kalerkantho

সোমবার । ৫ ডিসেম্বর ২০১৬। ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৪ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


চীনা প্রেসিডেন্টের সফর

১৬০০০০ কোটি টাকার ঋণে সাড়া চায় ঢাকা

আবুল কাশেম ও আরিফুজ্জান তুহিন   

২৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



 ১৬০০০০ কোটি টাকার ঋণে সাড়া চায় ঢাকা

বাংলাদেশের বড় উন্নয়ন প্রকল্পের বেশির ভাগ কাজের ঠিকাদারই চীনের। পদ্মা সেতু নির্মাণ থেকে শুরু করে সর্বশেষ ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক চার লেনে উন্নীতকরণ প্রকল্পের ঠিকাদারিও পাচ্ছে চীনা কম্পানি।

বিভিন্ন প্রকল্পে আগ বাড়িয়ে অর্থায়নের প্রস্তাব দেয় চীন, সে মতে সরকার প্রকল্প প্রস্তাব চূড়ান্ত করে ঠিকাদার নিয়োগের অনুমোদন দিলেও শেষ পর্যন্ত ঋণচুক্তি করছে না দেশটি। ২০১৩ সালের পর থেকে গত তিন বছরে বাংলাদেশের সঙ্গে কোনো ঋণচুক্তি করেনি চীন। আবার কোনো প্রকল্পে অর্থায়ন করবে কি না সেটাও স্পষ্ট করে বলছে না দেশটি। চীনের কাছে ২৫টি প্রকল্পে প্রায় দুই হাজার ৯ কোটি ডলার বা এক লাখ ৬০ হাজার কোটি টাকার অর্থায়ন চেয়ে কোনো জবাব না পাওয়ায় প্রকল্পগুলোর অগ্রগতি থমকে আছে। আর চীনের মতামত না পাওয়ায় অন্য উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকেও অর্থ সংস্থান করতে পারছে না বাংলাদেশ। আগামী ১৪-১৫ অক্টোবর চীনের প্রেসিডেন্ট শি চিংপিংয়ের ঢাকা সফরকালে ওই সব প্রকল্পে অর্থায়ন সম্পর্কে স্পষ্ট সিদ্ধান্ত আশা করছে সরকার।

২০১৩ সালে সর্বশেষ পদ্মা জশলদিয়া প্রকল্পে চীনের সঙ্গে ঋণচুক্তি সই করেছিল সরকার। এরপর দীর্ঘ সময় ধরে বাংলাদেশের প্রকল্পে চীনের পক্ষ থেকে অর্থায়নের সিদ্ধান্ত না জানানোয় বেশ হতাশ অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। হতাশার বড় কারণ হলো, ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক চার লেনে উন্নীতকরণ প্রকল্পসহ আরো বেশ কয়েকটি প্রকল্প ২০১৮ সালের মধ্যেই শেষ করার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। এ অবস্থায় অর্থমন্ত্রী বারবার ঢাকায় চীনা রাষ্ট্রদূতের মাধ্যমে চীন সরকারের কাছে চিঠি লিখে তাগাদা দিলেও এ ব্যাপারে কোনো সিদ্ধান্ত জানাচ্ছে না দেশটি। অথচ ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক চার লেনে উন্নীতকরণ প্রকল্পসহ এক ডজন প্রকল্পের ঠিকাদার নিয়োগপ্রক্রিয়া প্রায় সম্পন্ন হয়ে গেছে। কোনো কোনোটির বাণিজ্যিক চুক্তিও হয়েছে। শুধু ঋণচুক্তি বাকি।

এ অবস্থায় গত ২২ আগস্ট ঢাকায় চীনের রাষ্ট্রদূত মা মিংকুয়াংকে লেখা চিঠির শুরুতেই হতাশা প্রকাশ করে অর্থমন্ত্রী বলেছেন, ‘অত্যন্ত দুঃখের বিষয় যে ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক চার লেনে উন্নীত করতে অর্থায়ন করতে অনুরোধ করে অনেক চিঠি আমরা দিয়েছি। এখন আমি এটা বলতে চাই যে আমরা এই প্রকল্পে আপনাদের কাছ থেকে অর্থায়ন চাই। বেশ কিছু সময় ধরে কয়েকটি চীনা ঠিকাদারের সঙ্গে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের কাজ নিয়ে আলোচনা চলছে। আমি বলতে চাই, অর্থায়নের সিদ্ধান্ত যত ত্বরান্বিত হবে, চুক্তি স্বাক্ষরও তত তাড়াতাড়ি হবে। আমি এটা বলতে বাধ্য হচ্ছি এ কারণে যে আমাদের অভিজ্ঞতা যথেষ্ট ভালো নয়। ’

ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক চার লেনে উন্নীতকরণ প্রকল্প নিয়ে ২০১৫ সালের আগস্টের শুরুতে সরকারের সঙ্গে চীনাদের সমঝোতা হয়। ওই প্রসঙ্গ তুলে ধরে আবুল মাল আবদুল মুহিত লিখেছেন, ‘সমঝোতা অনুযায়ী এই প্রকল্পটি বাস্তবায়নের কাজও কোনো রকম দরপত্র আহ্বান ছাড়াই চীনা ঠিকাদারকে দেওয়া হবে। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করার বিষয়ে আমি খুবই উচ্চাকাঙ্ক্ষী। এমনকি আমি ২০১৮ সালের মধ্যেই এটি চালু করতে চাই। ’

২৫টি প্রকল্পের তালিকা ও অর্থায়নের পরিমাণের তথ্য তুলে ধরে মুহিত চীনা রাষ্ট্রদূতকে বলেছেন, ‘বিভিন্ন সময়ই এই তালিকা আপনাদের দেওয়া হয়েছে। ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক চার লেনে উন্নীতকরণসহ তালিকায় ২৫টি প্রকল্প রয়েছে। আমি এ চিঠির সঙ্গেও তালিকাটি আবার দিচ্ছি। আমরা সবার আগে জানতে চাই, এর মধ্যে কোন কোন প্রকল্পে আপনারা অর্থায়ন করবেন। এটা জানা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এর মধ্য থেকে কিছু প্রকল্পের জন্য অর্থ চেয়ে আমরা অন্য উন্নয়ন সহযোগীদের কাছে তাদের প্রাথমিক বিবেচনার জন্য পাঠিয়েছি। ’

অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) কর্মকর্তারা বলছেন, চীনা রাষ্ট্রদূতকে লেখা অর্থমন্ত্রীর চিঠির পর বেশ ইতিবাচক সাড়া পাওয়া যাচ্ছে। চীনা প্রেসিডেন্ট শি চিংপিংয়ের সফরকালে কর্ণফুলী নদীতে টানেল নির্মাণ বিষয়ে চুক্তি সই হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। এ প্রকল্পটিতে ৭০ কোটি ৫৮ লাখ ডলার বৈদেশিক মুদ্রার প্রয়োজন। গত বুধবার অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকে ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক চার লেনে উন্নীতকরণ প্রকল্পের ঠিকাদার হিসেবে চায়না হার্ভারকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। ফলে এ প্রকল্পটিতেও ১৬০ কোটি ৩৩ লাখ ডলার অর্থায়নের সিদ্ধান্ত চীনের তরফ থেকে পাওয়ার সম্ভাবনা স্পষ্ট হচ্ছে।

যে ২৫টি প্রকল্পের কথা অর্থমন্ত্রী বলেছেন, সেগুলোর মধ্যে ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক চার লেনে উন্নীতকরণ ও কর্ণফুলী নদীতে টানেল নির্মাণ ছাড়া আরো ১০টি প্রকল্প রয়েছে, যার মধ্যে কয়েকটির বাণিজ্যিক চুক্তি সই হয়েছে, আবার কোনো কোনোটির চুক্তি সই নিয়ে আলোচনা চলছে।

