kalerkantho

শনিবার । ৩ ডিসেম্বর ২০১৬। ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ২ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


ব্রিটিশ আমলের আইন সংস্কারের তাগিদ

রেজাউল করিম   

১৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



ব্রিটিশ আমলের আইন সংস্কারের তাগিদ

আমাদের বিচারব্যবস্থা এখনো সম্পূর্ণ নির্ভরশীল ব্রিটিশদের প্রণীত ফৌজদারি, দেওয়ানি কার্যবিধি, দণ্ডবিধিসহ বিভিন্ন আইনের ওপর। অথচ পরিবর্তিত পরিস্থিতিতেও ২০০ বছরের পুরনো আইনগুলো সংস্কার করা হয়নি।

আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ সংস্কার এখন সময়ের দাবি।

আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন আইনজীবী আজমালুল হোসেন কিউসি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ব্রিটিশরা ছিল এখানে রুলিং ক্লাস, কলোনিয়াল। তারা চিন্তা করেছিল, তাদের সিস্টেমের মধ্যে ঢুকানো গেলে এ দেশের নাগরিকদের কবজায় আনা সহজ হবে। মাত্র কয়েকজন ব্রিটিশ নাগরিক এসে আমাদের কবজা করেছে। তারা বিচার ও শাসনব্যবস্থা একজনের হাতে রেখে সেই ধাঁচেই আইন প্রণয়ন করেছে। অথচ তাদের নিজের দেশের বিচার ও শাসনব্যবস্থা আলাদা। অথচ আজও আমরা ওই কলোনিয়াল আইনে বিচারব্যবস্থাসহ আরো অনেক কিছু পরিচালনা করছি। এর একটি ফল হলো, আমাদের বিচারিক ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের মধ্যে টানাপড়েন। নির্বাহীরা আবার ম্যাজিস্ট্রেট হয় কী করে? এ কাজ করে গেছে ব্রিটিশরা। ’ তিনি আরো বলেন, ‘ব্রিটিশরা এ দেশ ছাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ওদের তৈরি আইনগুলো বঙ্গোপসাগরে ফেলে দেওয়া উচিত ছিল। আমি এখনো মনে করি সেটাই করা উচিত হবে। অথবা সেগুলো সংস্কার করে আমাদের উপযোগী করে নিতে হবে। ’

আইন বিশেষজ্ঞ ড. শাহদীন মালিক কালের কণ্ঠকে বলেন, প্রতিটি আইন পরিবর্তনশীল। সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আইনও পরিবর্তন হয়। এখন অনেক আইন পরিবর্তন হচ্ছে, নতুন আইন হচ্ছে সরকারের স্বার্থরক্ষায়। তবে জনগণের স্বার্থরক্ষাকারী আইনগুলো সংস্কারে সরকারের আগ্রহ কম।   

শাহদীন মালিক আরো বলেন, আইন তৈরি করে জাতীয় সংসদ। অথচ এখন বেশির ভাগ সংসদ সদস্যের আইন সম্পর্কে ধারণা কম। তাহলে আইন কিভাবে সংস্কার হবে, গণমুখী নতুন আইন হবে? আবার আইন কমিশন সংস্কারের যেসব সুপারিশ করে, অনেক ক্ষেত্রে সরকার তা আমলে নেয় না।

আইন কমিশনের সদস্য ড. এম শাহ আলম বলেন, ‘কমিশনের মূল কাজ হলো সংশোধন, বাতিল ও নতুন আইন প্রণয়নের সুপারিশ করা। আমরা সেটাই করছি। সরকার তা আমলে নেবে কি না তা দেখার দায়িত্ব আমাদের নয়। আমরা অনেক সময় সরকারের অনুরোধে প্রতিবেদন তৈরি করি আবার কখনো নিজেরাই উদ্যোগী হয়ে সুপারিশ করে থাকি। যার অনেকটিই কাজে আসে না। আবার পারিবারিক সহিংসতা (প্রতিরোধ ও সুরক্ষা) আইন, নিরাপদ খাদ্য আইনসহ বেশ কিছু ভালো আইন হয়েছে কমিশনের সুপারিশ ও খসড়া অনুসরণ করেই। ’

