kalerkantho

মঙ্গলবার । ৬ ডিসেম্বর ২০১৬। ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৫ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


শহীদ ও যুদ্ধাহতের তালিকায় রাজাকার

আজিজুল পারভেজ   

২৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



শহীদ ও যুদ্ধাহতের তালিকায় রাজাকার

মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে যাঁরা রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা ভোগ করছেন তাঁদের মধ্যে রয়েছে ভুয়া মুক্তিযোদ্ধার ছড়াছড়ি। তালিকায় মুক্তিযুদ্ধ করেনি, শুধু যে এমন লোকজন রয়েছে তাই নয়, আছে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারী রাজাকারও।

বিস্ময়কর হলেও সত্যি, মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়ে যারা মুক্তিযুদ্ধ মানেনি, দেশকে স্বীকার করেনি তারা এখন রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা ভোগ করছে। এমনকি শহীদ মুক্তিযোদ্ধার তালিকায়ও ঢুকে পড়েছে মুক্তিযোদ্ধা নয় কিংবা মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে মারা পড়া চিহ্নিত রাজাকাররা। একইভাবে মুক্তিযুদ্ধে আহত না হয়েও এখন যুদ্ধাহতের রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা ভোগ করছে অনেকেই। যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা ও শহীদ মুক্তিযোদ্ধার তালিকা নিয়ে বিভিন্ন সময়ে প্রশ্ন উঠলেও এই তালিকা দুটি কখনোই যাচাই-বাছাই করা হয়নি।

যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের কতজন প্রকৃত যুদ্ধাহত? : যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতির জন্য আবেদন করে ছয়জন। মন্ত্রণালয়ের যাচাই-বাছাই ও পরীক্ষায় একজনও প্রমাণ করতে পারেনি মুক্তিযুদ্ধকালে আহত হওয়ার বিষয়টি। মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতির জন্য আবেদন করে ১২ জন, কিন্তু যাচাই-বাছাইয়ে আটজনই মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে নিজেদের প্রমাণ করতে পারেনি। জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিলের (জামুকা) গত ১৮ আগস্ট অনুষ্ঠিত ৩৬তম সভায় এই বিষয়গুলো নিষ্পত্তি করা হয়। এভাবে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য বরাদ্দ রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা ভোগ করার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছে কিছু লোক। আর  এভাবেই বেড়ে চলেছে মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা।

জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল গঠিত ‘যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা যাচাই-বাছাই সাবকমিটি’র গত ৬ জুন অনুষ্ঠিত সভায় ‘যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা’ হিসেবে গেজেটভুক্তির ছয়টি আবেদন নিষ্পত্তি করা হয়। আবেদনকারীরা কাগজপত্র ও সরাসরি সাক্ষাৎকার প্রদানকালে যুদ্ধাহত হওয়ার প্রমাণ দিতে না পারায় আবেদন প্রত্যাখ্যান করা হয়।

স্বাধীনতার ৪৫ বছর পরও মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে নিজেকে যুদ্ধাহত প্রমাণ করে রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা ভোগ করার প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। যুদ্ধাহত হিসেবে তালিকাভুক্তির প্রচেষ্টা যেমন অব্যাহত রয়েছে, তেমনি তালিকাভুক্তদের মধ্যে ভুয়া যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা ধরা পড়ার ঘটনাও ঘটছে।

যুদ্ধাহত হিসেবে রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা ভোগকারী মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার সরদার আব্দুল মালেকের বিরুদ্ধে সম্প্রতি হেমায়েত উদ্দিন বীরবিক্রম অভিযোগ করেন যে সরদার আব্দুল মালেক মুক্তিযোদ্ধা হলেও তিনি যুদ্ধাহত নন। এ ব্যাপারে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থা ও মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্টকে প্রতিবেদন দিতে বললে গোয়েন্দা সংস্থা তাঁকে যুদ্ধাহত নয়, আর ট্রাস্ট তাঁকে যুদ্ধাহত হিসেবে প্রতিবেদন দেয়। প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে তাঁর যুদ্ধাহতের গেজেট বাতিলের সিদ্ধান্ত নিয়েছে জামুকা।

মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্ট সূত্রে জানা যায়, যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তালিকাভুক্তরা চারটি ক্যাটাগরিতে মাসিক ৯ হাজার ৭০০ টাকা থেকে শুরু করে ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত রাষ্ট্রীয় সম্মানী ভাতাসহ অন্য সুযোগ-সুবিধা পেয়ে থাকেন। মাসিক ভাতা ছাড়াও যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধার পরিবার রেশনসামগ্রী হিসেবে চাল, আটা, চিনি, ভোজ্য তেল, ডাল পেয়ে থাকে। সর্বোচ্চ চারজনের পরিবারের জন্য ৮৬ কেজি রেশনসামগ্রী বরাদ্দ দেওয়া হয়। এ ছাড়া বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানির বিল ও হোল্ডিং ট্যাক্স মওকুফের সুবিধা ভোগ করে থাকেন মুক্তিযোদ্ধারা। সরকারি পরিবহনে বিনা মূল্যে যাতায়াত সুবিধা ও ভিআইপি লাউঞ্জ কিংবা কেবিন ব্যবহারের সুযোগও আছে তাঁদের জন্য। যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের বিদেশে চিকিৎসার জন্য ট্রাস্টের মাধ্যমে সর্বোচ্চ আট লাখ টাকা পর্যন্ত সহায়তা প্রদানের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।

বর্তমানে যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধার সুবিধা ভোগ করছেন পাঁচ হাজার ২৭ জন। কিন্তু সুযোগ-সুবিধা বাড়তে থাকার সঙ্গে ‘যুদ্ধাহত’ উপাধি পেতে আগ্রহীর সংখ্যাও বাড়তে থাকে। যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তালিকাভুক্তির জন্য মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়ের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্টে ২০১৪ সালের এপ্রিল পর্যন্ত ৯ হাজার ৮১৫ জনের আবেদন জমা পড়ে। ২০১৪ সালে বর্তমান মন্ত্রী দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা যাচাই-বাছাইয়ে কড়াকড়ি আরোপ করা হয়। বর্তমানে যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তালিকাভুক্তির জন্য কেউ আবেদন করলে মুক্তিযুদ্ধের সময়ের চিকিৎসার কাগজপত্র চাওয়া হয়। পঙ্গুত্ব নির্ধারণের জন্য সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালের বিশেষজ্ঞ প্যানেলের মুখোমুখি হতে হয় আবেদনকারীকে। এ কারণে অনেকে আবেদন করলেও শেষ পর্যন্ত পরীক্ষার মুখোমুখি হওয়ার হার কমে এসেছে। যাঁরা আবেদন করেছেন তাঁদের আবেদন উপজেলা পর্যায়ে যাচাই-বাছাই হবে বলে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে।

জানা যায়, স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্ট গঠিত হওয়ার পর যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধার তালিকাভুক্তি এবং তাঁদের রাষ্ট্রীয় ভাতা দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়। তখন কল্যাণ ট্রাস্টে নিয়োজিত ডাক্তার যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে পঙ্গুত্বের মাত্রা নির্ধারণ করে রিপোর্ট দিতেন। সেই রিপোর্টের ভিত্তিতেই কল্যাণ ট্রাস্টের বোর্ড অব ট্রাস্টিজের সভায় যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে অনুমোদন দেওয়া হতো। অনেকেই যুদ্ধাহত না হয়েও বিশেষ সুবিধালাভের জন্য আঁতাতের মাধ্যমে কল্যাণ ট্রাস্টের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের বিশেষ সুবিধা প্রদান করে যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি আদায় করে রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা ভোগ করছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

