kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ৮ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৭ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


সরকারি সার চুরির ধুম

আরিফুজ্জামান তুহিন   

১৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



সরকারি সার চুরির ধুম

বাল্ক ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল নামের একটি পরিবহন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান বিসিআইসির (বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন) নির্দিষ্ট বাফার গুদামে সার পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব পায় ২০১৪ সালে। ওই বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে চলতি বছরের জানুয়ারি পর্যন্ত ছয় লাখ ৪১ হাজার ৪৮৯ টন ইউরিয়া সার পৌঁছে দিতে প্রতিষ্ঠানটিকে ২০টি কার্যাদেশ দেয় বিসিআইসি।

তার মধ্যে গত ৩১ আগস্ট পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটি পৌঁছে দিয়েছে চার লাখ ২৬ হাজার ৭৭৫ টন। দুই লাখ ১৪ হাজার ৭১৪ টন সার এখনো বিসিআইসিকে বুঝিয়ে দেয়নি তারা। এ পরিমাণ সারের বাজারমূল্য ৭৩০ কোটি টাকারও বেশি (টনপ্রতি আমদানি মূল্য ৩৪ হাজার টাকা)। অথচ কার্যাদেশ পাওয়ার ২১ দিনের মাথায় নির্দিষ্ট গুদামে সার পৌঁছে দেওয়ার কথা।

এ বিষয়ে বাল্ক ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল বিসিআইসিকে জানিয়েছে, বাকি সার তাদের জিম্মায় ‘ট্রানজিটে’ রয়েছে। বিসিআইসির প্রয়োজনে তারা সার গুদামে পৌঁছে দেবে।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, বিসিআইসির গুদামে জায়গা না হওয়ায় পরিবহন ঠিকাদাররা সারের একটি অংশ নিজ খরচে অন্য কোনো গুদামে রাখেন। দীর্ঘদিন সেভাবেই পড়ে থাকে। একে ‘ট্রানজিট সার’ হিসেবে অভিহিত করেন ঠিকাদাররা। ট্রানজিটে থাকা এই সারের বেশির ভাগ অংশই পরে আর সরকারি গুদামে পৌঁছে না। কারণ ফেলে রাখার একপর্যায়ে সুযোগ বুঝে ঠিকাদাররা সেই সার খোলা বাজারে বিক্রি করে দেন।

কালের কণ্ঠের অনুসন্ধানে জানা গেছে, গত কয়েক বছরে ট্রানজিটের নামে অন্তত দেড় লাখ টন সার খোলাবাজারে বিক্রি করা হয়েছে, যার মূল্য ৫৪০ কোটি টাকা। আর প্রতিবছরই ট্রানজিট সারের পরিমাণ বাড়ছে। বিসিআইসির কর্মকর্তাদের হাত করে ট্রানজিটের নামে সরকারি সার বিক্রি করে দিচ্ছে কয়েকটি পরিবহন ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান। কালের কণ্ঠ’র অনুসন্ধানে এসব তথ্য জানা গেছে।

ট্রানজিটের নামে ব্যাপকহারে সার চুরি শুরু হয়েছে মূলত ২০১২ সাল থেকে। সার লোপাটে জড়িত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলো হলো পোটন অ্যান্ড ট্রেডার্স, এনসি, নবাব অ্যান্ড কম্পানি, এম আর ট্রেডিং, নূর ট্রেডিং, বিটি, রেক্স মটরস ও গ্রামসিকো লিমিটেড। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ও বিসিআইসির কিছু কর্মকর্তা মিলে সার লোপাটের সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছে। গত চার বছরে প্রভাবশালী এই সিন্ডিকেট ট্রানজিটের নামে সার বিক্রি করে হাতিয়ে নিয়েছে বিপুল অর্থ। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি সার লোপাট হয়েছে ২০১২ ও ২০১৩ সালে।   

জানা যায়, কৃষকের কাছে চাহিদা অনুযায়ী সার দিতে বিসিআইসি সারা দেশে ২৪টি বাফার গুদামে ইউরিয়া সার মজুদ করে। এ ছাড়া দেশের সাতটি ইউরিয়া সার কারখানাসহ বিসিআইসির ১৫টি কারখানা মিলিয়ে সারা দেশে বিসিআইসির ৩৯টি স্থানে প্রায় সাড়ে তিন লাখ টন ইউরিয়া সারা মজুদ করা যায়। গুদামের বাইরে খোলা জায়গায় আরো এক থেকে দেড় লাখ টন সার মজুদ করা হয়। সব মিলিয়ে বিসিআইসির নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় সারা দেশে প্রায় পাঁচ লাখ টন সার মজুদ রাখা যায়।