বিশিষ্ট আইনজীবী ব্যারিস্টার রফিক-উল হক বলেন, ‘২০০ বছর আগের আইন দিয়ে দ্রুত ন্যায়বিচার করা সম্ভব নয়। ফৌজদারি কার্যবিধি প্রণয়ন করেছে ব্রিটিশরা। তাদের দেশেও বহুবার তা সংশোধন করে সময়োপযোগী করা হয়েছে। আর আমরা ২০০ বছর পিছিয়ে আছি। ’

বহুল আলোচিত তনু হত্যাকাণ্ডের কয়েক দিন পর একটি অনুষ্ঠানে প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা বলেছিলেন, এটি একটি আধুনিক অপরাধ। ১৮৯৮ সালের ফৌজদারি আইনে তদন্ত করে এর বিচার করা যাবে না। এ ঘটনার তদন্ত করতে হবে নতুন ডিজিটালাইজড পন্থায়। বর্তমান সমাজব্যবস্থার সঙ্গে প্রচলিত ফৌজদারি আইনের মিল নেই। একে ঢেলে সাজাতে হবে।

ব্যারিস্টার রফিক-উল হক আরো বলেন, শুধু ফৌজদারি কার্যবিধি নয়, অনেক আইনেরই সংস্কার দরকার। আর কাজে লাগে না এমন আইনগুলো বাতিল করা প্রয়োজন।

সংস্কারের সুপারিশ কার্যকর হয় না : ১৯৯৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর গত ২০ বছরে ১৪২টি আইন সংস্কারের সুপারিশ করেছে আইন কমিশন। এর বেশির ভাগই আমলে নেয়নি সরকার। যদিও আইন কমিশনের সুপারিশ কার্যকর করার ক্ষেত্রে কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। কিন্তু কমিশন গঠন করা হয়েছে আইনকে যুগোপযোগী করার জন্যই।

১৯৯৬ সালে প্রতিষ্ঠার পর সর্বপ্রথম প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনাল আইন সংশোধনের সুপারিশ করে কমিশন। ১৯৯৭ সালে ক্রিমনাল ল সংশোধনসহ মোট ৯টি সুপারিশ করা হয়। এরপর ১৯৯৮ সালে সাতটি, ১৯৯৯ সালে ১১টি, ২০০০ সালে পাঁচটি, ২০০১ সালে আটটি, ২০০২ সালে ১১টি, ২০০৩ সালে ১২টি, ২০০৫ সালে ছয়টি, ২০০৬ সালে তিনটি, ২০০৭ সালে ১০টি, ২০০৮ সালে দুটি, ২০০৯ সালে সাতটি, ২০১০ সালে তেরটি, ২০১১ সালে ছয়টি, ২০১২ সালে সাতটি, ২০১৩ সালে ছয়টি, ২০১৪ সালে ৯টি, ২০১৫ সালে ছয়টি ও চলতি বছরে দুটি সুপারিশ করেছে আইন কমিশন।   মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃতি অপরাধ আইন-২০১৬ প্রণয়নে যে সুপারিশ করেছে আইন কমিশন, সেটি সরকার আমলে নিয়েছে। এ ছাড়া ১৯৯৬ সাল থেকে এ পর্যন্ত প্রায় ৩৪টি সুপারিশের কোনোটি আংশিক আবার কোনোটি পুরো বাস্তবায়িত হয়েছে।

আইন কমিশনের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা বলেন, কমিশনের সব সুপারিশ গ্রহণযোগ্য হবে না, এটাই স্বাভাবিক। তবে সুপারিশের বিষয়ে মতামত জানাতে হবে। সুপারিশ কেন গ্রহণযোগ্য নয়, সেটি অন্তত জানাতে হবে। বিশ্বের বেশির ভাগ উন্নত দেশে নতুন আইন প্রণয়ন ও বিদ্যমান আইন সংস্কারে তাদের আইন কমিশন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। ভারতের আইন কমিশন অত্যন্ত শক্তিশালী। দেশটিতে ১৮৫৩ সালে প্রথম আইন কমিশন প্রতিষ্ঠা করা হয়। ব্রিটিশ শাসনামলে ওই কমিশনই প্রথম ফৌজদারি কার্যবিধি, দেওয়ানি কার্যবিধি ও দণ্ডবিধি প্রণয়ন করে।


মন্তব্য