kalerkantho

শুক্রবার । ৯ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৮ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


৩০০ ফুট রাস্তার দুপাশে দখলবাজি

অবৈধ দোকান গ্যারেজ হাটবাজার : প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশিত প্রকল্প বেহাল

আপেল মাহমুদ   

২২ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



৩০০ ফুট রাস্তার দুপাশে দখলবাজি

রাজধানীর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকাসংলগ্ন কুড়িল ৩০০ ফুট রাস্তার দুই পাশে খাল দখল করে গড়ে উঠেছে একের পর এক অবৈধ স্থাপনা। ছবি : মঞ্জুরুল করিম

কুড়িল ফ্লাইওভার থেকে বালু নদী পর্যন্ত ৩০০ ফুট রাস্তার দুই পাশে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে ১০০ ফুট করে মোট ২০০ ফুট প্রশস্ত ক্যানেল তৈরির কাজ শুরু হতে যাচ্ছে। মূলত পূর্বাচল আবাসন প্রকল্পের পরিবেশ রক্ষার জন্য এই উদ্যোগ।

এরই মধ্যে জমি অধিগ্রহণের কাজ শেষ হয়েছে। কিন্তু একই সঙ্গে সেই অধিগ্রহণ করা জমি দখলের প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। প্রকল্পের জমির ওপর হাটবাজার, দোকানপাট, ঘরবাড়ি,  নার্সারি এমনকি গাড়ির গ্যারেজ পর্যন্ত গড়ে তুলেছে অবৈধ দখলদাররা।

আগা খান স্কুলের প্লটসংলগ্ন ৩০০ ফুট রাস্তায় সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে বিশাল নার্সারি গড়ে তোলা হয়েছে। ফলে রাস্তার অর্ধেকই অবরুদ্ধ হয়ে গেছে। এর পাশেই চায়ের স্টল বসিয়েছেন এলাহী নামের এক ব্যক্তি। তিনি জানান, নার্সারিটি করেছেন মিরপুরের এক ব্যক্তি। এসব দেখার কেউ নেই। স্থানীয় কিছু রাজনৈতিক মাস্তান দখলদারদের সহযোগিতা করছে। এ জন্য ওদেরও ব্যবসায়ীরা খুশি করে থাকে।

শুধু নার্সারি বা চায়ের স্টল নয়, রাস্তার দুই পাশে ক্যানেলের জমির ওপর হোটেল-রেস্তোরাঁ, মুদি দোকান এমনকি মনিহারি দোকান পর্যন্ত গড়ে তোলা হয়েছে। কিছু স্থাপনা রয়েছে দোতলা ও তিনতলা পর্যন্ত। বাঁধন নামের একটি প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপক আবদুল হালিম জানান, সেখানে তাঁরাই প্রথম হোটেল খোলেন। বেচাকেনা ভালো হওয়ায় এরপর আরো অনেকে এসেছে। এখন সবার ব্যবসা ভালো। মনে হচ্ছে, কিছুদিনের মধ্যে আরো প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠবে।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানায়, প্রতিদিন সকাল-বিকাল এমনকি রাতেও ৩০০ ফুটে অনেক মানুষ বেড়াতে আসে। মূলত তাদের টার্গেট করেই এসব দোকানপাট ও হোটেল-রেস্তোরাঁ দ্রুত গড়ে উঠেছে। বিকেল হলে গাড়ির জটে পুরো এলাকা একাকার হয়ে যায়। তখন ৩০০ ফুট দিয়ে চলাফেরা দুরূহ হয়ে পড়ে। উত্তরা কফি শপের মালিক মনোয়ার হোসেন জানান, ৩০০ ফুটে তিনি দ্বিতীয় শাখা খুলেছেন। রাস্তার ওপর দোকান দিলেও কোনো সরকারি সংস্থা কিংবা পুলিশ বাধা দেয়নি।

অবৈধ দোকানপাট, গাড়ির গ্যারেজ, বাস ও প্রাইভেট কার স্ট্যান্ড গড়ে ওঠায় শুধু ৩০০ ফুট রাস্তাই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে না, একই সঙ্গে কুড়িল ফ্লাইওভারটিও বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে বলে স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ। মস্তুল গ্রামের মোহাম্মদ হারিশ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘এখনো রাস্তাটি আনুষ্ঠানিকভাবে সরকার চালু করেনি। কিন্তু এরই মধ্যে যেভাবে অবৈধ স্থাপনা গড়ে উঠেছে, তাতে ভবিষ্যতে কী অবস্থা দাঁড়াবে তা কেউ জানে না। ’

