kalerkantho

রবিবার। ৪ ডিসেম্বর ২০১৬। ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৩ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


শেষ বেলার বোলিংয়ে স্বস্তির জয়

নোমান মোহাম্মদ   

২৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



শেষ বেলার বোলিংয়ে স্বস্তির জয়

অসাধারণ বোলিংয়ে বাংলাদেশকে রোমাঞ্চকর জয় এনে দিলেন তাসকিন আহমেদ। ছবি : মীর ফরিদ

বিকেলের আকাশ ছেয়ে ছিল মেঘে। রাতের আকাশ ঢাকা অন্ধকারে।

কাল আফগানিস্তানের বিপক্ষে ম্যাচে অনেকটা সময় জুড়ে তা যেন বাংলাদেশ ক্রিকেটের আয়না। মেঘ আর আঁধারের প্রতিচ্ছবি যেখানে। কিন্তু এই বাংলাদেশ তো আর সেই বাংলাদেশ নেই। মেঘ তাড়িয়ে, আঁধার সরিয়ে শেষ পর্যন্ত তাই ৫৬ হাজার বর্গমাইলের ক্রিকেট-আকাশ উদ্ভাসিত চাঁদের আলোয়। রুদ্ধশ্বাস ম্যাচে ৭ রানের জয়ে পূর্ণিমা-নৃত্যে মেতে ওঠে গোটা মানচিত্র। আবার! আরো একবার!অথচ সিরিজের এই প্রথম ওয়ানডে জেতার কথা নয় বাংলাদেশের। সাধারণ ক্রিকেটীয় সমীকরণে ম্যাচ থেকে তো স্বাগতিকরা ছিটকে যায় অনেক আগে। আফগানিস্তান ৪০ ওভারে দুই উইকেটে ১৮৯ রানে পৌঁছে যাওয়ার পর সবচেয়ে বেশি করে। শেষ ১০ ওভারে ৭৭ রান চাই সফরকারীদের। ক্রিজে দুই সেট ব্যাটসম্যান এবং সব মিলিয়ে আট উইকেটের অক্ষত পুঁজি— আফগানদের জয় তখন সময়ের ব্যাপার! কিন্তু ‘বড় দল’-এর সামনে ওসব সাধারণ সমীকরণ ভেসে গেছে কত! কাল যেমন ভেসে যায় আরেকবার। তাতে প্রমাণিত হয়, সত্যিকারের বড় দল হয়ে ওঠার কক্ষপথেই রয়েছে বাংলাদেশ।

৪১তম ওভারে সাকিব আল হাসান ফিরিয়ে দেন রহমত শাহকে (৯৩ বলে ৭১)। ভেঙে যায় ৩২.৫ ওভারে ১৪৪ রানের জুটি। থিতু হওয়া অন্য ব্যাটসম্যান হাসমতউল্লাহ শহীদি (১১০ বলে ৭২) আউট হন তাইজুল ইসলামের বলে। ব্যস, রক্তের গন্ধ পাওয়া হাঙ্গরের মতো বাংলাদেশ এরপর ঝাঁপিয়ে পড়ে আফগানদের ওপর। যদিও গাণিতিক সম্ভাবনার পক্ষপাত তখনো প্রতিপক্ষে। না হয় দুই সেট ব্যাটসম্যান আউট, তবু এখনকার ক্রিকেটে ছয় উইকেট হাতে নিয়ে ৩৯ বলে ৫৬ রান আর অমন কী!

কিন্তু আফগানদের জন্য সেটিকে অজেয় বানিয়ে তোলেন বাংলাদেশের বোলাররা। ততক্ষণ পর্যন্ত যে বোলিং আক্রমণ ছিল নখদন্তহীন, হঠাৎ তা রূপান্তরিত দাঁত-নখর বের করা ভয়ংকর বোলিং লাইনে। শেষ ৩০ বলে ৩৮ রান লাগে, মাশরাফি এসে আউট করে দেন নাজিবুল্লাহ জাদরানকে। আসগর স্টানিকজাই পরের বলে নেমেই দুর্দান্ত ছক্কা মারেন, এর চেয়েও দুরন্ত সাকিবের করা পরের ওভার। ২৪ বলে ২৮ রান প্রয়োজন, এমন অবস্থায় দেন মোটে এক রান। বল তুলে দেওয়া হয় তাসকিন আহমেদের হাতে, আগে ছয় ওভারে ৪৯ রান দিয়ে যিনি উইকেটশূন্য। কিন্তু দলের প্রবল প্রয়োজনে সেই পেসার হয়ে ওঠেন যেন তাঁর নতুন গুরু কোর্টনি ওয়ালশের মতো। দেন মাত্র ছয় রান, তুলে নেন দুই উইকেট। তাও কোন দুজনের উইকেট? মোহাম্মদ নবী ও স্টানিকজাই। তাতেই জয় এক রকম নিশ্চিত হয়ে যায় বাংলাদেশের। তিন উইকেট হাতে নিয়ে শেষ ১২ বলে কি আর ২১ রান করতে পারবে আফগানিস্তান!

