kalerkantho

সোমবার । ৫ ডিসেম্বর ২০১৬। ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৪ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


বিএনপি-জামায়াতের নেতাকর্মীতে আস্থা এমপি ওদুদের

তৈমুর ফারুক তুষার ঢাকা ও শহীদুল হুদা অলক, চাঁপাইনবাবগঞ্জ   

২১ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



বিএনপি-জামায়াতের নেতাকর্মীতে আস্থা এমপি ওদুদের

দীর্ঘদিন চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছেন জিয়াউর রহমান তোতা। তাঁর প্রয়াত বাবা নাসির উদ্দিন আহমেদ ছিলেন আওয়ামী লীগের জনপ্রিয় নেতা।

আওয়ামী পরিবারের সঙ্গে এমনভাবে জড়িয়ে থাকা সেই তোতা আক্ষেপ করে বললেন, ‘বিএনপি-জামায়াত সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনের সময় আমার বিরুদ্ধে চারটি মামলার বাদী ছিলেন এজাবুল হক বুলি। ভাগ্যের নির্মম পরিহাস, এই বুলিই এখন আওয়ামী লীগের নিয়ন্ত্রক। তাঁদের চক্রান্তে আমার মতো আওয়ামী লীগের আরো অনেক ত্যাগী নেতাকর্মীকে মামলার আসামি করা হচ্ছে। ’ খোঁজ নিয়ে জানা গেল, শুধু তোতাই নন তাঁর মতো আরো অনেক ত্যাগী নেতাকর্মীই এখন সংগঠনে কোণঠাসা। দলে তো মূল্যায়ন নেই-ই উপরন্তু মামলা-হামলার ভয়ে এখন পলিয়ে বেড়াচ্ছেন অনেকে। আর যাদের কারণে এসব নেতাকর্মী নিজের সংগঠনে এমন বিপদাপন্ন তারা আবার দলে উড়ে এসে জুড়ে বসা। কেউ কেউ তাদের আবার বলে থাকে হাউব্রিড নেতা। তাদের দাপটে চাঁপাইনবাবগঞ্জের আদি ও ত্যাগী আওয়ামী লীগাররা এখন ‘নিজভূমে পরবাসী’।  

চারদলীয় জোট সরকারের আমলে বিএনপি-জামায়াতের নেতাকর্মীদের বহু জুলুম-নির্যাতন সয়েছেন চাঁপাইনবাবগঞ্জ আওয়ামী লীগের অসংখ্য নেতাকর্মী। জুলুম-নির্যাতন সয়ে তাঁরা অপেক্ষায় ছিলেন নিজেদের দল কখনো ক্ষমতায় এলে নিশ্চয়ই দিন বদলাবে। অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে দল ক্ষমতায় এলো। কিন্তু দুর্দিন ঘুচল না তাদের। চারদলীয় জোটের সময় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের ওপর নির্যাতনে বিএনপি-জামায়াতের যে নেতারা নেতৃত্ব দিয়েছেন তাঁদেরই কয়েকজন এখন চাঁপাইনবাবগঞ্জ আওয়ামী লীগের নিয়ন্ত্রক। তাঁদের কাছে নানা জুলুম-নির্যাতনের শিকার হচ্ছে পুরনো নেতাকর্মীরা। বিএনপি-জামায়াত থেকে আসা এসব নব্য আওয়ামী লীগারের দাপটে কোণঠাসা হয়ে পড়েছে পুরনোরা।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সদর আসনের সংসদ সদস্য আবদুল ওদুদ

 চারদলীয় জোট সরকারের মেয়াদের একেবারে শেষের দিকে বিএনপি ছেড়ে আওয়ামী লীগে আসেন। আওয়ামী লীগ তাঁকে আস্থায় নিয়ে সংসদ সদস্য হিসেবে মনোনয়ন দেয়। তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন এবং আওয়ামী লীগ তাঁকে জেলার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেয়। কিন্তু চাঁপাইনবাবগঞ্জ আওয়ামী লীগের পুরনো নেতাকর্মীদের ওপর আস্থা স্থাপন করতে পারেননি ওদুদ। বিএনপি-জামায়াত থেকে ভাগিয়ে আনা পুরনো রাজনৈতিক সহকর্মীদের ওপরই ভরসা এবং আস্থা আবদুল ওদুদের। তিনি বিএনপির সাবেক কয়েকজন নেতাকে নিয়ে নিজের একটি বলয় তৈরি করেছেন। এঁরাই এখন জেলার রাজনীতি, ঠিকাদারি, বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের নিয়ন্ত্রক। এঁদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, জমি দখল, দলীয় নেতাকর্মীদের নির্যাতনের অভিযোগ রয়েছে।