কুড়িলের বাসিন্দা কাজী নুরুল হক অভিযোগ করেন, ৩০০ ফুট রাস্তাটি অবৈধ দখলদারদের জন্য পোয়াবারো হয়ে উঠেছে। সরকার শত শত কোটি টাকা খরচ করে একটি কার্যকর মহাসড়ক তৈরি করেছে। অথচ সেটা দখল করে দখলদাররা ব্যবসা-বাণিজ্য শুরু করেছে। অনেকে রাস্তার অংশবিশেষ দখল করে গাড়ির গ্যারেজ চালাচ্ছে। এতে রাস্তা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। কুড়িল ফ্লাইওভারের নিচে কমপক্ষে ২০০ প্রাইভেট কারের স্ট্যান্ড রয়েছে। এগুলো অবৈধ গাড়ি। অনেক চোরাই গাড়ি ভুয়া নম্বরপ্লেট লাগিয়ে যাত্রী পরিবহন করছে। অনেক সময় সেসব গাড়িতে যাত্রী তুলে ছিনতাই করা হয়।

কুড়িল থেকে দু-তিন কিলোমিটার পূর্বদিকে গেলে একাধিক বড় বড় কাঁচাবাজার চোখে পড়ে। বাজারগুলো ৩০০ ফুট রাস্তা কিংবা পূর্বাচল প্রকল্পের জমির ওপর। সেখানে মাছ-তরকারি, ফলমূল থেকে শুরু করে চায়ের স্টল, হোটেল ও পান-সিগারেটের দোকানপাট রয়েছে। প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ সেখানে আসে।

কালের কণ্ঠ’র অনুসন্ধানে জানা যায়, রাজউকের আবাসন প্রকল্প, রাস্তা ও ক্যানেলের প্রায় ১০০ বিঘা জমি এরই মধ্যে অবৈধ দখলদারদের নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে, যার বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় এক হাজার কোটি টাকা। ওই জমিতে বাণিজ্যিক স্থাপনা গড়ে যারা লাভবান হচ্ছে, তাদের অধিকাংশই স্থানীয়। রাস্তা কিংবা ক্যানেলের পাশে যাদের জমি আছে, তাদের কেউ কেউ সরকারি জমি দখল করে স্থাপনা নির্মাণ করেছে। ডুমনীর বাসিন্দা হযরত আলী মোল্লা বলেন, ‘আমরা এখন সরকারি জমিতে স্থাপনা নির্মাণ করে ব্যবসা-বাণিজ্য করছি। পরে সরকারের প্রয়োজনে ছেড়ে দেব। ’

নগরবিদদের অভিমত, পূর্বাচলের প্রবেশপথ উন্মুক্ত রাখা এবং ৩০০ ফুট রাস্তা ও ক্যানেলের সৌন্দর্য ধরে রাখতে দ্রুত অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদ করা প্রয়োজন। কারণ একসময় এটিই ঢাকার সবচেয়ে দৃষ্টিনন্দন সড়কে পরিণত হবে। তবে বর্তমান দখলদারিত্ব বজায় থাকলে সামনে সমস্যাটি আরো প্রকট হয়ে উঠবে। তখন দখলদারদের উচ্ছেদ করতে রাজউককে প্রচণ্ড বেগ পেতে হবে। কারণ সমাজে অবৈধ দখলদারদের আশ্রয়দাতারাও প্রভাবশালী। অতীতে এর অনেক নজির দেখা গেছে। তাই ৩০০ ফুটে এখনই রাজউকের তদারকি বাড়লে দখলদাররা সরে যেতে বাধ্য হবে।

রাজউকের একাধিক কর্মকর্তা বলেন, ‘এখনই যদি অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদ করা না হয়, তাহলে ভবিষ্যতে অনেক ঝামেলায় পড়তে হবে। দখলদাররা একসময় মামলা-মোকদ্দমা করে উচ্ছেদ কার্যক্রম দীর্ঘদিন আটকে দিতে পারে। তখন কিছু বেসরকারি সংস্থা কিংবা এনজিও তাঁদের পক্ষ নেবে। কেউ কেউ তাদের আইনি সহযোগিতা দিতে এগিয়ে আসবে। অনেক প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে রাজউককে এ ধরনের সমস্যা মোকাবিলা করতে হয়েছে। ’ 

পূর্বাচলের উপপরিচালক আব্দুল হামিদ মিয়া কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘রাস্তা ও প্রকল্পের কিছু কিছু এলাকায় অবৈধ দখলদার রয়েছে। আমরা যেকোনো সময় সেসব উচ্ছেদ করে ফেলব। এরপর যাতে অবৈধ দখলদাররা আর ফিরে আসতে না পারে সে ব্যবস্থাও নেব। ’

 


মন্তব্য