পারে না। ৪৯তম ওভারে রুবেল হোসেনের হাতে বল তুলে দিয়ে শঙ্কার সামান্য দোলা। আগের আট ওভারে যে ৫৪ রান দিয়েও পাননি কোনো উইকেট। অথচ সেই পেসার সে ওভারে দেন আট রান; উইকেটও পান। ফলে নায়ক হওয়ার মঞ্চটা প্রস্তুত হয়ে যায় তাসকিনের সামনে, যিনি মাত্র দিন দুয়েক আগে বোলিং অ্যাকশনের শুদ্ধতার সনদ পান আইসিসি থেকে। শেষ ওভারে আরো দুই শিকারে ম্যাচে নিজের উইকেটসংখ্যা চারে নিয়ে যান এই পেসার। শেষ ওভারে প্রতিপক্ষের ১৩ রান প্রয়োজন থাকলেও দেন না পাঁচের বেশি। সাত রানে জিতে যায় বাংলাদেশ। যে জয়ে আনন্দের চেয়ে স্বস্তি বেশি। প্রতিপক্ষ যে আফগানিস্তান!

ম্যাচের আবহে প্রতিপক্ষ হিসেবে অবশ্য আফগানদের চেয়ে বেশি উচ্চারিত ছিল অন্য আরো দুটি বিষয়। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অনভ্যস্ততা এবং বৃষ্টির চোখরাঙানি। প্রকৃতি তেমন বাগড়া দেয়নি, তবে বাংলাদেশের জার্সিতে ছয় মাস এবং ওয়ানডেতে সাড়ে ১০ মাস পর নামার জড়তা ছিল ক্রিকেটারদের পারফরম্যান্সে। সৌম্য সরকার (০) যেমন আউট হয়ে যান ইনিংসের প্রথম ওভারে। এরপর তামিম ইকবাল ও ইমরুল কায়েসের ৮৩ রানের জুটিতে স্থিরতা আসে কিছুটা। তবে তাতে আফগান ফিল্ডারদের অবদান অনেক। ৩০ রানের সময় তামিমের ব্যাট থেকে ওঠা ক্যাচ ব্যাকওয়ার্ড পয়েন্টে ছেড়ে দেন হাসমতউল্লা। ইমরুলও (৩৭) বেশ কবার বেঁচে গিয়ে ব্যাটের ভেতরের কানায় লেগে বোল্ড।

সুযোগ কাজে লাগাতে পারেন না তিন নম্বরে নামা এই বাঁহাতি। বাঁহাতি ওপেনার অবশ্য দুহাতে লুফে নেন সুযোগ। ১৫ রান করে প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে সব ধরনের ফরম্যাট মিলিয়ে ৯ হাজার রান হয়ে যায় তামিমের। এরপর কাট করে চার মেরে ফিফটিতে পৌঁছেন ৬৩ বলে। ইমরুলের পর মাহমুদ উল্লাহর সঙ্গে গড়ে তোলেন ভালো জুটি। সেঞ্চুরি যখন অবধারিত মনে হচ্ছিল, তখনই লং অফে ক্যাচ দিয়ে আউট তামিম; ৯৮ বলে ৯টি চারের মালায় ৮০ রান করে।

৪০ ওভারে তিন উইকেটে ১৯৬ রানে পৌঁছে যায় বাংলাদেশ। এখান থেকে ২৮০ মনে হচ্ছিল ভীষণ সম্ভব, এমনকি এখনকার ক্রিকেটের বাস্তবতায় ৩০০-ও অবাস্তব নয়। কিন্তু মাহমুদ (৭৪ বলে ৬২) আউট হওয়ার পর সাকিব (৪০ বলে ৪৮) ছাড়া আর কেউ বুক চিতিয়ে দাঁড়াতে পারেননি। না মুশফিকুর রহিম (৬), না সাব্বির রহমান (২)। শেষ ১০ ওভারে তাই মোটে ৬৯ রান যোগ করে ২৬৫-তে থেমে যায় মাশরাফির দল।

ব্যাটিংয়ের মতো বোলিং-ফিল্ডিংয়ে খুব সড়গড় ছিল না বাংলাদেশ। স্লিপে ক্যাচ পড়ে ইমরুলের হাত গলে, বল ফসকে যায় মাহমুদ উল্লাহর মুঠো থেকে। তাতে তৃতীয় উইকেটে ১৪৪ রানের জুটি গড়ে জয়ের সম্ভাবনা তৈরি করে আফগানিস্তান। কিন্তু শেষ দিকে যে বড় দলের মতো ঝলসে ওঠে স্বাগতিকরা! অবিশ্বাস্য শেষ ওভারসহ সাকল্যে ১০ ওভারে ২৬ রান দিয়ে দুই শিকার সাকিবের। সে পথে আবদুর রাজ্জাককে (২০৭) টপকে ওয়ানডেতে দেশের সর্বোচ্চ উইকেট হয়ে যায় তাঁর। বিবর্ণ শুরু সামলে শেষ দিকে ঝলসে ওঠেন তাসকিন। মাশরাফি-রুবেলরাও করেন সাধ্যমতো। তাতেই লেখা হয় বাংলাদেশের জয়ের চিত্রনাট্য।

খেলা সাঙ্গ হওয়ার পর মিরপুর শেরে বাংলা স্টেডিয়ামের ওপরের আকাশ থেকে ঝরঝরিয়ে নামে বৃষ্টি। বাংলাদেশ জিতেছে বলে সেটিকে তখন আর বিষাদের কান্না মনে হয় না। মনে হয় আনন্দাশ্রু। ফ্লাডলাইটের রুপালি আলোয় তা কী মায়াবীই না লাগে!


মন্তব্য