kalerkantho

সোমবার । ৫ ডিসেম্বর ২০১৬। ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৪ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


লিফটে ‘ভর’ করে কর্তাদের বিদেশ ভ্রমণ

তোফাজ্জল হোসেন রুবেল   

২৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



লিফটে ‘ভর’ করে কর্তাদের বিদেশ ভ্রমণ

সরকারি বিভিন্ন ভবনে লিফট লাগানোর সুযোগ কাজে লাগিয়ে ইউরোপের বিভিন্ন দেশ ভ্রমণে মেতে উঠেছেন গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় এবং এর অধীনে থাকা সংস্থার আটজন কর্মকর্তা ও প্রকৌশলী। এঁদের মধ্যে জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষের (এনএইচএ) দুই প্রকৌশলী যাচ্ছেন স্পেনে।

গণপূর্ত অধিদপ্তরের চার প্রকৌশলী ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের দুই কর্মকর্তা মিলে যাচ্ছেন স্পেন ও সুইজারল্যান্ডে। গত কয়েক দিনের ব্যবধানে আরো বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা ও প্রকৌশলী লিফট পরিদর্শনের নামে বিদেশ ভ্রমণ করেছেন। বিষয়টি নিয়ে সম্প্রতি গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের মধ্যে বেশ ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে। গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় এবং সংশ্লিষ্ট অধিদপ্তর ও সংস্থা সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

সূত্র মতে, লিফট পরীক্ষা-নিরীক্ষা বা ব্যবস্থাপনার সঙ্গে জড়িত নন এমন কর্মকর্তারাও যোগ দিচ্ছেন এ ধরনের  বিদেশ ভ্রমণে। মূলত ২০০৫ সালের গণপূর্তর ‘শিডিউল অব রেটস’-এ প্রকৌশলীরা কৌশল করে এ ভ্রমণের সুযোগ রেখেছেন। এ সুযোগে যখনই কোনো লিফট কেনার দরকার হয় তখনই এর ওপর ভর করে বিদেশ ভ্রমণের হিড়িক পড়ে। ঠিকাদারের সঙ্গে মিলেমিশে এমন বিদেশ ভ্রমণের ফলে প্রতিটি লিফটের মূল্য বাস্তবের চেয়ে চার-পাঁচ লাখ টাকা বেশি পড়ে।

গৃহায়ণ ও গণপূর্ত সচিব শহীদ উল্লাহ খন্দকার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘গত কয়েক দিনে অনেকেই বিদেশ যেতে অনুমোদন চেয়েছেন। এ-সংক্রান্ত ফাইলও আমাদের কাছে আসছে। এখন প্রকল্পের সঙ্গে বা ক্রয়সংক্রান্ত শিডিউলে বিদেশ ভ্রমণের সুযোগ থাকলে তো অনুমোদন না দেওয়ার সুযোগ নেই। তবে লিফট ক্রয়ের সময় আসলেই বিদেশে যেতে হবে—এ ধরনের মানসিকতা পরিহার করা উচিত। এ ছাড়া যে প্রক্রিয়ায় এখন কর্মকর্তা বা প্রকৌশলীরা বিদেশে যান তাও খতিয়ে দেখার সময় এসেছে। ’

গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, লিফট দেখার (প্রাক-জাহাজীকরণ পরিদর্শন) জন্য আগামী কয়েক দিনের মধ্যে সুইজারল্যান্ড ও স্পেনে যাচ্ছে তিনটি টিম। একটি টিমে আছেন জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষের সদস্য (পরিকল্পনা) সাইদুর রহমান ও তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (ঢাকা সার্কেল) সাসছুর রহমান। বিষয়টির সত্যতা নিশ্চিত করে জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান খন্দকার আখতারুজ্জামান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমাদের মোহাম্মদপুর এফ ব্লকের ফ্ল্যাট প্রকল্প থেকে দুজন প্রকৌশলী স্পেনে যাচ্ছেন। এ প্রকল্পের লিফট ক্রয়ে বিদেশ ভ্রমণের সুযোগ রয়েছে। তবে ভবিষ্যতে এসব বিদেশ ভ্রমণে নিরুৎসাহিত করা হবে। ’

