kalerkantho

বুধবার । ৭ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৬ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


দীর্ঘদিন পালিয়ে থাকায় খোকার সম্পদ বাজেয়াপ্ত

গুলশানের বাড়ি ও রূপগঞ্জের জমি

আশরাফ-উল-আলম ও এম বদি-উজ-জামান   

২৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



দীর্ঘদিন পালিয়ে থাকায় খোকার সম্পদ বাজেয়াপ্ত

আদালতের নির্দেশনার পর বিএনপি নেতা সাদেক হোসেন খোকার গুলশানের বাড়ি এখন সরকারি সম্পত্তি (ওপরে)। এরপর গতকাল রূপগঞ্জের ৫০ একর সম্পত্তি সরকার নিজ তত্ত্বাবধানে নেয়। ছবি : কালের কণ্ঠ

আইন অনুযায়ী সাজাপ্রাপ্ত কোনো ব্যক্তি ৩০ দিনের মধ্যে রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করতে পারেন। কিন্তু অবৈধভাবে সম্পদ অর্জনের দায়ে ঢাকার সাবেক মেয়র সাদেক হোসেন খোকার সাজা হওয়ার এক বছরের বেশি সময় পরও তিনি আত্মসমর্পণ করে উচ্চ আদালতে আপিল করেননি।

এ কারণে তাঁর সম্পদ বাজেয়াপ্ত করছে সরকার।

আদালতের রায় অনুযায়ী জরিমানার টাকা আদায় করতে এরই মধ্যে গুলশানে খোকার বাড়ি ও নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে তাঁর ৫০ একর জমি বাজেয়াপ্ত করে সরকার তা দখলে নিয়েছে। এ ছাড়া গাজীপুরের কালিয়াকৈরে ১০০ একর জমি বাজেয়াপ্ত করার চূড়ান্ত প্রক্রিয়া চলছে।

বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান খোকাকে করা জরিমানার টাকা আদায়ের জন্য তাঁর সম্পদ বাজেয়াপ্ত করার প্রক্রিয়া শুরু হয় গত জুলাইয়ে। অবৈধভাবে সম্পদ অর্জনের দায়ে ২০১৫ সালের ২০ অক্টোবর সাদেক হোসেন খোকার ১৩ বছরের কারাদণ্ড ও দুই লাখ টাকা জরিমানা করেন ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-৩। একইভাবে অবৈধভাবে অর্জিত সম্পদ সরকারের অনুকূলে বাজেয়াপ্ত করার নির্দেশ দেওয়া হয় রায়ে।

রায়ে অবৈধভাবে অর্জিত ১০ কোটি পাঁচ লাখ ২১ হাজার ৮৩২ টাকার স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তি রাষ্ট্রের অনুকূলে বাজেয়াপ্ত করার নির্দেশ দেওয়া হয়। বাজেয়াপ্ত হওয়া সম্পদের মধ্যে রয়েছে রাজধানীর গুলশান-২-এর ৭২ নম্বর রোডের পাঁচ কাঠা জমির ওপর ছয়তলা প্রায় আড়াই কোটি টাকা মূল্যের বাড়ি, গাজীপুর জেলার কালিয়াকৈর থানা এলাকা ও নারায়ণগঞ্জে প্রায় সাড়ে সাত কোটি টাকা মূল্যমানের ১৩৩ দশমিক ৫৯৫২ একর জমি, মেসার্স বুড়িগঙ্গা ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের নামে হাবিব ব্যাংকের মতিঝিল শাখায় চলতি হিসাব নম্বর ৫০২৬-৮০-এ জমা করা ২৩ লাখ ১২ হাজার ৯৭৬ দশমিক ২৯ টাকা।

