kalerkantho

রবিবার। ৪ ডিসেম্বর ২০১৬। ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৩ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


মা-বাবা খুন অসহায় সুপ্তি সমাপ্তি

অভিযোগের তীর ৫ বখাটের দিকে

রৌমারী (কুড়িগ্রাম) প্রতিনিধি   

২০ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



মা-বাবা খুন অসহায় সুপ্তি সমাপ্তি

মাত্র এক দিন আগেই মা-বাবার ভালোবাসা জড়িয়ে রেখেছিল শিশু দুটিকে। ঘাতকের কালো হাত সুপ্তি আর সমাপ্তিকে করে দিয়েছে অনাথ। ছবি : কালের কণ্ঠ

কুড়িগ্রামের রৌমারীতে এক দম্পতির লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। গত রবিবার গভীর রাতে উপজেলার বাইটকামারী গ্রামে ঘরে ঢুকে স্বামীকে কুপিয়ে এবং স্ত্রীকে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়েছে বলে পুলিশ জানিয়েছে।

এ ঘটনায় পরিবারের সদস্যরা স্থানীয় পাঁচ বখাটেকে সন্দেহ করছে। ঘটনার পর থেকে তাদের এলাকায় দেখা যায়নি।

নিহতরা হলেন গোলাম হোসেন (৩০) ও শিল্পী খাতুন (২৪)। গোলাম হোসেন বাইটকামারী গ্রামের মৃত আব্দুর রাজ্জাকের ছেলে।

গতকাল সোমবার বসতঘর থেকে লাশ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য কুড়িগ্রাম সদর হাসপাতাল মর্গে পাঠায় পুলিশ।

রৌমারী থানার ওসি এ বি এম সাজেদুল ইসলাম জানান, স্ত্রীকে শ্বাসরোধে এবং স্বামীকে কুপিয়ে হত্যা  করা হয়েছে। লাশের সুরতহাল প্রতিবেদনে সেটাই বোঝা যাচ্ছে। শেষ রাতের দিকে দুর্বৃত্তরা ওই নির্মম ঘটনা ঘটিয়েছে বলে তিনি মনে করছেন।

এলাকাবাসী জানায়, গোলাম হোসেন একসময় পাবনায় তাঁতকলে কাজ করতেন। তবে সম্প্রতি বাড়ি ফিরে ছোটখাটো ব্যবসা শুরু করেন তিনি। আট বছর আগে গোলাম হোসেন ও শিল্পী খাতুনের বিয়ে হয়। সুপ্তি খাতুন (৭) ও সমাপ্তি খাতুন (৫) নামের দুটি মেয়ে রয়েছে তাঁদের। ঘটনার সময় সুপ্তি তার নানার বাড়িতে ছিল। ছোট মেয়ে সমাপ্তির সামনেই তার মা-বাবাকে হত্যা করা হয়। শিশুটি আতঙ্কে কিছু বলতে পারছে না।

গোলাম হোসেনের মা বাছাতন বেওয়া ও শিল্পী খাতুনের মা মিলন মালা অভিযোগ করে সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, গোলাম হোসেন পাবনায় তাঁতকলে কাজ করার সময় দুই মেয়ে নিয়ে শিল্পী বাড়িতেই থাকতেন। এলাকার সানা উল্লাহ (২৬), আব্দুল আউয়াল (২৮), মাজম আলী (২৭), শামসুল হক (২৭) ও কামরুল ইসলাম (২৫) দীর্ঘদিন ধরে শিল্পীকে উত্ত্যক্ত করে আসছিল। আড়াই মাস আগে শিল্পী খাতুন কুড়িগ্রাম পুলিশ সুপারের কাছে অভিযোগ করেন।

বাছাতন ও মিলন মালা বলেন, পুলিশ ঘটনা তদন্ত করতে গিয়ে স্থানীয়ভাবে মীমাংসার উদ্যোগ নেয়। এ নিয়ে স্থানীয় বন্দবেড় ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ইউনিয়ন শাখা আওয়ামী লীগের সভাপতি উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার আব্দুল কাদের সালিস বৈঠকে ওই বখাটেদের মারধর করেছিলেন। এতে বখাটেরা আরো ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। এর জের ধরে গোলাম হোসেন ও শিল্পীকে খুন করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তাঁরা।

কুড়িগ্রাম অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মিনহাজুল ইসলাম ও সহকারী পুলিশ সুপার মনিরুজ্জামান ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন।

পুলিশ কর্মকর্তা মিনহাজুল ইসলাম বলেন, ‘খুনিদের যেকোনো মূল্যে গ্রেপ্তার করা হবে। আপনারা ধৈর্য ধরুন। ’

সুপ্তি ও সমাপ্তির কী হবে :  মা-বাবাকে নির্মমভাবে খুন করার ঘটনা ঘটেছে ছোট মেয়ে সমাপ্তির চোখের সামনে। ঘটনার পর থেকে সে কথা বলতে পারছে না। কেউ কিছু জানতে চাইলে শুধু ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকছে, কান্না করতেও ভুলে গেছে যেন। মাঝে মাঝে সে ভয়ে আঁতকে উঠছে, জড়িয়ে ধরছে তার বোন আর নানিকে। শিশুটি কারো কাছেই যাচ্ছে না। কাঁদছে তাদের স্বজনরা, কাঁদছে গ্রামবাসীও। যারাই অসহায় অবুঝ দুই বোনকে দেখছে, চোখের পানি ধরে রাখতে পারছে না।

ঘটনার সময় বড় মেয়ে সুপ্তি নানির বাড়িতে ছিল। বাড়ি ফিরে মা-বাবার রক্তাক্ত নিথর দেহ দেখে তার অসহায় জিজ্ঞাসা, ‘মা-বাবার কী হয়েছে? তারা তো কথা বলে না? গায়ে রক্ত ক্যা? তোমরা মা-বাবাকে কই নিয়া যাও, সবাই কান্দে ক্যা?’

সুপ্তির এমন প্রশ্নের মুখে অসহায় তার দাদি ও নানি। মা-বাবার লাশ বাড়ি থেকে নিয়ে যাওয়ার সময় সুপ্তি জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়ে। তাকে কোনোভাবেই সরানো যাচ্ছিল না।

গোলাম হোসেন ও শিল্পী দম্পতির অবুঝ দুই সন্তান সুপ্তি ও সমাপ্তির ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। সুপ্তি তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ছে। সমাপ্তিও স্কুলে যায়।

নানি মিলন মালা বলেন, ‘এহন দুই মেয়ের কী হবে? এর সঙ্গে যদি দুই বোনরেও মাইরা ফেলাইত তাহলে এত চিন্তা হতো না। মা-বাবা হারানো ছোট ছোট দুই বোনের মুখের দিক তাকাইলে স্থির থাকবার পারি না। ’

দাদি বাছাতন বেওয়া বলেন, ‘আমরা বিপদে পড়ছি বাচ্চা দুইডাক নিয়া। তারা তো এহন এতিম। তাগরে থাকা-খাওয়া, পড়াশোনা এহন দেখবে কে? এ দুনিয়াত বাবা-মা ছাড়া সন্তানরা মানুষ হবো কিভাবে। তা ছাড়া তাদের সহায়-সম্পদ বলতে কিছু নেই। স্বজনরা আর কয় দিন দেখবে! কিছুদিন যাওয়ার পর সবাই সব ভুলে যাবে। তহন তো বাচ্চা দুইডা অসহায় হয়ে পড়বে। ’


মন্তব্য