সরকারি ভবনের জন্য লিফট কিনতে গণপূর্ত অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (ইলেকট্রিক্যাল) শফিকুল ইসলাম, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (পিপিসি) রেজাউল করিম ও মন্ত্রণালয়ের একজন উপসচিব যাচ্ছেন স্পেনে। আগামী ২৫ সেপ্টেম্বর এ তিনজনের বিদেশ যাওয়ার সব আয়োজন সম্পন্ন হয়েছে বলে জানা গেছে। এ ছাড়া নির্বাচন কমিশন সচিবালয় ভবনে লিফটের জন্য সুইজারল্যান্ডে যাচ্ছেন প্রকৌশলী মাহবুবুল হক ও বরুণ কুমার বিশ্বাসসহ মন্ত্রণালয়ের একজন প্রতিনিধি।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে গণপূর্ত অধিদপ্তরের একাধিক প্রকৌশলী বলেন, ২০০৫ সালে গণপূর্তর শিডিউল অব রেটসে বিদেশ ভ্রমণ নিশ্চিত করে লিফটের মূল্য নির্ধারণ করা আছে। এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে প্রকৌশলীরা বিদেশ ভ্রমণ করে থাকেন। বর্তমানে এখানে ভাগ বসাচ্ছেন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা। যাঁরা বিদেশে যান তাঁরা লিফটের যাচাইকরণ ও ব্যবস্থাপনার সঙ্গে কোনোভাবেই জড়িত থাকেন না। এ ছাড়া বিদেশ ভ্রমণ করে নিজেদের অভিজ্ঞতার একটি প্রতিবেদন দেওয়ার কথা থাকলেও তা কেউ দেন না। অর্থাৎ অভিজ্ঞতার জন্য কেউ যান না, আসলে সেখানে ঘুরতে যান।

ওই প্রকৌশলীদের দাবি, শিডিউলে দুটি লিফটের পেছনে একজন করে বিদেশ যাওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে। এটা সম্পূর্ণ অযৌক্তিক। এ ছাড়া ২০০৫ সালে বিদেশে গিয়ে লিফট দেখার প্রয়োজন ছিল। এখন তো একই লিফট বারবার আনা হচ্ছে, সেই লিফট ইউরোপের বিভিন্ন দেশে গিয়ে দেখার দরকার পড়ে না।

গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী হাফিজুর রহমান মুন্সি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘২০০৫ সালের শিডিউল অনুযায়ী সংশ্লিষ্টরা বিদেশে যায়। যেহেতু প্রায় ১১ বছর আগে সেই সময় ও বাস্তবতা চিন্তা করে শিডিউল করা হয়েছিল, তাই এখন এ সফর বাতিল করে দাম কমানোর সুযোগ আছে। আমরা এ বিষয় ইতিবাচক দৃষ্টিতে বিবেচনা করব। ’

লিফট ক্রয়ের সঙ্গে জড়িত এক কর্মকর্তা বলেন, ‘বর্তমানে সরকারি অনেক কাজে স্বচ্ছতা এলেও আমাদের লিফট ক্রয়সংক্রান্ত বিষয়ে সবই অন্ধকারে রয়ে গেছে। একজন ঠিকাদার লিফট আমদানির কাজটি পাওয়ার পর তাঁর অর্থে সংশ্লিষ্টরা বিভিন্ন দেশে ঘুরতে যান। আবার কখনো তাঁর (ঠিকাদার) সঙ্গে মিলে এ বিদেশ ভ্রমণে যাওয়ার কতটুকু যৌক্তিকতা আছে? ইউরোপের এসব দেশে একেকজনের থাকা-খাওয়া ও হোটেল ভাড়াসহ সাড়ে তিন থেকে চার লাখ টাকা ব্যয় হয়। আবার যাঁরা বিদেশে যান তাঁদের হাতখরচের জন্য কিছু অর্থও মাঝেমধ্যে ঠিকাদার দিয়ে থাকেন। ফলে একটি লিফট দেশে এসে স্থাপন করা পর্যন্ত বাজারমূল্যের চেয়ে কয়েক লাখ টাকা বেশি অপচয় হয়। এখন এ ধরনের বিধান বাতিল করা প্রয়োজন। ’


মন্তব্য