আইন অনুযায়ী সাজাপ্রাপ্ত কোনো ব্যক্তি ৩০ দিনের মধ্যে রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করতে পারেন। কিন্তু দীর্ঘদিন পরও খোকা আত্মসমর্পণ করে উচ্চ আদালতে আপিল না করায় তাঁর সম্পদ বাজেয়াপ্ত করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে সরকার। গত জুলাইয়ে খোকাকে করা জরিমানার টাকা আদায়ের জন্য তাঁর সম্পদ বাজেয়াপ্ত করার প্রক্রিয়া শুরু হয়। গত ১২ জুলাই সভা করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। দুদকের চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ, কমিশনার ড. নাসিরুদ্দিন আহমেদ, মহাপরিচালক মো. মঈদুল ইসলাম ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা সভায় উপস্থিত ছিলেন। খোকার সম্পদ বাজেয়াপ্তির বিষয়টি স্পষ্টীকরণের জন্য আইন ও বিচার মন্ত্রণালয়ের সচিব বরাবর চিঠি লেখার সিদ্ধান্ত হয় সভায়। তবে সম্পদ বাজেয়াপ্ত করার দায়িত্ব যেহেতু সরকারের, তাই জেলা ম্যাজিস্ট্রেটকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ করা হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে ঢাকার জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ সালাহ উদ্দিন আইন ও বিচার বিভাগের সচিব বরাবর একটি চিঠি লেখেন। চিঠিতে বলা হয়, রায়ে উল্লিখিত সাদেক হোসেন খোকার ঢাকায় গুলশান-২ নম্বর সার্কেলের ৭২ নম্বর রোডের বাড়ি নম্বর-৯ একটি ছয়তলা বাড়ি। পাঁচ কাঠা জমির ওপর এটি নির্মিত। বাড়িটি একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান নিয়ন্ত্রণ করছে। চিঠিতে আরো বলা হয়, খোকার অবৈধভাবে অর্জিত এই বাড়ি যে প্রতিষ্ঠান কর্তৃক ব্যবহৃত হচ্ছে, সেই প্রতিষ্ঠানকে কিভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হবে তা নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে আরো তিনটি বিষয়ে মতামত চাওয়া হচ্ছে। এক. স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ রাষ্ট্রের অনুকূলে বাজেয়াপ্তির আদেশ কার্যকর করার জন্য জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ক্ষমতাপ্রাপ্ত কি না, দুই. স্থাবর-অস্থাবর যাবতীয় সম্পদ রাষ্ট্রের অনুকূলে বাজেয়াপ্তির আদেশ কোন পদ্ধতিতে কার্যকর হবে এবং তিন. জমি, বাড়ি ও বাড়ির ভেতর অন্য কোনো অস্থাবর সম্পদ থাকলে তা একই কর্তৃপক্ষ কর্তৃক কার্যকর করা হবে কি না এসব বিষয়ে মতামত চাওয়া হয়। এ বিষয়ে ‘খোকার অবৈধ সম্পদ বাজেয়াপ্ত হচ্ছে : আদালতের নির্দেশ কার্যকর করতে আইনি প্রক্রিয়া শুরু’ শিরোনামে কালের কণ্ঠে গত ২৯ জুলাই একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়।

আইন মন্ত্রণালয় মতামত দেওয়ার পর খোকার সম্পদ বাজেয়াপ্ত করার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয় জেলা প্রশাসন।

আমাদের নারায়ণগঞ্জ ও রূপগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী সাদেক হোসেন খোকার ৫০ দশমিক ৮৯ একর জমি বাজেয়াপ্ত করেছে নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসন। নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের কর্ণগোপ, তেতলাবো ও গোলাকান্দাইল মৌজার এই জমি সরকারের দখল, নিয়ন্ত্রণ ও হেফাজতে নেওয়ার জন্য গত ২০ আগস্ট  নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসককে নির্দেশ দেয় সরকার। ওই জমির মূল্য আট কোটি ৯৩ লাখ ৫১ হাজার ৭৩৯ টাকা নির্ধারণ করা হয়। গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে বাজেয়াপ্ত জমিতে লাল নিশান উড়িয়ে দেয় উপজেলা প্রশাসন। বাজেয়াপ্তির বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ফারহানা ইসলাম ও সহকারী কমিশনার (ভূমি) সাইদুল ইসলাম।

