kalerkantho

মঙ্গলবার । ৬ ডিসেম্বর ২০১৬। ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৫ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


মুনাফার লোভে মহাসড়কে ঝরছে প্রাণ

পার্থ সারথি দাস   

১৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



মুনাফার লোভে মহাসড়কে ঝরছে প্রাণ

নীতিনির্ধারণী সভায় এসে জোরগলায় প্রতিশ্রুতি দিলেও শীর্ষ পরিবহন নেতাদের গাড়িও মহাসড়কে বেপরোয়া ছুটছে। ঈদ মৌসুমে বেশি ট্রিপ মেরে বাড়তি লাভের আশায় চালককে তাঁরা বাধ্য করছেন জোরে চালাতে।

বাসের বেপরোয়া গতি, গাড়ির ফিটনেসহীনতা, মাহেন্দ্রসহ নিষিদ্ধ পরিবহন মহাসড়ক দাপিয়ে বেড়ানোয় দুর্ঘটনা বাড়ছে, প্রাণ যাচ্ছে সাধারণের। গত বছরের ১ আগস্ট থেকে দেশের ২২টি জাতীয় মহাসড়কে তিন চাকার যানবাহন নিষিদ্ধ করেছিল সরকার। আর ওই বছরই মহাসড়কে দূরপাল্লার বাসের সর্বোচ্চ গতি ৮০ কিলোমিটার নির্ধারণ করা হয়েছিল। কিন্তু এর কোনোটিই কার্যকর হয়নি।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এবার বাস মালিকরা বেশি ট্রিপ দিতে বাধ্য করায় চালকরা গতিসীমা মানছেন না। এতে প্রতিদিনই মহাসড়কে প্রাণ ঝরছে। সারা দেশে সড়ক দুর্ঘটনা ৫০ শতাংশ কমে এলেও ঈদ মৌসুমে ব্যাপক প্রাণহানিতে সংশ্লিষ্টরা উদ্বিগ্ন। গতকাল শনিবারও সড়ক দুর্ঘটনায় ১১ জেলায় শিশু ও শিক্ষকসহ অন্তত ২৪ জন নিহত হয়েছে। আহত অন্তত ৬২ জন। এর আগে শুক্রবার ময়মনসিংহের নান্দাইল ও নীলফামারীর ডিমলায় মারা গেছে দুই শিশু। গত সোমবার থেকে গতকাল পর্যন্ত সড়কে প্রাণ গেছে অন্তত ৮৩ জনের।

ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর, আশুগঞ্জ, সরাইল ও বিজয়নগরে স্থানে স্থানে রয়েছে বাঁক। ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদরের খাটিহাতা বহু আগে থেকেই দুর্ঘটনাপ্রবণ। শুক্রবার সকালে মহাসড়কের বিজয়নগর থানার শশই গ্রামে মৌলভীবাজার থেকে ঢাকামুখী মাইক্রোবাসের সঙ্গে ঢাকা থেকে মৌলভীবাজারগামী এনা পরিবহনের বাসের সংঘর্ষে আটজনের প্রাণ যায়। দুর্ঘটনার পর শুক্রবার রাতে বিজয়নগর থানায় এ ব্যাপারে মামলা হয়েছে। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা খাটিহাতা মহাসড়ক পুলিশের উপপরিদর্শক আবদুল হক গতকাল কালের কণ্ঠকে বলেন, মাইক্রোবাসটি বাসটিকে ওভারটেক করতে যাওয়ায় ওই দুর্ঘটনা ঘটে। বাসটিও বেপরোয়া গতিতে চলছিল। দুর্ঘটনার পর বাসের চালক মো. লিটন অসুস্থ হয়ে রাজধানীর একটি হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন। এনা পরিবহনের মালিক খন্দকার এনায়েতউল্ল্যাহ। তিনি ঢাকা সড়ক পরিবহন সমিতির সাধারণ সম্পাদক। দেশের শীর্ষ পরিবহন নেতাদের অন্যতম খন্দকার এনায়েতউল্লাহ সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের সড়ক নিরাপত্তাসংক্রান্ত সভায় নীতিনির্ধারণে সহযোগিতা করেন, পরামর্শ দেন।