মুক্তিযোদ্ধা তালিকায় রাজাকার, ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা : মুক্তিযুদ্ধ না করেও মুক্তিযোদ্ধার দাবিদার যেমন কয়েক হাজার, তেমনি রাজাকাররাও মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। বিভিন্ন সময়ে যেসব ভুয়া মুক্তিযোদ্ধার সনদ ও গেজেট বাতিল হচ্ছে তার মধ্যে কয়েকজন রাজাকারও ছিল।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, মুক্তিযুদ্ধ না করেই যে কেবল মুক্তিযোদ্ধা হয়ে যাচ্ছে তাই নয়, মুক্তিযুদ্ধবিরোধী ভূমিকার কারণে দালাল আইনে গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিরাও মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়ে মুক্তিযোদ্ধার সুযোগ-সুবিধা ভোগ করছে। কুমিল্লার মুরাদনগর উপজেলার দায়রা ইউনিয়নের পদুয়া গ্রামের আব্দুল আলিমের ছেলে মো. জব্বর আলী ওরফে রুক্কু মিয়া দালাল আইনে (মামলা নং ১২/৭২) গ্রেপ্তার হয়েছিল। সাধারণ ক্ষমার সুযোগে ১৯৭৪ সালে মুক্তি পাওয়া এই ব্যক্তি মুক্তিযোদ্ধা সংসদের ১৯৯৬ সালে মুক্তিবার্তার লাল বইয়ে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয়। এখন রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা ভোগ করছে সে।

নড়াইলের মুলদাইড় গ্রামের শেখ আবদুল হামিদ ও ঝিকড়া গ্রামের মতিয়ার রহমান নামের দুজন মুক্তিযোদ্ধার তালিকাভুক্ত হলেও তারা দুজন ছিল রাজাকার। কেবল তাই নয়, তাদের বিরুদ্ধে রয়েছে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে মুক্তিযোদ্ধার সম্মানী ভাতাসহ সব সুযোগ-সুবিধা ভোগ করে আসছিল সে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থার সমন্বয়কের কাছ থেকে এ ব্যাপারে অভিযোগ পাওয়ার পর জামুকা তাদের গেজেট ও সনদ বাতিলের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি, সাময়িক সনদ ও গেজেটে অন্তর্ভুক্তির বিষয়ে জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিলের (জামুকা) গত ১৮ আগস্ট অনুষ্ঠিত ৩৬তম সভায় ১২টি আবেদন নিষ্পত্তি করা হয়। এর মধ্যে আট আবেদনকারীই ছিল ভুয়া।

ডিএমপির মোহাম্মদপুর ট্রাফিক জোনের সহকারী পুলিশ কমিশনার আমিরুল ইসলাম মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি, গেজেট ও সনদের জন্য আবেদন করলে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী নিজে তাঁর সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেন। কিন্তু তিনি নিজেকে মুক্তিযোদ্ধা প্রমাণ করতে পারেননি।

মোশাররফ হোসেন খান ও এস এম জাহাঙ্গীর হোসেনের মুক্তিযোদ্ধা দাবির বিষয়টি আদালত পর্যন্ত গড়ায়। সর্বশেষ মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী তাদের সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেন। কিন্তু তারা নিজেদের মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে প্রমাণ করতে পারেনি।

এ ছাড়া ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা অভিযোগে ফরিদপুরের সদরপুর উপজেলার মোলামের ডাংগী গ্রামের আব্দুল মালেক (পিতা আলম বেপারী), ঢাকার ধামরাই উপজেলার বড়নালাই গ্রামের আবদুস সালাম (পিতা হাজি ইয়াছিন আলী), চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গা উপজেলার দক্ষিণ গোবিন্দপুর গ্রামের মিজানুর রহমান (পিতা মহিউদ্দিন মোল্লা) ও কুমিল্লার আদর্শ সদর উপজেলার পালপাড়া গ্রামের সহিদুর রহমানের (পিতা আবিদ আলী) মুক্তিযোদ্ধা গেজেট ও সাময়িক সনদ বাতিল করা হয়েছে।

