kalerkantho

সোমবার । ৫ ডিসেম্বর ২০১৬। ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৪ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


যমদূত হয়ে চলন্ত বাস ঘরে, ঘুমন্ত দম্পতি নিহত

সড়কে ঝরল আরো ৭ প্রাণ

কালের কণ্ঠ ডেস্ক   

২২ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



যমদূত হয়ে চলন্ত বাস ঘরে, ঘুমন্ত দম্পতি নিহত

মঙ্গলবার গভীর রাতে রাজশাহী নগরীর বহরমপুর লেভেলক্রসিংয়ের পাশের বাড়িতে ঢুকে পড়ে এই বাস (বাঁয়ে)। এতে ঘুমন্ত অবস্থায় মারা যান ভ্যানচালক বশির উদ্দিন ও তাঁর স্ত্রী রেশমা বেগম। ছবি : কালের কণ্ঠ

রাত তখন দেড়টা। দুই শিশু সন্তানকে নিয়ে স্বামী-স্ত্রী যখন অঘোর ঘুমে, ঠিক তখনই একটি বেপরোয়া গতির যাত্রীবাহী বাস ঢুকে পড়ল তাঁদের বেড়ার ঘরে।

প্রাণ গেল এই দম্পতির।

গত মঙ্গলবার দিবাগত রাতে রাজশাহী নগরীর বহরমপুর লেভেলক্রসিংয়ের কাছে বস্তিতে এ ঘটনা ঘটে। মুহূর্তেই তিনটি ঘর ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। এতে আহত হয় আরো চার বস্তিবাসী।

একই রাতে সড়ক দুর্ঘটনায় কুমিল্লার দাউদকান্দি, কক্সবাজারের চকরিয়া ও নীলফামারীর কিশোরগঞ্জে নিহত হয়েছে তিনজন। এর আগে বিকেলে যশোরের মণিরামপুরে মারা গেছে এক শিশু। আর গতকাল বুধবার সিলেটে দুজন ও ফরিদপুরে এক শিশু প্রাণ হারিয়েছে।

আমাদের নিজস্ব প্রতিবেদক ও প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর :

যেন দানব ঢুকল ঘরে : রাজশাহী নগরীর বহরমপুরে নিহত দুজন হলেন ভ্যানচালক বশির উদ্দিন (৪০) ও তাঁর স্ত্রী রেশমা খাতুন (৩৮)। বশিরের

গ্রামের বাড়ি বরিশালে।

আহতদের মধ্যে রয়েছেন রেলওয়ের বহরমপুর ক্রসিংয়ের গেটম্যান দিপু (৪০) ও তাঁর স্ত্রী চম্পা খাতুন (৩৫), পাশের ক্লাব ঘরের মানিক (১৬) ও জাকির (১৯)। বাসযাত্রীদের মধ্যে আহত হয়েছেন ফিরোজ (৪১), মামুন (১৯), শরীফ (২৪), এমদাদুল (৩৪) ও উত্তমসহ (৫২) অন্তত ১৫ জন। আহতদের সবাইকে রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

প্রত্যক্ষদর্শী ও বাসযাত্রীদের সূত্রে জানা গেছে, কেয়া পরিবহনের বাসটি চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে ঢাকা যাচ্ছিল। মঙ্গলবার রাত ১০টার দিকে চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে বাসটি নাচোল এসে যাত্রী নিয়ে ছাড়ার কথা ছিল। কিন্তু সেটি চাঁপাইনবাবগঞ্জ শহর থেকে ছেড়ে এসে রাত ১২টার দিকে নাচোল পৌঁছে। এরপর সেখান থেকে অন্তত ২৫ জন যাত্রী ওঠানো হয়। বাসটিতে অন্তত ৪০ জন যাত্রী ছিল।

বাসযাত্রী মামুন রশিদ কালের কণ্ঠকে জানান, দুই ঘণ্টা দেরি করে বাসটি ছাড়ার কারণে শুরু থেকেই বেপরোয়া গতিতে চালাতে থাকেন চালক। কখনো ১০০ কিলোমিটার গতিতে আবার কখনো ১২০-১৩০ কিলোমিটার গতিতে বাসটি চলছিল। এরই মধ্যে বাসটি রাজশাহী নগরীর বহরমপুর লেভেলক্রসিংয়ের টার্নিংয়ের কাছে চলে আসে। কিন্তু চালক সেটি খেয়াল করেননি। হঠাৎ বাসটি ফুটপাতের ওপর উঠে যায় এবং পরে রাস্তার বাঁ পাশের সিগন্যাল লাইট ভেঙে ঢুকে পড়ে বস্তিতে।

