kalerkantho

শুক্রবার । ৯ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৮ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


বখাটের ছুরিতে নিভল নিতু

মাদারীপুর প্রতিনিধি   

১৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



বখাটের ছুরিতে নিভল নিতু

বখাটের হাতে নির্মমভাবে নিহত নিতুর স্বজনদের কান্না। ছবি : কালের কণ্ঠ

বখাটের ছুরিকাঘাতে স্কুল ছাত্রী রিশা হত্যাকাণ্ড নিয়ে আলোচনা না থামতেই এবার মাদারীপুরের কালকিনি উপজেলায় আরেক স্কুল ছাত্রী একইভাবে হত্যার শিকার হয়েছে। নবম শ্রেণির ওই ছাত্রীর নাম নিতু মণ্ডল।

গতকাল রবিবার সকালে উপজেলার আইসারকান্দি গ্রামে মিলন মণ্ডল নামে এক যুবক তাকে ছুরি মেরে হত্যা করে। পরে জনতা ধাওয়া করে মিলনকে ধরে পুলিশের হাতে তুলে দেয়।

নিতু স্থানীয় নবগ্রাম উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়ত। তার বাবার নাম নির্মল মণ্ডল। তাদের বাড়ি উপজেলার নবগ্রাম ইউনিয়নের আইসারকান্দি গ্রামে। পরিবারের অভিযোগ, স্কুলে যাওয়া-আসার পথে প্রতিদিন নিতুকে উত্ত্যক্ত করত মিলন। প্রেমের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করাতেই তাকে (নিতু) হত্যা করে সে।

কালকিনি সৈয়দ আবুল হোসেন কলেজের ব্যবস্থাপনা বিভাগের (সম্মান) দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র মিলনের বাড়িও একই গ্রামে। তার বাবার নাম বীরেণ মণ্ডল। নিতুর ছোট ভাইকে প্রাইভেট পড়াত সে (মিলন)।

স্থানীয় লোকজন, পুলিশ ও পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, নিতুকে দীর্ঘদিন ধরে  উত্ত্যক্ত করছিল মিলন। স্কুলে যাওয়া-আসার পথে প্রতিদিন প্রেমের প্রস্তাব দিত। নিতু বারবার সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করত। এতে ক্ষিপ্ত হয় মিলন। ঈদের ছুটির পর গতকাল সকালে স্কুলে যাওয়ার পথে নিতুকে বাধা দেয় মিলন। প্রতিবাদ করলে সে ছুরি দিয়ে নিতুর পেট ও পিঠে আঘাত করে। নিতুর চিৎকারে স্থানীয়রা ছুটে এলে মিলন দ্রুত পালিয়ে যায়। উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়ার পথেই মারা যায় নিতু। পরে স্থানীয়রা মিলনকে ধাওয়া করে একটি বিলের মধ্য থেকে আটক করে পুলিশে খবর দেয়। ডাসার থানা পুলিশ এসে তাকে থানায় নিয়ে যায়।

প্রত্যক্ষদর্শী পঞ্চম শ্রেণির ছাত্রী কমলা অধিকারী বলে, ‘আমি পুরো ঘটনা দেখেছি। নিতু দিদি স্কুলে যাচ্ছিল। এ সময় ওই ছেলেটি (মিলন) প্রথমে দিদিকে কী যেন বলে, এরপর পকেট থেকে ছুরি বের করে কোপাতে থাকে। দিদি মাটিতে পড়ে যায়, ওই অবস্থায়ও তাকে কোপাতে থাকে। একপর্যায়ে ছুরিটি পাশের খালে ফেলে দিয়ে ছেলেটি পালিয়ে যায়। এ সময় ভয়ে আমি চিৎকার করতে থাকি। ’

খবর পেয়ে মাদারীপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. নাসির উদ্দিন ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। এ সময় তিনি বলেন, বখাটেকে আটক করা হয়েছে। নিতুর লাশ ময়নাতদন্তের জন্য মাদারীপুর সদর হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়েছে। এ ঘটনায় আইনগত সব ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

