kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ৮ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৭ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


রাজনীতি

আগে দল পুনর্গঠনে দৃষ্টি বিএনপির

শফিক সাফি   

২৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



আগে দল পুনর্গঠনে দৃষ্টি বিএনপির

রাজনৈতিক আন্দোলনে মাঠ পর্যায়ে কর্মসূচি বাস্তবায়নে প্রধান দায়িত্বটা পালন করে থাকেন মূলত সংশ্লিষ্ট দলের মধ্যম পর্যায়ের নেতারা। দেশের অন্যতম বড় রাজনৈতিক দল বিএনপির ক্ষেত্রেও বরাবর এমনটাই হয়ে আসছে।

মধ্যম পর্যায়ের নেতারা নির্দেশ পান বিএনপি এবং এর অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের শীর্ষস্থানীয় নেতাদের কাছ থেকে। বিএনপির এই মধ্যম পর্যায়ের নেতাদের ভাষ্য—দল সুসংগঠিত না থাকলে আন্দোলনকে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে টেনে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হয় না। তাই আগে দল পুনর্গঠন করাটা জরুরি।

বিএনপির মধ্যম পর্যায়ের বেশ কয়েকজন শীর্ষস্থানীয় নেতা বলেছেন, দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটির নেওয়া সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে তাঁরা সব সময়ই প্রস্তুত থাকেন। তবে সাম্প্রতিক সময়ে মাঠের রাজনীতি গরম করার মতো কোনো কর্মসূচি আসতে পারে এমন নির্দেশনা বা আভাস তাঁদের কাছে এখনো পৌঁছেনি।

সূত্রে জানা গেছে, আন্দোলনের মূল চালিকাশক্তি মধ্যম পর্যায়ের নেতাদের মতামত নীতিনির্ধারক পর্যায়েও গুরুত্ব পাচ্ছে। বিএনপি এখন মূলত স্বল্পমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে রাজনীতি করছে। এই পরিকল্পনার আওতায় দল এবং অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলো পুনর্গঠন চলছে। একই সঙ্গে গুরুত্ব পাচ্ছে সারা দেশে ৭৫টি

সাংগঠনিক জেলার নতুন কমিটি গঠন। দ্বিতীয় পর্যায়ে নেতারা নামবেন গণসংযোগে। এই পর্যায়ে প্রথমে দলের সিনিয়র নেতারা বিভিন্ন স্থানে কমিটি গঠনের পাশাপাশি সভা-সমাবেশ করবেন। এসব কর্মসূচিতে তাঁরা নির্দলীয় সরকারের অধীন জাতীয় নির্বাচন, নির্বাচন কমিশন (ইসি) পুনর্গঠন, রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র, দলের নেতাকর্মীদের নামে মামলা-হামলাসহ নানা বিষয় তুলে ধরবেন। দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াও সিনিয়র নেতাদের এসব কর্মসূচিতে যোগ দেবেন। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় বিশেষ করে বিভাগীয় শহরগুলোতে গণসংযোগের পরিকল্পনা রয়েছে তাঁর। জনসম্পৃক্ত ইস্যুগুলো তুলে ধরে তিনি মাঠের ভবিষ্যৎ আন্দোলনের বিষয়ে আভাস দেবেন। এরপর তৃতীয় পর্যায়ে গিয়ে বিএনপিপ্রধান সরকারবিরোধী আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণা করবেন।

জানতে চাইলে দল পুনর্গঠনের সঙ্গে যুক্ত বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান মোহাম্মদ শাহজাহান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা আন্দোলনের মধ্যেই আছি। বিভিন্ন বিষয়ে সভা-সমাবেশ বা সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে আমরা সরকারের নানা দুর্নীতি ও অনৈতিক বিষয়গুলো তুলে ধরছি। এটাও আন্দোলনের অংশ। ’ তিনি বলেন, ‘কমিটি গঠনের কাজ শুরু হয়েছে। আশা করি আগামী মাসের মধ্যে বেশ কয়েকটি জেলার নতুন কমিটি সম্মেলনের মাধ্যমে ঘোষণা করতে পারব। পুনর্গঠন প্রক্রিয়া শেষে দলীয়প্রধান সিদ্ধান্ত নেবেন কখন সরকারবিরোধী আন্দোলনে আমরা রাস্তায় নামব। ’

তবে বিএনপির স্থায়ী কমিটির এক সদস্য জানান, আগামী ডিসেম্বরের আগে হরতাল বা অবরোধের মতো সরকারবিরোধী কঠোর কোনো কর্মসূচিতে যাওয়ার পরিকল্পনা আপাতত দলের নেই।

খালেদা জিয়া গত বৃহস্পতিবার পবিত্র হজ পালন শেষে দেশে ফিরে শনিবার রাতে গুলশানে প্রথম অফিস করেন। রাত ৯টা ১০ মিনিটে নিজ কার্যালয়ে এলে তাঁকে অভ্যর্থনা জানান দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য তরিকুল ইসলাম, মির্জা আব্বাস, ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল আউয়াল মিন্টু, শওকত মাহমুদ, কোষাধ্যক্ষ মিজানুর রহমান সিনহাসহ বেশ কয়েকজন নেতা। পরে তিনি দলের কয়েকজন সিনিয়র নেতার কাছ থেকে দেশের পরিস্থিতি সম্পর্কে অবগত হন।