নিহত বশিরের প্রতিবেশী রংমিস্ত্রি রফিকুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, রাত ১টা ২০ মিনিটের দিকে হঠাৎ বিকট আওয়াজ কানে আসে। সেই আওয়াজে ঘুম ভেঙে যায় তাঁর। পড়িমরি করে ঘুম থেকে উঠে দেখেন, পাশের ঘরে বশিরের দুই ছেলে কান্নাকাটি করছে। আর মাটির সঙ্গে মিশে যাওয়া তাদের ঘরের মধ্যে পড়ে আছে মা-বাবার লাশ। ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে আছে বাসটি। তাঁর কাছে মনে হয়েছে সেটি একটি দানব।

রেশমার বোন শিল্পী খাতুন জানান, তাঁর বোন ও দুলাভাই মারা গেলেও বেঁচে গেছে তাঁদের দুই শিশু সন্তান আলিফ (৭) ও রাহাত (৫)। তারা মা-বাবার সঙ্গেই ঘুমিয়ে ছিল। তাদের বড় ভাই রাশেদুল ইসলাম হূদয় রাতেই কাজ করার জন্য ঢাকা গেছে।

শিল্পী কান্নাজড়িত কণ্ঠে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘গোটা সংসারটি তছনছ করে দিল এই বাস। এখন দুই শিশুকে নিয়ে আমরা কোথায় যাব? তাদের কে দেখবে? কাদের কাছে তারা মানুষ হবে?’

জানা গেছে, খবর পেয়ে রাশেদুল গতকাল ফিরে এসেছে। সে বাদী হয়ে রাজপাড়া থানায় বাসের চালক ও তত্ত্বাবধায়ককে আসামি করে মামলার প্রস্তুতি নিচ্ছিল।

রাজপাড়া জোনের সহকারী কমিশনার (এসি) ইফতে খায়ের আলম বলেন, ঘটনার পর থেকে বাসের চালক পলাতক। তাকে আটকের চেষ্টা চলছে।

হাত উদ্ধারের জন্য অপেক্ষা : দুর্ঘটনার পরপরই হতাহতদের উদ্ধারে প্রথমে এগিয়ে যায় বাসযাত্রীরা। এর কিছুক্ষণ পর উদ্ধারে যোগ দেয় রাজশাহী সদর ফায়ার সার্ভিসের একটি দল। বশির ও রেশমার লাশ এবং আহতদের একে একে উদ্ধার করা হয়। কিন্তু রেশমার একটি হাত আটকা পড়ে বাসের চাকার নিচে। তাঁর লাশ টেনেহিঁচড়ে বের করার সময় সেটি চাকার নিচেই রয়ে যায়।

দুপুর গড়িয়ে বিকেল হয়ে যায়। কিন্তু বাস উদ্ধার না করায় হাতটিও বের করে আনা যাচ্ছিল না। সে কারণে লাশ দাফনও হচ্ছিল না। শেষে সন্ধ্যা পৌনে ৬টার দিকে বাসটি টেনে সরানোর পর রেশমার বাঁ হাতটি উদ্ধার করা হয়। এরপর স্বামী-স্ত্রী দুজনকে দাফন করা হয় নগরীর হেতেমখাঁ কবরস্থানে।

প্রতিবেশী রফিকুল ইসলাম বলেন, রেশমার হাতের পুরোটাই বাসের নিচে ছিল। এ কারণে লাশ ময়নাতদন্ত হলেও দাফন করা যাচ্ছিল না। তাঁরা সবাই হাতের জন্য অপেক্ষা করছিলেন।

রাজশাহী সদর ফায়ার সার্ভিসের জ্যেষ্ঠ স্টেশন কর্মকর্তা শরিফুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বাসটি বশির ও রেশমাকে চাপা দেওয়ার পরপরই তাদের মৃত্যু হয়। আর তাদের লাশ যখন উদ্ধার করা হয়, তখন রেশমার বাম হাতটি ছিল না। বাসের চাকার নিচে পড়েই হাতটি বিচ্ছিন্ন হয়ে রয়ে যায়। বাসটি সরাতে দেরি হওয়ার কারণেই রেশমার হাতটিও উদ্ধার করতে দেরি হয়। ’

