kalerkantho

শনিবার । ৩ ডিসেম্বর ২০১৬। ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ২ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


কাশ্মীরে ভারতীয় ঘাঁটিতে হামলা, ১৭ সেনা নিহত

পাল্টা গুলিতে নিহত ৪ হামলাকারী

কালের কণ্ঠ ডেস্ক   

১৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



কাশ্মীরে ভারতীয় ঘাঁটিতে হামলা, ১৭ সেনা নিহত

সন্ত্রাসী হামলার পর ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের উরিতে গতকাল ভোরে সেনাঘাঁটিতে ধোঁয়ার কুণ্ডলী। ছবি : ওয়েবসাইট

ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের উরিতে ভারতীয় সেনাবাহিনীর ঘাঁটিতে সন্ত্রাসী হামলায় ১৭ সেনা সদস্য নিহত হয়েছেন। সেনাদের পাল্টা গুলিতে মারা গেছে চার হামলাকারীও।

আহত হয়েছেন অন্তত ৩৫ সেনা। গতকাল রবিবার ভোর থেকে ছয় ঘণ্টা থেমে থেমে গোলাগুলি চলে উভয় পক্ষের মধ্যে। এখনো কোনো সন্ত্রাসী গ্রুপ এ হামলার দায় স্বীকার না করলেও পাকিস্তানভিত্তিক জঙ্গি সংগঠন জয়েশ-ই-মোহাম্মদকে সন্দেহ করছে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ।

এ ঘটনাকে ‘কাপুরুষোচিত হামলা’ উল্লেখ করে এর তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। এক টুইট বার্তায় তিনি বলেন, ‘হামলায় জড়িতদের কেউ রেহাই পাবে না। উপযুক্ত জবাব দেওয়া হবে। ’ এ ঘটনার নেপথ্যে পাকিস্তানের হাত রয়েছে বলে ইঙ্গিত করে ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিং বলেছেন, হামলাকারীরা যে উচ্চ প্রশিক্ষিত তার আভাস মিলেছে।

ভারতীয় সেনাবাহিনীর একজন মুখপাত্র জানান, রবিবার ভোর ৪টার দিকে ভারত-পাকিস্তান নিয়ন্ত্রণ রেখার কাছে কাশ্মীরের উরি এলাকায় সেনাঘাঁটিতে অনুপ্রবেশ করে হামলা চালায় চার আত্মঘাতী। তারা গুলির পাশাপাশি গ্রেনেডের বিস্ফোরণও ঘটায়। সেনাদের সঙ্গে ছয় ঘণ্টা ধরে চলা লড়াইয়ে তারা (হামলাকারী) সবাই নিহত হয়েছে।

সেনা সূত্রগুলো জানায়, সেনাঘাঁটির সীমানা পিলারের তার কেটে হামলাকারীরা ভেতরে প্রবেশ করে। ওই সময় সেনারা তাঁবুতে ঘুমাচ্ছিলেন। গ্রেনেড আক্রমণে তাঁদের তাঁবুতে আগুন ধরে গেলে হতাহতের ঘটনা ঘটে। হামলায় গুলিবিদ্ধ ৩০ সেনাকে হেলিকপ্টারযোগে ১০০ কিলোমিটার দূরে শ্রীনগরের সেনা হাসপাতালে এনে ভর্তি করা হয়েছে। সন্দেহজনক জায়গাগুলোতে তল্লাশি চলছে। প্রকাশিত ভিডিওতে শ্রীনগর-মুজাফ্ফারাবাদ মহাসড়কের পাশের ওই ঘাঁটিটি থেকে ধোঁয়া উঠতে দেখা গেছে। কয়েকটি সেনা ব্যারাকে আগুন ধরে গেছে এবং সেখান থেকে বড় ধরনের বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায় বলে জানা গেছে।

ইতিমধ্যেই ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন প্রতিরক্ষামন্ত্রী মনোহর পারিকর ও ভারতের সেনাপ্রধান জেনারেল দলবির সিং।

ঘটনার পরপরই টুইট বার্তায় ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিংহ তাঁর রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র সফর বাতিলের ঘোষণা দেন। গতকাল এই সফর শুরু হওয়ার কথা ছিল। বিকেলে একটি জরুরি বৈঠকও ডাকেন তিনি। এক টুইটে তিনি বলেন, হামলাকারীরা যে উচ্চ প্রশিক্ষিত ছিল এবং তাদের সঙ্গে বিশেষ ধরনের যন্ত্রপাতি ছিল, তার সুনির্দিষ্ট আভাস পাওয়া গেছে। আরেক টুইট বার্তায় রাজনাথ সিং বলেন, এ ঘটনায় তিনি ক্ষুব্ধ। পাকিস্তানকে ‘একটি সন্ত্রাসবাদী রাষ্ট্র’ আখ্যায়িত করে তিনি বলেন, তারা (পাকিস্তান) এখনো সন্ত্রাসবাদকে অব্যাহত ও প্রত্যক্ষ সমর্থন দিয়ে চলেছে।

