kalerkantho

রবিবার। ৪ ডিসেম্বর ২০১৬। ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৩ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ড

দুর্নীতিবাজ চক্র আবার সক্রিয়

নূপুর দেব, চট্টগ্রাম   

২৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



দুর্নীতিবাজ চক্র আবার সক্রিয়

চট্টগ্রাম মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডে অনিয়ম, দুর্নীতি ও জালিয়াতির হোতারা আবারও সক্রিয় হয়ে উঠছে। ছাড়পত্র, উত্তরপত্র, ফলাফল, পুনর্নিরীক্ষার ফল, বৃত্তি পরীক্ষার ফল জালিয়াতির সঙ্গে দীর্ঘদিন জড়িত থাকার পাশাপাশি উচ্চ আদালতের আদেশ জালিয়াতিতেও সংঘবদ্ধ এই চক্র জড়িত ছিল।

সেই চক্রের বিরুদ্ধে বোর্ডের বিভিন্ন কেনাকাটায় নিম্নমানের পণ্যসামগ্রী কিনে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ারও অভিযোগ রয়েছে। এসব অভিযোগ তদন্তে গঠিত কমিটির প্রতিবেদন পেয়ে বোর্ড কর্তৃপক্ষ এরই মধ্যে মোট ছয় কর্মকর্তা-কর্মচারীকে সাময়িক বরখাস্ত করেছে। তাঁদের মধ্যে তিনজন হাইকোর্টের আদেশ জালিয়াতির জন্য বরখাস্ত হন। অধ্যাপক মোহাম্মদ শাহজাহান বোর্ডের চেয়ারম্যান থাকাকালে এ ব্যবস্থা নেওয়া হয়। তখন অনিয়ম, দুর্নীতি ও জালিয়াতির হোতারা গা ঢাকা দেন।

সমপ্রতি শিক্ষা বোর্ডের নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে অধ্যাপক শাহেদা ইসলাম যোগদান করেন। এখন ওই দুর্নীতিবাজ চক্র চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডে আধিপত্য বিস্তারের লক্ষ্যে বিভিন্ন সময় যাঁরা অনিয়ম-দুর্নীতির বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিলেন সেই কর্মকর্তাদের ঘায়েল করতে মরিয়া হয়ে উঠেছে।

অনেকেই বলছে, এর মধ্য দিয়ে বর্তমান বোর্ড চেয়ারম্যানকে চাপে ফেলার জন্য উঠে-পড়ে লেগেছে চক্রটি।

শুধু তাই নয়, বিভিন্ন টেন্ডার হাতিয়ে নিতে না পেরে চক্রটি গত বছর উন্নত ও গুণগত মানসম্পন্ন ‘ওএমআর’ ফরম কেনা নিয়ে অযৌক্তিক প্রশ্ন তুলছে বলে বোর্ডের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা অভিযোগ করেছেন। শিক্ষা বোর্ডের ফলাফলের সঙ্গে ওএমআরের কোনো সম্পর্ক না থাকলেও উদ্দেশ্যমূলকভাবে বোর্ডের ভাবমূর্তি এবং উন্নতমানের ওএমআর সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ইস্ট ওয়েস্ট মিডিয়া গ্রুপ লিমিটেডের সুনাম ক্ষুণ্নের চেষ্টা করছেন। এর সঙ্গে কিছু শিক্ষকও জড়িত রয়েছেন বলে বোর্ড সূত্রে জানা গেছে।

ওএমআর ও ফলাফল বিপর্যয় নিয়ে যাঁরা অযৌক্তিক প্রশ্ন তুলেছেন তাঁদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানে যাচ্ছে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ড। এক মাসের মধ্যে অভিযোগ প্রমাণ করতে না পারলে অপপ্রচারকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানান বোর্ড চেয়ারম্যান অধ্যাপক শাহেদা ইসলাম।

সমপ্রতি এক সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের ২০১৬ সালের এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার ফল বিপর্যয়ের অন্যতম প্রধান কারণ পরীক্ষার উত্তরপত্রে নিম্নমানের ওএমআর শিট ব্যবহার।

