kalerkantho

সোমবার । ৫ ডিসেম্বর ২০১৬। ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৪ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


বেনামি অ্যাকাউন্টে লেনদেন জঙ্গিদের

আবুল কাশেম   

২০ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



বেনামি অ্যাকাউন্টে লেনদেন জঙ্গিদের

কিশোরগঞ্জ পৌরসভার তারাপাশা এলাকার স্টেশন রোডের বাসিন্দা নাজমুল হোসেন মৃদুল। ১৯৮৫ সালের ১০ ডিসেম্বর জন্ম নেওয়া নাজমুলের বাবা নুরুল হুদা, মা খোদেজা বেগম।

তার জাতীয় পরিচয়পত্রের নম্বর ১৯৮৫৪৮২৪৯০৭৩৩৮ ৯৫১। কিন্তু সে নরসিংদীর শিবপুর উপজেলার মানিকদী গ্রামের অখিল সরকার নামে ভুয়া জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) দিয়ে অ্যাকাউন্ট খুলে বিভিন্ন ব্যাংক থেকে বড় অঙ্কের টাকা আত্মসাৎ ও লেনদেন করেছে। একটি গোয়েন্দা সংস্থা এই তথ্য উদ্ঘাটন করার পর মৃদুলকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী পর্যবেক্ষণে রেখেছে।

এ রকম ভুয়া জাতীয় পরিচয়পত্র ব্যবহার করে বিভিন্ন ব্যাংকের অসংখ্য অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে অবৈধ অর্থ লেনদেন হচ্ছে জানিয়ে অর্থ মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ ব্যাংককে প্রতিবেদন দিয়েছে একটি গোয়েন্দা সংস্থা। তারা বলেছে, অবৈধ লেনদেন, অর্থপাচার এবং জঙ্গি ও সন্ত্রাসীদের অর্থ জোগান বন্ধে আরো কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য জাতীয় পরিচয়পত্র অনলাইন ভেরিফিকেশন বাধ্যতামূলক করা জরুরি হয়ে পড়েছে।

ভুয়া জাতীয় পরিচয়পত্র ব্যবহার করে খোলা ব্যাংক অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে জঙ্গিরা বিদেশ থেকে রেমিট্যান্স সংগ্রহ করছে। সাধারণত প্রবাসীরা ওয়েস্টার্ন ইউনিয়ন মানি এক্সচেঞ্জ, বিএ এক্সপ্রেস, আরআইএ, মানিগ্রামসহ বিভিন্ন এজেন্টের মাধ্যমে রেমিট্যান্স পাঠান। তা সত্ত্বেও জঙ্গি অর্থায়ন বন্ধে পাঠানো রেমিট্যান্সের উৎস ও গন্তব্যস্থল সঠিকভাবে শনাক্তকরণ জরুরি হয়ে পড়েছে। জঙ্গি ও সন্ত্রাসীরা টাকার গন্তব্যস্থল গোপন রাখতে তৎপর থাকে। সে জন্য তারা নিরীহ অপরিচিত মানুষের জাতীয় পরিচয়পত্রের নম্বর ব্যবহারের মাধ্যমে তাদের অজ্ঞাতে রেমিট্যান্স তোলার একটি পদ্ধতি অবলম্বন করছে। তাই পাঠানো অর্থের সুবিধাভোগীর পরিচয় সম্পর্কে নিশ্চিত হতে অর্থ লেনদেনের ক্ষেত্রে জাতীয় পরিচয়পত্র যাচাই করা উচিত।

গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনটি অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব মো. ইউনুসুর রহমান, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. ফজলে কবির, প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তাবিষয়ক উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) তারিক আহমেদ সিদ্দিকী, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব মো. আবুল কালাম আজাদ এবং বাংলাদেশ ফিন্যানশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) মহাব্যবস্থাপক দেবপ্রসাদ দেবনাথের কাছে পাঠানো হয়েছে।