জানা গেছে, প্রায় ১৫ বছর আগে রূপগঞ্জ উপজেলার তেতলাবো মৌজায় ৩৮ একর ৬২ শতাংশ ৬০ অযুতাংশ, গোলাকান্দাইল মৌজায় তিন একর ৯ শতাংশ ৭৫ অযুতাংশ ও কর্ণগোপ মৌজায় ৬ একর ১৫ শতাংশ ৭২ অযুতাংশ জমি বুড়িগঙ্গা ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইসমত আরার নামে ১১৭টি দাগে কৃষিজমি কেনেন সাদেক হোসেন খোকা। সেখানে জমি পাহারা দেওয়ার জন্য ১৮ থেকে ২২ জন আনসার নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। স্থানীয় বেশ কয়েকজন প্রভাবশালী প্রজেক্টটি দেখাশোনার দায়িত্বে রয়েছেন। ওই প্রজেক্টে ২০ থেকে ২৫ বিঘা খাসজমি রয়েছে। সরকারি খাসজমি ভুয়া দলিল বানিয়ে বিভিন্নভাবে রেজিস্ট্রি করে নিয়েছেন সাদেক হোসেন খোকা। এ ছাড়া অনেক নিরীহ কৃষকের জমিও জবরদখলসহ জাল দলিল সম্পাদন করে নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) সাইদুল ইসলাম বলেন, ‘আদালতের নির্দেশে আমরা ৫০ একর ৮৯ শতাংশ জমি বাজেয়াপ্ত করে লাল পতাকা টানিয়ে দিয়েছি। এখন জমি খাস খতিয়ানভুক্ত করার প্রক্রিয়া চলছে। ’ 

জেলা প্রশাসক রাব্বি মিঞা জানান, আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী সাদেক হোসেন খোকার ৫০ দশমিক ৮৯ একর জমি এরই মধ্যে সরকারের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে খাসজমি হিসেবে রেকর্ড করা হয়েছে। সরকারের নিয়ম অনুযায়ী এ জমির দখল নিয়ে লাল পতাকা এবং সাইনবোর্ড লাগানো হয়েছে।

নারায়ণগঞ্জের এই জমি সরকারের দখলে নেওয়ার আগে গত বুধবার ঢাকার গুলশানে পাঁচ কাঠা জমির ওপর নির্মিত ছয়তলা ভবন সরকারের দখলে নেওয়া হয়। ওই বাড়িতে নোটিশ টাঙিয়ে বলা হয়েছে, এটি বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে। গুলশান সার্কেলের কানুনগো আমিরুল ইসলাম জানান, আদালতের রায় অনুযায়ী জেলা প্রশাসকের দপ্তরের নির্দেশ পালন করে তাঁরা গত বুধবার সাদেক হোসেন খোকার গুলশানের ছয়তলা বাড়িটি (ভূমিসহ) দখলে নিয়েছেন। সেখানে বাজেয়াপ্তির নোটিশ টাঙিয়ে দেওয়া হয়েছে।

গাজীপুর থেকে আমাদের নিজস্ব প্রতিবেদক ও কালিয়াকৈর প্রতিনিধি জানান, গাজীপুরের কালিয়াকৈরে খোকার জমি বাজেয়াপ্তির কাজ প্রক্রিয়াধীন। কালিয়াকৈরের জানের চালা, বাঁশতলী, কালিয়াদহ, তালতলী, বাগাম্বর ও কাচারস মৌজায় খোকার যৌথ মালিকানায় প্রায় ৮৩ একর (২৪৯ বিঘা) জমি রয়েছে বলে উপজেলা ভূমি অফিস সূত্রে জানা গেছে।

