kalerkantho

রবিবার । ১১ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ১০ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


রামপালবিরোধী আন্দোলনে নজর ভারতীয় কম্পানির

ইউনেসকোর অনুরোধ রাখবে না বাংলাদেশ

আরিফুজ্জামান তুহিন   

২১ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



রামপালবিরোধী আন্দোলনে নজর ভারতীয় কম্পানির

সুন্দরবনের পাশে বাগেরহাটের রামপালে কয়লাভিত্তিক ১৩২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্র বিরোধী আন্দোলন বিষয়ে অবগত আছে রামপালের অংশীদার ভারতীয় কম্পানি। সেই সঙ্গে সর্বশেষ পরিস্থিতি, প্রকল্প বাস্তবায়নে ধীরগতির কারণ—এসব বিষয়ে ওয়াকিবহাল থাকতে চায় তারা।

বাংলাদেশে রামপালবিরোধী আন্দোলনের গতিপ্রকৃতি ও সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলতে প্রতিষ্ঠানটি এরই মধ্যে বাংলাদেশে অবস্থান করা তাদের প্রতিনিধিকে তলব করেছে। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় থেকে এসব তথ্য জানা গেছে।

বাগেরহাটের রামপালে কয়লাভিত্তিক ১৩২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্রটি বাংলাদেশের রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) ও ভারতের সরকারি সংস্থা ন্যাশনাল থার্মাল পাওয়ার কম্পানির (এনটিপিসি) সমান মালিকানায়। এ কেন্দ্রটি পরিচালনার জন্য বাংলাদেশ-ভারত ফ্রেন্ডশিপ পাওয়ার কম্পানি লিমিটেড (বিআইপিসিএল) নামে একটি কম্পানি গঠন করা হয়েছে। এটিই রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র নামে পরিচিত। এ কম্পানির এমডি উজ্জ্বল কান্তি ভট্টাচার্যকে গত রবিবার জরুরিভাবে এনটিপিসির প্রধান অফিস ভারতের দিল্লিতে ডাকা হয়েছে।

জানা গেছে, রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র বিরোধী আন্দোলন সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পেতে চায় ওই প্রতিষ্ঠান। এ ছাড়া রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে ধীরগতি নিয়েও অসন্তুষ্টি রয়েছে এনটিপিসির নীতিনির্ধারকদের। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে চুক্তি হয়েছে ২০১০ সালে। অথচ কেন্দ্র নির্মাণে  তেমন কোনো অগ্রগতি নেই। সবেমাত্র এটির অর্থপ্রাপ্তির নিশ্চয়তা পাওয়া গেছে। অন্যদিকে পটুয়াখালীর পায়রায় ১৩২০ মেগাওয়াট কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে ২০১৪ সালে। কিন্তু ওই কেন্দ্রটির নির্মাণকাজ বহুদূর এগিয়ে গেছে। এসব কারণে এনটিপিসি নাখোশ বিআইপিসিএলের কর্তাব্যক্তিদের ওপর। এসব কারণেই বিআইপিসিএলের এমডিকে জরুরি তলব করা হয়েছে।

রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র বিরোধী আন্দোলনের গতিপ্রকৃতি নিয়ে কথা হলে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ গতকাল মঙ্গলবার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বিষয়টি আমরা নজরে রাখছি। ’

বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ বন্ধ রাখার অনুরোধ ইউনেসকোর : রামপালে ১৩২০ মেগাওয়াটের কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণসহ এ সংশ্লিষ্ট সব কাজ বন্ধ রাখার অনুরোধ জানিয়েছে জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতিবিষয়ক সংস্থা ইউনেসকো। গত মাসে এ সংস্থার পাঠানো ৫০ পৃষ্ঠার এক প্রতিবেদনে সরকারের কাছে এ আবেদন জানায় তারা। একটি নিরপেক্ষ সংস্থা দিয়ে পরিবেশের চূড়ান্ত সমীক্ষা বা ইআইএ না করার আগ পর্যন্ত রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের কাজ বন্ধ রাখার অনুরোধ জানানো হয়েছে। এ ছাড়া বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য পশুর নদ খননের কাজও এ সময় বন্ধ রাখার অনুরোধ জানানো হয়। সেই সঙ্গে বিদ্যুৎকেন্দ্রটি অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার পরামর্শও দিয়েছে তারা। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় থেকে এ তথ্য জানা গেছে। ইউনেসকো আগামী ১১ অক্টোবরের মধ্যে রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিষয়ে সংস্থাটির পাঠানো ৫০ পৃষ্ঠার প্রতিবেদনের বিষয়ে মতামত দেওয়ার তারিখ বেঁধে দিয়েছে।

