kalerkantho

শনিবার । ৩ ডিসেম্বর ২০১৬। ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ২ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


শিবির ক্যাডার থেকে জঙ্গি নেতা আকাশ

রেজোয়ান বিশ্বাস ও আসাদুজ্জামান দারা   

২৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



শিবির ক্যাডার থেকে জঙ্গি নেতা আকাশ

মালয়েশিয়ায় একে-৪৭ রাইফেলসহ গ্রেপ্তার পেয়ার আহমেদ আকাশ দেশে থাকতেও বড় সন্ত্রাসী ছিলেন। জামায়াত-শিবিরের ক্যাডার হিসেবে তাঁর উত্থান।

দশ ট্রাক অস্ত্র মামলায় গ্রেপ্তার হওয়ার পর জামিন নিয়ে মালয়েশিয়ায় পালিয়ে গিয়ে ব্যবসার আড়ালে যোগ দেন উগ্র-মৌলবাদী গোষ্ঠীর সঙ্গে। গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারিতে জঙ্গি হামলার পরিকল্পনাকারীদের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ ছিল। যেসব জঙ্গি নেতা মালয়েশিয়ায় অবস্থান করে দেশে জঙ্গি হামলার পরিকল্পনা করেছিলেন তাঁদের মধ্যে এই আকাশও একজন।

মালয়েশিয়ায় আকাশের ব্যবসায়িক অংশীদার মো. ফজলুল আমীন জাভেদ মোবাইল ফোনে কালের কণ্ঠকে বলেন, গত ১৯ আগস্ট মালয়েশিয়ার পুচংয়ের একটি বাসা থেকে আকাশকে গ্রেপ্তার করে সে দেশের পুলিশ। তাঁকে ২ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হয়।

আকাশ বর্তমানে ফেনী কারাগারে আছেন বলে জানিয়েছেন সেখানকার পুলিশ সুপার রেজাউল হক। তিনি বলেন, মালয়েশিয়ায় গ্রেপ্তার করার পর ফেরত পাঠানো পিয়ার আহমেদ আকাশের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগ পাওয়া গেছে। তাঁর বিরুদ্ধে দেশ-বিদেশ থেকে যেসব তথ্য পাওয়া যাচ্ছে তার তদন্ত চলছে।

পেয়ার আহমেদ আকাশ ফেনী শহরে জামায়াত পরিচালিত শাহীন একাডেমি স্কুল থেকে ১৯৯৩ সালে এসএসসি পাস করেন। স্কুলে পড়ার সময়ই নিজের ভগ্নিপতি ও জেলা জামায়াতের নায়েবে আমির আবু ইউসুফের হাত ধরে জামায়াত-শিবিরের রাজনীতিতে যুক্ত হন তিনি। পরে অস্ত্র ব্যবসায় জড়িয়ে পড়েন। আকাশ দাগনভূঞা উপজেলার পূর্বচন্দ্রপুর ইউনিয়নের নয়নপুর গ্রামের বাসিন্দা।

ফেনী জেলা পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, আলোচিত দশ ট্রাক অস্ত্রের চালান থেকে খোয়া যাওয়া একে-৪৭ রাইফেল বিক্রি করার সময় ২০০৫ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর ফেনীতে আকাশসহ তিনজন র‌্যাবের হাতে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। পরে ওই ঘটনায় দায়ের করা মামলায় তাঁদের জেলহাজতে পাঠানো হয়। ওই সময় জিজ্ঞাসাবাদে আকাশ জানিয়েছিলেন, পুলিশের সার্জেন্ট আলাউদ্দিন ও সার্জেন্ট হেলাল উদ্দিনের সহায়তায় বিভিন্ন সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর কাছে তিনি অস্ত্রগুলো বিক্রি করেন। এক-এগারোর পর আকাশ জামিন পেয়ে পালিয়ে মালয়েশিয়া চলে গিয়েছিলেন। ইন্টারপোলের নোটিশ মাথায় নিয়ে মালয়েশিয়ায় তাঁর অন্য জীবন শুরু হয়। দেশে থাকতে তিনি যেমন জামায়াত-শিবিরের অস্ত্রের জোগানদাতা ছিলেন, বিদেশে থেকেও তেমনি জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মীদের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। মালয়েশিয়ায় পলাতক থেকেও তিনি জামায়াতের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বজায় রাখেন। মালয়েশিয়ায় অবৈধভাবে অবস্থানকালে আকাশ অস্ত্র ব্যবসায় জড়িয়ে পড়েন। তাঁর সঙ্গে দেশের শিবির ক্যাডারদেরও নিয়মিত যোগাযোগ ছিল। চট্টগ্রাম অঞ্চলের অনেক শীর্ষস্থানীয় শিবির নেতার সঙ্গে আকাশ মালয়েশিয়ায় থেকে যোগাযোগ রাখতেন। দেশে সরকারবিরোধী কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত ব্যক্তিদের সঙ্গেও মালয়েশিয়ায় বৈঠক করতেন তিনি। সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে এর আগে ২০১৪ সালের ১৫ ডিসেম্বরও মালয়েশিয়া পুলিশের হাতে আটক হয়েছিলেন আকাশ।

