kalerkantho

মঙ্গলবার । ৬ ডিসেম্বর ২০১৬। ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৫ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


বিশ্বনেতাদের প্রতি প্রধানমন্ত্রী

টেকসই ভবিষ্যতের জন্য বাড়াতে হবে নারীর কর্মক্ষেত্র

শরণার্থী ইস্যুতে মিয়ানমারের সঙ্গে কাজ করবে বাংলাদেশ

কালের কণ্ঠ ডেস্ক   

২২ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



টেকসই ভবিষ্যতের জন্য বাড়াতে হবে নারীর কর্মক্ষেত্র

নারীদের জন্য টেকসই ভবিষ্যৎ নির্মাণের লক্ষ্যে সুযোগ সম্প্রসারণ এবং কর্মক্ষেত্রকে প্রসারিত করতে বিশ্বনেতাদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, ‘যে সমাজ নারীর অংশগ্রহণ এবং ক্ষমতায়নের জন্য সুযোগ সৃষ্টি করে দেয়, সে সমাজে উগ্র চরমপন্থার কোনো স্থান নেই।

আমাদের নারীর কর্মক্ষেত্রকে প্রসারিত করার মাধ্যমে সবার জন্য টেকসই ভবিষ্যৎ বিনির্মাণে কাজ করে যেতে হবে। ’

নিউ ইয়র্ক সময় মঙ্গলবার জাতিসংঘ সদর দপ্তরের কনফারেন্স রুমে ‘ওমেন্স লিডারশিপ অ্যান্ড জেন্ডার পার্সপেক্টিভ অন প্রিভেন্টিং অ্যান্ড কাউন্টারিং ভায়োলেন্স এক্সট্রিমিজম’ শীর্ষক সাইট ইভেন্টে ভাষণকালে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। নরওয়ের প্রধানমন্ত্রী এরনা সোলবার্গের আমন্ত্রণে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।

সন্ত্রাসবাদ ও সহিংস চরমপন্থা সভ্যসমাজকে লাঞ্ছিত করছে উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, ‘তারা শান্তি ও নিরাপত্তা, টেকসই উন্নয়ন এবং মানুষের প্রতি মর্যাদাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। আমরা অবশ্যই আমাদের অবস্থান থেকে এই চ্যালেঞ্জ

মোকাবিলা করব। এই সমস্যা সমাধানে আমাদের একযোগে কাজ করতে হবে। আমরা যে সমাধানের পথেই যাই না কেন, নারীদের সেখানে অংশীদারি থাকতে হবে। ’ প্রধানমন্ত্রী এ সময় উগ্র চরমপন্থা প্রতিরোধে নারীদের অংশগ্রহণ এবং নারী নেতৃত্বের অন্তর্ভুক্তির নতুন পরিকল্পনার জন্য সন্তোষ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, ‘আমি সবার জন্য শিক্ষানীতিতে বিশ্বাসী, বিশেষ করে নারীদের জন্য এবং এটাই সমাজ থেকে সন্ত্রাস এবং উগ্র চরমপন্থা হটানোর ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার। ’ তিনি বলেন, ‘আমি আমাদের মায়েদের একেকজনকে তাদের সন্তানদের জন্য রোল মডেল হিসেবে নিজেকে উপস্থাপনের জন্য উৎসাহিত করে থাকি। দেশের প্রাইমারি স্কুলগুলোর শিক্ষকদের ৬০ শতাংশ নারী শিক্ষক এবং যারা এই সমাজে বিশেষ করে শিশুতোষ সমাজে মূল্যবোধ এবং সংযমের আলো ছড়াচ্ছে। আমাদের শিশুদের অবশ্যই এসব সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড এবং উগ্র চরমপন্থার পথ থেকে দূরে রাখতে হবে। ’

শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমাদের দেশের পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নারী সদস্য এবং স্থানীয় সরকারের নারী জনপ্রতিনিধিরা বিভিন্ন পরিবার পর্যায়ে সরাসরি যোগাযোগের মাধ্যমে সমাজ থেকে উগ্র চরমপন্থার মতো অসামঞ্জস্য দূরীকরণে গণসচেতনতা সৃষ্টিতে বিশেষ ভূমিকা রাখছে। ’

এ ক্ষেত্রে নারীদের অধিকার আদায়ে জাতীয় সংসদের নারী সদস্যদের ভূমিকার কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, তিনি এটা দেখে খুশি যে সহিংস চরমপন্থা রোধে জাতিসংঘ মহাসচিব নারীর ভূমিকা ও নেতৃত্ব উপলব্ধি করে নতুন কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করেছেন।

উগ্র সন্ত্রাসবাদে নারীদেরও সম্পৃক্ত করার জন্য নতুন এক ধরনের অপচেষ্টা শুরু হয়েছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী এ সময় সন্ত্রাস ও উগ্র চরমপন্থার বিরুদ্ধে তাঁর সরকারের জিরো টলারেন্স নীতির প্রসঙ্গ উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, কী কারণে এসব নারী ভুল পথে প্রলুব্ধ হচ্ছে তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমি বিশ্বাস করি গোঁড়ামি প্রবণতা ও সহিংস চরমপন্থারোধে সবার জন্য শিক্ষা বিশেষ করে মেয়েদের জন্য শিক্ষা একটি শক্তিশালী হাতিয়ার। আমি আমাদের মেয়েদের তাদের সন্তানদের সামনে আদর্শ মডেল ও পরম বন্ধু হিসেবে ভূমিকা পালনে অনুপ্রাণিত করছি। ’ প্রধানমন্ত্রী এ সময় জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতির প্রসঙ্গসহ তাঁর সরকারের গৃহীত বিভিন্ন নারীর উন্নয়নমূলক পদক্ষেপের তথ্য তুলে ধরেন। প্রধানমন্ত্রী তাঁর ভাষণে ‘গ্লোবাল কমিউনিটি অ্যানগেজমেন্ট অ্যান্ড রেজিলিয়েন্স ফান্ড’র (জিসিইআরএফ) সঙ্গে মিলে তাঁর সরকারের নারীর ক্ষমতায়নের লক্ষ্যে পদক্ষেপ গ্রহণের কথাও উল্লেখ করেন।