এসব প্রকল্পের মধ্যে ডেভেলপমেন্ট অব ন্যাশনাল আইসিটি ইনফ্রা-নেটওয়ার্ক ফর বাংলাদেশ গভর্নমেন্ট ফেস-৩ (ইনফো-সরকার) প্রকল্পে দরকার ১৫ কোটি ডলার, ইনস্টলেশন অব সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং (এসপিএম) উইথ ডাবল পাইপলাইন প্রকল্পে ৫০ কোটি ডলার, রাজশাহী ওয়াসার সার্ফেস ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্লান্টে ৫০ কোটি ডলার, সিস্টেম লস রিডাকশন বাই রিপ্লেসিং পাঁচ মিলিয়ন ইলেকট্রো মেকানিক্যাল এনার্জি মিটার উইথ ইলেকট্রনিক এনার্জি মিটার প্রকল্পে ১৬ কোটি ৬০ লাখ ডলার, এক্সপানসন অ্যান্ড স্ট্রেংদেনিং অব পাওয়ার সিস্টেম নেটওয়ার্ক আন্ডার ডিপিডিসি এরিয়া প্রকল্পে ২০৩ কোটি ৮০ লাখ ডলার, পদ্মা সেতু রেল লিংক (ফেস-১) প্রকল্পে ১৬৫ কোটি ৮৫ লাখ ডলার এবং পদ্মা সেতু রেল লিংক (ফেস-২) প্রকল্পে ৯২ কোটি ডলার। এ ছাড়া পাওয়ার গ্রিড নেটওয়ার্ক স্ট্রেংদেনিং প্রজেক্ট আন্ডার পিজিসিবি প্রকল্পে ১৩২ কোটি ডলার, ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেস ওয়ে প্রকল্পে ১৩৯ কোটি ডলার এবং মর্ডানাইজেশন অব টেলিকমিউনিকেশন নেটওয়ার্ক ফর ডিজিটাল কানেকটিভিটি প্রকল্পে ২০ কোটি ডলার দরকার। এই ১২টি প্রকল্পে মোট বৈদেশিক সহায়তা দরকার এক হাজার ১১৫ কোটি ডলার।

আরো ১৩টি প্রকল্পে অর্থায়ন চেয়ে গত বছরের ১২ ডিসেম্বর চীনের কাছে তালিকা পাঠিয়েছে বাংলাদেশ। ওই ১৩ প্রকল্পে ৮৯৪ কোটি ডলার বৈদেশিক সহায়তা চেয়েছে সরকার। এসব প্রকল্পে চীন অর্থায়ন করবে কি না সে বিষয়ে এখনো কোনো জবাব দেয়নি।

এ প্রকল্পগুলোর মধ্যে জয়দেবপুর-ময়মনসিংহ মিটারগেজ রেললাইন ডুয়েলগেজে রূপান্তরে ২৬ কোটি ডলার, জয়দেবপুর-ঈশ্বরদী রেললাইন ডুয়েলগেজে রূপান্তরে ৭৫ কোটি ডলার, ডিজিটাল কানেকটিভিটিতে ১০০ কোটি ডলার, সীতাকুণ্ড-চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মেরিন ড্রাইভ এক্সপ্রেসওয়ে ও কোস্টাল সুরক্ষা প্রকল্পে ২৮৬ কোটি ডলার, মংলাবন্দর সম্প্রসারণ ও আধুনিকায়নে ২৫ কোটি ডলার, বড় পুকুরিয়ায় ভূগর্ভস্থ কয়লা উত্তোলন প্রকল্পে ২৬ কোটি ডলার, গজারিয়ায় ৩৫০ মেগাওয়াট কয়লাভিত্তিক থার্মাল বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে ৪৩ কোটি ডলার, আখাউড়া-সিলেট রেললাইন মিটারগেজ থেকে ডুয়েল গেজে উন্নীতকরণ প্রকল্পে ১৭৬ কোটি ডলার এবং পিডিবির ডিস্ট্রিবিউশন এলাকায় প্রি-পেইড মিটার স্থাপন প্রকল্পে ৫২ কোটি ডলার চেয়ে কোনো সাড়া মেলেনি।

এ ছাড়া দিরাশ্রম রেলওয়ে স্টেশনে নতুন অভ্যন্তরীণ কনটেইনার ডিপো নির্মাণে ২০ কোটি ডলার, ওভারলোডেড ট্রান্সফরমার প্রতিস্থাপন প্রকল্পে ২৩ কোটি ডলার, পানি সরবরাহ ও পয়োনিষ্কাশন প্রকল্পে ১৫ কোটি ডলার এবং সরকারি পাটকল আধুনিকায়নে ২৮ কোটি ডলার চেয়েছে সরকার।


মন্তব্য