জাতীয় সড়ক নিরপত্তা পরিষদের সভায় গত বছর মহাসড়কে গাড়ির সর্বোচ্চ গতিবেগ ৮০ কিলোমিটার নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু শুক্রবারের দুর্ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছে, এনা পরিবহনের বাসটি ৮০ কিলোমিটারের বেশি গতিতে চলছিল। মহাসড়ক পুলিশের উপপরিদর্শক আবদুল হকও একই কথা জানিয়েছেন। জানা গেছে, গত বছর সড়ক নিরাপত্তা পরিষদের সভায় খন্দকার এনায়েত উল্লাহও উপস্থিত ছিলেন। তিনি বর্তমানে ব্যাংককে অবস্থান করছেন। এনা পরিবহনের মহাব্যবস্থাপক মো. আতিকুল আলম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমাদের বাসে গতিসীমা নির্ধারণী গভর্নর সিল লাগানো হয়েছে, গতিও স্বাভাবিক ছিল। তবে বিপরীত দিক থেকে তিনটি মাইক্রোবাস সারিবেঁধে আসছিল। দুর্ঘটনাকবলিত মাইক্রোবাসটি ওভারটেক করতে যাওয়ায় দুর্ঘটনা ঘটে। ’ মাইক্রোবাসটির মালিক জহির আহমেদ লাল মিয়া বলেন, এনা পরিবহন রং সাইডে ছিল। গতি ১০০ কিলোমিটারের বেশি ছিল। ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক দিয়ে উত্তরের ১৬টি জেলা থেকে ঢাকায় ফিরছে ঈদযাত্রীরা। এ মহাসড়কের মির্জাপুর, পুংলী, আনালিয়াবাড়িসহ বিভিন্ন স্থানে দুর্ঘটনায় প্রাণ ঝরছে যাত্রীদের। টাঙ্গাইল জেলার মির্জাপুর উপজেলার পাঁচ কিলোমিটার পশ্চিমে ইচাইলে গতকাল শনিবার সকাল ৭টা ১০ মিনিটে কুড়িগ্রাম থেকে ঢাকাগামী জাবালে নূর পরিবহনের একটি বাসের সঙ্গে বিপরীত দিক থেকে আসা ইটবোঝাই ট্রাকের সংঘর্ষে পাঁচজনের প্রাণহানি ঘটে। বাসে কমপক্ষে ৪৫ জন যাত্রী ছিল। বিআরটিএ সূত্রে জানা গেছে, জাবালে নূর পরিবহন ঢাকা মহানগরীর একাধিক রুটে চলাচল করে। কিন্তু ঈদের সময় যাত্রী পরিবহনের জন্য চুক্তিতে সেটি চলাচল করছিল মহাসড়কে। জাবালে নূরের মালিককে চিহ্নিত করতে পারেনি পুলিশ।

শুক্রবার ভোরে একই মহাসড়কে কালিহাতী উপজেলার পুংলীতে পোশাক শ্রমিকদের নিয়ে লালমনিরহাট থেকে রওনা দেওয়া একটি লোকাল বাস দুর্ঘটনায় পড়লে পাঁচজন মারা যান। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বেপরোয়া গতিতে ছোটা বাসটি প্রভাতী-বনশ্রী পরিবহন কম্পানির। এ কম্পানির পরিচালক ২৮ জন। প্রভাতী-বনশ্রীর ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবুল মনসুর বুলবুল বলেন, ‘রুট ছাড়া বাস চালালে তার দায় কম্পানির নয়, বাস মালিকের। আমার কোনো বাস এ ধরনের দুর্ঘটনা ঘটিয়েছে বলে এখনো খবর আসেনি। ’ তিনি আরো বলেন, ‘ঈদের সময় চুক্তিতে বাস চালানো হলে দায় মালিকের, তা জানিয়ে আমরা চিঠি দিয়েছিলাম। ’ আবুল মনসুর বুলবুল ঢাকা সড়ক পরিবহন সমিতির প্রচার সম্পাদক।

