kalerkantho

শুক্রবার । ৯ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৮ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


আধিপত্যের বিরোধে যুবলীগকর্মী খুন

নিজস্ব প্রতিবেদক   

১৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



আধিপত্যের বিরোধে যুবলীগকর্মী খুন

রাজধানীর মতিঝিলের এজিবি কলোনি এলাকায় গুলিবিদ্ধ দুই যুবলীগকর্মীর মধ্যে একজন মারা গেছেন। তাঁর নাম রিজভি হাসান বাবু ওরফে বোচা বাবু (৩৪)।

গতকাল শনিবার ভোরে অ্যাপোলো হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়। একই ঘটনায় গুলিবিদ্ধ ইমন (৩০) ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।

গত শুক্রবার রাত সোয়া ১১টার দিকে মতিঝিল যুবলীগের ১৯ নম্বর ওয়ার্ড অফিসের সামনে ইমন ও বাবুকে গুলি করে পালিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা। বাবু ও ইমন ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের ১০ নম্বর ওয়ার্ডের কর্মী।

পুলিশ, দলীয় ও স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে, মতিঝিলে যুবলীগের নেতাকর্মীদের আধিপত্য বিস্তারের বিরোধের জের ধরে এ হত্যাকাণ্ড ঘটে। বাবু ১০ নম্বর ওয়ার্ড যুবলীগের সভাপতি মারুফ রেজা সাগরের অনুসারী ছিলেন। তাঁর (বাবু) বিরুদ্ধে হত্যাসহ বেশ কয়েকটি মামলা আছে। তাঁদের প্রতিপক্ষ একই ওয়ার্ডের যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক আনোয়ার হোসেন মিলন। দলীয় পদ দখল, মতিঝিলের সরকারি অফিসে চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজিসহ মোটা অঙ্কের টাকার ভাগভাটোয়ারা নিয়ে উভয় পক্ষের মধ্যে বিরোধ রয়েছে। একই রকম বিরোধের জেরে ২০১৩ সালে গুলশানে খুন হন ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের তৎকালীন সাংগঠনিক সম্পাদক রিয়াজুল হক খান মিল্কী।

জানা গেছে, বাবুর বাবার নাম আবুল কালাম, তিনি পেশায় ব্যবসায়ী। মা রীনা আক্তার সরকারি কর্মকর্তা। তাঁদের গ্রামের বাড়ি নেয়াখালীর চরআফজাল গ্রামে। বাবু পরিবারের সঙ্গে সবুজবাগের পূর্ব বাসাবো ওয়াসা রোডের ১০/৩/৩ নম্বর বাসায় থাকতেন। তিনি দুই মেয়ের জনক।

গতকাল বাবুর লাশের সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করেন মতিঝিল থানার উপপরিদর্শক (এসআই) দুলাল চন্দ্র কুণ্ডু। তিনি কালের কণ্ঠকে জানান, বাবুর বাঁ গালের মাঝামাঝিতে একটি গুলির ছিদ্র রয়েছে। গুলিটি মাথার দিকে চলে গেছে। পুলিশ জানায়, ঢাকা মেডিক্যালে ভর্তি ইমনের অবস্থাও আশঙ্কাজনক। তাঁর ডান ঊরু ও পাঁজরে গুলির চিহ্ন এবং মাথায় কাটা জখমের চিহ্ন রয়েছে।

শুক্রবার হামলার শিকার পক্ষটি দাবি করছে, বাবু ১০ নম্বর ওয়ার্ড যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক পদপ্রার্থী ছিলেন। মতিঝিল থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও মিল্কী হত্যায় অভিযুক্ত জাহিদুল ইসলাম টিপুর নির্দেশে ওয়ার্ড যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক আনোয়ার হোসেন মিলন, ওই ওয়ার্ড স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাধারণ সম্পাদক আনোয়ারুল আজীম তুষার, যুবলীগকর্মী হিরক, সানি, রাজাসহ আট থেকে ১০ জন এ হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে।

ঢাকা মহানগর পুলিশের মতিঝিল বিভাগের অতিরিক্ত উপকমিশনার (এডিসি) মোহাম্মদ তারেক বিন রশিদ বলেন, ‘অভ্যন্তরীণ বিরোধের জের ধরে এ হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। বাবুর বিরুদ্ধে হত্যা, পুলিশের ওপর হামলা, অস্ত্র আইনসহ পাঁচ-ছয়টি মামলা আছে। সাগর ও মিলনের বিরুদ্ধেও কয়েকটি মামলা আছে। ঈদের আগে উভয় পক্ষ মারামারি করে পরস্পরের বিরুদ্ধে মামলা করে। ওই মামলায় তারা জামিনে ছাড়া পেয়েছে। শুক্রবারের ঘটনায়ও মামলা প্রক্রিয়াধীন। জড়িতদের আইনের আওতায় আনা হবে। ’

