kalerkantho

শনিবার । ৩ ডিসেম্বর ২০১৬। ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ২ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


সন্তানের বিলাসী সাধে তুচ্ছ বাবার প্রাণ!

মারা গেলেন দগ্ধ রফিকুল

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা ও ফরিদপুর   

২২ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



সন্তানের বিলাসী সাধে তুচ্ছ বাবার প্রাণ!

রফিকুল হুদা, ফারদিন হুদা

কিশোর ছেলের দেওয়া আগুনে দগ্ধ বাবা এ টি এম রফিকুল হুদা (৪৮) অবশেষে মারা গেলেন। ফরিদপুরের ব্যবসায়ী বাবার কাছে স্কুল পেরোনো সন্তান ফারদিন হুদা মুগ্ধের আবদার ছিল নতুন মডেলের মোটরবাইক।

সন্তানের সাধ, আর বাবার সাধ্যে খুব বেশি ফারাক ছিল না। কারণ এক বছর আগেই ছেলেকে কিনে দেওয়া হয়েছে পাঁচ লাখ টাকা দামের মোটরবাইক। কিন্তু এবারের আবদারে সায় না দিতেই ক্ষুব্ধ সন্তান পেট্রল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয় বাবার শোবার ঘরে। দগ্ধ রফিকুল ছয় দিন চিকিৎসাধীন থাকার পর গতকাল বুধবার মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। গতকাল বুধবার বিকেলে ছেলে ফারদিন হুদা মুগ্ধকে আসামি করে ফরিদপুর কোতোয়ালি থানায় মামলা হয়েছে। পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি। অবক্ষয়ের মর্মান্তিক এ উদাহরণে বিচলিত ও হতবাক সবাই।

ফরিদপুর কোতোয়ালি থানার ওসি নাজিমউদ্দিন আহমেদ জানান, নিহত রফিকুলের ভগ্নিপতি মো. আকরাম উদ্দিন বাদী হয়ে হত্যা মামলা দায়ের করেছেন। এজাহারে আসামি করা হয়েছে ফারদিন মুগ্ধকে। তাকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।

স্বজনরা জানায়, ফরিদপুরের ব্যবসায়ী এ টি এম রফিকুল হুদার কাছে ছেলে সম্প্রতি আবদার করেছিল লেটেস্ট মডেলের ইয়ামাহা মোটরবাইক কিনে দিতে। একই কম্পানির দামি আরেকটি মোটরবাইক কিছুদিন আগে কিনে দেওয়ায় বাবা এ আবদারে রাজি হননি। এক বছরের পুরনো বাইক নিয়ে ক্ষুব্ধ ছিল মুগ্ধ। এরই জেরে ঈদের দুই দিন পর গত বৃহস্পতিবার বিকেলে মুগ্ধ বাবার শোবার ঘরে পেট্রল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয়। মারাত্মক দগ্ধ অবস্থায় রফিকুল দোতলা থেকে নিচে নেমে আসেন। স্বামীর শরীরের আগুন নেভাতে গিয়ে সামান্য দগ্ধ হন গৃহকর্ত্রী সিলভিয়া হুদা। প্রতিবেশী ও স্বজনরা তাঁদের দুজনকে ফরিদপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করে। শারীরিক পরিস্থিতির অবনতি ঘটায় রফিকুলকে পরদিন স্থানান্তর করা হয় ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গতকাল সকালে রফিকুলের মৃত্যু হয়।

ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের বার্ন ইউনিটের আবাসিক সার্জন পার্থ শঙ্কর পাল কালের কণ্ঠকে বলেন, আইসিইউতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় সকাল ৯টার দিকে এ টি এম রফিকুল ইসলাম হুদাকে মৃত ঘোষণা করা হয়। তাঁর শ্বাসনালিসহ শরীরের ৯৫ শতাংশই পুড়ে গিয়েছিল।

হাসপাতাল সূত্র জানায়, নিহত রফিকুলের বড় ভাই এ টি এম সিরাজুল হুদা, ভগ্নিপতি গোলাম মোস্তফা ও ভাগ্নে ইফতেখার আলম সেতু হাসপাতালে ছিলেন। ময়নাতদন্ত শেষে তাঁরা লাশ গ্রহণ করে ফরিদপুরের বাড়িতে দাফনের জন্য নিয়ে গেছেন।

পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, রফিকুলের বাবার নাম আবদুর রাজ্জাক। তাঁদের বাড়ি ফরিদপুর কমলাপুরের পুটিবাড়ী। রফিকুলের এক ভাই এ টি এম শামসুল হুদা সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার। রফিকুলের একমাত্র ছেলে মুগ্ধ এ বছর ফরিদপুর জেলা স্কুল থেকে এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে উত্তীর্ণ হয়েছে। এ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক দুর্গারানী সিকদার বলেন, মুগ্ধ অনেকটা অন্তর্মুখী স্বভাবের। সহপাঠীদের সঙ্গে তেমন একটা মিশত না। এমনকি শিক্ষকরাও তাকে চিনতেন কম। মধ্যমমানের ছাত্র ছিল সে। এ বছর এসএসসি পরীক্ষা দিয়ে এ গ্রেডে পাস করে।

রফিকুলের এ মর্মান্তিক মৃত্যু পরিবারের সদস্যদের শোকে স্তব্ধ করে দিয়েছে। পারিবারিক অবক্ষয়ের এ চিত্রে স্তম্ভিত ফরিদপুরবাসীসহ সবাই।

ফরিদপুর জেলা মহিলা পরিষদের সভাপতি অধ্যাপক শিপ্রা রায় বলেন, এমন ঘটনা ঘটার পেছনে বড় কারণ হলো—পরিবারের সঠিক শিক্ষার অভাব। সন্তানকে বোঝানোর দায়িত্ব মা-বাবার। একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত সামর্থ্য থাকলেও সন্তানকে অনেক কিছু না দেওয়া উত্তম। সন্তানের নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ ভেবে দাবি মেটানোর সিদ্ধান্ত নিতে হয়। যে মর্মান্তিক ঘটনা ঘটেছে তাতে সামগ্রিকভাবে সমাজেরও দায় রয়েছে।

এদিকে ঘটনার আগে ১৩ সেপ্টেম্বর রাতে মুগ্ধ ফেসবুক স্টেটাসে লেখে—‘পৃথিবীতে নিজে ভালো থাকতে হলে স্বার্থপর হতে হবে। আর অন্যকে ভালো রাখতে গেলে নিঃস্বার্থ হতে হবে এটাই সত্য। ’ বাবা দগ্ধ হওয়ার পর মুগ্ধের মানসিক অবস্থা সম্পর্কে স্বজনরা তেমন ধারণা দিতে পারেনি। সে পলাতক রয়েছে। তবে মৃত্যুর আগে রফিকুল স্বজনদের বলেছেন, ‘অবুঝ ছেলে এ কাজ করেছে, ওকে আমি মাফ করে দিয়েছি। ’


মন্তব্য