kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ৮ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৭ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


কানাডায় প্রধানমন্ত্রী

খুনি নূর চৌধুরীকে ফেরতের উপায় খুঁজবে কানাডা

কূটনৈতিক প্রতিবেদক   

১৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



খুনি নূর চৌধুরীকে ফেরতের উপায় খুঁজবে কানাডা

মৃত্যুদণ্ডাদেশ পাওয়া ব্যক্তিদের ফেরত না পাঠানোর নীতি থাকলেও কানাডা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আত্মস্বীকৃত খুনি নূর চৌধুরীকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর উপায় খুঁজতে বাংলাদেশের সঙ্গে আলোচনায় সম্মত হয়েছে। গত শুক্রবার রাতে কানাডার মন্ট্রিয়লের হায়াত রিজেন্সি হোটেলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও কানাডীয় প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডোর নেতৃত্বে দুই দেশের প্রতিনিধিদলের দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে কানাডা এ সম্মতির কথা জানায়।

বাসস, ইউএনবি ও বিডিনিউজ এ খবর জানায়।

প্রধানমন্ত্রীর প্রেসসচিব ইহসানুল করীম বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও কানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডোর নেতৃত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকেই বাংলাদেশের আদালতে দণ্ডিত নূর চৌধুরীকে ফেরতের উপায় বের করতে মতৈক্য হয়। তিনি বলেন, এখন দুই দেশের কর্মকর্তারা বৈঠক করে বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার রায় কার্যকরের জন্য নূর চৌধুরীকে দেশে ফিরিয়ে আনার উপায় বের করবেন।

তিনি আরো বলেন, শেখ হাসিনার সঙ্গে জাস্টিন ট্রুডোর বৈঠকে সন্ত্রাসবাদ নিয়েও আলোচনা হয়। দুই নেতাই জঙ্গিবাদ ইস্যুকে একটি ‘বৈশ্বিক সমস্যা’ হিসেবে অভিহিত করে তা সমাধানে একসঙ্গে কাজ করার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন।

কানাডার প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের জঙ্গিবিরোধী অবস্থান এবং জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে চলমান অভিযানের প্রশংসা করেন বলেও তিনি জানান।

দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য বৃদ্ধি এবং বিনিয়োগ ও গার্মেন্ট পণ্যের রপ্তানির মতো বিষয়গুলো নিয়েও দুই প্রধানমন্ত্রী আলোচনা করেন। শেখ হাসিনা বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ জানালে কানাডার প্রধানমন্ত্রী আন্তরিকতার সঙ্গে তা গ্রহণ করেন। কানাডার প্রধানমন্ত্রী বলেন, তিনি ১২ বছর বয়সে তাঁর বাবা তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী পিয়েরে ট্রুডোর সঙ্গে বাংলাদেশ সফর করেছিলেন। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শিগগিরই বাংলাদেশ সফরে আগ্রহের কথা শেখ হাসিনাকে জানান জাস্টিন ট্রুডো।

কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, খুনি নূর চৌধুরীকে বাংলাদেশের ফেরত পাওয়ার প্রক্রিয়া বেশ জটিল হলেও এ নিয়ে আলোচনার সিদ্ধান্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। নূর চৌধুরী বর্তমানে কানাডার টরন্টোতে রয়েছেন। কানাডা ইতিপূর্বে একাধিকবার বলেছে, মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ার আশঙ্কা আছে এমন কোনো ব্যক্তিকে তারা ফেরত পাঠায় না। মৃত্যুদণ্ড হতে পারে এমন কোনো দেশে কোনো ব্যক্তিকে ফেরত না পাঠানোর বিষয়েও কানাডা আদালতের নির্দেশনা রয়েছে। বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড নিয়ে নূর চৌধুরীর প্রকাশ্য স্বীকারোক্তি ও বাংলাদেশে তাঁর বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডাদেশের বিষয়েও কানাডা অবগত।

তবে কানাডায় রাজনৈতিক আশ্রয়ের জন্য নূর চৌধুরীর আবেদন ২০০৭ সালেই প্রত্যাখ্যাত হয়েছে। এরপর তিনি বাংলাদেশে ফেরত গেলে তাঁর মৃত্যুঝুঁকির কথা উল্লেখ করে কানাডা সরকারের কাছে আবেদন করেছেন।

তিনিসহ ছয়জন জাতির জনক হত্যাকাণ্ডে মৃত্যুদণ্ডাদেশ নিয়ে বিদেশে পালিয়ে আছেন। তাঁদের ফিরিয়ে এনে আদালতের রায় কার্যকরের জনদাবি রয়েছে। আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকারের পক্ষ থেকে এ ব্যাপারে জোর প্রয়াস চালানো হচ্ছে। নূর চৌধুরী ছাড়াও পলাতক অন্যরা হলেন আব্দুর রশিদ, শরিফুল হক ডালিম, এম রাশেদ চৌধুরী, আব্দুল মাজেদ ও রিসালদার মোসলেম উদ্দিন।

বঙ্গবন্ধু হত্যামামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ১২ জনের মধ্যে পাঁচজনের ফাঁসি ২০১০ সালের ২৭ জানুয়ারি কার্যকর হয়। তাঁরা হলেন সৈয়দ ফারুক রহমান, সুলতান শাহরিয়ার রশিদ খান, মুহিউদ্দিন আহমদ (আর্টিলারি), বজলুল হুদা ও এ কে এম মহিউদ্দিন (ল্যান্সার)। এ ছাড়া পলাতক থাকা আজিজ পাশা ২০০১ সালের মাঝামাঝি জিম্বাবুয়েতে মারা যান বলে তথ্য পাওয়া যায়।