প্রতিবছর সারের চাহিদা থাকে ২৫ থেকে ২৬ লাখ টন। এর মধ্যে বিসিআইসি গড়ে প্রতিবছর আমদানি করে প্রায় ১৪ লাখ টন ইউরিয়া। আরো ১৩ থেকে ১৪ লাখ টন সার দেশের সাতটি কারখানায় উৎপাদিত হয়। এই বিপুল পরিমাণ সার বিসিআইসির নিজস্ব গুদামে রাখার জায়গা নেই। আর বিসিআইসির গুদাম সংকটেরই সুযোগ নিয়েছে ওই সিন্ডিকেট।  

জানা গেছে, আমদানি করা সার চট্টগ্রাম ও মংলা বন্দর থেকে পরিবহন ঠিকাদারদের মাধ্যমে সারা দেশে বিসিআইসির ৩৯টি স্থানে গুদামজাত করার জন্য পাঠানো হয়। নিয়ম অনুযায়ী, বন্দর থেকে সার বুঝে নেওয়ার পর সর্বোচ্চ ২১ দিনের মধ্যে পরিবহন ঠিকাদারদের সেই সার সংশ্লিষ্ট গুদামে পৌঁছে দেওয়ার কথা। তবে সেই সারের একটি বড় অংশ শেষ পর্যন্ত কখনোই গুদামে পৌঁছে না। এসব সার ‘ট্রানজিট’ সার হিসেবে দেখায় পরিবহন ঠিকাদাররা। বিসিআইসি সারের হিসাব নেওয়া শুরু করলে ঠিকাদাররা নতুন করে পরিবহনের জন্য বরাদ্দ পাওয়া সার থেকে আগের ঘাটতি মিটিয়ে দেয়। তখন আবার নতুন সারের ক্ষেত্রে ট্রানজিট দেখায় তারা। নতুন বরাদ্দ না থাকলে কখনো কখনো তারা বাজার থেকে অল্প পরিমাণ সার কিনে বিসিআইসিকে বুঝিয়ে দিয়ে বলে, বাকিটা ট্রানজিটে আছে।

নাম না প্রকাশ করার শর্তে বিসিআইসির এক কর্মকর্তা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘পরিবহন ঠিকাদাররা ২১ দিনের মধ্যে বিসিআইসির নির্দিষ্ট বাফার গুদাম বা কারখানার গুদামে সার পাঠাবেন—এটাই আমাদের সঙ্গে তাঁদের চুক্তি। কিন্তু আমাদের গুদামে স্থান সংকট রয়েছে। এই সুযোগে ঠিকাদাররা কিছু সার বাফার গুদামে দিয়ে বাকিটা দেশের বিভিন্ন স্থানে গুদাম ভাড়া করে মজুদ করেন। পরে তাঁরা এসব সার বাজারে বিক্রি করে দেন। আমরা হিসাব চাইলে তাঁরা বলেন, সার ট্রানজিটে আছে। এই চুরির সঙ্গে প্রভাবশালী কর্মকর্তারাও জড়িত। ’

কী পরিমাণ সার ট্রাজনিটে রয়েছে, তা জানতে ২০১২ সালের ৩১ জুলাই বিসিআইসির ঊর্ধ্বতন মহাব্যবস্থাপক (নিরীক্ষা) এস এম মিজানুর রহমানকে সভাপতি করে চার সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়। কমিটি ২০১৩ সালের ১৫ এপ্রিল বিসিআইসির বোর্ড সভায় প্রতিবেদন জমা দেয়। তাতে জানানো হয়, ২০১০-১১ অর্থবছরে ৩০ হাজার টন, ২০১১-১২ অর্থবছরে ২২ হাজার টন এবং ২০১২-১৩ অর্থবছরে দুই লাখ ২৮ হাজার টন সার ট্রানজিটে ছিল। প্রতিবেদন দেওয়ার সময় পর্যন্ত ট্রানজিট সারের পরিমাণ ছিল দুই লাখ ৫৩ হাজার টন।

