kalerkantho

সোমবার । ৫ ডিসেম্বর ২০১৬। ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৪ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


সাইবার আক্রমণ

এনবিআরের তথ্য চুরির শঙ্কা, নিরাপত্তায় জোর

ফারজানা লাবনী   

১৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



এনবিআরের তথ্য চুরির শঙ্কা, নিরাপত্তায় জোর

বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার পর এবার হ্যাকাররা সরকারের গুরুত্বপূর্ণ সংস্থা জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্যও চুরি করতে পারে বলে শঙ্কা প্রকাশ করেছে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের তিন গোয়েন্দা সংস্থা। তাই হ্যাকিংয়ের হাত থেকে বাঁচতে জরুরিভাবে চার স্তরবিশিষ্ট নিরাপত্তা বলয় তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে এনবিআর।

প্রযুক্তিগত এই নিরাপত্তা বলয় তৈরিতে সহায়তা নেওয়া হবে বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিলের। এনবিআরের দায়িত্বশীল সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

হ্যাকিংয়ের মাধ্যমে এনবিআরের সাইট ও কম্পিউটার থেকে যাতে কোনো তথ্য চুরির ঘটনা না ঘটে এ জন্য অর্থ মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের তিনটি গোয়েন্দা সংস্থা কঠোর নজরদারি করছে। সংস্থাগুলো হলো এনবিআরের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা শাখা সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স সেল (সিআইসি), ভ্যাট নিরীক্ষা ও তদন্ত অধিদপ্তর (ভ্যাট গোয়েন্দা) এবং শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর (শুল্ক গোয়েন্দা)। সম্প্রতি এনবিআরের তথ্য হ্যাকিংয়ের আশঙ্কা করে এ বিষয়ে জোরালো প্রতিরোধ গড়ে তোলার সুপারিশ জানিয়ে এনবিআর চেয়ারম্যান মো. নজিবুর রহমানের দপ্তরে পৃথক তিনটি চিঠি পাঠিয়েছে ওই তিন গোয়েন্দা সংস্থা। এ সতর্কতাকে জরুরি বিবেচনা করে চেয়ারম্যান তিন গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তাদের নিয়ে ছয় সদস্যের টাস্কফোর্স গঠন করে প্রতিরোধের নির্দেশ দিয়েছেন। এ কমিটির আহ্বায়ক এনবিআর চেয়ারম্যান নিজেই।

সিআইসির চিঠিতে বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক পর্যায়ের বড় মাপের কিছু চোরাকারবারি (অর্থ, সোনা ও মাদক পাচারকারী) অস্ত্র, গোলাবারুদ, বিস্ফোরক ও জাল অর্থ বাংলাদেশে সরবরাহে বাংলাদেশের কিছু অসাধু ব্যক্তির সঙ্গে হাত মিলিয়েছে। এসব ব্যক্তির অনেকের তথ্য সিআইসি এবং ট্রান্সফার প্রাইজিং সেলের প্রযুক্তিগত তথ্যভাণ্ডারে গচ্ছিত আছে। আবার বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের কিছু রাজস্ব ফাঁকিবাজ ব্যবসায়ীর অর্থপাচার ও রাজস্ব ফাঁকির তথ্যও সিআইসির ফরেনসিক ল্যাবে তদন্তের কাজ চলছে। যা হ্যাকিংয়ের মাধ্যমে স্থানান্তর বা নষ্ট করে ফেলার চেষ্টা করা হচ্ছে। তারা হ্যাকিং করে ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানের আয়-ব্যয়ের হিসাব, স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের পরিমাণ, আমদানি-রপ্তানি, ব্যবসায়িক লেনদেন, রাজস্বসংক্রান্ত হিসাবের তথ্য নষ্ট ও পরিবর্তন করে রাজস্ব ফাঁকি দিতে পারে। এ ছাড়া এনবিআরকে বিপাকে ফেলতে সাধারণ করদাতাদের রাজস্বসংক্রান্ত গোপন তথ্যও ফাঁস করে দিতে পারে।

