kalerkantho

মঙ্গলবার । ৬ ডিসেম্বর ২০১৬। ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৫ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


নতুন ইসি গঠন নিয়ে সুবাতাসের আভাস

কাজী হাফিজ   

২৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



নতুন ইসি গঠন নিয়ে সুবাতাসের আভাস

কাজী রকিবউদ্দীন আহমদের নেতৃত্বাধীন বর্তমান নির্বাচন কমিশনের (ইসি) মেয়াদ শেষ হতে আর মাত্র সাড়ে চার মাস বাকি। সরকার ও কমিশনের পরিকল্পনায় আপাতত কোনো পরিবর্তন না হলে জেলা পরিষদ এবং নারায়ণগঞ্জ ও কুমিল্লা সিটি করপোরেশন নির্বাচন শেষ করে বিদায় নিতে হবে পাঁচ সদস্যের এ কমিশনকে।

এ জন্য স্বাভাবিকভাবেই নতুন কমিশন কিভাবে গঠন হবে, পাঁচ বছর আগের মতোই রাষ্ট্রপতির উদ্যোগে সার্চ কমিটি গঠন হবে কি না—এসব নিয়ে কথাবার্তা শুরু হয়ে গেছে। সম্প্রতি আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেছেন, ২০১২ সালের মতোই সার্চ কমিটি গঠন করে নতুন নির্বাচন কমিশনারদের নিয়োগ দেওয়া হবে। এদিকে আগের ওই সার্চ কমিটির বিরোধিতা করে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর আলোচনা সাপেক্ষে সব রাজনৈতিক দল থেকে প্রতিনিধি নিয়ে সার্চ কমিটি গঠন করার দাবি জানিয়েছেন। গত মঙ্গলবার রাজধানীর ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে এক আলোচনা সভায় তিনি এ দাবি জানান।

ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল-আলম হানিফ গত বুধবার সকালে ধানমণ্ডিতে আওয়ামী লীগ সভাপতির কার্যালয়ে সাংবাদিকদের বলেন, নির্বাচন কমিশন নিয়ে সব রাজনৈতিক দলের মতামত জরুরি। তাই প্রয়োজনে সবার সঙ্গেই আলোচনা হতে পারে। সবার পরামর্শের ভিত্তিতে নতুন নির্বাচন কমিশন গঠনেরও আভাস দেন হানিফ।

এ ধরনের মত ও আভাসকে ইতিবাচক ও সুবাতাসের আভাস হিসেবে দেখছেন বিশিষ্টজনরা। তাঁরা বলছেন, সব দলের অংশগ্রহণে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে এমনটাই আশা করেন তাঁরা। তাঁদের প্রত্যাশা নির্বাচন কমিশনও হবে সব পক্ষের কাছে গ্রহণযোগ্য। আগামী নির্বাচন ঘিরে বিরাজমান রাজনৈতিক সংকট আরো বাড়ুক তা কারো কাম্য নয়।

তবে রাষ্ট্রের সংবিধান প্রণয়নের ৪৪ বছর পরও সেই সংবিধানের ১১৮ (১) অনুচ্ছেদ অনুসারে নির্বাচন কমিশন গঠনের জন্য কোনো আইন না হওয়া দুঃখজনক বলে মন্তব্য করেন অনেকে। সংবিধানের ওই অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘উক্ত বিষয়ে প্রণীত কোন আইনের বিধানাবলী-সাপেক্ষে রাষ্ট্রপতি প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে ও অন্যান্য নির্বাচন কমিশনারকে নিয়োগদান করিবেন। ’

সুশাসনের জন্য নাগরিক—সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার এ বিষয়ে বলেন, সংবিধান অনুসারে নির্বাচন কমিশনারদের নিয়োগের জন্য একটা আইন হওয়া দরকার। আইন না করে নির্বাচন কমিশনারদের নিয়োগ দিলে তার বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যাবে।

নির্বাচন পর্যবেক্ষক সংস্থা ব্রতির নির্বাহী পরিচালক শারমিন মোরশেদ বলেন, নির্বাচন কমিশনারদের নিয়োগের জন্য এখনো কোনো আইন হয়নি—এটা দুঃখজনক।