বাসচাপায় দুই মোটরসাইকেল আরোহী নিহত : দক্ষিণ সুরমা উপজেলার লালাবাজারে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে হানিফ পরিবহনের একটি বাসের চাপায় দুই মোটরসাইকেল আরোহী নিহত হয়েছেন। গতকাল দুপুরে এ দুর্ঘটনা ঘটে। নিহতরা হলেন লালাবাজার ইউনিয়নের বাঘরখলা কালাপুর গ্রামের বাবুল মিয়ার ছেলে আব্দুস শহিদ (২৭) ও মকবুল মিয়ার ছেলে ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য ইউনুছ আলী (৩০)।

বাস-লেগুনার সংঘর্ষে নিহত ১ : কুমিল্লার দাউদকান্দিতে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে মঙ্গলবার গভীর রাতে বাস-লেগুনার সংঘর্ষে একজন নিহত ও পাঁচজন আহত হয়েছে। নিহত ব্যক্তি হলেন দাউদকান্দির ইলিয়টগঞ্জ বাশরা গ্রামের শহর আলীর ছেলে মাহে আলম (৩৫)।

সদ্যোজাত সন্তানকে দেখতে আসার পথে নিহত : কক্সবাজারের চকরিয়ার একটি বেসরকারি হাসপাতালে প্রসব হওয়া সদ্যোজাত সন্তানকে দেখতে আসার সময় সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন আবদুল জলিল (৩৫)। দুটি ইজিবাইক পাল্লা দিয়ে চলার সময় নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে একটি সড়কের পাশে গাছের সঙ্গে ধাক্কা খায়। এতে ওই ইজিবাইকের যাত্রী জলিল মাথায় আঘাত পেয়ে ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান। তিনি চিরিঙ্গা ইউনিয়নের পালাকাটা উলুঘোনা এলাকার দরবেশ আলীর ছেলে।

বাড়ি ফেরা হলো না মাদ্রাসা ছাত্রীর : বোনের বাড়ি বেড়াতে যাওয়ার আনন্দ নিয়েই বাড়ি ফিরছিল মাদ্রাসার অষ্টম শ্রেণির ছাত্রী ফেরদৌসী আক্তার (১৪)। কিন্তু ট্রাক কেড়ে নিয়েছে তার প্রাণ। মঙ্গলবার রাত ১০টার দিকে নীলফামারীর কিশোরগঞ্জ উপজেলার রণচণ্ডী এলাকায় এই দুর্ঘটনা ঘটে। সে ওই এলাকার ডাঙ্গাপাড়া গ্রামের মফছিল আহমেদের মেয়ে। রণচণ্ডী বালিকা দাখিল মাদ্রাসায় পড়ত সে।

মায়ের পাশে দাঁড়ানো শিশু মাইক্রোবাসে পিষ্ট : ফরিদপুরের ভাঙ্গা উপজেলায় মাইক্রোবাসের নিচে চাপা পড়ে তামিম (৮) নামের এক শিশু নিহত হয়েছে। গতকাল দুপুরে ঢাকা-খুলনা মহাসড়কের মালিগ্রাম বাজার বাসস্ট্যান্ডের কাছে এ দুর্ঘটননা ঘটে। শিশুটি চান্দ্রা ইউনিয়নের দিঘলকান্দা গ্রামের মৃত জাহাঙ্গীর শেখের ছেলে। তামিম মায়ের সঙ্গে বেড়াতে যাওয়ার জন্য বাসস্ট্যান্ডে দাঁড়ানো ছিল।

ব্যাটারিচালিত ভ্যানের চাপায় শিশু নিহত : যশোরের মণিরামপুরে ব্যাটারিচালিত ভ্যানের চাপায় নয়ন হোসেন (৫) নামের এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। সে উপজেলার ঢাকুরিয়া গ্রামের হাফিজুর রহমানের ছেলে। মঙ্গলবার বিকেলে স্থানীয় ঢাকুরিয়া বাজারের কাছে ফুফুর সঙ্গে রাস্তা পার হওয়ার সময় নয়ন দুর্ঘটনায় পড়ে।


মন্তব্য