তবে পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র নাফিস জাকারিয়া রয়টার্সকে বলেন, ‘কোনো ধরনের তদন্ত ছাড়া পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ভারতের এমন তাৎক্ষণিক অভিযোগ আমরা প্রত্যাখ্যান করছি। ’

প্রাথমিক তদন্তের পর দায়িত্বশীল সেনা কর্মকর্তা ডিরেক্টর জেনারেল অব মিলিটারি অপারেশনস (ডিজিএমও) লেফটেন্যান্ট জেনারেল রণবীর সিং বলেন, ‘আমাদের প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, হামলার পেছনে পাকিস্তানের জঙ্গি সংগঠন জয়েশ-ই-মোহাম্মদের হাত রয়েছে। চারটি একে-৪৭, চারটি আন্ডার ব্যারেল গ্রেনেড লঞ্চার এবং অন্যান্য যুদ্ধ সরঞ্জাম ছিল তাদের কাছে, যা চার নিহত সন্ত্রাসীর কাছ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে। সব সমরাস্ত্রেই পাকিস্তানের চিহ্ন রয়েছে। ’

রণবীর সিং আরো জানান, হামলাকারীরা অটোম্যাটিক রাইফেল এবং ছোট আগ্নেয়াস্ত্র দিয়ে হামলা চালায় এবং সেনা সদস্যদের তাঁবু এবং অস্থায়ী ঘাঁটিতে আগুন ধরিয়ে দেয়। নিহত ১৭ সেনার মধ্যে ১৩-১৪ জন তাঁবুতে লাগা আগুনে মারা গেছেন। যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য ভারতীয় সেনাবাহিনী প্রস্তুত রয়েছে।

এদিকে এ হামলার ঘটনায় নিন্দা ও ১৭ সেনা সদস্য নিহতের ঘটনায় শোক প্রকাশ করেছেন ভারতের বিরোধী দল কংগ্রেসের সহসভাপতি রাহুল গান্ধী। ২০১৪ সাল থেকে কাশ্মীরের উত্তরাঞ্চলে ‘বিচ্ছিন্নতাবাদীদের’ চালানো হামলাগুলোর মধ্যে এটিই সবচেয়ে প্রাণঘাতী হামলা। ঘটনার পর পাকিস্তানের সঙ্গে নিয়ন্ত্রণ রেখা বন্ধ রয়েছে। চলতি বছরের জানুয়ারিতে এ ধরনের একটি ঘটনায় ভারতীয় সামরিক বাহিনীর সাত সদস্য নিহত হয়েছিলেন। ভারতীয় সীমান্ত অতিক্রম করে আসা ছয় অনুপ্রবেশকারী পাঞ্জাবের উচ্চ নিরাপত্তায় ঘেরা পাঠানকোট বিমানঘাঁটিতে প্রবেশ করে নির্বিচার গুলিবর্ষণ শুরু করে। তিন দিন ধরে তাণ্ডব চালানোর পর সেনা অভিযানে ওই ছয় হামলাকারীও নিহত হয়েছিল।

প্রায় দুই মাস ধরে কাশ্মীরে সহিংস বিক্ষোভ চলছে এবং এতে ৮০ জনেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছে। এর আগে কাশ্মীরের প্রধান শহর শ্রীনগরে ছররা গুলিতে ঝাঁঝরা হয়ে যাওয়া এক স্কুল ছাত্রের মৃতদেহ পাওয়া যাওয়ার পর রাজ্যজুড়ে কারফিউ জারির মধ্যেও লোকজন বিক্ষোভ করেছে। সম্প্রতি এক বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতাকে গুলি করে হত্যার পর সেখানে ভারতীয় শাসনের বিরুদ্ধে নতুন করে বিক্ষোভ শুরু হয়। শনিবারই কাশ্মীরে বিএসএফের আইজি বিকাশ চন্দ্র জানিয়েছিলেন, গত দুই মাসে নিয়ন্ত্রণ রেখা পেরিয়ে জঙ্গিদের ৩০ জনের একটি দল কাশ্মীরে ঢুকে পড়েছে। তারা বিভিন্ন এলাকায় আত্মগোপন করে রয়েছে। এ বিষয়টি জানার পরও উরির সেনাঘাঁটিতে কী করে হামলার ঘটনা ঘটল, তা খতিয়ে দেখছে নিরাপত্তা বাহিনী। নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা বলছেন, উরির এ ঘটনা নতুন করে পাক-ভারত সম্পর্কের অবনতি ঘটাতে পারে। এতে উপমহাদেশে নতুন করে একটা জটিলতা তৈরি হতে পারে। সূত্র : এএফপি, বিবিসি, রয়টার্স, এনডিটিভি, আনন্দবাজার।


মন্তব্য