কিন্তু কালের কণ্ঠ’র অনুসন্ধানে জানা গেছে, চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডে গত বছর মাধ্যমিক (এসএসসি) পরীক্ষায় পাসের হার ছিল ৮২.৭৭ শতাংশ। তা বেড়ে চলতি বছর (২০১৬) হয়েছে ৯০.৪৪ শতাংশ। এ ছাড়া গত বছর এসএসসিতে জিপিএ ৫ পেয়েছে সাত হাজার ১১৬ জন শিক্ষার্থী। আর এ বছর জিপিএ ৫ পেয়েছে আট হাজার ৬০৫ জন।

একইভাবে গত বছর উচ্চ মাধ্যমিক (এইচএসসি) পরীক্ষায় পাসের হার ছিল ৬৩.৪৯ শতাংশ। চলতি বছর তা বেড়ে ৬৪.৬০ শতাংশে উন্নীত হয়।

এ ব্যাপারে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ড চেয়ারম্যান অধ্যাপক শাহেদা ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ওএমআর ফরমের সঙ্গে পরীক্ষার ফলাফলের কোনো সম্পর্ক নেই। পরীক্ষার খাতায় শিক্ষার্থীরা কী লিখেছে তা মূল্যায়ন করে শিক্ষক নম্বর দেন। লেখার ওপরে পরীক্ষার ফল নির্ভর করে। ’ তিনি বলেন, ‘সর্বশেষ গত দুই বছরের ফলাফল তুলনা করলে তো আমরা দেখতে পাই, ২০১৫ সালের চেয়ে ২০১৬ সালে এসএসসি ও এইচএসসি দুই পরীক্ষায়ই পাস ও জিপিএ ৫ দুটিই বেড়েছে। এখানে তো ফলাফল বিপর্যয়ের কিছু দেখছি না। বরং ফলাফল আগের চেয়ে ভালো হয়েছে। ওএমআর ফরম উন্নত ও গুণগত মান দেখেই যথাযথ প্রক্রিয়ায় দরপত্রের মাধ্যমে তা কেনা হয়েছে। ইস্ট ওয়েস্ট মিডিয়া গ্রুপ লিমিটেড ছিল সর্বনিম্ন দরদাতা। প্রতিষ্ঠানটির ওএমআর খুবই উন্নতমানের হওয়ায় এবং দামও সর্বনিম্ন হওয়ায় আমরা ওই প্রতিষ্ঠানকে কার্যাদেশ দিয়েছি। ’

বোর্ড চেয়ারম্যান বলেন, ‘যারা নিম্নমানের ওএমআর বেশি দামে সরবরাহ করতে চেয়েছিল, যাদের অন্যায় আবদার পূরণ হয়নি তারা এ ধরনের অপপ্রচারে জড়িত থাকতে পারে। এ ধরনের বিভ্রান্তি ও অপপ্রচার করছে একটি সংঘবদ্ধ চক্র। ’

চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ড চেয়ারম্যান বলেন, ‘বোর্ডের ফলাফল ও ওএমআর নিয়ে যাঁরা বিভ্রান্তি ছড়িয়েছেন এবং অপপ্রচার করেছেন কয়েক দিন আগে তাঁদের আমি ডেকেছি। বলেছি, অভিযোগ প্রমাণ করতে না পারলে তাঁদের বিরুদ্ধে আমরা আইনানুগ ব্যবস্থা নেব। আমি এক মাসের সময় দিয়েছি। ’

সংঘবদ্ধ চক্রটির আবার সক্রিয় হয়ে ওঠার বিষয়ে জানতে চাইলে অধ্যাপক শাহেদা ইসলাম বলেন, ‘যারা আগে বিভিন্ন অপকর্ম করেছিল তারা সাময়িক বরখাস্ত হয়েছে। নতুন করে তাদের মধ্যে কেউ সক্রিয় হচ্ছে কি না তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ যখনই আমরা পাচ্ছি তখনই তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। ’

ওএমআর ফরমের গুণগত মান উন্নত থাকার কথা স্বীকার করে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের সচিব ড. পীযূষ দত্ত বলেন, ইস্ট ওয়েস্ট মিডিয়া গ্রুপ লিমিটেড নামের প্রতিষ্ঠানটি যে ওএমআর ফরম সরবরাহ করেছে তা উন্নতমানের। এর মান নিয়ে প্রশ্ন তোলার কোনো যৌক্তিকতা নেই। টেকনিক্যাল কমিটি, দরপত্র কমিটি ও যাচাই-বাছাই কমিটি সব কিছু দেখে যথাযথ নিয়ম অনুসরণ করে ইস্ট ওয়েস্ট মিডিয়া গ্রুপ লিমিটেডকে কার্যাদেশ দিয়েছে। তিনি বলেন, ‘আমাদের কম্পিউটার সেকশনে যাঁরা দক্ষতার সঙ্গে ওএমআর স্ক্যান করেন, তাঁদের কাছ থেকে এখন পর্যন্ত এ কাগজ নিয়ে কোনো অভিযোগ পাইনি। সুতরাং বলতে হবে, ওএমআর ফরম উন্নতমানের। ’

