kalerkantho

রবিবার । ১১ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ১০ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


ফিলরেম ও সোলায়ারের বিরুদ্ধে মামলা হচ্ছে

আবুল কাশেম   

২৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



ফিলরেম ও সোলায়ারের বিরুদ্ধে মামলা হচ্ছে

বাংলাদেশের রিজার্ভের চুরি হওয়া অর্থ উদ্ধার করতে ফিলিপাইনের রেমিট্যান্স সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ফিলরেম ও জুয়াড়ি প্রতিষ্ঠান সোলায়ার ক্যাসিনোর বিরুদ্ধে মামলা করতে যাচ্ছে দেশটির অ্যান্টি মানি লন্ডারিং কাউন্সিল (এএমএলসি)। ফিলিপাইনের অর্থপাচার প্রতিরোধী সংস্থাটি অনানুষ্ঠানিকভাবে এ তথ্য জানিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংককে।

আর চুরি হওয়া অর্থ উদ্ধার করার লক্ষ্যে ফিলিপাইনের আদালতে চলা মামলাগুলো সমন্বয়ের দায়িত্ব পালন করছে আন্তর্জাতিক পুলিশ সংস্থা ইন্টারপোল। এ ছাড়া রিজার্ভ চুরির সঙ্গে সম্পৃক্ত ফিলিপাইনের রিজাল কমার্শিয়াল ব্যাংকিং করপোরেশনের (আরসিবিসি) বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের করেসপনডেন্ট ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের উদ্যোগ নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক।

গত রবিবার অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো বাংলাদেশ ব্যাংকের এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে। খোয়া যাওয়া অবশিষ্ট অর্থ উদ্ধার করতে কত দিন লাগতে পারে, সে সম্পর্কে স্পষ্ট কিছু উল্লেখ না করে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘বিভিন্ন অপরাধের মাধ্যমে এক দেশ হতে অন্য দেশে পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনার সফল ঘটনাগুলো পর্যালোচনায় দেখা যায়, আইনি ও পদ্ধতিগত প্রক্রিয়াগুলো বেশ জটিল ও সময়সাপেক্ষ। ’

অবশ্য অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত গত বুধবার সাংবাদিকদের বলেছেন, চুরি হওয়া রিজার্ভের বাকি অর্থ  উদ্ধার করতে আরো চার-পাঁচ মাস সময় লাগতে পারে। ফিলিপাইনে চলা মামলা এবং আরো নতুন মামলার পরিপ্রেক্ষিতে ওই অর্থ ফেরত পাওয়া যাবে।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, রিজার্ভের চুরি হওয়া অবশিষ্ট অর্থ উদ্ধারের বিষয়ে ফিলিপাইন সরকারের শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করতে বাংলাদেশ থেকে উচ্চ পর্যায়ের একটি প্রতিনিধিদল আগামী মাসের শেষ দিকে ম্যানিলায় যাবে। ওই প্রতিনিধিদলে থাকবেন আইনমন্ত্রী আসিনুল হক এবং অর্থ প্রতিমন্ত্রী এম এ মান্নানও। তাঁরা ফিলিপাইনের নতুন প্রেসিডেন্ট রোদ্রেগো দুর্তেতেসহ দেশটির আইনমন্ত্রী, অর্থমন্ত্রী, অ্যাটর্নি জেনারেল ও উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন। ওই সময় মামলাগুলো পর্যালোচনা এবং সেগুলো দ্রুত নিষ্পত্তির মাধ্যমে অর্থ ফেরত পাওয়ার উপায়সহ সংশ্লিষ্ট অন্যান্য বিষয়েও আলোচনা হবে।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘ফিলিপাইনে সম্প্রতি গঠিত নতুন সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে চুরি যাওয়া রিজার্ভের বাকি অর্থ আদায়ের বিষয়ে আলোচনার জন্য বাংলাদেশ হতে একটি উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধিদলের আগামী অক্টোবর মাসের শেষ সপ্তাহে ফিলিপাইনে যাওয়ার বিষয়টি সক্রিয় বিবেচনাধীন রয়েছে। এ বিষয়ে ফিলিপাইনে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত সে দেশের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছেন। অনুষ্ঠেয় বৈঠকের তারিখ ও সময় নির্ধারিত হলে বাংলাদেশ প্রতিনিধিদল চূড়ান্ত করা হবে। ’

বাংলাদেশ ব্যাংক ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, বাংলাদেশ থেকে চুরি হওয়া আট কোটি ১০ লাখ ডলারের মধ্যে ব্যবসায়ী কিম উং এক কোটি ৫২ লাখ ২৫ হাজার ডলার ফেরত দিয়েছেন। ফিলিপাইনের আদালত ওই অর্থ বাংলাদেশকে ফেরত দিতে গত ১৬ সেপ্টেম্বর রায় দিয়েছিলেন।