নিতু হত্যার প্রতিবাদে গতকাল নবগ্রাম উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ক্লাস বর্জন করে। স্কুল কর্তৃপক্ষও তাৎক্ষণিক স্কুল ছুটি দিয়ে সবাইকে নিয়ে নিতুদের বাড়িতে ভিড় করে।

সহপাঠী সীমা, শিউলি, শশীসহ একাধিক শিক্ষার্থী বলে, ‘মিলন নিতুকে বিরক্ত করত। কিন্তু সে এভাবে নিতুকে হত্যা করবে তা আমরা কল্পনাও করতে পারিনি। আমরা মিলনের ফাঁসির দাবি জানাই। ’

নিতুর বাবা নির্মল মণ্ডল বলেন, ‘মিলন আমার মেয়েকে এভাবে হত্যা করবে তা কল্পনাও করিনি। আমি এর বিচার চাই, যাতে আর কোনো বাবা সন্তানহারা না হয়। ’

মা নিপা মণ্ডল বলেন, ‘আমার সামনে দিয়াই নিতু স্কুল ব্যাগ নিয়া ঘর থাইক্যা বাইর হইল। খানিক পরে একজন আইসা কইল, আমার মাইয়ারে কে জানি ছুরি দিয়া কোপাইয়া মাইরা ফ্যালাইছে। আমি দৌড়াইয়া গিয়া দেখি সব শেষ। আমার মাইয়্যা মইরা গেছে। নিতু যহন ছোট আছিল তহন মিলন তারে পড়াইত। এহন সে আমার ছোট পোলারে পড়ায়। হুনছি ও আমার মাইয়ারে বিরক্ত করত। কিন্তু এইভাবে মাইরা ফালাইবো তা ভাবি নাই। আমি মাইয়া হত্যার বিচার চাই। ’

মাদারীপুরের এসপি মোহাম্মদ সরোয়ার হোসেন বলেন, ঘটনায় জড়িত সন্দেহে মিলন মণ্ডলকে আটক করা হয়েছে। দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

যোগাযোগ করা হলে মাদারীপুর জেলা মহিলাবিষয়ক কর্মকর্তা মাহমুদা আক্তার কণা মোবাইল ফোনে বলেন, ‘আমি ঘটনাস্থলে গিয়ে ওর (নিতু) মা-বাবার সঙ্গে কথা বলব। আইনি সহযোগিতাসহ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার ব্যাপারে তাঁদের সব ধরনের সহযোগিতা করা হবে। ’

ঘটনার পর গতকাল মিলনের বাড়ি গিয়ে তার বৃদ্ধ দাদি ও বাকপ্রতিবন্ধী বোন ছাড়া আর কাউকে পাওয়া যায়নি। স্থানীয়রা জানায়, পরিবারের অন্য সদস্যরা পালিয়েছে।

প্রসঙ্গত, গত ২৪ আগস্ট ঢাকার উইলস লিটল ফ্লাওয়ার স্কুলের অষ্টম শ্রেণির ছাত্রী সুরাইয়া আক্তার রিশাকে কুপিয়ে আহত করে বখাটে যুবক ওবায়দুল খান। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ২৮ আগস্ট রিশার মৃত্যু হয়। ৩১ আগস্ট জনতা ওবায়দুলকে ধরে পুলিশে দেয়। পারিবারিক সূত্র জানায়, ওবায়দুল দীর্ঘদিন ধরে রিশাকে উত্ত্যক্ত করত।

গত ৭ সেপ্টেম্বর দিনাজপুরের বোচাগঞ্জ উপজেলায় ঘরে ঢুকে অষ্টম শ্রেণির এক ছাত্রীকে কুপিয়ে জখম করে এক বখাটে। পরে পুলিশ ইব্রাহিম চৌধুরী নামের ওই যুবককে আটক করে। ওই ছাত্রীর পরিবার জানায়, প্রেমের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করাতেই ক্ষিপ্ত হয়ে এভাবে হামলা চালায় ইব্রাহিম।


মন্তব্য