kalerkantho

শুক্রবার । ৯ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৮ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


জঙ্গিবাদে দীক্ষা বাবার হাতে

রেজোয়ান বিশ্বাস   

২০ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



জঙ্গিবাদে দীক্ষা বাবার হাতে

সাত বছর বয়সেই বাবা তানভীর কাদরীর হাত ধরে জঙ্গি কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত হয়েছিল তাহরীম কাদরী ওরফে রাসেল। তার বয়স এখন সাড়ে ১৪ বছর।

আর ছয় মাস পর ১৫ বছর বয়স হলেই রাসেল নব্য জেএমবির সামরিক শাখায় যোগ দিতে চেয়েছিল। শখ ছিল অস্ত্র চালানোর প্রশিক্ষণ নেওয়ার। ঢাকায় তার সঙ্গে জেএমবির শীর্ষ নেতাদের অনেকের সঙ্গে দেখা হয়েছে। এ তালিকায় আছে সাম্প্রতিক সময়ে অভিযানে নিহত নব্য জেএমবির সমন্বয়ক তামিম চৌধুরী, মেজর (অব.) মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম জাহিদ ওরফে মুরাদ চৌধুরী ছাড়াও নুরুল ইসলাম মারজানও (পালিয়ে থাকা শীর্ষ জঙ্গি)। জঙ্গি কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ততার অভিযোগে গ্রেপ্তার কিশোর তাহরীম কাদরী ওরফে রাসেল তিন দিনের রিমান্ডের প্রথম দিন গোয়েন্দা পুলিশকে এসব তথ্য দিয়েছে বলে জানা গেছে।

ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার মনিরুল ইসলাম জানিয়েছেন, কিশোর রাসেলকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ চলছে। এরই মধ্যে সে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছে।

রাসেলকে জিজ্ঞাসাবাদকারী ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের এক কর্মকর্তা বলেন, রিমান্ডে সে অকপটে তার জঙ্গিবাদে সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করছে। বাবার মৃত্যু আর মায়ের আহত হওয়া নিয়ে তার মধ্যে এখন পর্যন্ত কোনো ধরনের অনুশোচনা দেখা যায়নি। রাসেল মনে করে, ইসলাম কায়েম করতেই তার মা-বাবার এমন পরিণতি। পরিবার তাকে সেই শিক্ষাই দিয়েছে।   বাবা তানভীর কাদরী তাকে সাত বছর বয়স থেকেই জিহাদের জন্য তালিম দিত। জেএমবির কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করেছিল বাবাই। বাবার মাধ্যমে তার সঙ্গে তামিম চৌধুরীর পরিচয় হয়। আর পরিচয়ের সূত্র ধরে তামিম চৌধুরীও তাকে নানা আদেশ উপদেশ দিয়েছে। তার সঙ্গে শীর্ষ জঙ্গি নেতা মারজানের বেশ কয়েকবার দেখা হয়েছে। রাসেল জিজ্ঞাসাবাদে বলেছে, মারজান একবার পাবনা এলাকায়  ইসলামবিরোধী (কথিত) একজনকে হত্যা করতে গিয়েছিল। সে সময় তার কাছে থাকা পিস্তল থেকে গুলি বের না হওয়ায় সেই অপারেশন সফল হয়নি। এর পর থেকে মারজান অপারেশনে চাপাতি ব্যবহার করতেই পছন্দ করত। তাকেও চাপাতি চালনা শিখিয়েছিল মারজান।

রিমান্ডে গোয়েন্দাদের অপর এক প্রশ্নের জবাবে রাসেল জানিয়েছে, আজিমপুরের বাসায় থাকার আগে তারা উত্তরা, মিরপুর, শ্যামলী ও বারিধারা এলাকায় থেকেছে। এসব বাসায় নিয়মিত তামিম, মারজান, মেজর জাহিদসহ নব্য জেএমবির আরো অনেক শীর্ষ পর্যায়ের নেতার যাতায়াত ছিল। তবে অন্যদের অস্ত্র চালনার ট্রেনিং থাকলেও তার বাবা তানভীর কাদরীর অস্ত্র চালনার প্রশিক্ষণ ছিল না। এ কারণে তাদের আজিমপুরের বাসায় পুলিশ অভিযানের সময় তার বাবা মারা যায়—স্বীকারোক্তিতে এমন কথাও বলেছে রাসেল। আজিমপুরে অভিযানের সময় পুলিশের ওপর মরিচের গুঁড়া দিয়ে কেন হামলা চালিয়েছিল জানতে চাইলে রাসেল বলে, এ ছাড়া তার কাছে কোনো অস্ত্র ছিল না। বাঁচার জন্য সে হাতের কাছে যা পেয়েছে তাই ব্যবহার করেছে। কারণ সে বেঁচে থাকতে চেয়েছিল। তার মা ও  তার এক যমজ ভাইসহ পরিবারের সবাই নব্য জেএমবির সদস্য বলে সে জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছে। রাসেল বলেছে, নব্য জেএমবির খরচ চালাতে টাকা দিত তামিম চৌধুরী। জিহাদের জন্য মা-বাবা ও যমজ ভাইয়ের সঙ্গে সে সিরিয়ায় যাওয়ার চিন্তা করেছিল বলেও জানিয়েছে।  