ঢাকা মহানগর দক্ষিণ সিটির ১০ নম্বর ওয়ার্ড যুবলীগের সভাপতি মারুফ রেজা সাগর গতকাল দাবি করেন, নিহত যুবলীগ নেতা রিয়াজুল হক মিল্কী ১০ নম্বর ওয়ার্ডে ‘যুবলীগ ক্লাব’ নামের একটি ক্লাব প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। মিল্কী হত্যায় জড়িত জাহেদ সিদ্দিকী তারেকের সহযোগী জাহিদুল ইসলাম টিপুর নির্দেশে আনোয়ার হোসেন মিলন, তুষার, সানি ও রাজাসহ আট-নয়জন ১৪-১৫ দিন আগে ওই ক্লাবে হামলা-ভাঙচুর করে। পরে বিষয়টি মতিঝিল থানা পুলিশকে জানানো হয়। বাবু ১০ নম্বর ওয়ার্ড যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক পদপ্রার্থী ছিলেন। এ কারণে বর্তমান সাধারণ সম্পাদক মিলনের সঙ্গে তাঁর দ্বন্দ্ব চলছিল। মিলন নিজের পদবি টিকিয়ে রাখতে শুক্রবার রাতে তুষার, রাজা ও সানিসহ আট-দশজনকে নিয়ে বাবু ও ইমনকে এলোপাতাড়ি গুলি করে পালিয়ে যান।

সাগর আরো বলেন, ‘গত পরশু মিলনের সঙ্গে বাবুর বৈঠক হয়। সেখানে পদ নিয়ে দুজনের মধ্যে ঝগড়া-ফ্যাসাদ হয়। এ ঘটনাও এ হত্যার পেছনে একটি কারণ হতে পারে। ’ সাগরের অভিযোগের বিষয়ে মতিঝিল আওয়ামী লীগের নেতা জাহিদুল ইসলাম টিপু মোবাইল ফোনে সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমি গ্রামের বাড়িতে ঈদ করতে এসেছি। ১৪ আগস্ট একটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে আমি বাবুকে ধমক দিয়েছিলাম। এখন যদি এই হত্যায় আমাকে জড়ানো হয় সেটা হবে দুঃখজনক। ’

১০ নম্বর ওয়ার্ড যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক মিলন বলেন, ‘সভাপতি সাগর নিজের লোকদের দিয়ে এ হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে আমাদের ওপর দায় চাপানোর চেষ্টা করছে। আমাদের নামে মামলা দিয়ে এলাকাছাড়া করার পরিকল্পনা তার দীর্ঘদিনের। ’

ওই ওয়ার্ড স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাধারণ সম্পাদক আনোয়ারুল আজীম তুষার বলেন, ‘মিথ্যা অপবাদ দিয়ে সাগর আমাদের জড়ানোর চেষ্টা করছে। সাগর রাজনীতিকে নষ্ট করেছে। রাজনীতির নামে যা ইচ্ছা তাই করছে। ’

স্থানীয় সূত্র জানায়, ২০১৩ সালের ২৯ জুলাই রাতে গুলশানের শপার্স ওয়ার্ল্ডের সামনে খুন হয়েছিলেন রিয়াজুল হক মিল্কী। পুলিশের তদন্তে জানা যায়, মতিঝিলে সরকারি দপ্তরগুলোতে যুবলীগের নিয়ন্ত্রণে ব্যাপক হারে চাঁদাবাজি ও টেন্ডারবাজি চলে। ওই এলাকায় আধিপত্য, টাকার ভাগাভাগিসহ নানা বিরোধে অভ্যন্তরীণ কোন্দলে খুন হন মিল্কী। এ হত্যা মামলার প্রধান আসামি যুবলীগ নেতা জাহেদ সিদ্দিকী তারেক র‍্যাবের সঙ্গে কথিত ক্রসফায়ারে নিহত হন। সংগঠনের আরো কয়েকজন নেতার বিরুদ্ধে আদালতে প্রতিবেদন দিয়েছে পুলিশ। তারেকের অনুসারী জাহিদুল ইসলাম টিপু। টিপুর অনুসারী মিলন। আর সাগর ও নিহত বাবুর গ্রুপটি মিল্কীর অনুসারী ছিল। এ কারণে সাগরের গ্রুপটি টিপু-মিলনের প্রতিপক্ষ।

সূত্র জানায়, মতিঝিলে ২০১৩ সালের ৭ নভেম্বর দলীয় কোন্দলে আরেকটি হত্যাকাণ্ড ঘটে। মতিঝিলে সমবায় ব্যাংক ভবনে আওয়ামী লীগের নেতা ও পরিবহন ব্যবসায়ী খায়রুল আলম মোল্লাকে ছুরিকাঘাতে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। পরিবারের অভিযোগ, সায়েদাবাদ আন্তজেলা বাস টার্মিনালের টোল নিযন্ত্রণ নিয়ে বিরোধের জের ধরে স্থানীয় একটি পক্ষ তাঁকে হত্যা করেছে।


মন্তব্য