অনুষ্ঠানে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ এইচ মাহমুদ আলী, প্রধানমন্ত্রীর তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ক উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয়, এলজিআরডি ও সমবায়মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার খন্দকার মোশাররফ হোসেন, প্রবাসীকল্যাণ এবং বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী নুরুল ইসলাম বিএসসি, জ্বালানি উপদেষ্টা ড. তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী, শ্রম ও কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী মুজিবুল হক চুন্নু, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী মো. শাহরিয়ার আলম এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি ডা. দীপু মনি উপস্থিত ছিলেন।

শরণার্থী ইস্যুতে মিয়ানমারের সঙ্গে কাজ করবে বাংলাদেশ : প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, মিয়ানমারের শরণার্থী ইস্যুর সমাধানে উপায় বের করতে দেশটির নতুন নেতৃত্বের সঙ্গে কাজ করার অপেক্ষায় আছে বাংলাদেশ। তিনি বলেন, ‘আমরা এই ইস্যুর সমাধানে উপায় বের করার কাজে মিয়ানমারের নতুন নেতৃত্বের দিকে তাকিয়ে আছি। আমি ইতিমধ্যে এ বিষয়ে অং সান সু চিকে কিছু আভাসও দিয়েছি। ’ মঙ্গলবার অপরাহ্নে জাতিসংঘের সদর দপ্তরে ট্রাস্টিশিপ কাউন্সিল চেম্বারে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা আয়োজিত ‘লিডারশিপ সামিট অন রিফিউজস’ বিষয়ে বক্তব্য দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি অন্য আন্তর্জাতিক অংশীদারদের শরণার্থী ইস্যুতে সম্পৃক্ত হওয়ার আহ্বান জানান।

শেখ হাসিনা বলেন, ‘কাউকে পেছনে ফেলে না রাখার আমাদের যে অঙ্গীকার তা বাস্তবায়নে আমাদের অবশ্যই জনগণকে সুশৃঙ্খল, নিরাপত্তা, নিয়মানুবর্তিতা ও দায়িত্বের প্রতি উন্নয়ন সাধনে কাজ করতে হবে। ’

তিনি বলেন, ‘গত তিন দশকে মিয়ানমার থেকে আসা বিপুলসংখ্যক শরণার্থী ও উদ্বাস্তুকে বাংলাদেশ আশ্রয় দিয়েছে। আমাদের সম্পদের সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও আমরা ওই মানুষদের দায়িত্ব বহন করে চলেছি। আমাদের স্থানীয় জনগণ তাদের (শরণার্থী) আশ্রয় প্রদান ও সহযোগিতার জন্য জায়গার ব্যবস্থা করে দিয়েছে। যদিও এতে বিভিন্ন সামাজিক, অর্থনৈতিক, পরিবেশগত ও রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হতে হয়েছে। ’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, মিয়ানমারের শরণার্থীদের ক্যাম্পগুলোতে নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ও দক্ষতার বিষয়ে সরকার প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দিচ্ছে। তাদের উন্নতমানের আশ্রয়স্থলের ব্যবস্থা ও আত্মনির্ভরশীল হওয়ার জন্যও মনোযোগ দেওয়া হবে।

তিনি বলেন, ‘মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে আসা অন্যদের ব্যাপারেও সম্প্রতি একটি জরিপের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আমরা তাদের ‘তথ্য কার্ড’ শীর্ষক পরিচয়পত্র প্রদানের জন্যও পরিকল্পনা গ্রহণ করেছি। এই পরিচয়পত্র ন্যায়বিচার, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ও অন্যান্য সেবা প্রদানের ক্ষেত্রে তাদের জন্য সহায়ক হবে। ’ অনুষ্ঠানে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ এইচ মাহমুদ আলী, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব আবুল কালাম আজাদ ও পররাষ্ট্রসচিব মো. শহীদুল হক উপস্থিত ছিলেন।

এর আগে প্রধানমন্ত্রী জাতিসংঘের সদর দপ্তরে কনফারেন্স ভবনে জাতিসংঘ মহাসচিব বান কি মুন আয়োজিত ভোজসভায় অংশ নেন।

আরো দুটি আন্তর্জাতিক অ্যাওয়ার্ড গ্রহণ : নারীর ক্ষমতায়নে অসামান্য অবদানের জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গতকাল বুধবার ‘প্লানেট ৫০-৫০ চ্যাম্পিয়ন’ এবং ‘এজেন্ট অব চেঞ্জ অ্যাওয়ার্ড’ গ্রহণ করার কথা। জাতিসংঘ সদর দপ্তরের ইউএন প্লাজায় স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ৬টা ২০ মিনিটে জাতিসংঘ উইমেন ‘প্লানেট ৫০-৫০ চ্যাম্পিয়ন’ এবং গ্লোবাল পার্টনারশিপ ফোরাম ‘এজেন্ট অব চেঞ্জ অ্যাওয়ার্ড’ প্রদান করার কথা।  

নিউ ইয়র্ক সময় গতকাল সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় (বাংলাদেশ সময় শেষ রাত) জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ হলে ৭১তম অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রীর ভাষণ দেওয়ার কথা। সূত্র : বাসস।


মন্তব্য