তবে সরকার রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণকাজের প্রক্রিয়া অব্যাহত রেখেছে। সরকারের দাবি, রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র হলে তা সুন্দরবনের ওপর কোনো ধরনের ক্ষতিকর প্রভাব ফেলবে না। পশুর নদেরও কোনো ক্ষতি হবে না। এ বিষয়ে তারা ইউনেসকোর উদ্বেগ দূর করতে ফের সার্বিক বিষয় অবহিত করবে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ গতকাল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ইউনেসকো বিদ্যুৎকেন্দ্রের কাজসহ পশুর নদ খননের কাজও বন্ধ রাখার অনুরোধ করেছে। পশুর নদ খননের বিষয় আলাদা একটি মন্ত্রণালয় দেখবে। এর সঙ্গে অনেক কিছু জড়িত। এই মুহূর্তে আমরা কোনো কাজ বন্ধ করছি না। তবে ইউনেসকোর উদ্বেগ দূর করার ব্যবস্থা নিয়েছি। তাদের বেঁধে দেওয়া সময়ের মধ্যেই আমরা তাদের সব কিছু অবহিত করব। ’

এক প্রশ্নের জবাবে নসরুল হামিদ বলেন, ‘রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মিত হলে কোনো ক্ষতি হবে না সুন্দরবনের—এটি আমরা বলছি আমাদের গবেষণা রিপোর্ট হাতে পেয়েই। কিন্তু ইউনেসকো কোনো ধরনের গবেষণা না করেই একটি অপেশাদার প্রতিবেদন দিয়েছে। এটি ইউনেসকোর মতো প্রতিষ্ঠানের কাছে আমরা আশা করিনি। ’

প্রতিমন্ত্রী আরো বলেন, ‘ইউনেসকোর প্রতিনিধিদল সরেজমিন গিয়েছিল সুন্দরবনে। আমরা আশা করেছিলাম, তারা টেকনিক্যাল বিষয়গুলো নিয়ে বলবেন। যেমন কয়লা পরিবহন হলে ঠিক কি পরিমাণ কয়লা নদীতে মিশতে পারে, এতে নদীর পানির ঠিক কী কী পরিবর্তন হতে পারে, কিংবা কেন্দ্রের কারণে কী পরিমাণ কার্বন নিঃসরণ হবে আর তাতে সুন্দরবনের কী কী ক্ষতি হতে পারে। ইউনেসকোর প্রতিবেদনে এ ধরনের কোনো বিষয়ে নির্দিষ্ট করে বলা হয়নি। তারা যেসব প্রশ্ন উত্থাপন করেছে তা এই বিদ্যুৎকেন্দ্র বিরোধী আন্দোলনকারীদেরও। আর এসবের উত্তর বহুবার আমরা দিয়েছি। শেষ পর্যন্ত এটি নিয়ে কথা বলেছেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ’

এর আগেও ইউনেসকো রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র হলে সুন্দরবন ক্ষতির মুখে পড়বে এমন উদ্বেগ জানিয়ে সরকারের নীতিনির্ধারকদের চিঠি দিয়েছিল। ১৯৯৭ সালে সুন্দরবনকে বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে স্বীকৃতি দেয় ইউনেসকো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ কমিটি। এ কমিটি গত বছর জুলাইয়ে তাদের ৩৯তম অধিবেশনেও রামপাল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র সুন্দরবনের ক্ষতি করবে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিল। ক্ষয়ক্ষতি কমাতে সরকার কী ব্যবস্থা নেবে, সে সম্পর্কে তথ্য জানতে চেয়েছিল ইউনেসকো। ইউনেসকোর আগে জাতিসংঘের আরেক সংস্থা রামসার সেক্রেটারিয়েটের পক্ষ থেকেও সরকারের কাছে রামপাল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছিল। এসব সংস্থার উদ্বেগের জবাব দিয়েছে সরকার। তবে সরকারের পাওয়া জবাবের সঙ্গে সংস্থাগুলো একমত হয়নি।

উল্লেখ্য, গত ২২ মার্চ ইউনেসকোর তিন সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল এক সপ্তাহের জন্য বাংলাদেশ সফরে আসে। সফরকালে বিশেষজ্ঞদল বিদ্যুৎ বিভাগ, পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়, নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাসহ স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে। প্রতিনিধিদলের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল রামপালে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র হলে পরিবেশ ও সুন্দরবনের ওপর কী ধরনের প্রভাব পড়তে পারে, তা নিরূপণ করা। বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থার প্রতিনিধিদলের সঙ্গে ওই বিশেষজ্ঞদলের বৈঠক হওয়ার কথা থাকলেও পরে সেটি আর হয়নি। প্রতিনিধিদলটি ২৯ মার্চ বাংলাদেশ ছেড়ে যাওয়ার পাঁচ মাস পর এ-সংক্রান্ত প্রতিবেদন তৈরি করে সরকারের কাছে পাঠিয়েছে ইউনেসকো।


মন্তব্য