জানা যায়, বিএনপি থেকে আওয়ামী লীগে এসে আবদুল ওদুদ দলে নিজের অবস্থান পোক্ত করতে বিএনপি-জামায়াতের নেতাকর্মীদের আওয়ামী লীগে ভিড়িয়েছেন। সেই সঙ্গে সংগঠনের পুরনো নেতাকর্মীদের কোণঠাসা করেছেন। বিএনপির সাবেক নেতা ও বর্তমানে সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আলমগীর কবির, পৌর যুবদলের সাবেক সভাপতি ও বর্তমানে সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের কোষাধ্যক্ষ এজাবুল হক বুলি, সদর উপজেলা বিএনপির সাবেক সহসভাপতি বর্তমানে আওয়ামী লীগ নেতা ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌরসভার ভারপ্রাপ্ত মেয়র সাইদুর রহমান, সদর উপজেলা বিএনপির সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক ও বর্তমানে সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের প্রচার সম্পাদক বাবুল কুমার ঘোষকে সঙ্গে নিয়ে তিনি নিজস্ব বলয় তৈরি করেছেন।

জানতে চাইলে নাম প্রকাশ না করার শর্তে জেলা আওয়ামী লীগের এক নেতা বলেন, ‘ওদুদরা আওয়ামী লীগে এসেছেন আওয়ামী লীগকে ধ্বংস করতে। এঁদের কারণে চাঁপাইনবাবগঞ্জে পুরনো আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা একে একে রাজনীতি থেকে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ছে। ’

নাম প্রকাশ না করার শর্তে পৌর আওয়ামী লীগের একজন নেতা বলেন, ‘আবদুল ওদুদ কোনো নির্বাচনে নিজের পছন্দমতো প্রার্থী দিতে না পারলে তাঁর পক্ষে কাজ করেন না। যদি কেন্দ্র থেকে ওদুদের মতের বাইরে পুরনো কোনো আওয়ামী লীগের নেতাকে মনোনয়ন দেওয়া হয় তবে তাঁকে সহযোগিতা করেন না। এমনকি পুরনো নেতাদের নির্বাচনে হারিয়ে দিয়ে ওদুদ নিজের আধিপত্য পাকাপোক্ত করেছেন এমন উদাহরণও আছে। ’

বিএনপি থেকে যোগদানকারীরাই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় : চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের কোষাধ্যক্ষ এজাবুল হক বুলি সর্বশেষ বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের আমলে পৌর যুবদলের সভাপতি ছিলেন। বিএনপি ক্ষমতায় থাকাকালে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে বহু মামলার বাদী ছিলেন বুলি। তিনি সংসদ সদস্য আবদুল ওদুদের ভাতিজা। সম্প্রতি বুলি আওয়ামী লীগের মনোনয়ন নিয়ে সদর উপজেলার মহারাজপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানও নির্বাচিত হয়েছেন। চাচার হয়ে বুলি চাঁপাইনবাবগঞ্জে ঠিকাদারি নিয়ন্ত্রণ করেন। ওদুদের প্রভাবেই বুলি কিছুদিন আগে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা ঠিকাদার সমিতির আহ্বায়ক হন।

জানা যায়, বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা ও সাবেক সংসদ সদস্য হারুনুর রশিদ ও তাঁর স্ত্রী সৈয়দা আশিফা আশরাফী পাপিয়ার সঙ্গে খুবই ঘনিষ্ঠতা ছিল বুলির। বিএনপি আমলে হারুনুর রশিদের হয়ে স্থানীয় প্রশাসন ও দলীয় বিভিন্ন বিষয় দেখাশোনা করতেন বুলি। তিনি আওয়ামী লীগে যোগ দিয়ে ঠিকাদার সমিতির আহ্বায়ক হওয়ার পর থেকে ছাত্রদল-যুবদলের ডজনখানেক নেতাকে সঙ্গে নিয়ে জেলার যাবতীয় ঠিকাদারি কাজের ভাগবাটোয়ারা করে থাকেন।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার নারায়ণপুর ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান আলমগীর কবির আলম বিএনপির প্রতাপশালী নেতা ছিলেন। আলমগীরের বাবা হুমায়ুন কবির যিনি হুমায়ুন দারোগা নামে পরিচিত, তাঁর বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধে যুক্ত থাকার অভিযোগ রয়েছে। আলমগীর কবির আওয়ামী লীগে যোগ দিয়ে আবদুল ওদুদের প্রভাবে সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হন। এলাকায় আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টায় আলমগীর কবিরের বাহিনীর হাতে ২০১৩ সালে খুন হন আওয়ামী লীগের কর্মী নুরুল ইসলাম ও আখতারুল ইসলাম। জোড়া খুনের মামলায় এজাহারভুক্ত আসামি আলমগীরকে কিছুদিন আগে অনুষ্ঠিত ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে এমপি ওদুদের ইচ্ছায় দলীয় মনোনয়ন দেওয়া হয়। এতে নারায়ণপুর ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের পুরনো নেতাকর্মীরা ক্ষুব্ধ হয়। আলমগীরকে মনোনয়ন দেওয়ার বিরোধিতা করে বিদ্রোহী প্রার্থী হন প্রবীণ আওয়ামী লীগ নেতা কামাল উদ্দিন হোদা। নির্বাচনে হোদার কাছে পরাজিত হন আলমগীর।