এর আগে গত বছরের ৩১ জুন অনুষ্ঠিত জামুকার ৩০তম সভায় ‘ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা’—এমন অভিযোগে সুনামগঞ্জের জামালগঞ্জ উপজেলার শাহাবুদ্দিন চৌধুরী ও নবাব মিয়ার নাম মুক্তিযোদ্ধার তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয় জামুকার বৈঠকে।

এদিকে চলতি মাসেই দুজন ভুয়া মুক্তিযোদ্ধাকে ধরে জেলে পাঠিয়েছেন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী।

রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা হিসেবে মুক্তিযোদ্ধারা প্রত্যেকে এখন ৯ হাজার ৭০০ টাকা করে সম্মানী ভাতা পেয়ে থাকেন। মুক্তিযোদ্ধা চাকরিজীবীরা পেয়ে থাকেন এক বছরের বাড়তি চাকরির সুবিধা। চাকরি ক্ষেত্রে তাঁদের সন্তান ও নাতি-নাতনিদের জন্য রয়েছে ৩০ শতাংশ এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তির ক্ষেত্রে ৫ শতাংশ কোটা। মারা গেলে দেওয়া হয় রাষ্ট্রীয় সম্মান ও দাফনের জন্য অর্থ সহায়তা। মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে ভুয়া মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যাও বেড়ে চলেছে।

সারা দেশে শহীদ মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা কত এ ব্যাপারে কোনো পরিসংখ্যান নেই কোথাও। যাঁরাই মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্টের ভাতার জন্য আবেদন করে সফল হয়েছেন তাঁদের নামেই গেজেট হয়েছে।   মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কেন্দ্রীয় কমান্ড কাউন্সিলের মহাসচিব এমদাদ হোসেন মতিন জানান, তাঁদের কাছেও শহীদ মুক্তিযোদ্ধার কোনো পরিসংখ্যান নেই।

শহীদ মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় ভুয়া : শহীদ মুক্তিযোদ্ধার পরিবার হিসেবে দুই হাজার ৯৩৮টি পরিবার রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা ভোগ করছে। কিন্তু এই তালিকায়ও রয়েছে ভুয়া মুক্তিযোদ্ধার ছড়াছড়ি। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সহযোগী হওয়ায় মুক্তিযোদ্ধারা হত্যা করেছেন এমন ব্যক্তিও এই তালিকাভুক্ত হয়ে সম্মানিত হচ্ছে।

সিলেটের বিয়ানীবাজার উপজেলার মুড়িয়া ইউনিয়নের সারপারের ফয়েজ উদ্দীন নামের এক ব্যক্তি শহীদ মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তালিকাভুক্ত হয়েছে। মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্টের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত একটি দালালচক্রের মাধ্যমে তার নাম এই তালিকাভুক্ত হওয়ার পর তার পরিবার এখন রাষ্ট্রীয় সম্মান ও সুযোগ-সুবিধা ভোগ করছে। অনুসন্ধানে জানা যায়, ফয়েজ উদ্দীনের মৃত্যু একাত্তরে হয়নি। স্বাধীনতার পরপরই যুদ্ধফেরত মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে ফয়েজ উদ্দীন প্রাণ হারিয়েছিল।

