kalerkantho

রবিবার। ৪ ডিসেম্বর ২০১৬। ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৩ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


সন্ধ্যা নদীতে লঞ্চডুবি ১৩ লাশ ১৫ নিখোঁজ

নিজস্ব প্রতিবেদক, বরিশাল   

২২ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



সন্ধ্যা নদীতে লঞ্চডুবি ১৩ লাশ ১৫ নিখোঁজ

বরিশালের বানারীপাড়ায় সন্ধ্যা নদীতে গতকাল লঞ্চডুবির পর যাত্রীদের উদ্ধারে ফায়ার সার্ভিসের কর্মী ও ডুবুরিদের তৎপরতা। ছবি : কালের কণ্ঠ

বরিশালের বানারীপাড়া উপজেলায় সন্ধ্যা নদীতে প্রায় ৫০ জন যাত্রী নিয়ে এমএল ঐশী নামের একটি লঞ্চ ডুবে গেছে। গতকাল বুধবার সন্ধ্যা পর্যন্ত ১৩ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে।

সাঁতরে তীরে উঠেছে পাঁচজন। প্রশাসনের তালিকা অনুযায়ী, এখনো অন্তত ১৫ যাত্রী নিখোঁজ রয়েছে।  

গতকাল সকাল সাড়ে ১১টার দিকে উপজেলার সৈয়দকাঠি ইউনিয়নের মসজিদবাড়ী গ্রামের দাসেরহাট এলাকায় এ দুর্ঘটনা ঘটে। বানারীপাড়া থেকে উজিরপুর উপজেলার হারতার দিকে যাচ্ছিল লঞ্চটি। প্রত্যক্ষদর্শী ও প্রশাসনের শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নদীর ভাঙন ও স্রোতের টানে লঞ্চটি ডুবে গেছে। ঘটনা তদন্তে কমিটি গঠন করেছে জেলা প্রশাসন।

গতকাল খবর পেয়ে পুলিশ ও প্রশাসনের কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে যান। দুর্ঘটনার সময় কাছাকাছি এলাকায় ছিলেন দাসেরহাটের বাসিন্দা আবুল হোসেন। দুর্ঘটনাস্থলে তিনি বানারীপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. শহীদুল ইসলামকে ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে জানান, তখন আনুমানিক সকাল সাড়ে ১১টা বাজে, লঞ্চটি ঘাটে ভিড়ছিল। লঞ্চটি যখন ঘাট থেকে আনুমানিক ২০ গজ দূরে, ঠিক সে সময় হঠাৎ ঘাট এলাকার একটি বিশাল অংশ নদীতে ভেঙে পড়ে। স্রোত ও ভাঙনের কারণে সৃষ্ট তীব্র ঢেউয়ের মুখে পড়ে লঞ্চটির সামনের অংশ বাঁ দিকে কাত হয়ে যায় এবং একপর্যায়ে সেটি ডুবে যায়। এ সময় যাত্রীদের মধ্যে আহাজারি শুরু হয়। তাদের মধ্যে পাঁচজন সাঁতরে তীরে ওঠে।  

বানারীপাড়া থানার ওসি মো. জিয়াউল আহসান বলেন, দাসেরহাট ঘাটে যাত্রী নামাতে গিয়ে তীরের কাছাকাছি ডুবে যায় লঞ্চটি। প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাত দিয়ে তিনি বলেন, নদীর ভাঙন ও স্রোতের টানেই সেটি ডুবে গেছে। নারী, শিশুসহ ১৩ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। জীবিত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়েছে পাঁচজনকে। বরিশাল থেকে ফায়ার সার্ভিসের একটি দল ও ডুবুরিরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধারকাজে যোগ দেন।

