kalerkantho


বৃষ্টি আর আফগানিস্তানের মুখোমুখি বাংলাদেশ

মাসুদ পারভেজ   

২৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



বৃষ্টি আর আফগানিস্তানের মুখোমুখি বাংলাদেশ

আজই ওয়ানডে অভিষেক হয়ে যেতে পারে মোসাদ্দেক হোসেনের। আফগানিস্তানের বিপক্ষে প্রথম ওয়ানডের আগে কোচ চন্দিকা হাতুরাসিংহের সঙ্গে কাল মিরপুরে। ছবি : মীর ফরিদ

না জানলে যেকোনো ভাষাই বেশ দুর্বোধ্য ঠেকে। তবে ‘পশতু’ বোধ হয় একটু বেশিই।

ম্যানেজার ইংরেজিতে অনুবাদ করে না দিলে নিজের ভাষায় সংবাদ সম্মেলন সেরে যাওয়া আফগানিস্তান অধিনায়ক আসগর স্ট্যানিকজাইয়ের একটি শব্দও উদ্ধার করা মুশকিলই ছিল!

মিরপুর শেরেবাংলা স্টেডিয়ামের সংবাদ সম্মেলন কক্ষে যতক্ষণে সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি তিনি, ততক্ষণে হোটেলে ফিরে যাওয়া বাংলাদেশ দলের কাছেও একটি ব্যাপার দুর্বোধ্য হয়েই থেকেছে। এমন দুর্বোধ্য যে আজ তিন ম্যাচ সিরিজের প্রথম ম্যাচটির বেশ কিছুক্ষণ পেরিয়ে না যাওয়া পর্যন্ত বোধগম্য হওয়াও কঠিন। নিজেদের বোঝার বাইরে থাকা ব্যাপারটি অবশ্যই প্রতিপক্ষ আফগানিস্তান নয়, নয় গতকাল সকাল থেকেই মুখ গোমড়া করে নিয়মিত বিরতিতে কেঁদে উঠতে থাকা আকাশও।

তাঁদের বোঝার বাইরে তাঁরা নিজেরাই। তা যতই তাঁরা গত বছর আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে সাফল্যের ফুল ফোটাক না কেন! গত বছরের ১১ নভেম্বর জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে নামার পর থেকে তো মাশরাফি বিন মর্তুজাদের ওয়ানডেই খেলা হয়নি আর। অর্থাৎ আফগানিস্তান ম্যাচ দিয়ে আজ প্রায় ১১ মাস পর ওয়ানডের ভুবনে ফিরতে চলেছে বাংলাদেশ। কিন্তু ফিরেই যে এত দিনের অনভ্যাস ঝেড়ে ফেলে স্বমহিমায় দেখা দিতে পারবে, সে নিশ্চয়তাও তো নেই। কারণ অতি ব্যবহারে যেমন জিনিস জীর্ণ হয়, তেমনি অব্যবহারে শীর্ণও হতে পারে। গত বছর ওয়ানডে ক্রিকেটে দ্রুতবেগে ছুটতে থাকা বাংলাদেশ দলের ইঞ্জিনে দীর্ঘদিন তো তেল-মবিলই পড়েনি!

আজ পড়বে এবং এমনও নয় যে পড়ামাত্রই পুরো গতি পাবে।

তাই একটু অপেক্ষায়ও থাকতে হবে। সেই অপেক্ষাই বেশ গুরুত্ব পাচ্ছে হেড কোচ চন্দিকা হাতুরাসিংহের কাছেও। কাল দুপুরের সংবাদ সম্মেলনে বলছিলেন সে কথাই, ‘আপনারা ঠিকই বলেছেন। আমরা অনেক দিন ধরেই খেলছি না। আর এ না খেলাটাই আমাদের একমাত্র দুর্বলতা। না খেলার কারণে এত দিন পর আমরা কেমন করব, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েই গেছে। সে অনিশ্চয়তাই আমরা পেরোতে চাই। সে জন্যই প্রথম ম্যাচটি খুব গুরুত্বপূর্ণ। আরো গুরুত্বপূর্ণ প্রথম ঘণ্টাটি। একই সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ ভালো শুরুও। ’

এর মধ্যে সামর্থ্যে কিছুটা মরিচা ধরে থাকলেও তা ঝেড়ে ফেলতে যখন মরিয়া বাংলাদেশ, তখন আফগানরা অন্য রকম এক আনন্দ নিয়েই সিরিজ শুরু করতে চলেছে। টেস্ট পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সিরিজ খেলার সুযোগ তাদের হয়ই না বলা চলে। তার ওপর তেমন সুযোগ যদি হুট করেই মিলে যায়, তাহলে তো কথাই নেই। এই সিরিজ খেলার সুযোগও এসেছে আচমকাই। আর বাংলাদেশের বিপক্ষে প্রথমবারের মতো এই দ্বিপক্ষীয় সিরিজ খেলার সুযোগ পেয়ে যেন তারা বর্তেও গেছে অনেকটা। কোচ লালচাঁদ রাজপুত থেকে শুরু করে অধিনায়ক স্ট্যানিকজাই, প্রত্যেকেই পারলে এমন সুযোগ করে দেওয়ার জন্য বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) কাছে কৃতজ্ঞতায় নুয়ে পড়েন।