গত ১০ সেপ্টেম্বর (শনিবার) রাতে রাজধানীর লালবাগ থানাধীন আজিমপুরের ২০৯/৫ নম্বর পিলখানা রোডের একটি ছয়তলা আবাসিক ভবনের দ্বিতীয় তলায় অভিযান চালায় ঢাকা মহানগর পুলিশের কাউন্টার টেররিজম ইউনিট। পরে ওই বাসা থেকে তানভীর কাদরীর লাশ উদ্ধার করা হয়। অভিযানের সময় আহত হয় তিন নারী জঙ্গি। ওই বাসা থেকেই কিশোর রাসেলকে গ্রেপ্তার করে গোয়েন্দা পুলিশ। এরপর তাকে কিশোর সংশোধনাগারে রাখা হয়। এরপর গত রবিবার তাহরীম কাদরী ওরফে রাসেলকে (১৪) তিন দিনের রিমান্ডে নেওয়ার আদেশ দিয়েছেন আদালত। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা গোয়েন্দা পুলিশের পরিদর্শক আহসানুল হক গত রবিবার ১০ দিনের রিমান্ডের আবেদন করে তাকে আদালতে পাঠান। শুনানি শেষে ঢাকার অতিরিক্ত দায়রা জজ আদালতের বিচারক রুহুল আমিন তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। গতকাল ছিল রিমান্ডের প্রথম দিন।

ঢাকা মহানগর পুলিশের কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের উপকমিশনার (ডিসি) মহিবুল ইসলাম গতকাল কালের কণ্ঠকে বলেন, রাসেল কিশোর হলেও একজন অপরাধী। আজিমপুরে জঙ্গি আস্তানায় অভিযানের সময় রাসেল পুলিশের ওপর হামলা চালিয়েছিল। তাকে কিভাবে মগজ ধোলাই করে জঙ্গি দলে ভেড়ানো হলো, তার মা-বাবা ছাড়াও পরিবারের আরো কে কে জঙ্গিবাদে সম্পৃক্ত, তার মতো আরো কোনো কিশোর এ ধরনের অপরাধে জড়িত রয়েছে কি না, সেসব তথ্য মামলার তদন্তে কাজে লাগবে।  

গোয়েন্দা সূত্র মতে, রাসেলকে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে গ্রেপ্তার দেখিয়ে রিমান্ডের আবেদন করে গোয়েন্দা পুলিশ। এ ঘটনায় গত রবিবার রাতে পুলিশের কাউন্টার টেররিজম ও ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিটের (সিটিটিসি) এসআই দেলোয়ার হোসেন বাদী হয়ে লালবাগ থানায় একটি মামলা করেন। মামলার এজাহারে আসামিদের বিরুদ্ধে আজিমপুরের একটি বাসাকে আস্তানা হিসেবে ব্যবহার করে জঙ্গি সংগঠনের কর্মকাণ্ড পরিচালনা এবং পুলিশের ওপর হামলার অভিযোগ আনা হয়েছে। তানভীরের লাশ ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ মর্গের মরচুয়ারিতে রয়েছে। আর তানভীরের স্ত্রী আহত ফাতেমা ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছে। ওই জঙ্গি আস্তানায় অভিযানের সময় গোয়েন্দা পুলিশ আট বছর বয়সী জুনায়ারা ওরফে পিংকি ও এক বছর বয়সী সাবিহা জামান নামের দুই শিশুকে উদ্ধার করে ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টারে পাঠায়। তবে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ওই শিশুরা এখন তাদের স্বজনদের কাছে রয়েছে।


মন্তব্য