উপজেলা প্রশাসনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, নিহত ১৩ জন হলেন সুখদেব (৪০), রাজ্জাক (৬০), শান্তা (১০), মনোয়ারা বেগম (৫০), কোহিনুর (৪৫), রেহেনা (৩০), সাগর মীর (২৫), মোজাম্মেল (৬০), রাবেয়া খাতুন (৩৫), জয়নাল (৪০), মিলন ঘরামী (৩০), সালমা বেগম (৩৫) ও সালেহা (৩০)। তবে তাৎক্ষণিক তাঁদের বিস্তারিত পরিচয় পাওয়া যায়নি।

দুর্ঘটনার খবর পেয়ে গতকাল দুপুর থেকেই সন্ধ্যার তীরে জড়ো হতে থাকে স্বজনরা। একেকটি লাশ উদ্ধার করে পাড়ে আনার সঙ্গে সঙ্গে তারা সেখানে ভিড় করতে থাকে। প্রিয়জনের লাশ খুঁজে পেয়ে হাহাকার করতে থাকে স্বজনরা, কাঁদতে কাঁদতে জ্ঞান হারায় কেউ। যারা তখনো নিখোঁজ স্বজনের কোনো খবর পায়নি তারা আহাজারি আর বিরামহীন ছোটাছুটি করতে থাকে।  

প্রায় চার ঘণ্টা ধরে নদীর তীরে অপেক্ষার পর বোনের লাশ পেয়েছেন মসজিদবাড়ী গ্রামের হেমায়েত হোসেন। তবে তাঁর ছোট ভাইয়ের স্ত্রী রূপা বেগম ও ভাতিজা রিয়াদ তখনো নিখোঁজ ছিল। বোনের লাশের পাশে বসে হেমায়েতের কান্না আশপাশে উপস্থিত অন্যদের চোখও ভিজিয়ে তোলে।  

দুপুরের কড়া রোদে স্বামীর জন্য অপেক্ষা করছিলেন আলেয়া বেগম। একসঙ্গে বানারীপাড়া থেকে লঞ্চে উঠেছিলেন তাঁরা। আলেয়া জানান, দাসেরহাটে ঘাটে ভিড়তে গিয়ে নদীর পাড়ের একটি বড় অংশ ভেঙে পড়ে। এতে লঞ্চটি ডুবে যায়। তিনি সাঁতরে তীরে উঠতে পারলেও তাঁর স্বামী এখনো নিখোঁজ।

ইঞ্জিনচালিত নৌকায় করে নিখোঁজ ভাগ্নের সন্ধান করছিলেন রফিকুল ইসলাম। তিনি জানান, রুহুল আমীন স্বরূপকাঠি ফায়ার সার্ভিসে কাজ করত। ছুটি পেয়ে লঞ্চে করে সাতবাড়িয়ায় গ্রামের বাড়ি ফিরছিল। দুর্ঘটনার পর থেকে সে নিখোঁজ রয়েছে।

পুলিশ প্রশাসনের তালিকা অনুযায়ী নিখোঁজ রয়েছেন ১৫ জন। তাঁরা হলেন, বানারীপাড়ার সৈয়দকাঠি ইউনিয়নের জিরাকাঠি গ্রামের মিলন ঘরামীর স্ত্রী খুকু মনি (২৪), তাঁদের তিন বছরের সন্তান শাফওয়ান, একই গ্রামের রহিম হাওলাদারের পাঁচ বছরের ছেলে রিয়াদ হাওলাদার, নয়াকান্দি গ্রামের সিরাজ হাওলাদারের ছেলে জয়নাল হাওলাদার (৫৫), সাতবাড়িয়া গ্রামের রহমান হাওলাদারের ছেলে মজিদ হাওলাদার (৬৫), একই গ্রামের আলেক সরদারের ছেলে রুহুল আমীন (৩০), আলমগীর সরদারের সাড়ে তিন বছরের মেয়ে মাফিয়া, খলিলুর রহমানের দুই সন্তান দিদান (৮) ও নাফসি (১০), মসজিদবাড়ী গ্রামের ইসমাইল মোল্লার ছেলে মুজা মোল্লা (৬২), পূর্ব সৈয়দকাঠি গ্রামের হামেদ হাওলাদারের ছেলে জাকির হোসেন (৪০), উজিরপুরের হাতরা ইউনিয়নের হিজলকাঠি গ্রামের মনিসংকরের স্ত্রী আলপনা রানী (২৫), মশং গ্রামের সিদ্দিকুর রহমানের ছেলে রফি (১০), কেশবকাঠি গ্রামের খলিল হাওলাদারের স্ত্রী হামিদা বেগম (৪০) ও স্বরূপকাঠির আলকীর হাট গ্রামের কালামের স্ত্রী হিরা বেগম (২৫)।

