kalerkantho

সোমবার । ৫ ডিসেম্বর ২০১৬। ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৪ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


কবরে নামানোর সময় কেঁদে উঠল নবজাতক

নিজস্ব প্রতিবেদক, ফরিদপুর   

২৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



কবরে নামানোর সময় কেঁদে উঠল নবজাতক

‘তার জন্য খবর খোঁড়া হয়েছিল। রাত বেশি হয়ে যাওয়ায় সিদ্ধান্ত হয় ভোরেই নবজাতকের দাফন সম্পন্ন হবে।

খোঁড়া কবরের পাশেই কার্টনভতি ‘লাশ’ পড়েছিল রাতভর। ভোরে দাফনের সময় কার্টন খোলা মাত্রই কেঁদে ওঠে শিশুটি। সেই নবজাতক এখন হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্চাকেন্দ্রে ভর্তি আছে। মনকে নাড়া দেওয়া এমনই ভয়াবহ ঘটনা ঘটেছে ফরিদপুরে। শিশুর স্বজনরা নবজাতককে মৃত ঘোষণাকারী ডাক্তারের বিচার চেয়েছে।  

ঘটনাটি ঘটেছে শহরের ডা. জাহেদ মেমোরিয়াল শিশু হাসপাতালে গত বুধবার রাতে। এ ঘটনায় তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে নবজাতকের স্বজনরা  বলেছেন, ‘জন্ম নেওয়ার পর মায়ের দুধ পর্যন্ত পায়নি শিশুটি। ভূমিষ্ট হওয়ার পরই চিকিৎসক কন্যা শিশুটিকে মৃত ঘোষণা করেন। আমরা ডাক্তারের কথায় বিশ্বাস করে ওই রাতেই নবজাতককে কবর দিতে একটি কার্টনে ভরে কবরস্থানে নিয়ে যাই। জেলা ক্রিকেট দলের সাবেক সদস্য নাজমুল হুদা মিঠু ও অ্যাডভোকেট নাজনীন আক্তার পপি দম্পতি জানান ঘটনার পর আমরা মুষরে পড়ি। স্বজনরা নবজাতককে কবরস্থানে নিয়ে যায়। এরপর যা ঘটল তা সভ্য সমাজে বিরল। আমরা ঘটনার তদন্ত ও দোষিদের শাস্তি চাই। যাতে করে এমন নজির আর সৃষ্টি না হয়। ’

হাসপাতাল ও ভুক্তভোগী পরিবার সূত্রে জানা গেছে, প্রসব বেদনায় কাতর হয়ে অ্যাডভোকেট নাজনীন আক্তার পপিকে তাঁর শ্বশুর গতকাল বুধবার রাত সাড়ে ১১টার দিকে ডা. জাহেদ মেমোরিয়াল শিশু হাসপাতালে নিয়ে আসেন। এ সময় ওই হাসপাতালের চিকিৎসক রিজিয়া আলম প্রসূতিকে অন্য কোথাও নিয়ে যেতে পরামর্শ দেন। আবুল কালাম মিয়া বলেন, ‘রোগীর অবস্থা খারাপ হওয়ায় আমরা বারবার চিকিৎসককে অনুরোধ করি। কর্তব্যরত চিকিৎসক ডা. রিজিয়া আলম বিরক্তি প্রকাশ করেন এবং বারবার অন্যত্র যাওয়ার পরামর্শ দেন। এর মধ্যে পপির অবস্থা দেখে তাঁকে লেবার রুমে নিয়ে গেলে স্বাভাবিকভাবেই একটি কন্যসন্তান প্রসব হয়। খবর পেয়ে ডা. রিজিয়া আলমও সেখানে যান এবং পরিক্ষা-নিরীক্ষা করে নবজাতককে মৃত ঘোষণা করেন। ’

আবুল কালাম বলেন, ‘ডা. রিজিয়া আলম শিশুটিকে মৃত ঘোষণা করেন প্রসবের পরপরই। তখন রাত সাড়ে ১২টা। আমরা রাত ৩টার দিকে নবজাতককে শহরের অলীপুর কবরস্থানে দাফন করতে নিয়ে যাই। কবরস্থানের দায়িত্বপ্রাপ্ত মাওলানা হাজি আব্দুর রব বলেন, এখন লোকজন নেই, ভোরে আসেন। তখন কবর দেওয়ার ব্যবস্থা হবে। আমরা কার্টনে ভরা নবজাতককে কবরস্থানে রেখেই বাড়ি চলে আসি। বৃহস্পতিবার ভোর ৬টার দিকে কবর দিতে গেলে মাওলানা কার্টনে শিশুটির মাথা কোন দিকে তা নিশ্চিত হতে তা খুললে শিশুটি নড়াচড়া করে কেঁদে ওঠে। এ অবস্থায় সঙ্গে সঙ্গে আমরা নবজাতককে নিয়ে ওই হাসপাতালে ছুটে যাই। নবজাতককে ইনকিউবিটরে রেখে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে এখন। ’ তিনি তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে ওই চিকিৎসকের দায়িত্ব অবহেলার বিচার দাবি করেন। তিনি বলেন, নইলে ভবিষ্যতে আরো এ রকম ঘটনা ঘটতে পারে।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে ডা. রিজিয়া আলম বলেন, ‘হাসপাতালের আসন সংকট থাকায় রোগী প্রথমে ভর্তি করতে চাইনি। পরে জানতে পারি প্রসূতি স্বাভাবিকভাবেই একটি কন্যাসন্তান প্রসব করেছেন। তখন আমি শিশুটির পালস ও রেসপন্স (কান্নাকাটি না করা) না পাওয়ায় তাকে মৃত মনে করে স্বজনদের নিয়ে যেতে বলি। তবে শিশুটি বেঁচে আছে জেনে ভালো লাগছে। ’ তবে তিনি কোনো অবহেলা হয়নি দাবি করে বলেন, ছয় মাসেরও কম সময় মায়ের পেটে ছিল নবজাতক। অসময়ে জন্ম নেওয়ায় দুর্বল ছিল সে। হৃত্স্পন্দন পাওয়া যায়নি। তাই তাকে মৃত ঘোষণা করা হয়।

ওই হাসপাতালের পরিচালনা কমিটির সদস্য শওকত আলী জাহিদ এটিকে অলৌকিক ঘটনা বলে মন্তব্য করেন। হাসপাতাল পরিচালনা কমিটির যুগ্ম সম্পাদক সালাউদ্দিন ফরিদ বলেন, ‘এ ঘটনা আমরা খতিয়ে দেখব। যদি কোনো অভিযোগ পাওয়া যায় বা কারো কোনো অবহেলার প্রমাণ পাওয়া যায় তাহলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ পাঁচ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে দিয়েছে। তাদের তদন্ত শেষ হলে আমরা পরবর্তী ব্যবস্থা নেব। ’

ফরিদপুরের সিভিল সার্জন ডা. অরুণ কান্তি বিশ্বাস বলেন, এ ধরনের ঘটনা খুবই দুঃখজনক। রোগী এলেই চিকিৎসকের দায়িত্ব তাকে সেবা দেওয়া। তিনি বলেন, কেন এমন হলো তা খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।


মন্তব্য