kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ৮ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৭ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


টাম্পাকো ট্র্যাজেডি

অবৈধ বুস্টার মেশিন বিস্ফোরণ থেকেই দুর্ঘটনা!

নিজস্ব প্রতিবেদক, গাজীপুর   

১৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



অবৈধ বুস্টার মেশিন বিস্ফোরণ থেকেই দুর্ঘটনা!

টঙ্গীর বিসিক শিল্পনগরীর টাম্পাকো কারখানায় দুই টনের একটি বয়লার ব্যবহারের অনুমোদন ছিল। কিন্তু কারখানা কর্তৃপক্ষ অনুমোদন ছাড়াই ১.২ টনের আরেকটি বয়লার বসিয়েছিল।

পাশাপাশি অবৈধভাবে এক টনের থার্মোফ্লুইড হিটারও ব্যবহার করত তারা, সেটিও এক ধরনের বয়লার। এতগুলো বয়লার চালানোর জন্য প্রয়োজনীয় গ্যাস না পাওয়ায় কারখানা কর্তৃপক্ষ গ্যাসের লাইনে অবৈধভাবে বুস্টার মেশিন লাগিয়েছিল। তা দিয়ে বাড়তি গ্যাস টেনে নিত তারা। সেই বুস্টার মেশিন বিস্ফোরণ থেকেই দুর্ঘটনা ঘটেছে বলে ধারণা করছেন সংশ্লিষ্টরা। টাম্পাকো ফয়েলস কারখানার শ্রমিক, বিশেষজ্ঞ প্রকৌশলী ও তিতাস গ্যাসের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে এমন তথ্য পাওয়া গেছে।

গত ১০ সেপ্টেম্বর সকালের ওই দুর্ঘটনায় প্রথমে বিস্ফোরণ ও পরে আগুন লেগে কারখানার তিনটি ভবন বিধ্বস্ত হয়। গতকাল শনিবার বিকেল পর্যন্ত ৩৪ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। আহত হয়েছে ৩৮ জন। এখনো নিখোঁজ রয়েছে ১১ জন। সেনাবাহিনী ও ফায়ার সার্ভিস উদ্ধার তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে।  

টাম্পাকোর শ্রমিক-কর্মচারীদের সূত্র জানায়, কারখানায় দুই টনের একটি বয়লারের অনুমোদন ছিল। কিন্তু কর্তৃপক্ষ অবৈধভাবে কারখানায় ১.২ টনের একটি বয়লার ও এক টনের একটি থার্মোফ্লুইড হিটার (একজাতীয় বয়লার) ব্যবহার করছিল। ওই দুই বয়লারের জন্য যে পরিমাণ গ্যাসের প্রয়োজন, তা না পাওয়ায় কারখানা কর্তৃপক্ষ পাইপলাইনে বুস্টার মেশিন লাগিয়ে গ্যাস টেনে নিয়ে বয়লারে ব্যবহার করত। সেই বুস্টার মেশিনই বিস্ফোরিত হয়েছে। তা থেকেই অগ্নিকাণ্ড, ভবনধস ও হতাহতের ঘটনা ঘটে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন বিশেষজ্ঞ প্রকৌশলী বলেন, টাম্পাকোতে তিনটি বয়লার ব্যবহার করা হচ্ছিল। গ্যাসের চাপ কম থাকায় সেখানে অবৈধভাবে বুস্টার মেশিন ব্যবহার করা হত। সেই মেশিন বিস্ফোরিত হয়েই দুর্ঘটনা ঘটে থাকতে পারে। বয়লার বিস্ফোরণে এ দুর্ঘটনা ঘটেনি, এটি নিশ্চিত। কারণ কারখানার সব বয়লার অক্ষত আছে। তিনি আরো জানান, কারখানায় প্রচুর মিথানল ছিল। বিস্ফোরণের পর অগ্নিকাণ্ড ও ভবনধসের ফলে আগুন মিথানলে ছড়িয়ে ভয়াবহ আকার নেয়।

তিতাস গ্যাসের টঙ্গী অঞ্চলের ম্যানেজার অজিত দে কালের কণ্ঠকে জানান, টাম্পাকোতে দুটি রেগুলেটর (গ্যাস মিটার) ছিল। বয়লার চালানোর জন্য একটি মিটারে প্রতি ঘণ্টায় ১২ হাজার ২৫ ঘনফুট এবং অপর মিটারের মাধ্যমে জেনারেটরের জন্য প্রতি ঘণ্টায় ১২ হাজার ৩৬০ ঘনফুট গ্যাস ব্যহারের অনুমোদন ছিল। কারখানায় গ্যাসের চাপ ছিল ১০ পিএসআই। বিস্ফোরণের পর প্রশাসনিক ভবন বিধ্বস্ত হওয়ায় কারখানার গ্যাস রেগুলেটিং অ্যান্ড মিটারিং স্টেশনে প্রবেশ করা যায়নি। এ কারণে দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ এখনো জানা যায়নি।  

তিনি আরো জানান, গ্যাসের চাপ কম থাকায় অনেকে গ্যাস লাইনে বুস্টার মেশিন লাগিয়ে কারখানায় ব্যবহার করে। বুস্টার মেশিন পাম্প করে লাইন থেকে টেনে গ্যাস নিয়ে আসে। এ মেশিন ব্যবহার সম্পূর্ণ অবৈধ ও বিপজ্জনক। তাঁরও ধারণা, বুস্টার মেশিন বিস্ফোরিত হয়েই ওই দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।