মাগুরার খাতের আলী শেখ পাকিস্তানিদের সহযোগী হওয়ায় মুক্তিযোদ্ধারা তাকে ধরে নিয়ে গেলে মুক্তিযোদ্ধাদের বিরুদ্ধে পরিচালিত অভিযানে সে পাকিস্তানি সেনাদের গুলিতে নিহত হয়েছিল। তার নামও শহীদ মুক্তিযোদ্ধার তালিকাভুক্ত হয়। তার স্ত্রী গোলজান নেছা শহীদ মুক্তিযোদ্ধার উত্তরাধিকারী হিসেবে ১৯৮৪ সাল থেকে রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা ভোগ করে আসছেন। একইভাবে মাগুরার হাবিবুর রহমান মোল্লা পাকিস্তানি বাহিনীর সহযোগী ছিল। মুক্তিযোদ্ধারা তাকে ধরে বিচারের জন্য কামান্না ক্যাম্পে নিয়ে গেলে হাবিবুরের ভাই তজিবুর তার এক রাজাকার আত্মীয়ের মাধ্যমে পাকিস্তানি বাহিনীর সহায়তায় কামান্না আক্রমণ করে। এই আক্রমণে ২৭ জন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন। ওই আক্রমণে হাবিবুরও মারা পড়ে। এই হাবিবুরের নামও শহীদ মুক্তিযোদ্ধার তালিকাভুক্ত হয়। সম্প্রতি তার ব্যাপারে অভিযোগ জানানো হলে তার স্ত্রীর নামে বরাদ্দ ভাতা বন্ধ করা হয়েছে।

শহীদ মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় ভুয়া নাম অন্তর্ভুক্তির প্রচেষ্টা এখনো অব্যাহত রয়েছে। ফরিদপুর জেলার মধুখালী উপজেলার কালীপদ বিশ্বাসকে শহীদ মুক্তিযোদ্ধা দাবি করে তালিকাভুক্তির জন্য জামুকায় সম্প্রতি আবেদন করে তার স্ত্রী লীলা রানী বিশ্বাস। যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী বীরেন সিকদারও তাতে সুপারিশ করেন। কিন্তু মুক্তিযোদ্ধা সংসদের উপজেলা ও ইউনিয়ন কমান্ডার জানান, ওই ব্যক্তি পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধে নিহত হয়নি। ফলে জামুকার বৈঠকে ওই আবেদন নাকচ করে দেওয়া হয়েছে।

বরিশালের মীরাবাড়ীর অক্সফোর্ড মিশন রোডের মীর মুজিব আলীকে শহীদ মুক্তিযোদ্ধা দাবি করে গেজেটে অন্তর্ভুক্তির জন্য তার সন্তান আবেদন করে জামুকায়। কিন্তু আবেদনের পক্ষে তথ্য-প্রমাণ না পাওয়ায় জামুকার ৩৬তম সভায় তা প্রত্যাখ্যান করা হয়।

নৌ কমান্ডো তালিকায় ২৩ ভুয়া : বাংলাদেশ গেজেটে মোট ৪৭২ জন নৌ কমান্ডোর নাম মুক্তিযোদ্ধা তালিকায় প্রকাশিত হয়। পরবর্তী সময়ে মোট ৪৭৯ জন নৌ কমান্ডোর তালিকা দেওয়া হয় মুক্তিযোদ্ধা সংসদের পক্ষ থেকে। এটা যাচাই-বাছাই করার জন্য জামুকা পাঁচ সদস্যের একটি সাবকমিটি গঠন করে। এই সাবকমিটি ওই তালিকায় ২৩ জনকে নৌ কমান্ডো নন বলে চিহ্নিত করে। পরে তাঁদের নাম গেজেট থেকে বাতিলের সুপারিশ করা হয়। ওই ২৩ জন এখন এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে রিট করেছেন বলে জানা গেছে।

যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা ও শহীদ মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা এমনকি রাজাকারদের অন্তর্ভুক্তির বিষয়ে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হকের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি বলেন, ‘বিষয়টি আমাদেরও নজরে এসেছে। সারা দেশে মুক্তিযোদ্ধাদের যাচাই-বাছাই শেষ হলে এই তালিকাগুলোকে যাচাই-বাছাই করা হবে। ভুয়াদের অবশ্যই চিহ্নিত করে বাদ দেওয়া হবে। ’


মন্তব্য