ঢাকা-বরিশাল মহাসড়কে মাদারীপুরের রাজৈরের বড় ব্রিজ এলাকায় শুক্রবার দুপুরে সমুদ্র সৈকত পরিবহনের একটি বাসের সঙ্গে নিষিদ্ধ মাহেন্দ্রর মুখোমুখি সংঘর্ষে তিনজনের প্রাণ যায়। মহাসড়ক পুলিশের ভাঙ্গা থানার উপপুলিশ পরিদর্শক মো. মহসীন জানান, দুর্ঘটনার পর থেকে বাস মালিক যোগাযোগ করেননি। কালের কণ্ঠ’র অনুসন্ধানে জানা গেছে, ঢাকা-কুয়াকাটা রুটে এ কম্পানির চারটি বাস চলে। কম্পানির পাঁচ পরিচালকের একজন নাজমুল সাহদাত কালের কণ্ঠকে বলেন, কোরবানির ঈদের তিন দিন আগে নতুন বাস মহাসড়কে নামানো হয়। মাহেন্দ্র ওভারটেক করায় ওই দুর্ঘটনা ঘটেছে। ৪১ আসনের বাসটি কত গতিতে চলছিল জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘তা জানি না। ’ তবে তাঁর দাবি, নিষিদ্ধ মাহেন্দ্র, টমটমের জন্য মহাসড়কে বাস চালানো যাচ্ছে না। ঢাকা-বরিশাল মহাসড়কের ভুরঘাটা, টেকেরহাটসহ বিভিন্ন স্থানে মাহেন্দ্র শুধু পণ্য নয়, যাত্রীও পরিবহন করছে।

১৯৮৩ সালের মোটরযান অধ্যাদেশ অনুযায়ী গাড়ির গতিসীমা নির্ধারণ করার জন্য গভর্নর সিল সংযোজন বাধ্যতামূলক। তা করা না হলে অপরাধীর তিন মাসের কারাদণ্ড বা এক হাজার টাকা জরিমানা বা ঊভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে। পরিবহন সংশ্লিষ্টরা কালের কণ্ঠকে জানায়, আশির দশক থেকে মহাসড়কে দূরপাল্লার গাড়িতে গতিসীমা নির্ধারণ করা ছিল। গতিসীমা মেনে চলার জন্য গাড়িতে গভর্নর সিল সংযোজন বাধ্যতামূলক ছিল। এটি করত বিআরটিএর স্পিড গভর্নর সিল কন্ডাক্টররা। কিন্তু এখন বিআরটিএর সব সার্কেল অফিস থেকে স্পিড গভর্নর সিল কন্ডাক্টর পদ তুলে দেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশ বাস-ট্রাক ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান ও সোহাগ পরিবহনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. ফারুক তালুকদার সোহেল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমাদের কম্পানির গাড়িচালকদের বাসের গতিসীমা ৮০ কিলোমিটার নির্ধারণ করে দিয়েছি। আগে এটি ছিল ১২০ কিলোমিটার। গতি নিয়ন্ত্রণে আনায় আমার কম্পানির গাড়িতে দুর্ঘটনা ৯৯ শতাংশ কমে গেছে। ’ 

গত বছর সড়ক নিরাপত্তা পরিষদের সভায় চালকদের প্রতি পাঁচ ঘণ্টায় কমপক্ষে ৩০ মিনিট বিশ্রাম দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছিল। তবে বাস ও বিভিন্ন পরিবহনের মালিকরা তা মানছে না। বরং ট্রিপ বেশি দিয়ে বেশি লাভের জন্য ঈদ মৌসুমে চালকদের দ্রুত বাস চালাতে তারা বাধ্য করে। গতকাল ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের ধলেশ্বরী পরিবহনের চালক মো. আলম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ঈদের সময় ঢাকা থেকে যাওয়ার পথে যানজটের জন্য ট্রিপ অর্ধেকে কমে যায়। তা পোষাতে হয় ঈদের পরে বেশি ট্রিপ দিয়ে। আমাদের ঘুমের কোনো হিসাব নেই। ’

অদক্ষ চালকদের হাতে মালিকরাই চাবি তুলে দেয় : মহাসড়ক সচিব

সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সচিব এম এ এন ছিদ্দিক গত রাতে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘চালকরা বেশি ট্রিপের চাপে আছে। আমি সরেজমিনে গিয়ে জানতে পেরেছি, যেখানে চারটি ট্রিপ দেওয়া উচিত সেখানে ট্রিপ হয়ে যাচ্ছে পাঁচটা বা ছয়টা। কিন্তু চাহিদার তুলনায় দক্ষ চালক তৈরি হয়নি। অদক্ষ চালকদের হাতে মালিকরাই চাবি তুলে দেয়। যেসব গাড়ি দুর্ঘটনা ঘটিয়েছে সেগুলোর মালিকদের আমরা ডেকে সতর্ক করব, আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেব। বিআরটিএকে তালিকা তৈরি করতে বলেছি। রুট পারমিট বাতিল করলে অন্য নামে কম্পানি করে রুট নিয়ে নেয় কৌশলী মালিকরা। আমরা এ ক্ষেত্রে নজরদারি বাড়াব। ’


মন্তব্য