অবৈধ মেশিন কিভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে, জানতে চাইলে ওই কর্মকর্তা বলেন, ‘এসব বিষয় তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। তা ছাড়া বুস্টার মেশিন থেকেই বিস্ফোরণ ঘটেছে, এটা এখনো নিশ্চিত নয়, ধারণা মাত্র। ’  

জানা গেছে, প্রতিষ্ঠানে বয়লার ব্যবহারের আগে শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীন প্রধান বয়লার পরিদর্শকের কার্যালয় থেকে রেজিস্ট্রেশন ও অনুমোদন নিতে হয়। টঙ্গী শিল্পাঞ্চলের বয়লার পরিদর্শনের দায়িত্বে ছিলেন প্রধান বয়লার পরিদর্শক আবদুল মান্নান। টাম্পাকোর দুর্ঘটনা নিয়ে কথা বলতে তাঁর মোবাইল ফোনে বারবার কল করা হলেও তিনি তা রিসিভ করেননি।  

গতকাল বিকেলে বয়লার পরিদর্শক প্রকৌশলী শরাফত আলী কারখানা পরিদর্শন করেন। টাম্পাকোতে বয়লার বিস্ফোরণের কোনো ঘটনা ঘটেনি জানিয়ে তিনি বলেন, ‘এ কারখানায় দুই টনের একটি বয়লারের অনুমোদন আছে। বয়লারটি ১৯৯৭ সালে কোরিয়া থেকে কেনা। আরো একটি বয়লার আছে, তবে আমরা এটি অকেজো বা অব্যবহৃত হিসেবে জানি। আর থার্মোফ্লুইড হিটার আসলে বয়লার নয়, তেল গরম করার যন্ত্র। এটি ব্যবহারে কোনো অনুমোদন লাগে না। ’ 

উদ্ধার তৎপরতা : টাম্পাকো ফয়েলস কারখানায় গতকাল অষ্টম দিনের মতো উদ্ধার তৎপরতা চালায় ফায়ার সার্ভিস ও সেনাবাহিনীর উদ্ধারকারী দল। তবে সন্ধ্যা পর্যন্ত আর কোনো লাশ উদ্ধার করা হয়নি। ভারী বুলডোজার ও হেমার দিয়ে উদ্ধারকারী সদস্যদের বিধ্বস্ত ভবনের কংক্রিট সরিয়ে নিতে দেখা গেছে। ভবনের ভেতরের ধ্বংসাবশেষের নিচ থেকে গতকালও ধোঁয়া বের হতে দেখা যায়। পুলিশ ও গাজীপুর সিটি করপোরেশন উদ্ধারকাজে সেনাবাহিনী ও ফায়ার সার্ভিসকে সহযোগিতা করছে।

তদন্তের অগ্রগতির বিষয়ে জানতে চাইলে ফায়ার সার্ভিসের পরিচালক (প্রশাসন) লে. কর্নেল মোশারফ হোসেন বলেন, টাম্পাকোতে গ্যাস ও বিদ্যুতের কোনো সমস্যা ছিল কি না, তা জানতে তিতাস গ্যাস ও ডেসকোসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে চিঠি দিয়ে তাদের নিজ নিজ তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে। তাদের প্রতিবেদন পাওয়া গেলে সব সমন্বয় করে তদন্ত প্রতিবেদন প্রস্তুত করা হবে। যেহেতু এখন ঈদের ছুটি, তাই অন্যান্য সংস্থার প্রতিবেদন পেতে আরো সময় লাগতে পারে।

গতকালও কারখানার সামনে এবং জেলা প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণ কক্ষের কাছে অপেক্ষায় ছিল নিখোঁজ শ্রমিকদের স্বজনরা। তাদের অনেকেই নিখোঁজ ব্যক্তির ছবি হাতে বা বুকে ঝুলিয়ে কাঁদছিল। প্রিয় স্বজনের লাশ খুঁজে বের করার আকুতি জানাচ্ছিল তারা।   

নিয়ন্ত্রণ কক্ষের দায়িত্বে থাকা গাজীপুরের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মো. ইফতেখার আহমেদ চৌধুরী জানান, এ পর্যন্ত নিহতের সংখ্যা ৩৪। ২৮ জনের লাশ শনাক্ত করার পর স্বজনরা নিয়ে গেছে। এখনো নিখোঁজ রয়েছে ১১ জন। পুড়ে বিকৃত হয়ে যাওয়ায় ছয়জনের লাশ পরিচয়হীন অবস্থায় ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের মর্গের হিমঘরে রাখা আছে। স্বজনদের সঙ্গে ডিএনএ টেস্টের মাধ্যমে পরিচয় শনাক্ত করে এসব লাশ হস্তান্তর করা হবে। সরকারের সহায়তা প্রদানের জন্য হতাহত ব্যক্তিদের স্বজনদের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা নেওয়া হচ্ছে। এসব প্রক্রিয়া শেষ হলে সবাইকে একসঙ্গে ডেকে সহায়তার অর্থ প্রদান করা হবে। ইতিমধ্যে আহত ১৫ জন এবং নিহত দুজনের পরিবারকে জেলা প্রশাসকের পক্ষ থেকে সহায়তা দেওয়া হয়েছে।


মন্তব্য