কালের কণ্ঠ’র অনুসন্ধানে জানা গেছে, ২০০৭ সালে ট্রানজিট সারের পরিমাণ ছিল মাত্র ৮৫১ টন।   বাড়তে বাড়তে ২০১৪ সালে তার পরিমাণ দাঁড়ায় এক লাখ ৭৩ হাজার টনে। গত বছর ট্রানজিট সারের পরিমাণ ছিল এক লাখ ৬৭ হাজার টন। চলতি অর্থবছরে এখন পর্যন্ত ট্রানজিট সারের পরিমাণ চার লাখ টনের বেশি। তার মধ্যে লোপাট করা হয়েছে অন্তত দেড় লাখ টন।  

ট্রানজিটের নামে সার মজুদ করায় যাতে বিপাকে পড়তে না হয় সে জন্য ঠিকাদাররা বিসিআইসিকে একটি চিঠি দিয়ে রাখেন। তাতে বলা হয়, বিসিআইসির নির্দিষ্ট গুদামে জাগয়া না থাকায় সার পরিবহনে সংকট তৈরি হচ্ছে। বিসিআইসি তাদের সার রাখতে না পারায় এখন তা ভাড়া করা গুদামে রাখতে হচ্ছে। এ জন্য পরিবহন মালিককে জরিমানা দিতে হবে বিসিআইসির।

জানা গেছে, যশোরের নোয়াপাড়া, পাবনার নগরবাড়ী, সিরাজগঞ্জের বাঘাবাড়ী, বগুড়ার শান্তাহার এবং বরিশাল ও রাজশাহীসহ দেশের বেশ কিছু জায়গায় নিজস্ব অর্থায়নে মাসের পর মাস সার মজুদ করে রাখেন পরিবহন ঠিকাদাররা। সুযোগ বুঝে এসব সারের একটি অংশ ভেজাল মিশিয়ে চোরাই বাজারে বিক্রি করে তাঁরা।

সার লোপাটের সিন্ডিকেট : ২০১১ সালের পর থেকেই ইউরিয়া সার লোপাটের পরিমাণ বেড়েছে। অভিযোগ রয়েছে, ট্রানজিটের নামে সরকারি সার লোপাটের এ চক্রের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন বিসিআইসির মহাব্যবস্থাপক সৈয়দ জাকির হোসেন, অতিরিক্ত প্রধান মহাব্যবস্থাপক মো. নুর নবী, ব্যবস্থাপক সৈয়দ খুরশিদ হাশেম ও উপব্যবস্থাপক রেজাউল করিম। বিসিআইসির অসাধু কর্মকর্তাদের সঙ্গে মিলে পোটন অ্যান্ড ট্রেডার্স, এনসি, নবাব অ্যান্ড কম্পানি, এম আর ট্রেডিং, নূর ট্রেডিং, বিটি, বাল্ক ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল, রেক্স মটরস ও গ্রামসিকো ট্রানজিট সারের বড় অংশ খোলাবাজারে বিক্রি করে।  

অনুসন্ধানে জানা গেছে, ২০০৯-১০ অর্থবছর থেকে ২০১৩-১৪ অর্থবছর পর্যন্ত চট্টগ্রাম ও মংলা বন্দর থেকে ৪৯ লাখ ১৫৩ হাজার টন সার পরিবহন ঠিকাদারদের মাধ্যমে সারা দেশের গুদামে পাঠানোর কার্যাদেশ দেওয়া হয়। এর মধ্যে নবাব অ্যান্ড কম্পানি ছয় লাখ ২৩ হাজার ৭২৯ টন, নূর ট্রেডিং ২১ হাজার ৩০০ টন এবং এম আর ট্রেডিং ১৪ হাজার ৬৮৯ টন সার পরিবহনের দায়িত্ব পায়। এই তিন পরিবহনের কাছ থেকে অন্তত এক লাখ টন সার লোপাট হয়েছে। বাল্ক ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল ২০১৪ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি থেকে গত ৭ জানুয়ারি পর্যন্ত ছয় লাখ ৪১ হাজার ৪৮৯ টন সার পরিবহনের বরাদ্দ পায়। এর মধ্যে দুই লাখ ১৪ হাজার ৭১৪ টন সার প্রতিষ্ঠানটি এখনো বিসিআইসিকে বুঝিয়ে দেয়নি।