প্রসঙ্গত, পুরনো ১০ ডিজিটের টিআইএন বাতিল করে ই-টিআইএন প্রদানের মধ্য দিয়ে ২০১৩-১৪ অর্থবছর থেকে এনবিআর অটোমেশনে যাত্রা শুরু করে। চলতি বছরের শুরু থেকে এনবিআর পর্যায়ক্রমে ই-ফাইলিংয়ে যাচ্ছে। এরই মধ্যে বৃহৎ করদাতা ইউনিটের আওতায় থাকা উচ্চ আয়ের করদাতাদের তথ্য এনবিআরের ভাণ্ডারে গচ্ছিত রাখার কাজ শেষের পথে। এই করদাতাদের এবার অনলাইনে আয়কর রিটার্ন পরিশোধের সুযোগ রাখা হয়েছে।

এনবিআর সূত্র জানায়, ই-টিআইএনধারী করদাতার ই-ফাইলিংয়ে থাকা তথ্য থেকে করদাতার কর অঞ্চল, কর সার্কেল, আয়-ব্যয় সঞ্চয় সম্পদের পরিমাণ ও তা বৃদ্ধির পরিমাণ, করের পরিমাণ, করদাতার পেশা, পরিবারের সদস্যসংখ্যা, তাদের সম্পদের পরিমাণ ও সদস্যদের করের পরিমাণ জানা যায়। আয়কর বিভাগের তথ্যভাণ্ডার হ্যাকিংয়ের মাধ্যমে রাজস্ব পরিশোধ ও বকেয়ার হিসাব পরিবর্তনেরও আশঙ্কা রয়েছে।

গত ২০১৫-১৬ অর্থবছর থেকে অনলাইনে আমদানি-রপ্তানিসহ শুল্কসংক্রান্ত তথ্য যাচাই-বাছাই ও গচ্ছিত রাখতে এসআইকোডা ওয়ার্ল্ড সফটওয়্যার ব্যবহার শুরু হয়েছে। বর্তমানে এ সফটওয়্যারের আপডেট ভার্সন এসআইকোডা ওয়ার্ল্ড প্লাস প্লাস ব্যবহার করা হচ্ছে। সম্প্রতি এনবিআরের তদন্ত প্রতিবেদনে বন্ড সুবিধার অপব্যবহার করে অর্থপাচারের তথ্য পাওয়া যায়। সংসদীয় কমিটির সুপারিশে এনবিআর বন্ড-সংক্রান্ত কার্যক্রম অনলাইনে পরিচালনার উদ্যোগ নিয়েছে। এ ছাড়া শুল্ক দপ্তরগুলোর মধ্যে এবং এনবিআরের মূল দপ্তরের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপনের ক্ষেত্রেও এসআইকোডা সফটওয়্যার ব্যবহার করা হচ্ছে। সব প্রক্রিয়া শেষে আমদানি-রপ্তানিকারকের তথ্য, চালান, ব্যাংকের এলসির তথ্যসহ কোন দেশে কোন প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে ক্রয় বা বিক্রি হচ্ছে, কী পরিমাণ রাজস্ব পাওনা এবং কতটা পরিশোধ হচ্ছে তা শুল্ক বিভাগের তথ্যভাণ্ডারে স্বয়ংক্রিয়ভাবে জমা হবে। হ্যাকিংয়ের মাধ্যমে এসব তথ্য নষ্ট বা পরিবর্তন করে অসাধু ব্যবসায়ীরা রাজস্ব ফাঁকি দিতে পারে।

এনবিআরের আওতাধীন শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ডিজি) ড. মইনুল খান কালের কণ্ঠকে বলেন, এনবিআরের শুল্ক বিভাগ ম্যানুয়াল পদ্ধতি ছেড়ে দ্রুত অটোমেশনে যাচ্ছে। শুল্ক বিভাগ কাগজহীন দপ্তরে পরিণত হবে। বর্তমানে চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর ও তিনটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তথ্য আধুনিক সফটওয়্যারের মাধ্যমে মূল দপ্তরের সঙ্গে আদান-প্রদান এবং গচ্ছিত রাখার কাজ চলছে। হ্যাকিংয়ের মাধ্যমে কেউ এসব তথ্য মুছে ফেললে বা নিজের কাছে নিয়ে বা পরিবর্তন করলে শুল্ক খাতে বড় ধরনের বিপর্যয় হবে। এ ধরনের বিপর্যয় রোধে এনবিআর বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিলের সহায়তায় প্রতিরোধ গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