সূত্র মতে, কালিয়াকৈরের শ্রীফলতলী ভূমি অফিসের আওতাধীন জানের চালা মৌজায় খোকার ৪২ শতক, সফিপুর ইউনিয়ন ভূমি অফিসের আওতাধীন বাঁশতলী, তালতলী, কালিয়াদহ, কাচারস ও বাগাম্বর মৌজায় বুড়িগঙ্গা ইন্ডাস্ট্রিজের নামে ৭৪ একর জমি রয়েছে, যার ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইসমতারা বেগম। অন্যদিকে সাহবাজপুর ইউনিয়ন ভূমি অফিসের আওতাধীন উত্তর বক্তারপুর এলাকায় তাঁর প্রায় সাত একর জমি রয়েছে।

গাজীপুরের জেলা প্রশাসক এম এম আলম গতকাল সন্ধ্যায় জানান, আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী, কালিয়াকৈরের বিভিন্ন মৌজায় থাকা সাদেক হোসেন খোকার জমি বাজেয়াপ্তির কাজ প্রক্রিয়াধীন।

খোকার আশা : এদিকে দেশে ফিরে আপিল করে বাজেয়াপ্ত করা সম্পত্তি ফেরত পাওয়ার আশা করছেন সাদেক হোসেন খোকা। দুর্নীতির মামলার রায় অনুযায়ী জরিমানার টাকা আদায় করতে অবৈধ সম্পদ বাজেয়াপ্ত করার খবর পেয়ে তিনি এই আশা ব্যক্ত করেন। খোকা যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্কে আছেন। ঢাকা থেকে যোগাযোগ করা হলে তিনি গতকাল কালের কণ্ঠকে বলেন, রাজনৈতিকভাবে হয়রানি করার জন্যই একতরফা এ রায় হয়েছে। আদালতের অনুমতি নিয়েই তিনি বিদেশে চিকিৎসাধীন এবং এ-সংক্রান্ত কাগজপত্র আদালতে জমা দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, দেশে ফিরে তিনি সশরীরে উপস্থিত হয়ে এ রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করবেন। তিনি আরো বলেন, ‘আমি আশা করছি, আপিল করার সুযোগও পাব এবং খালাসও পাব। ’

খোকার আইনজীবীরা বলছেন, আপিল করার সুযোগ পেলে তিনি যদি আপিলে খালাস পেয়ে যান তবে বাজেয়াপ্ত করা সম্পদ ফেরত পাবেন তিনি। আইনজীবীরা আরো বলেন, দেশে প্রচলিত তামাদি আইনের বিধান মতে সাজাপ্রাপ্ত পলাতক আসামি যখন গ্রেপ্তার হন বা আদালতে আত্মসমর্পণ করেন তখন তিনি আপিল করতে পারেন।

অ্যাডভোকেট মাসুদ আহমেদ তালুকদার বলেন, সাজা হয়েছে বলেই খোকার সম্পদ বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে। যদি তিনি উচ্চ আদালতে আপিল করতে পারেন এবং উচ্চ আদালত যদি তাঁকে খালাস দেন তবে ওই সম্পদ আইন অনুযায়ী তাঁকে ফেরত দিতে হবে। আর যদি সাজা বহাল থাকে তবে তিনি ফেরত পাবেন না।

এই প্রথম কারো সম্পদ বাজেয়াপ্ত : এর আগে এক-এগারোর সরকারের আমলে অনেক প্রভাবশালী রাজনীতিককে সাজা দেওয়া হয়। এদের মধ্যে প্রায় সবাই আপিল করেন। আপিলে বেশির ভাগ রাজনীতিক খালাস পান। কেউ কেউ পলাতকও ছিলেন। তবে কারো সম্পদই বাজেয়াপ্ত করা হয়নি। জেলা প্রশাসককে দেওয়া দুদকের চিঠিতেই বিষয়টি স্পষ্ট হয়।


মন্তব্য