ফায়ার সার্ভিসের সহকারী পরিচালক ফারুক হোসেন শিকদার বলেন, খবর পেয়ে বানারীপাড়া ও বরিশালের দুটি ইউনিট ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধার অভিযান শুরু করে। স্রোতের কারণে উদ্ধার অভিযান চালাতে সমস্যা হলেও কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে তাঁরা ডুবে যাওয়া লঞ্চটি খুঁজে পান। তীরের কাছাকাছি এলাকায় ডুবলেও এটি স্রোতের টানে মাঝ নদীতে চলে যায়। লঞ্চটি ৮-১০ ফুট পানির নিচে বেঁধে রাখা হয়েছে।

অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডাব্লিউটিএ) নৌ নিরাপত্তা ও ট্রাফিক বিভাগের উপপরিচালক মোস্তাফিজুর রহমান গতকাল রাত সাড়ে ৯টায় কালের কণ্ঠকে বলেন, স্থানীয়ভাবে কার্গোর সঙ্গে রশি বেঁধে লঞ্চটি টেনে তোলার চেষ্টা করা হলেও একপর্যায়ে রশি ছিঁড়ে যায়। এজন্য সন্ধ্যা ৭টার দিকে উদ্ধারকাজ স্থগিত করা হয়। সহায়তার জন্য বরিশাল থেকে উদ্ধারকারী জাহাজ নির্ভীক আসছে। সেটি এলে ফের উদ্ধারকাজ শুরু হবে।

মোস্তাফিজুর রহমান আরো বলেন, ট্রলারের কাঠামো পরিবর্তন করে এমএল ঐশীকে লঞ্চ বানানো হয়েছে। যাত্রীবাহী লঞ্চটির কোনো রুট পারমিট নেই, এমনকি সার্ভে সনদও নেই। এটি গোপনে বানারীপাড়া থেকে উজিরপুর নৌরুটে যাত্রী পরিবহন করছিল। বিধি অনুযায়ী উদ্ধার তৎপরতা শেষে লঞ্চ মালিকের বিরদ্ধে মেরিন আইনে মামলার পাশাপাশি ঘটনা তদন্তে কমিটি গঠন করা হবে।

বানারীপাড়ার ইউএনও মো. শহীদুল ইসলাম বলেন, নদীর ভাঙন ও স্রোতের টানে লঞ্চটি ডুবে যায়। ১৩ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। আরো অন্তত ১৫ জন নিখোঁজ থাকার কথা বলছে যাত্রীদের স্বজনরা। ফায়ার সার্ভিস ও ডুবুরিরা উদ্ধার অভিযানে অংশ নিয়েছে। তবে তীব্র স্রোতের কারণে উদ্ধার অভিযানে সমস্যা হচ্ছে। নৌবাহিনীকে খবর দেওয়া হয়েছে।

বরিশালের জেলা প্রশাসক ড. গাজী মো. সাইফুজ্জামান জানান, ঘটনা তদন্তে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট জাকির হোসেনকে প্রধান করে ৯ সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে। সাত কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে। প্রতিবেদন পেলেই লঞ্চ মালিক ও চালকদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। লাশ নিয়ে যাওয়ার সময় স্বজনদের জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ১০ হাজার টাকা করে দেওয়া হচ্ছে।


মন্তব্য