kalerkantho

সোমবার । ৫ ডিসেম্বর ২০১৬। ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৪ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


টাম্পাকো ট্র্যাজেডি

স্বজনের লাশের খোঁজে অশ্রুসিক্ত অপেক্ষা

নিজস্ব প্রতিবেদক, গাজীপুর   

১৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



স্বজনের লাশের খোঁজে অশ্রুসিক্ত অপেক্ষা

টঙ্গীর টাম্পাকো ফয়েলসের দুর্ঘটনায় নিহতদের একজন ফ্লোর হেলপার রফিকুল। তাঁর স্ত্রী নার্গিস হাসপাতাল, মর্গ ও দুর্ঘটনাস্থলে স্বামীর লাশের সন্ধান করে করে ক্লান্ত হতাশ। ছবি : কালের কণ্ঠ

কিশোরগঞ্জের হোসেনপুর উপজেলার মেছেরা গ্রামের মৃত আব্বাস আলীর ছেলে রফিকুল ইসলাম (৪০) ছিলেন টাম্পাকো ফয়েলসের ফ্লোর হেলপার। পরিবার নিয়ে থাকতেন টঙ্গীর মরকুন এলাকায়।

রাতের শিফটে ডিউটি করে ভোর ৬টার দিকে বের হওয়ার কথা ছিল রফিকুলের। গত শনিবার ভোরে দুর্ঘটনার খবর পেয়ে তিন সন্তানকে নিয়ে ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন তাঁর স্ত্রী নার্গিস বেগম। কিন্তু সাত দিন পেরিয়ে গেলেও স্বামী রফিকুলের সন্ধান পাননি তিনি। দুুর্ঘটনাস্থল, হাসপাতাল ও ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের মর্গে সকাল-বিকাল ঘুরতে ঘুরতে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন নার্গিসও। গতকাল শুক্রবার সকালে স্বামীর ছবি হাতে নিয়ে তিন সন্তানসহ তিনি দাঁড়িয়ে ছিলেন বিধ্বস্ত টাম্পাকো কারখানাসংলগ্ন গাজীপুর জেলা প্রশাসনের কন্ট্রোল রুমের সামনে। ছবি দেখিয়ে কর্তব্যরত কর্মকর্তার কাছে বারবার জানতে চাইছিলেন তাঁর স্বামীর কোনো সন্ধান পাওয়া গেছে কি না।

রফিকুলের ছেলে, দশম শ্রেণির ছাত্র রকিবুল ইসলাম কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলে, ‘বাবাই ছিল আমাদের সব। সব জায়গায় খোঁজ করেও বাবার লাশ পাচ্ছি না। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে গেলে বলছে, এখানে নেই, ঘটনাস্থলে যেতে। আবার এখানে এলে বলছে, মর্গে ছয় লাশ আছে, সেখানে খোঁজ নিতে। আমরা গরিব মানুষ। এখন লাশের জন্য কার কাছে যাব?’ বলেই কান্নায় ভেঙে পড়ে রকিবুল। পাশেই বাবার জন্য ফুঁপিয়ে কাঁদছিল একমাত্র মেয়ে সাবিনা (১৪)। বাবার ছবি বুকে জড়িয়ে বলতে থাকে, ‘আমাদের নিয়ে ঈদ করতে বাড়ি যাওয়ার কথা ছিল বাবার। ওই কারখানা আমাদের সব কাইড়া নিছে। আমরা বিচার চাই। বাবার লাশ চাই। ’ 