কর্মকর্তারা জানান, বাকি ছয় কোটি ৫৮ লাখ ডলার ফেরত পেতে ফিলরেম ও সোলায়ার ক্যাসিনোর বিরুদ্ধে মামলা করা হচ্ছে। রিজার্ভের খোয়া যাওয়া আট কোটি ১০ লাখ ডলারের বড় অংশ রিজাল ব্যাংক হয়ে ফিলরেমে পৌঁছায়। ফিলরেম থেকে তা ক্যাসিনো হয়ে চীন ও হংকংয়ে চলে যায়। তবে আট কোটি ১০ লাখ ডলারের মধ্যে ফিলরেমের কাছে এক কোটি ১০ লাখ ডলার রয়ে যায়, যা প্রতিষ্ঠানটি গোপন করেছে। মামলা করে ফিলরেমের কাছ থেকে ওই অর্থ আদায় করে বাংলাদেশকে দিতে চায় ম্যানিলার এএমএলসি। আর বাংলাদেশের রিজার্ভ চুরির সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকার দায়ে ফিলিপাইনের কেন্দ্রীয় ব্যাংক দেশটির রিজাল ব্যাংককে ১০০ কোটি পেসো বা দুই কোটি ১০ লাখ ডলার জরিমানা করেছে। এ ঘটনায় রিজার্ভের অর্থ চুরির সঙ্গে রিজাল ব্যাংকের সম্পৃক্ততা প্রমাণিত হওয়ায় ব্যাংকটির বিরুদ্ধেও মামলা করা হবে।

ফিলিপাইনে নিযুক্ত বাংলাদেশের তৎকালীন রাষ্ট্রদূত মেজর জেনারেল (অব.) জন গোমেজ গত ৫ এপ্রিল পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো এক ফ্যাক্স বার্তায় বলেছেন, ফিলরেম যত ডলার কনভার্ট (অন্য মুদ্রায় রূপান্তর) করেছে, ব্যবসায়ী কিম উংসহ বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের অ্যাকাউন্টে ফিলরেম যে পরিমাণ অর্থ রেমিট্যান্স আকারে পাঠিয়েছে, তার পরিমাণ বাংলাদেশ থেকে চুরি হওয়া আট কোটি ১০ লাখ ডলার থেকে এক কোটি ৭০ লাখ ডলার কম। অর্থাৎ এই এক কোটি ৭০ লাখ ডলার (প্রায় ১৩৩ কোটি টাকা) ফিলরেম গোপনে লুকিয়ে রেখেছে।

ফিলরেম অবশ্য তাদের কাছে রিজার্ভের অর্থ থাকার কথা অস্বীকার করেছে। গত মার্চ মাসে সিনেট কমিটির শুনানিতে ফিলরেমের মালিক সালুদ বাউতিস্তা বাংলাদেশের কাছে দুঃখ প্রকাশ করে বলেছিলেন, চুরি হওয়া অর্থ অন্য মুদ্রায় রূপান্তর করে তার প্রতিষ্ঠান যে মুনাফা করেছে, তার পুরো অর্থই তিনি বাংলাদেশকে ফেরত দেবেন। কিন্তু ওই এক কোটি ৭০ লাখ ডলার থাকার কথা ফিলরেম অস্বীকার করলেও ফিলিপাইনের সিনেট ব্লু রিবন কমিটির তখনকার চেয়ারম্যান সিনেটর গুইগুনার ও সিনেট কমিটি অন ব্যাংকস অ্যান্ড ফিন্যানশিয়াল ইনস্টিটিউশনসের চেয়ারম্যান সিনেটর ওসমেনা বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূতের কাছে স্বীকার করেছেন, তাঁরা জানেন বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে চুরি হওয়া এক কোটি ৭০ লাখ ডলার এখনো রয়েছে ফিলরেমের কাছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, ‘বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ হতে চুরি হওয়া অর্থ উদ্ধারে বিশ্বব্যাংক ও ইন্টারপোল বাংলাদেশকে সহযোগিতা করছে। ইন্টারপোলের উদ্যোগে ইতোমধ্যে ফিলিপাইনে একটি কেস কো-অর্ডিনেশন মিটিং অনুষ্ঠিত হয়েছে। গত ৯ সেপ্টেম্বর বিশ্বব্যাংকের উদ্যোগে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ফিলিপাইন ও যুক্তরাষ্ট্রের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নিয়ে একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। ’


মন্তব্য