অধ্যাপক পীযূষ আরো বলেন, ‘আমরা গত কয়েক বছরে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন অভিযোগ তদন্তে কমিটি গঠন করেছি। এরই মধ্যে যে ছয়জনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে তাঁদের দুজন কর্মকর্তা আছেন। যারা অপকর্ম করে তারা যাতে আবারও সক্রিয় হয়ে উঠতে না পারে সে ব্যাপারে আমরা সতর্ক আছি। ’

বোর্ডের সিনিয়র সিস্টেম এনালিস্ট কিবরিয়া মাসুদ খান বলেন, ‘ওএমআর ফরমের কোনো ত্রুটি নেই। এটা উন্নতমানের। ’

বোর্ড সূত্রে জানা যায়, গত বছরের ৩০ জুন ওএমআর ফরম ছাপানোর প্রাপ্ত দরপত্র পর্যালোচনা করা হয়। ওএমআর ফরম ফলাফল প্রকাশের ক্ষেত্রে স্পর্শকাতর হওয়ায় মানসম্মত ওএমআর শিট যাচাই করার জন্য একটি টেকনিক্যাল কমিটি গঠন করা হয়। তাদের সুপারিশ অনুযায়ী সক্ষমতা মোতাবেক সর্বনিম্ন দরদাতা ইস্ট ওয়েস্ট মিডিয়া গ্রুপ লিমিটেডকে সর্বসম্মতিক্রমে কার্যাদেশ দেওয়ার সুপারিশ করা হয়। টেন্ডার কমিটির এই সুপারিশের পর ইস্ট ওয়েস্ট মিডিয়া গ্রুপ লিমিটেডকে ওএমআর ফরম সরবরাহের কার্যাদেশ দেওয়া হয়।

বোর্ড সূত্রে জানা যায়, গত বছর এসএসসি ও এইচএসসির নির্বাচনী পরীক্ষায় অকৃতকার্য শিক্ষার্থীরা হাইকোর্টের একটি আদেশ বোর্ডে জমা দেয়। ওই আদেশে বোর্ডকে তাদের পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগ দিতে বলা হয়। আদেশটি ভুয়া বলে অভিযোগ উঠলে ওই বছরের ৬ এপ্রিল বোর্ড একটি তদন্ত কমিটি করে। কমিটির আহ্বায়ক ছিলেন উপপরিচালক (হিসাব ও নিরীক্ষা) শওকত আলম এবং সদস্য ছিলেন উপকলেজ পরিদর্শক মো. হালিম ও রেজা মোহাম্মদ এনামুল হক চৌধুরী। তদন্তে এই আদেশ ভুয়া বলে প্রমাণ হয়। এই জালিয়াতির সঙ্গে শিক্ষা বোর্ডের তিনজন কর্মকর্তা-কর্মচারীর সম্পৃক্ততার প্রমাণ পায় তদন্ত কমিটি। তদন্ত প্রতিবেদনের সুপারিশ অনুযায়ী সহকারী পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক মো. ওসমান গণি, শাখা কর্মকর্তা মো. জাহাঙ্গীর ও অফিস সহায়ক মো. শাখাওয়াত হোসাইনকে গত বছরের ১৭ সেপ্টেম্বর সাময়িক বরখাস্ত করে বোর্ড কর্তৃপক্ষ।

এর আগে সহকারী পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক মো. ওসমান গণি চেক জালিয়াতির দায়ে একবার সাময়িক বরখাস্ত হয়েছিলেন। এ ছাড়া ২০০৪ সালে চাকরিতে নিয়োগের সময় কক্সবাজার পৌরসভা থেকে তিনি যে অভিজ্ঞতা সনদ দিয়েছিলেন সেটিও ছিল ভুয়া। তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে তাঁর এই জালিয়াতি ধরা পড়ে।


মন্তব্য