চাঁপাইনবাবগঞ্জে আবদুল ওদুদের ঘনিষ্ঠ ও প্রভাবশালী আরেক নেতা হলেন সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের প্রচার সম্পাদক বাবুল কুমার ঘোষ। তিনি চারদলীয় জোট সরকারের আমলে সদর উপজেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক ছিলেন। আবদুল ওদুদ আওয়ামী লীগে যোগদানের কিছুদিন পরে তিনিও আওয়ামী লীগে আসেন। আবদুল ওদুদ সদর আসনের সংসদ সদস্য নির্বাচিত হলে ক্ষমতাধর হয়ে ওঠেন বাবুল কুমার। তিনি এখন চাঁপাইনবাবগঞ্জে ওদুদের যাবতীয় সভা-সমাবেশ, সামাজিক-সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজনের দায়িত্ব পালন করে থাকেন।

যোগ দিয়েই পৌরসভার ভারপ্রাপ্ত মেয়র : গত পৌরসভা নির্বাচনে বিএনপির সমর্থন নিয়ে ১১ নম্বর ওয়ার্ডে কাউন্সিলর নির্বাচিত হন সদর উপজেলা বিএনপির সহসভাপতি সাইদুর রহমান। তাঁর বাবা ছিলেন চিহ্নিত স্বাধীনতাবিরোধী। তাঁরা পারিবারিকভাবেই দীর্ঘদিন ধরে বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। সাইদুর রহমানের বড় ভাই আফতাব উদ্দিনও বিএনপি নেতা হিসেবে পৌরসভার কমিশনার নির্বাচিত হয়েছিলেন।

সাইদুর রহমান কাউন্সিলর নির্বাচিত হওয়ার কিছুদিন পর সংসদ সদস্য ওদুদের হাতে ফুলের তোড়া দিয়ে আওয়ামী লীগে যোগ দেন। এর কিছুদিন পরে তিনি পৌরসভার ভারপ্রাপ্ত মেয়রের দায়িত্ব পান। সাইদুর রহমানের সঙ্গে একই দিন আওয়ামী লীগে যোগদান করেন চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌর এলাকার জামায়াতের ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত নামোশংকরবাটির জামায়াত নেতা আবদুল মান্নানের স্ত্রী মোসলেমা বেগম মুসি। তিনি জামায়াতের সমর্থন নিয়ে নির্বাচিত পৌরসভার সংরক্ষিত আসনের কাউন্সিলর নির্বাচিত হয়েছেন। তিনি নাশকতাসহ সরকারবিরোধী প্রচারণার মামলায় পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার ছিলেন। জামিনে মুক্তি পেয়ে তিনি আওয়ামী লীগে যোগ দেন। সাইদুরের মতো তাঁকেও মূল্যায়ন করা হয় পৌরসভার প্যানেল মেয়রের পদ দিয়ে।

জানা যায়, সাইদুর রহমান যেদিন ভারপ্রাপ্ত মেয়রের দায়িত্ব গ্রহণ করেন সেদিনই তাঁর ভাই আবদুল হান্নান দলবল নিয়ে শহরের নামোশংকরবাটিতে চাল ব্যবসায়ী তরিকুল ইসলামের গুদামে হামলা চালান। এ ঘটনায় গত ১৬ মার্চ চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর মডেল থানায় একটি মামলা করেন তরিকুল ইসলাম। তিনি মামলার এজাহারে অভিযোগ করেন, আবদুল হান্নান ২০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেন। চাঁদা না দেওয়ায় তাঁর প্রতিষ্ঠানে হামলা চালানো হয়।