ফেনীর দাগনভূঞার ওসি আসলাম উদ্দিন জানান, আকাশ ২০০৫ সালে অস্ত্র মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে জামিন নিয়ে মালয়েশিয়া পালিয়ে যান। এরপর তাঁর খোঁজ চলছিল। গত মাসে তাঁকে মালয়েশিয়ার পুলিশ গ্রেপ্তার করে দেশে পাঠায়। বর্তমানে তিনি ফেনী কারাগারে রয়েছেন।

ফেনীর পুলিশ সূত্রে জানা যায়, শিবির ক্যাডার আকাশের কাছে ২০০৫ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর দুটি একে-৪৭ রাইফেল পাওয়া গিয়েছিল। গ্রেপ্তার হওয়ার পর জেলে থাকা অবস্থায়ও তাঁর সঙ্গে সন্ত্রাসীদের মোবাইল ফোনের মাধ্যমে যোগাযোগ ছিল। মালয়েশিয়ায় অবস্থানকালে আকাশ মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টাসহ দেশের বিরুদ্ধে নানা ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিলেন। ফেনীর দাগনভূঞা থানার এসআই সাইফুল ইসলাম বলেন, মালয়েশিয়া থেকে ফেরত পাঠানোর পর তাঁর কাছেই আকাশকে হস্তান্তর করা হয়।

এদিকে মালয়েশিয়া পুলিশের বরাত দিয়ে সে দেশের সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ৩৭ বছর বয়সী বাংলাদেশি ওই ব্যক্তি (আকাশ) কুয়ালালামপুরের বুকিত বিনতাংয়ে একটি রেস্তোরাঁ চালাতেন। একটি আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী সংগঠনের ব্যবহারের জন্য অস্ত্র পাচারে জড়িত থাকার অভিযোগ আনা হয় তাঁর বিরুদ্ধে। তাঁর নামে ইন্টারপোলের ‘রেড নোটিশ’ও জারি হয়েছিল। ইসলামিক স্টেটসহ (আইএস) আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত থাকার পাশাপাশি সন্ত্রাসবাদে জড়িত থাকার অভিযোগে গত মাসে (২ থেকে ১৭ আগস্টের মধ্যে) বাংলাদেশসহ তিনটি দেশের নাগরিকদের গ্রেপ্তার করে মালয়েশিয়ার পুলিশ। তাঁদের মধ্যে একজন বাংলাদেশের, একজন নেপালের, একজন মরক্কোর ও একজন মালয়েশিয়ার নাগরিক। অন্যদেরও নিজ নিজ দেশে ফেরত পাঠিয়েছে মালয়েশিয়ার পুলিশ। গত বৃহস্পতিবার মালয়েশিয়ার পুলিশের বিজ্ঞপ্তির বরাত দিয়ে চ্যানেল নিউজ এশিয়া, ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস টাইমস ও দ্য স্টার অনলাইন এ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। তবে প্রতিবেদনে গ্রেপ্তার হওয়া কারো নাম প্রকাশ করা হয়নি। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, ইন্টারপোলের পরোয়ানাভুক্ত এক বাংলাদেশি রেস্তোরাঁ মালিকসহ চারজনকে গ্রেপ্তার করেছে দেশটির পুলিশ। গ্রেপ্তারকৃতদের মধ্যে তিনজনই বিদেশি। এরই মধ্যে তাঁদের নিজ নিজ দেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে।

প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, গ্রেপ্তার হওয়া নেপালি ব্যক্তিটি মালয়েশিয়ায় একটি বিনোদন আউটলেটের ব্যবস্থাপক ছিলেন। আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী সংগঠনের সদস্যদের ব্যবহারের জন্য ভ্রমণের ভুয়া কাগজপত্র তৈরির সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। আর মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক জঙ্গিগোষ্ঠী আইএসের সদস্য সন্দেহে মরক্কোর নাগরিককে গ্রেপ্তার করা হয়। মালয়েশীয় পুলিশ বলছে, সিরিয়ায় অনুপ্রবেশের চেষ্টার পর তুরস্কেও তিনি এর আগে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। আর গ্রেপ্তার হওয়া মালয়েশিয়ার নাগরিকটি এক ব্যবসায়ীর ব্যক্তিগত গাড়িচালক। ফেসবুকে আইএসের কর্মকাণ্ডের সক্রিয় সমর্থক মোহাম্মদ ওয়ানদি মোহাম্মদ জেদি নামে এক ব্যক্তির সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক রয়েছে। তিনি মালেয়েশিয়ায় অবস্থানকালে বাংলাদেশেও সন্ত্রাসী হামলার পরিকল্পনা করেছিলেন।

