kalerkantho

শনিবার । ১০ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৯ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


ডিএসসিসির জ্বালানি খাতে নৈরাজ্য

সরকারি জ্বালানির ব্যক্তিগত ব্যবহার

তোফাজ্জল হোসেন রুবেল   

২৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



সরকারি জ্বালানির ব্যক্তিগত ব্যবহার

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) কর্মকর্তাদের যানবাহনে জ্বালানি ব্যবহার নিয়ে চলছে ভয়াবহ অনিয়ম। সরকারি পরিবহন ব্যবহার করতে পারেন, এমন কর্মকর্তারা নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে ইচ্ছামতো জ্বালানি ব্যবহার করছেন ব্যক্তিগত সফরে।

এতে বিপুল অঙ্কের অর্থের অপচয় হচ্ছে সংস্থাটির। সম্প্রতি ডিএসসিসির পরিবহনে জ্বালানি তেল ব্যবহারে অনিয়মের অভিযোগ এনে এক বছরে ২৭ লাখ ৬৯ হাজার চার টাকার অডিট আপত্তি অনা হয়। যাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে তাঁদের মধ্যে আছে ডিএসসিসির সচিব খান মোহাম্মদ রেজাউল করিম, মেয়রের একান্ত সচিব (পিএস) কবির মাহমুদ ও সদ্য বিদায়ী প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ব্রি. জে. ডা. মাসুদুর রহমানের নামও। এর মধ্যে সচিব ও পিএস একেকবার গাড়িতে ১২০ লিটার থেকে ২০০ লিটার পর্যন্ত অকটেন নিয়েছেন। একইভাবে প্রধান প্রকৌশলী, প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা, প্রধান সম্পত্তি কর্মকর্তা, প্রধান হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা, আইন কর্মকর্তা, মহাব্যবস্থাপক (পরিবহন), অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী, অতিরিক্ত প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তাসহ পাঁচটি অঞ্চলের আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তারাও নির্ধারিত বরাদ্দের দ্বিগুণ জ্বালানি নিচ্ছেন।

ডিএসসিসির পরিবহন শাখার কর্মকর্তারা জানান, প্রাধিকার ভিত্তিতে যানবাহন বরাদ্দের পর একজন কর্মকর্তা প্রতিদিন ১০ লিটার জ্বালানি পেতে পারেন। কিন্তু দেখা গেছে, এ নিয়ম মানছেন খুব কমসংখ্যক কর্মকর্তাই। মাস শেষে দেখা যায় কেউ কেউ বরাদ্দের দ্বিগুণ-তিন গুণ জ্বালানি ব্যবহার করেছেন। অনুসন্ধানে জানা যায়, সচিব খান মোহাম্মদ রেজাউল করিম তিন বছরের বেশি সময় ধরে ডিএসসিসিতে কর্মরত। তাঁর গ্রামের বাড়ি বরগুনা জেলায়। এই কর্মকর্তা প্রতি ঈদে বাড়ি যাওয়ার সময় কমপক্ষে ২০০ লিটার করে জ্বালানি নিয়ে যান। সর্বশেষ চলতি বছরের ১৪ এপ্রিল ১৬০ লিটার ও ৭ জুলাই ২০০ লিটার জ্বালানি নিয়েছেন একবারেই। এ ছাড়া ঢাকা ও আশপাশে চলাচলের সময়ও বরাদ্দের দ্বিগুণ-তিন গুণ জ্বালানি নেন তিনি। সচিবের গাড়িতে বরাদ্দের অতিরিক্ত জ্বালানি ব্যবহারের জন্য এরই মধ্যে অডিট আপত্তি উঠেছে। তবে কোনো কর্মকর্তা চাইলেও বরাদ্দের অতিরিক্ত জ্বালানি ব্যবহার করতে পারবেন না বলে দাবি করেন সচিব খান মোহাম্মদ রেজাউল করিম। তিনি বলেন, ‘অডিটের কোনো আপত্তি থাকলে তা সরকারি কোষাগারে টাকা জমা দিয়ে দিলেই শেষ হয়ে যাবে। ’

মেয়রের একান্ত সচিব কবির মাহমুদও প্রায় সাত মাস আগে বান্দরবানসহ কয়েকটি স্থানে বেড়াতে যান। এ সময় তিনি ডিএসসিসির তহবিলের টাকায় ১৫০ লিটার অকটেন নিয়ে যান। এ ছাড়া এই কর্মকর্তা ব্যক্তিগত কাজে গত এক বছরের ব্যবধানে তিনবার বগুড়া গিয়েছেন। এ সময়ও ১২০ লিটার করে অকটেন নিয়ে গেছেন। কবির মাহমুদ এই মুহূর্তে দেশের বাইরে অবস্থান করায় তাঁর মন্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি। অডিট অপত্তিতে ডিএসসিসির সদ্য বিদায়ী প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ব্রি. জে. ডা. সাইদুর রহমানের অতিরিক্ত জ্বালানি ব্যবহারের কথা উল্লেখ আছে। তিনি ৮০ লিটার অকটেন নিয়ে চাঁদপুর গিয়েছিলেন ব্যক্তিগত কাজে।