বিএফআইইউয়ের মহাব্যবস্থাপক দেবপ্রসাদ দেবনাথ কালের কণ্ঠকে বলেন, ব্যাংকিং পরিষেবায় জাতীয় পরিচয়পত্র যাচাই বাধ্যতামূলক করার সুপারিশসংবলিত প্রতিবেদন একটি গোয়েন্দা সংস্থার কাছ থেকে পাওয়া গেছে। তবে ব্যাংকগুলোকে এ ধরনের নির্দেশনা দিতে হলে তা বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি বিভাগ (বিআরপিডি) থেকে জারি করতে হবে। তবে সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদে অর্থায়ন ও অর্থপাচার রোধ এবং ঝুঁকির নিরিখে বিএফআইইউ জাতীয় পরিচয়পত্র যাচাই করার পরামর্শ দিতে পারে।

দেবপ্রসাদ দেবনাথ বলেন, অনেকেই জাতীয় পরিচয়পত্র ছাড়াই জন্ম সনদ, নাগরিকত্ব সনদ বা অন্যান্য তথ্য দিয়ে ব্যাংকে অ্যাকাউন্ট খোলে। গ্রাহকের দেওয়া এ ধরনের সব তথ্য যাচাই করতে হবে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের সুবিধার জন্যই। এ কারণে ‘আপনার গ্রাহককে জানুন—কেওয়াইসি’ ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিআরপিডির মহাব্যবস্থাপক আবু ফারাহ মো. নাসের বলেন, এ-সংক্রান্ত কোনো সুপারিশ আমি এখনো পাইনি।

বিভিন্ন রেমিট্যান্স এজেন্টের মাধ্যমে পাওয়া অর্থ বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট ব্যাংক থেকে উত্তোলনের সময় সাধারণত জাতীয় পরিচয়পত্রের কপি জমা দিতে হয়। এ ছাড়া বিদেশ থেকে দেওয়া সিকিউরিটি কোড জানাতে হয়। টাকার গন্তব্যস্থল গোপন রাখার জন্য জঙ্গি বা দুষ্কৃতকারীরা অন্য কোনো নিরীহ ব্যক্তির জাতীয় পরিচয়পত্র নকল করে তা জমা দেয়। অন্যদিকে জঙ্গি বা দুষ্কৃতকারীর কাছে বিদেশ থেকে প্রেরক সরাসরি সিকিউরিটি কোড ওই ই-মেইল বা এসএমএসের মাধ্যমে পাঠিয়ে থাকে।

ফলে টাকা গ্রহণকালে যখন কোনো গ্রাহক তার জাতীয় পরিচয়পত্র (অন্য ব্যক্তির নামে তৈরি নকল) এবং সঠিক সিকিউরিটি কোড উপস্থাপন করে, তখন সংশ্লিষ্ট ব্যাংকটি বিনা দ্বিধায় অর্থ দিয়ে দেয়। ফলে অর্থের প্রকৃত গন্তব্যস্থল গোপন রাখা সম্ভব হয়।

ব্যাংক কর্মকর্তারা জানান, জাতীয় পরিচয়পত্রের সঠিকতা যাচাইয়ে প্রায় সব ব্যাংকের কাছেই নির্বাচন কমিশন থেকে একটি সংযোগ প্রদান করা হয়েছে। কিন্তু ওই সংযোগ ব্যাংকগুলোর প্রধান শাখা কিংবা দু-একটি নির্ধারিত শাখায় সীমাবদ্ধ। ফলে প্রত্যন্ত অঞ্চলের শাখায় জাতীয় পরিচয়পত্র যাচাই করার এই পদ্ধতি সহজলভ্য নয়।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক যাতে বাংলাদেশের সব ব্যাংক শাখায় অনলাইনে জাতীয় পরিচয়পত্র যাচাইয়ের পদ্ধতি চালু করার বিষয়ে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেয়, সে সুপারিশ করে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘বর্তমানে যেহেতু ন্যাশনাল ডাটাবেইসে (জাতীয় পরিচয়পত্র এবং মোবাইল কম্পানিগুলোর মাধ্যমে) দেশের সকল প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিকের বায়োমেট্রিক তথ্য সংরক্ষিত রয়েছে, তাই এর উত্কৃষ্ট সুফল পাওয়ার জন্য সকল ব্যাংকে জাতীয় পরিচয়পত্র ভেরিফিকেশনের পাশাপাশি বায়োমেট্রিক ভেরিফিকেশন (ফিঙ্গারপ্রিন্ট স্ক্যানারের মাধ্যমে) করার বিষয়টি পর্যায়ক্রমে বাধ্যতামূলক করা যেতে পারে। ’


মন্তব্য