জেলার সঙ্গে উপজেলা কমিটির দ্বন্দ্ব চরমে : ওদুদের একক আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টায় আওয়ামী লীগের জেলা কমিটির সঙ্গে একাধিক উপজেলা কমিটির তীব্র কোন্দল দেখা দিয়েছে। জেলা কমিটির সঙ্গে শিবগঞ্জ উপজেলা কমিটির দ্বন্দ্ব চরমে উঠেছে। ইতিমধ্যে উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সংসদ সদস্য গোলাম রাব্বানী এবং সাধারণ সম্পাদক আতাউর রহমানকে দল থেকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নিয়ে তা অনুমোদনের জন্য কেন্দ্রীয় কমিটির কাছে পাঠিয়েছে জেলা কমিটি।

জানা যায়, গত পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে উপজেলা কমিটির মতামতকে গুরুত্ব না দিয়ে নিজেদের পছন্দমতো প্রার্থীর নাম প্রস্তাব করে কেন্দ্রে পাঠায় জেলা কমিটি। এতে ক্ষুব্ধ হন উপজেলার নেতারা। প্রার্থী মনোনয়নে জেলার অন্যায় আধিপত্যের বিরোধিতা করে বিদ্রোহী প্রার্থী দেন উপজেলার নেতারা। পৌরসভা নির্বাচনে বিপুল ভোটে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী জয়ী হন আর নৌকার প্রার্থীর জামানত বাজেয়াপ্ত হয়। ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে উপজেলার ১৪ ইউনিয়নের মাত্র দুটিতে নৌকা প্রতীকের প্রার্থী জয়লাভ করে আর বিদ্রোহী প্রার্থীরা জয় পান পাঁচটিতে। এ ঘটনার পর শিবগঞ্জ উপজেলা কমিটি সঙ্গে জেলা কমিটির দ্বন্দ্ব আরো তীব্রতর হয়।

জানতে চাইলে শিবগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আতাউর রহমান বলেন, ‘জেলা আওয়ামী লীগ খেয়ালখুশি মতো সংগঠন চালাচ্ছে। কেন্দ্রীয় নির্দেশনা ও গঠনতন্ত্রের তোয়াক্কা না করেই তারা সংগঠন পরিচালনা করছে। স্থানীয় সরকার নির্বাচনে জনপ্রিয়তা ও যোগ্যতাকে বিচার না করে মনোনয়ন বাণিজ্য করার কারণেই নৌকার প্রার্থীদের এমন ভরাডুবি ঘটেছে। ’

অনুমোদন আটকে আছে পৌর কমিটির : জেলা আওয়ামী লীগের সূত্রগুলো জানায়, সংগঠনের কোনো শাখা কমিটিতে নিজের অনুসারী বিএনপি-জামায়াত থেকে আসা নেতাকর্মীদের রাখতে না পারলে সে কমিটির অনুমোদন মেলে না। নিজের ইচ্ছেমতো না হওয়ায় সম্মেলনের পর এক বছর আট মাস পেরিয়ে গেলেও পৌর আওয়ামী লীগের কমিটি অনুমোদন আটকে রেখেছেন জেলার সাধারণ সম্পাদক আবদুল ওদুদ। ২০১৪ সালের ২০ নভেম্বর শহরের শহীদ সাটু হলে ব্যাপক আয়োজনের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠিত হয় চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌর আওয়ামী লীগের সম্মেলন। আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী দীপু মনির উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত এ সম্মেলনে কাউন্সিলরদের গোপন ভোটে সভাপতি নির্বাচিত হন অধ্যাপক শরিফুল আলম এবং সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন অ্যাডভোকেট মিজানুর রহমান। পরে এ দুই নেতা আওয়ামী লীগের ত্যাগী নেতাকর্মীদের নিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ কমিটি জেলার অনুমোদনের জন্য জমা দেন। কিন্তু গত দেড় বছরেও এ কমিটি অনুমোদন পায়নি।

কমিটি অনুমোদন না পাওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে পৌর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মিজানুর রহমান মিজান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক সম্পূর্ণ অগঠনতান্ত্রিকভাবে কমিটি আটকে রেখেছেন, যা সংগঠনকে স্থবির করেছে। জেলা সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের মনমতো লোকজন কমিটিতে স্থান না পাওয়ায় কমিটি অনুমোদন দিচ্ছেন না। ’