মালয়েশিয়ার পুলিশের আইজি খালিদ আবু বকরের বরাত দিয়ে গত বৃহস্পতিবার সে দেশের দ্য স্টার অনলাইন জানায়, ওই বাংলাদেশি নাগরিক (আকাশ) মালয়েশিয়ার পর্যটনকেন্দ্র বুকিত বিনতাংয়ে রেস্তোরাঁ চালাতেন। সেখানে গুলশান হামলায় জড়িত সন্দেহভাজন এক জঙ্গির সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎ হয়েছিল। ওই জঙ্গির নাম আন্দালিব আহমেদ। এ ছাড়া তাঁর সঙ্গে বাংলাদেশের আরো অনেক জঙ্গি সদস্যের যোগাযোগ ছিল। আন্দালিব মালয়েশিয়ার মোনাশ ইউনিভার্সিটিতে পড়তেন। মালয়েশিয়া থেকে তুরস্কেও গিয়েছিলেন তিনি। স্টার অনলাইনের প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, ওই বাংলাদেশি (আকাশ) গুলশানে হলি আর্টিজান বেকারিতে জঙ্গি হামলার পরিকল্পনায় জড়িত। ‘আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী সংগঠনের ব্যবহারের জন্য অস্ত্র পাচারে’ জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে।

পুলিশ জানায়, আকাশ একসময় মালয়েশীয় এক ব্যবসায়ীর গাড়িচালক ছিলেন। তিনি নিজের  ফেসবুক অ্যাকাউন্টে আইএসের পক্ষে প্রচার চালাতেন। তাঁর বিরুদ্ধে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের আরো অনেক অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। সেসব যাচাই-বাছাই চলছে।

মালয়েশিয়ায় আকাশের হোটেলে জঙ্গিদের আড্ডা : পুলিশ সূত্র জানায়, আকাশের মালিকানায় কুয়ালালামপুরে ‘রসনা বিলাস’ নামের একটি হোটেল রয়েছে। ওই হোটেলকে ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করে আকাশ জঙ্গি নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখত। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারকাজ বাধাগ্রস্ত করতে আকাশ মালয়েশিয়ায় সভা-সমাবেশও করেছিল। আদম ব্যবসার এজেন্টসহ বিভিন্ন ব্যবসায়ও তার হাত ছিল।

২০১৫ সালের ১৯ এপ্রিল জামায়াতপন্থীদের মালিকানাধীন রিয়েল এস্টেট কমপানি মিশন গ্রুপের সৌজন্যে মালয়েশিয়ায় এক সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে আকাশ উপস্থিত থাকে। পাশাপাশি মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশ হাইকমিশনের সঙ্গে প্রবাসী কমিউনিটি নেতার পরিচয়ে বিভিন্ন সময় মতবিনিময় অনুষ্ঠানেও যোগ দেয় আকাশ। মালয়েশিয়া বাংলাদেশি কমিউনিটি প্রেস ক্লাবের সাইনবোর্ডের আড়ালেও আকাশ তার অনুগত সঙ্গী জহিরুল ইসলাম হিরন, মোহাম্মদ মহিউদ্দিন, সালেহ আহমেদ সাগর, শাহনুর, মমিনুল হক, জিয়া উদ্দিন মাহমুদ, মোহাম্মদ আখতার হোসেনসহ অনেককে আড়ালে রাখার চেষ্টা করত। দেশে থাকতে ২০০৫ সালে ফটিকছড়িতে র‌্যাবের হাতে ক্রসফায়ারে নিহত শিবির ক্যাডার আজরাইল ছিল আকাশের ঘনিষ্ঠ। সে সময় আজরাইলের কাছে আকাশ চারটি একে-৪৭ রাইফেল বিক্রি করেছিল বলে তথ্য পেয়েছে পুলিশ।

আন্দালিবকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হতে পারে : মালয়েশিয়ার মোনাস বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আন্দালিব আহমেদ আলোচিত আকাশসহ গুলশান হামলার জঙ্গিদের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিল বলে এরই মধ্যে খবর ছড়িয়েছে। মালয়েশিয়ার স্টার অনলাইনে বলা হয়েছে, আন্দালিব নামের ওই ছাত্র তুরস্কের ইস্তাম্বুলেও যায়। আলোচিত ওই যুবক জাতীয় দলের সাবেক ফুটবলার আশরাফ উদ্দিন আহমেদ চুন্নুর ছেলে।

পুলিশ জানিয়েছে, গতকাল পর্যন্ত গুলশান হামলার তদন্তে আন্দালিবের সংশ্লিষ্টতা না পাওয়ায় তাকে আটক না করা হলেও প্রয়োজনে জিজ্ঞাসাবাদ করা হতে পারে। তবে সাবেক ফুটবলার চুন্নু বলেছেন, ‘আমার ছেলে এখন আমার সঙ্গে গার্মেন্ট ব্যবসা করছে। প্রতিদিনই সে আমার সঙ্গে কারখানায় যাচ্ছে, আসছে। তার জঙ্গি হওয়ার কোনো সুযোগই নেই। ’

ঢাকা মহানগর পুলিশের উপকমিশনার (মিডিয়া) মাসুদুর রহমান বলেন, ‘জঙ্গিরা নানা ছদ্মনাম ব্যবহার করে। গুলশান হামলার তদন্ত এখনো শেষ হয়নি। প্রয়োজন হলে আন্দালিবকেও জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। ’


মন্তব্য