ট্রানজিটের সার চুরির দায়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে আটক হওয়ারও নজির রয়েছে। নূর টেড্রিংয়ের স্বত্বাধিকারী ইলিয়াস চেয়ারম্যান সার লোপাটের অভিযোগে ২০০৫ সালে র‍্যাবের হাতে আটক হয়েছিলেন। এ ঘটনায় তাঁকে জেলও খাটতে হয়। আর চুরি ধরা পড়ায় এম আর ট্রেডিংয়ের মালিক দেশই ত্যাগ করেছেন।

বিসিআইসির প্রতিবেদনেই লোপাটের সত্যতা : বিসিআইসির একটি কমিটিও অনুসন্ধানে ট্রানজিটের নামে সার লোপাটের অভিযোগের সত্যতা পেয়েছে। ২০১২ সালের জুনে আমদানি করা ইউরিয়া নিয়ে তিনটি জাহাজ বাংলাদেশে আসে। এসব জাহাজে ৮০ হাজার ২৫০ টন সার আমদানি করে বিসিআইসি। তার মধ্যে পাঁচ হাজার ৫০৫ টন সারের হদিস না পাওয়ায় ২০১২ সালের ৮ নভেম্বর বিসিআইসির ব্যবস্থাপক (অর্থ) মো. লুত্ফর রহমানকে প্রধান করে চার সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়। ওই কমিটি ২০১৩ সালের ৪ জুন প্রতিবেদন জমা দেয়। তাতে সার লোপাটের জন্য কয়েকটি পরিবহন ঠিকাদার ও বিসিআইসির বেশ কয়েকজন কর্মকর্তাকে অভিযুক্ত করা হয়।

প্রতিবেদন সূত্রে জানা গেছে, তিনটি জাহাজের মধ্যে গালফ সাগরা ও মারিয়া এনএম ভেড়ে চট্টগ্রাম বন্দরে, ডায়মন্ড ফেলকন ভেড়ে মংলায়। তিন জাহাজের সার বিসিআইসির গুদামে পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব পায় নবাব অ্যান্ড কম্পানি, বাল্ক ট্রেডার্স ইন্টারন্যাশনাল, পোটন ট্রেডার্স, গ্রামসিকো লিমিটেড, এম আর ট্রেডিং ও রেক্স মটরস। এর মধ্যে পোটন ট্রেডার্স এক হাজার টন সার নির্দিষ্ট সময়ের আট মাস পরে সংশোধনী বরাদ্দপত্রের মাধ্যমে বিসিআইসির গুদামে পৌঁছে দেয়। নবাব অ্যান্ড কম্পানি দুই বছর পরও বরাদ্দ করা ৩৬০ টন সার পটুয়াখালীর বাফার গুদামে পৌঁছে দেয়নি। রেক্স মটরসও ১৯২ টন সার পৌঁছে দেয়নি বাফার গুদামে। আর খোয়া যাওয়া বাকি সারের হদিস মেলেনি আজ অবধি।

কমিটি বিসিআইসির মহাব্যবস্থাপক সৈয়দ জাকির হোসেন, অতিরিক্ত প্রধান মহাব্যবস্থাপক মো. নূর নবী, ব্যবস্থাপক সৈয়দ খুরশিদ হাশেম, ক্রয় বিভাগের কর্মকর্তা মো. কামরুজ্জামান, মহাব্যবস্থাপক (ক্রয়) খোকন চন্দ্র দাস, বিসিআইসি শাখা অফিসের উপমহাব্যবস্থাপক শহীদুল আলম, উপব্যবস্থাপক শেখ আরিফুজ্জামান, মো. সোহেল রানাকে অভিযুক্ত করে। তবে তাঁদের বিরুদ্ধে কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়নি বিসিআইসি কর্তৃপক্ষ।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, এম আর ট্রেডিং রংপুর বাফার গুদামে এক হাজার ৬১০ টন সার পৌঁছে দেয়নি। এ জন্য তাদের বারবার তাগিদ দেওয়া হয়। সর্বশেষ গত ৭ ফেব্রুয়ারিও সার পৌঁছে দিতে তাদের চিঠি দেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, ট্রানজিটের কথা বলে বিভিন্ন সময় ওই সার তারা লোপাট করেছে।  