ডিএসসিসির পরিবহন শাখার মহাব্যবস্থাপক শোয়েবুল আলম। তিনি নিজে একটি গাড়ি সার্বক্ষণিক ও একটি গাড়ি মাঝেমধ্যে পরিবারের জন্য ব্যবহার করেন। এ দুই গাড়ির জ্বালানিও নেওয়া হয় ডিএসসিসি থেকে। সাবেক প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আনছার আলী ও শেষ প্রশাসক ইব্রাহিম হোসেন খানও নিজ গ্রামে যেতেন করপোরেশনের টাকায় জ্বালানি নিয়ে।

দৈনিক বরাদ্দের প্রায় দ্বিগুণ জ্বালানি নেন এমন কর্মকর্তাদের মধ্যে রয়েছেন প্রধান সম্পত্তি কর্মকর্তা খালিদ আহমেদ, আইন কর্মকর্তা মোহাম্মদ শফিউল আরিফ, প্রধান ভাণ্ডার মোহাম্মদ সাখাওয়াৎ হোসেন, প্রধান প্রকৌশলী মো. নূরুল্লাহ, অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী নূরুল আমীন, প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা কমোডর এ কে এম বখতিয়ার, আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তা শাহিনা খাতুন, সানাউল হক, এস এম আনছারুজ্জামান, খালিদ পারভেজ খান ও বিজয় কৃষ্ণ দেবনাথ।

ডিএসসিসির একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানান, প্রশাসকদের আমলে জ্বালানি তেল ব্যবহারে ব্যাপক লুটপাটের অভিযোগ মেলে। মেয়র হিসেবে সাঈদ খোকন দায়িত্ব নিয়ে ব্যয় কমিয়ে আনতে নানামুখী পদক্ষেপ নেন। সেখানে পরিবহন বিভাগের দায়িত্বে থাকা খন্দকার মিল্লাতুল ইসলামের গড়ে তোলা সিন্ডিকেট ভেঙে দিয়ে তাঁকে অন্যত্র বদলি করা হয়। কিন্তু মেয়রের অজান্তে এখনো কয়েকজন কর্মকর্তা প্রভাব খাটিয়ে ব্যক্তিগত কাজে গাড়িতে শত শত লিটার জ্বালানি তেল ব্যবহার করছেন।

পরিবহন বিভাগের একজন কর্মকর্তা জানান, ডিএসসিসির সব কর্মকর্তার গাড়ির জ্বালানি পরিবহন বিভাগ থেকে ইস্যু করার নিয়ম থাকলেও প্রধান প্রকৌশলী, প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা ও পাঁচজন আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তা নিজেরা এ নিয়ম মানছেন না। তাঁরা নিজেদের পদের প্রভাব খাটিয়ে ইচ্ছামতো নিজেদের জন্য জ্বালানি তেল ইস্যু করেন। ফলে মাস শেষে দেখা যায় ডিএসসিসির জ্বালানি খাতে বিপুল অঙ্কের খরচ।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ডিএসসিসিতে জ্বালানি খাতে প্রতিবছরই বরাদ্দ বেড়ে চলছে। এর কারণ অনিয়ন্ত্রিতভাবে জ্বালানি তেলের ব্যবহার। বিদ্যুৎ-জ্বালানি খাতে ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ডিএসসিসির বরাদ্দ ছিল ৬৪ কোটি টাকা। আর তা সংশোধিত বরাদ্দে দাঁড়ায় ৬৭ কোটি ২৫ লাখ টাকা; যা মূল বরাদ্দের চেয়েও তিন কোটি ২৫ লাখ টাকা বেশি। চলতি অর্থবছরে এ খাতে ডিএসসিসির বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৭৯ কোটি টাকা, যা গত অর্থবছরের মূল বরাদ্দের চেয়ে ১৫ কোটি টাকা বেশি।

অডিট আপত্তি : অতিরিক্ত জ্বালানি তেল ও সিএনজি বাবদ অতিরিক্ত পরিশোধের জন্য অডিট বিভাগ থেকে চলতি বছরের ২৪ মার্চ একটি প্রতিবেদনে আপত্তি উঠে এসেছে। ডিএসসিসির মেয়র বরাবরে দাখিল করা এ প্রতিবেদনে ২৭ লাখ ৬৯ হাজার চার টাকার অতিরিক্ত জ্বালানি ব্যবহারের অভিযোগ পাওয়া যায়। প্রতিবেদনে আপত্তিকৃত এ অর্থ সংস্থার তহবিলে জমা দিয়ে প্রমাণাদিসহ অডিট অফিসে পাঠানোর কথা বলা হয়। অডিট প্রতিবেদনে সংস্থার সচিব খান মোহাম্মদ রেজাউল করিমের এক বছরে প্রায় ৯৪ হাজার ৫০০ টাকার অনিয়ম পাওয়া যায়। অডিট আপত্তিতে আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তা খালিদ পারভেজ, রণজিৎ চন্দ্র সরকার, আবুল কালাম আজাদ, ইমরুল চৌধুরী ও কে এম কবির আহমেদের নামও উঠে এসেছে। বর্তমানে খালিদ পারভেজ ছাড়া বাকি তিনজন অন্যত্র বদলি হয়ে চলে গেছেন। এ ছাড়া অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী নূরুল আমীন, নির্বাহী প্রকৌশলী রাজিব খাদেম, খায়রুল বাকের, বোরহান উদ্দিন, মাহতাব উদ্দিন (বিদ্যুৎ বিভাগ), সাবেক প্রধান হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা উমর ফারুক ও তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আনিসুর রহমানের নামে অডিট আপত্তি রয়েছে।

 


মন্তব্য