নতুন নির্বাচন কমিশন গঠন নিয়ে বিএনপি ও আওয়ামী লীগের বক্তব্য সম্পর্কে ড. বদিউল আলম মজুমদার কালের কণ্ঠকে বলেন, “সার্চ কমিটি এবারও হওয়া উচিত। তবে যাদের নিয়ে ওই কমিটি গঠন করা হবে তাঁদের স্বাধীনভাবে কাজ করার মানসিকতা থাকতে হবে। ‘আমার কাজ আমি করব, তোরে শুধু জিগাই লবো’—এ ধরনের পরিস্থিতি হলে চলবে না। সার্চ কমিটি কোন মানদণ্ডের ভিত্তিতে সম্ভাব্য নির্বাচন কমিশনারদের নাম সুপারিশ করবে তা ঠিক করে দিতে হবে। এটি হলে তাদের প্রস্তাব গ্রহণযোগ্যতা পাবে। ’

বদিউল আলম মজুমদার আরো বলেন, ‘২০১২ সালের সার্চ কমিটির মাধ্যমে অত্যন্ত বিতর্কিত নির্বাচন কমিশন পেয়েছি আমরা। এই কমিশন দেশের নির্বাচনব্যবস্থাকেই ধ্বংস করে দিয়েছে। আগের কমিশন নির্বাচনী আইনকানুন মানার যে সংস্কৃতি গড়ে তুলেছিল তা এই কমিশন নষ্ট করে দিয়েছে। তাঁরা যে সার্চ কমিটির মাধ্যমে নিয়োগ পেয়েছিলেন সেই কমিটির কয়েকজন সদস্যই ছিলেন বিতর্কিত। ’

ব্রতির নির্বাহী পরিচালক শারমিন মোরশেদ বলেন, ‘গতবারের সার্চ কমিটি নিয়ে ক্ষোভ ছিল। ওই কমিটিতে সবার মতামত নেওয়া হয়নি। আমি এ দেশের একজন নাগরিক হিসেবে চাইব, এমনভাবে একটি সার্চ কমিটি তৈরি হোক যার ওপর আস্থা রাখা যাবে। দেশের রাজনৈতিক সংকট সম্পর্কে নিশ্চয় সরকার ওয়াকিবহাল। তারা চাইবে না আগামী নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সেটা আরো ঘনীভূত হোক। সরকারি দলের পক্ষ থেকে সবার পরামর্শের ভিত্তিতে নতুন নির্বাচন কমিশন গঠনের যে আভাস দেওয়া হয়েছে তা ইতিবাচক। একে সাধুবাদ জানাই। অনেক বছর পর একটি কারণে সব দল আবার একসঙ্গে বসলে তা আমাদের সবার জন্যই মঙ্গলজনক হবে। এ ক্ষেত্রে সরকারের কমিটমেন্ট কতটা তার ওপর অনেক কিছু নির্ভর করবে। ’

আইন প্রণয়নে আগের কমিশনের উদ্যোগ : নির্বাচন কমিশনার নিয়োগের জন্য আইন প্রণয়নের একটি প্রস্তাব প্রস্তুত করেছিল ড. এ টি এম শামসুল হুদার নেতৃত্বাধীন আগের নির্বাচন কমিশন। ২০০৮ সালে নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে ‘প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও নির্বাচন কমিশনারের নিয়োগ-পদ্ধতি নির্ধারণকল্পে প্রণীত অধ্যাদেশ’ শিরোনামের ওই প্রস্তাব নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সংলাপে আলোচনাও করে ড. হুদার কমিশন। কিন্তু বিষয়টিতে সে সময়ের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাড়া না পাওয়ায় ২০১১ সালের শেষ দিকে তাদের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগমুহূর্তে প্রস্তাবটি আবারও তৎকালীন সরকারের কাছে পাঠানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়। ওই সময় সংবিধান সংশোধনের সুপারিশে গঠিত বিশেষ কমিটির কাছেও প্রস্তাবটি পাঠানো হয়।