যদিও বিসিবির এ আয়োজনটা নিঃস্বার্থ নয়। সামনেই আসছে ইংল্যান্ড এবং দীর্ঘদিন না খেলার অনভ্যাস নিয়েই তারা ইংলিশদের বিপক্ষে নেমে পড়তে চায়নি। চেয়েছে আগে কিছুটা হাত মকশো করে নিতে। সে জন্যই আফগানদের দাওয়াত দিয়ে আনা। যদিও মনের এই কথা মুখে বলা যায় না বলেই সম্ভবত হাতুরাসিংহেকে বলতে শোনা গেল, ‘আমরা এটিকে গুরুত্বপূর্ণ সিরিজ হিসেবেই নিচ্ছি। এমন নয় যে প্রস্তুতি সিরিজ বা এরকম কিছু ভেবে বসে আছি। আফগানিস্তান শক্তিশালী দল। বিশ্ব পর্যায়ে ওরা অঘটনেরও জন্ম দিয়েছে। এ জন্যই ওদের গুরুত্ব দিয়ে দেখছি। এবং অন্য যেকোনো দল হলে আমরা যেরকম প্রস্তুতি নিতাম, ওদের ক্ষেত্রেও তাই নিচ্ছি। ’

না খেলার জড়তা কাটিয়ে উঠতেই সম্ভবত আফগানিস্তানকে এত গুরুত্ব দিতে হচ্ছে। একই সময়ে আফগানরা অবশ্য খেলার মধ্যেই ছিল। বাংলাদেশ যে ১১ মাস খেলেনি, সেই সময়ে ১১টি ওয়ানডে খেলেছে সদ্যই হজ করে আসা স্ট্যানিকজাইয়ের দল। এর মধ্যে সংযুক্ত আরব আমিরাতে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে পাঁচ ম্যাচের ওয়ানডে সিরিজ ৩-২তে জিতেছেও। এর ভিত্তিতে বাংলাদেশের বিপক্ষে এই সিরিজে ভালো কিছু করার আশাও আছে তাদের। যারা নিজেদের বোলিং অ্যাটাককেও বাংলাদেশের কন্ডিশনের জন্য বেশ উপযোগী বলে মনে করছে। বিশেষ করে দুই লেগ স্পিনার রশীদ খান ও রহমত শাহর সামর্থ্যে যে দলটির আস্থাও ব্যাপক, সেটি তাদের ভারতীয় কোচ রাজপুতের কথায়ই স্পষ্ট, ‘আমাদের দারুণ দুজন লেগ স্পিনার আছে। কাজেই আমি বলব আমাদের বারুদ মজুদ আছে। এখন দেখা যাক ওরা বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানদের চমকে দিতে পারে কি না। ’

অবশ্য তিনি এটিও মানছেন যে আফগান স্পিন সামলানোর মতো ‘বেটার’ ব্যাটসম্যানের অভাব বাংলাদেশ দলে নেই। অভাব যেটির, সেটি লম্বা সময় ধরে খেলার অভ্যাসের। এঁদের মধ্যে খেলার বিরতিটা আরো বেশি সৌম্য সরকারের। পাঁজরের ইনজুরির কারণে গত নভেম্বরে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে হোম সিরিজ মিস করেছিলেন তিনি। অন্যরা যেখানে খেলতে নামছেন ১১ মাস পর, সেখানে এই বাঁহাতি ব্যাটসম্যান ওয়ানডে খেলতে চলেছেন ১৪ মাস পর। গত বছর জুলাইতে চট্টগ্রামে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে ৯০ রানের ইনিংসটিই হয়ে আছে তাঁর শেষ ওয়ানডে ইনিংস। যে ইনিংসে প্রোটিয়াদের বিপক্ষে সিরিজ জয়ের আনন্দে ডুবেছিল বাংলাদেশও। এত বড় সাফল্যে অবগাহন করা বাংলাদেশকে বিচলিত করে দেবে আফগানিস্তান, সেটি আপাতত বিশ্বাসযোগ্য কিছুতেই নয়।

দীর্ঘদিন না খেলার অনভ্যাসের কারণে গোলমাল হওয়ার সম্ভাবনাই বরং বেশি বিশ্বাসযোগ্য। সেই গোলমাল এড়াতেই মরিয়া বাংলাদেশও অপেক্ষায়। যা আবার ‘পশতু’র মতো দুর্বোধ্য মনে হওয়া ব্যাপারটির জট খোলার অপেক্ষাও!


মন্তব্য