বিসিআইসির ‘সাজানো’ প্রতিবেদন : দেশের ৩৯টি স্থানে নিজেদের বিভিন্ন গুদামে কী পরিমাণ সার মজুদ আছে, বিসিআইসি তার একটি তালিকা তৈরি করে গত জুলাইয়ে। ওই তালিকা পরে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। তাতে দাবি করা হয়, ২০১৫-১৬ অর্থবছরের জন্য ইউরিয়া সার আমদানি করা হয়েছিল ১৫ লাখ ৫৯ হাজার ৭৬ টন। সারা দেশের বাফার গুদামে পরিবহন ঠিকাদাররা ১২ লাখ ২৯ হাজার ১৯০ টন সার পৌঁছে দিয়েছে। গুদামে না পৌঁছা তিন লাখ ২৯ হাজার ৮৮৬ টন সারকে ট্রানজিট হিসেবে দেখানো হয়েছে। প্রতিবেদনে ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ট্রানজিট সারের পরিমাণ দেখানো হয়, এক লাখ ৫০ হাজার ২৯৮ টন।

তবে বিসিআইসির একটি সূত্র নিশ্চিত করেছে, প্রতিবেদনে ট্রানজিট সারের পরিমাণ ইচ্ছা করে কম দেখানো হয়েছে। কারণ চলতি বছরে ট্রানজিট সারের পরিমাণ হবে অন্তত চার লাখ ৪৩ হাজার টন। এর মধ্যে লোপাট করা হয়েছে অন্তত দেড় লাখ টান।

অভিযোগ আমলে নেয়নি বিসিআইসি : দিনাজপুরের জেলা প্রশাসক গত ১৪ মার্চ স্থানীয় পুলহাটের বাফার গুদামে সারের প্রকৃত মজুদ গণনার জন্য গুদাম ব্যবস্থাপককে চিঠি দিয়ে এ কাজে সহায়তার জন্য অনুরোধ করেন। তখন বিসিআইসির পক্ষ থেকে জেলা প্রশাসককে চিঠি দিয়ে বলা হয়, ধারণক্ষমতার বেশি সার এ গুদামে লট আকারে রাখা হয়েছে। আগামী অর্থবছরে সারের মজুদ কমে এলে তখন গোনা যাবে—এখন সারের মজুদ গণনা করা সম্ভব নয়।

ওই গুদামে গত ২৫ এপ্রিল রহস্যজনকভাবে আগুন ধরে যায়। কালের কণ্ঠ’র দিনাজপুর প্রতিনিধি সালাহ উদ্দিন আহমেদ বিভিন্ন সূত্রে খবর নিয়ে জানান, গুদামে ২০ হাজার টন ইউরিয়া সার মজুদ ছিল।

আগুন নেভার পর ওই দিন ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের প্রশিক্ষণ কর্মকর্তা নিখিল বিশ্বাস। এ সময় গুদামের ইনচার্জ মাসুদ রানা বিভাগীয় সম্মেলনে যোগ দিতে রংপুরে ছিলেন। তবে গুদামের দায়িত্বে থাকা দিজেন্দ্রনাথ রায় বারবার অনুরোধ সত্ত্বেও নিখিল বিশ্বাসকে রেজিস্টার দেখাননি। ফলে কী পরিমাণ সার ছিল আর কী পরিমাণ সার পুড়ে গেছে তা জানা সম্ভব হয়নি।

ট্রনজিটের নামে সার চুরির বিষয়ে জানতে চাইলে বিসিআইসির চেয়ারম্যান মোহাম্মদ ইকবাল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ট্রানজিটের সার অবশ্যই বাস্তবে থাকতে হবে। অন্যথায় দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বাফার গুদামগুলোর হিসাব মেলাতে কিছু কর্মকর্তাকে দায়িত্ব দিয়েছি। তাদের সঙ্গে একজন করে ম্যাজিস্ট্রেটকেও দায়িত্ব দিয়েছি। আশা করছি তাঁরা হিসাব মেলাতে পারবেন। হিসাব মেলাতে না পারলে কারা এর সঙ্গে জড়িত তা খুঁজে বের করব। ’

অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেওয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘এসব ঘটনা আমার যোগদানের আগের। এর মধ্যে অভিযুক্ত কেউ কেউ অবসরেও চলে গেছেন। ’


মন্তব্য