ওই প্রস্তাবিত প্রস্তাবে একজন প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও একজন নারীসহ দুজন নির্বাচন কমিশনার নিয়োগের কথা উল্লেখ ছিল। এতে বলা হয়েছিল, এসব পদে নিয়োগ পাওয়ার জন্য যোগ্যতার ক্ষেত্রে নারী ও পুরুষের মধ্যে কোনো পার্থক্য থাকবে না। ‘প্রমাণিত প্রশাসনিক দক্ষতা’ হবে এ পদের অন্যতম যোগ্যতা। এ নিয়োগে প্যানেল তৈরির জন্য একটি অনুসন্ধান কমিটি গঠন হবে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ কমিটির সদস্য ও আহ্বায়ক থাকবেন। এ ছাড়া প্রধান বিচারপতি মনোনীত হাইকোর্টের একজন বিচারক, দুর্নীতি দমন কমিশনের চেয়ারম্যান, সরকারি কর্মকমিশনের চেয়ারম্যান এবং মহাহিসাবরক্ষক ও নিয়ন্ত্রক এ কমিটির সদস্য হবেন। কমিটি প্রতিটি পদের জন্য তিন জনের নাম নির্ধারণ করবে। কমিটির কাজ পরিচালনার নিয়মাবলিও ওই কমিটি তৈরি করবে। প্যানেল প্রস্তুতের পর তা জাতীয় সংসদের কার্য উপদেষ্টা কমিটির পরীক্ষার জন্য প্রধানমন্ত্রীর অফিসে পাঠাতে হবে। কার্য উপদেষ্টা কমিটি ওই প্যানেল পরীক্ষা করে চূড়ান্ত করবে।

ওই প্রস্তাবে আরো বলা হয়, সাধারণভাবে সৎ বলে বিবেচিত না হলে বৈধ আয়ের ভিত্তিতে জীবন নির্বাহ না করলে, জাতীয় ও আঞ্চলিক রাজনৈতিক দলের সদস্য হলে, কোনো রাজনৈতিক দলের প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করলে এবং ঋণখেলাপি হলে কোনো ব্যক্তিকে ওই প্যানেলে অন্তর্ভুক্ত করা যাবে না।

কিন্তু নির্বাচন কমিশনারের সংখ্যা সম্পর্কে নির্বাচন কমিশনের ওই প্রস্তাব গ্রহণ না করে একজন প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও দুজন নারী কমিশনারসহ সর্বোচ্চ পাঁচজন কমিশনার নিয়ে নির্বাচন কমিশন গঠনের প্রস্তাব রাখে সংবিধান সংশোধনের সুপারিশ প্রণয়নের লক্ষ্যে গঠিত বিশেষ কমিটি। পরে নারী অন্তর্ভুক্তির বিষয়টিও বাদ যায়।

প্রথম সার্চ কমিটি : এদিকে আইন না করেই ২০১২ সালের ২২ জানুয়ারি তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমানের উদ্যোগে গঠন করা হয় নির্বাচন কমিশনার নিয়োগের জন্য সার্চ কমিটি। এ ধরনের কমিটি গঠন ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথম। সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেনের নেতৃত্বে চার সদস্যের ওই সার্চ কমিটিতে আরো ছিলেন হাইকোর্টের বিচারপতি মোহাম্মদ নুরুজ্জামান, পিএসসি চেয়ারম্যান এ টি এম আহমেদুল হক চৌধুরী, মহাহিসাবরক্ষক ও নিয়ন্ত্রক আহমেদ আতাউল হাকিম। ওই সার্চ কমিটির কাছে আওয়ামী লীগসহ নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধিত ২৩টি দল নাম প্রস্তাব পাঠালেও বিএনপিসহ ১৬টি দল কোনো প্রস্তাব পাঠায়নি। বিএনপি ও তাদের জোটের দলগুলো ওই সার্চ কমিটি প্রত্যাখ্যান করে প্রথমে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা ফিরিয়ে দেওয়ার দাবি জানায়।


মন্তব্য