জানা গেছে, খুনি নূর চৌধুরীকে ফিরে পেতে বাংলাদেশ সরকার বেশ কয়েক বছর ধরেই প্রয়াস চালিয়ে আসছে। সম্ভাব্য জটিলতাকে আমলে নিয়ে কানাডায় আইনি প্রতিষ্ঠানকে কাজে লাগানোর বিষয়কেও সরকার গুরুত্ব দিয়েছে। নূর চৌধুরীকে ফেরত আনার উদ্যোগ নিতে গত বছর আগস্টে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলীকে চিঠি লেখেন। পরে পররাষ্ট্রমন্ত্রী গত বছর ১৪ সেপ্টেম্বর ফিরতি চিঠিতে অর্থমন্ত্রীকে বলেন, ‘এ কথা সত্য যে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের প্রত্যাবাসনে কানাডীয় সরকার অনমনীয় নীতি অনুসরণ করে থাকে। বিশেষত ২০০১ সালের যুক্তরাষ্ট্র বনাম বার্নস মামলার রায়ে কানাডার সুপ্রিম কোর্ট এ ধরনের স্বদেশ প্রত্যাবাসনের বিষয়ে কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করায় কানাডা সরকার নূর চৌধুরীকে প্রত্যাবাসনে তাদের অপারগতার কথা আমাদের জানিয়ে আসছে। তা সত্ত্বেও এ ক্ষেত্রে বিকল্প আর কী কী ব্যবস্থা নেওয়া যায়, সে বিষয়ে আমার মন্ত্রণালয় সম্ভাব্য সকল পন্থা অনুসন্ধান করে যাচ্ছে। এরই অংশ হিসেবে আমরা কানাডার বেশকিছু ল ফার্মের সঙ্গে কয়েক দফা আলোচনা করেছি। ’ আলোচনার একপর্যায়ে আমরা জানতে পেরেছি যে যুক্তরাষ্ট্র বনাম বার্নস মামলার রায়ে বলা হয়েছে, ‘ব্যতিক্রমী পরিস্থিতি ছাড়া কোনো ব্যক্তিকে অন্য দেশে ফেরত পাঠানো যাবে না, যেখানে তার মৃত্যুদণ্ড হতে পারে। ’ লক্ষণীয় বিষয় হলো রায়ে ‘ব্যতিক্রমী পরিস্থিতি’কে সংজ্ঞায়িত করা হয়নি। নূর চৌধুরীর প্রত্যাবাসনের বিষয়টি কানাডার আদালতে উত্থাপিত হলে প্রথমবারের মতো কানাডার সুপ্রিম কোর্টের এ বিষয়ে ব্যাখ্যা দেওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে বলে আশা করা যায় এবং তদপ্রেক্ষিতে নূর চৌধুরীর অপরাধের মাত্রা বিবেচনায় তা ‘ব্যতিক্রমী পরিস্থিতি’ হিসেবে বিবেচিত হওয়ার সম্ভাবনা থাকবে বলে আইনজীবীগণ মতামত দিয়েছেন।

অর্থমন্ত্রীকে পাঠানো চিঠিতে পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরো বলেছেন, ‘আইনজীবী সূত্রে আরো জানা গেছে যে নূর চৌধুরীর রিফিউজি স্ট্যাটাসের আবেদন ২০০৭ সালে কানাডা সরকার প্রত্যাখ্যান করেছে। ’ কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র বনাম বার্নস মামলার রায়ের ভিত্তিতে নূর চৌধুরী ‘তাঁকে বাংলাদেশে প্রত্যাবাসন করা হলে তাঁর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হবে’ এই মর্মে কানাডা সরকারের কাছে প্রি রিস্ক রিমোভাল অ্যাসেসমেন্টের (ডিআরআরএ) আবেদন করেছে। আইনজীবীগণ আমাদের জানিয়েছেন যে সাধারণত এ ধরনের আবেদন অত্যন্ত স্বল্প সময়ের মধ্যে নিষ্পন্ন করা হলেও নূর চৌধুরীর আবেদনটি বিগত ছয় বছর ধরে অনিষ্পন্ন রয়েছে, যা স্বাভাবিক নয় বলেই প্রতীয়মান হয়। এ কারণেই নূর চৌধুরীকে বাংলাদেশে প্রত্যাবাসনের কোনোই সম্ভাবনা নেই, এ পর্যায়ে আমরা তা মনে করছি না।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী লিখেছেন, “আমি বিশ্বাস করি, বঙ্গবন্ধুর পলাতক খুনিদের যেকোনো মূল্যে দেশে ফিরিয়ে এনে সাজা কার্যকর করার বিষয়ে আমাদের অবস্থান অভিন্ন এবং দৃঢ়। আর তাই এ বিষয়ে কোনো পথ বা প্রক্রিয়া অনাবিষ্কৃত রাখা সমীচীন হবে না বলে আমি মনে করি। এ সকল বিষয় বিবেচনায় নিয়েই প্রধানমন্ত্রী নূর চৌধুরীকে আইনি প্রক্রিয়ায় দেশে ফিরিয়ে এনে সাজা কার্যকর করার লক্ষ্যে কানাডীয় ল ফার্ম ‘টরিস এলএলপি’কে নিয়োগ এবং আইনি প্রক্রিয়া সংশ্লিষ্ট ব্যয় নির্বাহে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ‘আইনি সহায়তা’ খাতে প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দের প্রস্তাবসমূহে অনুমোদন প্রদান করেছেন। ”


মন্তব্য