আছে জমি দখলের অভিযোগ : আবদুল ওদুদের বিরুদ্ধে চাঁপাইনবাবগঞ্জ শহরে জায়গা দখলের অভিযোগও রয়েছে। জানা যায়, জেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক বাবুল ইসলামের পরিবারের সদস্যরা স্বাধীনতার আগে থেকেই আওয়ামী লীগের সঙ্গে যুক্ত। বাবুলদের মালিকানাধীন শহরের বিখ্যাত কলেজ লন্ড্রিতে বঙ্গবন্ধুর ছবি থাকায় মুক্তিযুদ্ধের সময় তা বোমা মেরে উড়িয়ে দেওয়া হয়। ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু মারা যাওয়ার পরে কলেজ লন্ড্রিতে বঙ্গবন্ধুর ছবি থাকায় নানা নির্যাতনের শিকার হয় বাবুলদের পরিবার। সেই বাবুলের বাবার একটি জমি দখলে নিয়েছেন সংসদ সদস্য আবদুল ওদুদ।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, শহরের ২ নম্বর ওয়ার্ডে ওয়ালটন মোড় এলাকায় অবস্থিত জায়গাটি নিয়ে আদালতে মামলা চলার সুযোগে আবদুল ওদুদ তাঁর ব্যক্তিগত সহকারী তৌফিকুর রহমান খান বেদানাকে দিয়ে তা দখলে নেন। এরপর আদালতে মামলা নিষ্পত্তি হয়ে গেলেও জায়গার দখল ছাড়ছেন না সংসদ সদস্য। বাবুল ইসলামরা জমিটির দখল ছেড়ে দেওয়ার জন্য বারবার ধরণা দিলেও কোনো কাজ হচ্ছে না। উল্টো সংসদ সদস্য তাঁর ঘনিষ্ঠ লোকদের দিয়ে জমিটি বিক্রি করে দেওয়ার জন্য বাবুল ইসলামদের চাপ দিচ্ছেন।

আবদুল ওদুদের বক্তব্য : চাঁপাইনবাবগঞ্জে আওয়ামী লীগকে শক্তিশালী করতেই অন্য দল থেকে নেতাকর্মীদের ভিড়িয়েছেন বলে দাবি করেছেন আবদুল ওদুদ। জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমি চাঁপাইনবাবগঞ্জে আওয়ামী লীগের ভোট বাড়ানোর জন্য কাজ করছি। আওয়ামী লীগের পুরনো নেতাকর্মীরা আমার সঙ্গে রয়েছেন হাতে গোনা কয়েকজন ছাড়া। ওরা আওয়ামী লীগে থাকলে বরং আওয়ামী লীগের ভোট নষ্ট হবে। ’

আবদুল ওদুদ বলেন, ‘পুরনো ও নতুন আওয়ামী লীগ বলে কিছুই নেই। আওয়ামী লীগ তারাই যারা নৌকায় ভোট দেয়। যারা নিজেদের পুরনো বলে দাবি করে তারা আওয়ামী লীগ করে বলে মনে হয় না। কারণ আওয়ামী লীগ করলে দলের সম্মান নষ্ট করত না, চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসা করত না। ’

শিবগঞ্জ উপজেলা কমিটি প্রসঙ্গে আবদুল ওদুদ বলেন, ‘ওদের সমস্যা হলো ওরা কাউকেই মানতে চায় না। দল করতে হলে নিয়ম মানতে হবে। ওরা জেলাকে না মানলে কিভাবে হবে? ওরা জেলাকে মানে না বলেই সমস্যা হয়েছে। ’

চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌর কমিটির অনুমোদন আটকে থাকা প্রসঙ্গে আবদুল ওদুদ বলেন, ‘পৌর কমিটির সভাপতি স্থানীয় সরকার নির্বাচনে নৌকার বিরুদ্ধে ভোট করেছেন। ফলে তাঁকে বহিষ্কারের সুপারিশ কেন্দ্রে পাঠানো হয়েছে। এ জন্য কমিটির অনুমোদন আটকে আছে। ’

বাবুল ইসলামদের জমি দখলের অভিযোগ প্রসঙ্গে আবদুল ওদুদ বলেন, ‘ওদের জায়গাটি নিয়ে মামলা ছিল। তারা আদালতের রায় পেয়েছে বলে শুনেছি। এখন জমি বুঝিয়ে দেওয়ার দায়িত্ব জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের। ওরা (বাবুল ইসলাম) আমার কাছে এসেছে কয়েকবার। কিন্তু আমি তো জমি বুঝিয়ে দিতে পারব না। এটা জেলা প্রশাসকের কাজ। ’


মন্তব্য