শুল্ক গোয়েন্দা থেকে পাঠানো চিঠিতে বলা হয়েছে, বন্ড সুবিধার অপব্যবহারকারীদের নিয়ে এনবিআর প্রতিবেদন তৈরি করে তদন্ত করছে। এ তদন্তে আন্তর্জাতিক পর্যায়ের ক্রেতা-বিক্রেতা প্রতিষ্ঠানের এবং ব্যাংকের এলসি-সংক্রান্ত তথ্য সমন্বয় করে তদন্তকাজ চলছে। অনলাইনে বিভিন্ন দেশের রাজস্ব দপ্তরের সঙ্গে এসব তথ্য আদান-প্রদান হচ্ছে। তদন্তকাজে বিঘ্ন ঘটাতে এসব তথ্য হ্যাকিংয়ের আশঙ্কা করা হচ্ছে।     

বর্তমানে এনবিআরের ভ্যাট নিবন্ধিত ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা প্রায় সাড়ে সাত লাখ। অনলাইনে নিবন্ধিত সম্পূর্ণ নতুন নম্বরে আগামী অর্থবছর থেকে অনলাইনে ভ্যাট পরিশোধ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এরই মধ্যে প্রায় দুই হাজার বড় মাপের ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানের ব্যবসার ধরন, ভ্যাট পরিশোধের ও বকেয়ার পরিমাণসহ বিভিন্ন তথ্য এনবিআরের তথ্যভাণ্ডারে যোগ করার কাজ চলছে।  

এসব প্রতিষ্ঠান কী পরিমাণ পণ্য কোন সময়ে কত মূল্যে বিক্রি করবে তার তথ্য এনবিআরের ভ্যাট শাখায় অনলাইনে চলে যাবে এবং পণ্য বিক্রির সঙ্গে সঙ্গে হিসাবমতো ভ্যাট এনবিআরের কোষাগারে যোগ হবে। কোন প্রতিষ্ঠান এক মাসের ভ্যাট খাতে রাজস্ব পরের মাসের ১৫ তারিখের পর পরিশোধ করলে তা আর এনবিআর গ্রহণ করবে না। এনবিআর চেয়ারম্যানসহ সংশ্লিষ্ট শাখার কর্মকর্তারা বিশেষ কোডের মাধ্যমে এনবিআরের তথ্যভাণ্ডার থেকে এসব তথ্য দেখতে পারবেন।

এ বিষয়ে সদস্য (ভ্যাটনীতি) শাখার সদস্য ব্যারিস্টার জাহাঙ্গীর হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, বর্তমানে দেশের বড় মাপের অনেক প্রতিষ্ঠানের তথ্য অনলাইন প্রকল্পের আওতায় এনবিআরের তথ্যভাণ্ডারে যোগ করা হচ্ছে। হ্যাকিংয়ের মাধ্যমে এসব তথ্য পরিবর্তনের সুযোগ রয়েছে। এ অপচেষ্টা আটকাতে পৃথক নিরাপত্তা বলয় তৈরি করা হচ্ছে।

এনবিআর চেয়ারম্যান মো. নজিবুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ২০১৩ সাল থেকে এনবিআর অটোমেশনে কাজ করতে প্রস্তুতি নিচ্ছে। গত কয়েক বছরে প্রস্তুতি শেষের পথে। এখন এনবিআর বড় বড় রাজস্বসংক্রান্ত অপরাধের তদন্তে আগের চেয়ে সক্ষম। একই সঙ্গে দেশের করদাতা ও ব্যবসায়ীদের সব তথ্যও দেখভালের কাজ শুরু হয়েছে অনলাইনে। প্রযুক্তি যত এগিয়ে যাবে এর অপব্যবহারের আশঙ্কাও তত বাড়বে। এনবিআর রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ সংস্থা। এ প্রতিষ্ঠানের তথ্য সুরক্ষায় অচিরেই চার স্তরবিশিষ্ট নিরাপত্তা বলয় তৈরির কাজ শুরু হবে। এনবিআরের তথ্য হ্যাকিং হলে রাষ্ট্রের নিরাপত্তাব্যবস্থায় বড় ধরনের বিপর্যয় হবে। তাই প্রতিরোধ নেওয়া হচ্ছে।

নজিবুর রহমান আরো বলেন, ‘আমাদের তিন শাখার গোয়েন্দারা অত্যন্ত সক্রিয়। তারা এ বিষয়ে সতর্ক আছে। তাদের তত্ত্বাবধানে এ কাজ চলছে। ’


মন্তব্য