় পার্টি, বাসদ ইত্যাদি।

জাতীয় সংসদের স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী গভীর শোক প্রকাশ করে বলেছেন, সৈয়দ শামসুল হকের মৃত্যুতে বাংলাদেশ একজন প্রখ্যাত লেখক, কবি, নাট্যকার এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ধারক ও বাহককে হারাল। তাঁর মৃত্যু দেশের জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি।

এক শোকবার্তায় সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর বলেন, সৈয়দ শামসুল হক বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির বরপুত্র। তাঁর কলমের স্পর্শে আমাদের সাহিত্য জগৎ সমৃদ্ধ হয়েছে, পূর্ণতা পেয়েছে বাঙালি মানস। মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ধারণ করে তিনি দেশ ও জাতির কল্যাণে কাজ করে গেছেন সারা জীবন। তাঁর এ মহাপ্রয়াণ আমাদের জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি, আমাদের সাহিত্য ও সংস্কৃতির জন্য এক বড় দুঃসংবাদ।

শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ বলেন, সৈয়দ শামসুল হক তাঁর রচনার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের গৌরবান্বিত মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে অম্লান করে রেখেছেন। যত দিন বাংলাদেশ থাকবে, তত দিন তিনিও থাকবেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক বলেন, প্রগতিশীল চিন্তাধারার এক মুক্তবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ ছিলেন সৈয়দ শামসুল হক। তাঁর লেখনী মুক্তবুদ্ধির চেতনার পক্ষে এবং মুক্তিযুদ্ধের আদর্শকে ছড়িয়ে দেওয়ার অনুপ্রেরণা হিসেবে বাঙালি পাঠকের কাছে নন্দিত হয়েছে।

বিশিষ্ট কবি বেলাল চৌধুরী বলেন, মুক্তিযুদ্ধ-উত্তর সময় নিয়ে ‘পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়’ বা ফকির বিদ্রোহের পটভূমিতে নূরলদীনের সারা জীবন’-এর মতো কালজয়ী নাটক যাঁর হাত দিয়ে বের হয়, তিনি যে কত বড় মাপের লেখক এবং নাট্যকার তা বোধ করি বিশদ করাটা বাহুল্যেরই শামিল। সৃজনশীল রচনার মধ্য দিয়ে সৈয়দ শামসুল হক নিজেকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন।

সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম বলেন, ‘আমাদের সময়ের প্রতিভাবান সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হক শেষ পর্যন্ত চলে গেলেন। আমাদের সবার ইচ্ছা এবং ভালোবাসাও তাঁকে ধরে রাখতে পারল না। তবে তাঁর এই যাত্রার ধ্বনি সমকাল শুনবে। মহাকালে বাজবে। তিনি জরাকে জয় করেছেন, ভয়কে পরাস্ত করেছেন এবং তাঁর নূরুলদীনের মতো সবাইকে জাগরণের ডাক দিয়ে গেছেন। ’

সৈয়দ হকের মৃত্যুতে শোকবার্তায় উদীচীর কেন্দ্রীয় সংসদের সভাপতি কামাল লোহানী ও প্রবীর সরদার বলেন, আধুনিককালে বাংলা সাহিত্যের প্রায় সব ক্ষেত্রেই বিচরণ ছিল তাঁর। কবিতা, প্রবন্ধ, ছোটগল্প, উপন্যাস, কথা কাব্য, অনুবাদ সাহিত্য, শিশু সাহিত্যসহ অন্যান্য ক্ষেত্রে অনন্য প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন সৈয়দ হক। তাঁর রচিত কাব্যনাট্য ‘নূরুলদীনের সারা জীবন’ সর্বস্তরের মানুষের কাছে বিশেষ গ্রহণযোগ্যতা পায়। তাঁর মৃত্যুতে বাংলা সাহিত্যের এক উজ্জ্বল অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি ঘটল।

 


মন্তব্য