গুলশান কার্যালয়ে ওই রাতে উপস্থিত ছিলেন এমন এক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বেগম জিয়া দেশের পরিস্থিতি অবগত হওয়ার পাশাপাশি দল নিয়ে তাঁর নানা পরিকল্পনার কথা জানান। তিনি চাচ্ছেন সারা দেশে প্রতিটি ইউনিয়ন থেকে কমিটি হবে। থানা, উপজেলা, পৌরসভা এবং জেলা কমিটিও হবে। স্বেচ্ছাসেবক দলের কমিটি হবে খুব শিগগিরই। পরে যুবদলের কমিটি ঘোষণা করা হবে। মহিলা দলেরও কমিটি হবে। এসব কমিটি গঠন শেষে আন্দোলনে মাঠে নামা হবে। জনসম্পৃক্ত দাবিগুলোকে সামনে এনেই আন্দোলনে যাবে বিএনপি।

শনিবার রাতের ওই আলোচনায় বিএনপির নতুন কমিটিতে স্থান পাওয়া ও বঞ্চিত হওয়া নেতাদের বিষয়ে খালেদা জিয়ার মতামত এসেছে। তিনি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, যাঁরা দায়িত্ব পেয়েছেন তাঁরা বসে থাকলে পদ থাকবে না। নিয়মিত তাঁদের কাজের অগ্রগতি প্রতিবেদন তিনি অবহিত হবেন। আর যাঁরা পদ পাননি তাঁদের পর্যায়ক্রমে স্বেচ্ছাসেবক দল ও যুবদলে জায়গা দেওয়া হবে। এখন পদের আশায় তাঁরা কাজ না করলে পদ পাওয়ার সম্ভাবনাও ক্ষীণ হয়ে যাবে।

বিএনপির ঢাকা বিভাগের কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক শহীদুল ইসলাম বাবুল ও জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য বজলুল করিম চৌধুরী আবেদ এক প্রশ্নের জবাবে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আশা করি চলতি বছরের শেষের দিকে দল পুনর্গঠনকাজ অনেকাংশে শেষ হয়ে যাবে। ওই সময়ের মধ্যে নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠনসহ বেশ কিছু জনসম্পৃক্ত ইস্যু চলে আসবে। জনগণের স্বার্থে তখন আমাদের আন্দোলনে নামতেই হবে। ’

টেলিফোনে যোগাযোগ করলে বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল কালের কণ্ঠকে জানান, ৭৫টি সাংগঠনিক জেলার মধ্যে বেশ কয়েকটিতে নিয়মিত কমিটি হয়নি। অনেক জেলা চলছে আহ্বায়ক কমিটি দিয়ে। কোথাও আবার ভারপ্রাপ্তদের দিয়ে চলছে সাংগঠনিক কাজ। এ কারণে নতুন নেতৃত্ব যেমন তৈরি হচ্ছে না, তেমনি জেলার দলীয় কার্যক্রমও থমকে আছে। এর প্রভাব পড়ছে আন্দোলন কর্মসূচিতে। তাই বিএনপিপ্রধান আন্দোলনে নামার আগে এবার দল গুছিয়ে নিতে চান।

এদিকে গত বছরের মে মাসে তৃণমূল পর্যায়ে দল পুনর্গঠনের উদ্যোগ নিয়েছিল বিএনপি। কেন্দ্র থেকে এ জন্য দুই মাসের সময় বেঁধে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু দলের জাতীয় কাউন্সিলসহ বেশ কিছু কারণে সেই প্রক্রিয়া থেমে যায়। তবে কাউন্সিলের আগে ১৫টির মতো জেলায় নতুন কমিটি দিতে পেরেছিলেন দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতারা। সর্বশেষ পবিত্র ঈদুল আজহার আগে ঢাকা জেলা বিএনপির কমিটি ঘোষণা করা হয়েছে। এরপর নতুন করে পুনর্গঠন প্রক্রিয়া শুরু করে এর সমন্বয়কের দায়িত্ব দেওয়া হয় মোহাম্মদ শাহজাহানকে।

বিএনপি মহাসচিব গত আগস্টে দলের নয়াপল্টনের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে যুগ্ম মহাসচিব ও সাংগঠনিক সম্পাদকদের নিয়ে এ বিষয়ে একাধিকবার বৈঠক করেন। ওই সব বৈঠকে পুনর্গঠনকাজ দ্রুত করতে বিভাগওয়ারি বিভিন্ন জেলার নেতাদের সঙ্গে মতবিনিময়ের সিদ্ধান্ত হয়। মাঠে নামার আগে সাংগঠনিক সম্পাদকদের নিজ নিজ বিভাগের সাংগঠনিক প্রতিবেদন কেন্দ্রে জমা দেওয়ারও নির্দেশ দেওয়া হয়। সাংগঠনিক চিত্র তুলে ধরার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট বিভাগের গুম, খুন, আহত, নিহত ও গ্রেপ্তার হওয়া নেতাদের তালিকা দ্রুত কেন্দ্রে পাঠানোরও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

জানতে চাইলে চট্টগ্রাম বিভাগের কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক মাহবুবের রহমান শামীম কালের কণ্ঠকে বলেন, চট্টগ্রাম বিভাগের জন্য ১০টি প্রতিবেদন প্রস্তুত করতে হবে। ইতিমধ্যে আমরা সাতটি প্রতিবেদন চূড়ান্ত করেছি। বাকি তিনটি আগামী মাসে অনুষ্ঠেয় দলের সভার আগেই শেষ করা হবে। তিনি জানান, পুনর্গঠন প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে ইতিমধ্যে নোয়াখালী জেলার সম্মেলনের তারিখ চূড়ান্ত হয়েছে। আগামী ১৯ নভেম্বর সেখানে সম্মেলন হবে। লক্ষ্মীপুর, খাগড়াছড়িসহ আরো কয়েকটি জেলার সম্মেলনের তারিখও চলতি মাসের মধ্যেই চূড়ান্ত করা হবে।


মন্তব্য