একইভাবে স্বামী মাসুম আহম্মেদের লাশের জন্য ছোটাছুটি করছিলেন রূপালী বেগম। কখনো ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে, কখনো বা টঙ্গীতে। কেঁদে কেঁদে চোখের পানিও যেন শুকিয়ে গেছে তাঁর। গতকাল দুপুরে কথা হয় রূপালীর সঙ্গে। তিনি বলেন, স্বামী কুমিল্লার মুরাদনগরের টনকী গ্রামের মৃত তোফাজ্জল হোসেনের ছেলে মাসুম ছিলেন টাম্পাকোর নিটিং অপারেটর। সাড়ে তিন বছরের একমাত্র মেয়ে সামিয়াকে নিয়ে তাঁরা টঙ্গীর আরিচপুরে থাকতেন। ওই দিন ৬টার শিফটে কাজে যোগ দিতে ভোর সোয়া ৫টার দিকে বাসা থেকে বের হন মাসুম। তার পর থেকেই নিখোঁজ। দুর্ঘটনার খবর পেয়ে রূপালী ছুটে আসেন কারখানায়। পরে যান টঙ্গী হাসপাতালে, যেখানে লাশ রাখা হয়েছিল। লাশ ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গিলে সেখানেও খোঁজ করেন। কিন্তু এখনো লাশ পাননি তিনি। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের মর্গে ছয়টি লাশ থাকলেও বিকৃত হয়ে যাওয়ায় চেনার উপায় নেই। রূপালী জানান, ছয় বছর আগে মাসুমের সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়। সুখেই সংসার করছিলেন। এখন মা-মেয়ের সামনে শুধুই অন্ধকার। লাশটা পেলে বাড়িতে নিয়ে কবর দেবেন। মেয়ে বড় হলে যাতে বলতে পারেন, ‘এটা তোমার বাবার কবর। ’ ‘আমি আর কিছু চাই না,’ বলেই আবারও কেঁদে ফেলেন রূপালী।

কারখানার সহকারী অপারেটর নিখোঁজ কাজিম উদ্দিনের স্ত্রী পারভীনকেও দেখা গেছে বিধ্বস্ত কারখানার কাছে আহাজারি করতে। তিনি জানান, সব জায়গায় খুঁজেও স্বামীকে পাননি। কেউ কেউ বলছে, আটকে পড়া ভবনের ভেতর থেকে মানুষের আওয়াজ পাওয়া গেছে। তাই বসে আছেন, যদি অলৌকিকভাবে স্বামী জীবিত উদ্ধার হয়, সেই আশায়।  

শুধু রূপালী, পারভীন আর নার্গিস নন, কারখানায় অগ্নিকাণ্ডে নিহত অনেকের পরিবারই লাশের জন্য ছোটাছুটি করছে। তবে উদ্ধারকাজের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সেনাবাহিনী ও ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা বলছেন, ‘ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে লাশের পচা গন্ধ আসছে। ধ্বংসস্তূপ সরানো গেলে আরো লাশ পাওয়া যেতে পারে। ’

 

উদ্ধার অভিযান অব্যাহত

সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, গতকাল সপ্তম দিনে দুপুরে ভারি বৃষ্টি হলেও তা উপেক্ষা করেই চলে উদ্ধার অভিযান। বৃহস্পতিবার ও গতকাল সারা দিন প্রশাসনিক ভবনের বিধ্বস্ত স্থাপনা ভারী যন্ত্রপাতি নিয়ে সরানোর কাজ চলে। তিনতলা প্রশাসনিক ভবনের নিচতলার দেওয়াল ভেঙে একটি কাঠের প্রাচীন বড় পালংক, তৈজসপত্র, বেশ কিছু দেশি-বিদেশি বইপুস্তক এবং লক্ষাধিক টাকা উদ্ধার করা হয়েছে।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা টঙ্গী থানার এসআই সুমন ভক্ত জানান, বিস্ফোরণে বিধ্বস্ত প্রশাসনিক ভবনের নিচের তলায় তল্লাশি করে অক্ষত অবস্থায় ওই সব জিনিস এবং এক লাখ দুই হাজার টাকা উদ্ধার  করা হয়েছে। টাকাগুলো একটি কাঠের লকারে ছিল। তা ছাড়া ১৩ হাজার ৭৫৫ টাকা পুড়ে যাওয়া অবস্থায় পাওয়া গেছে।  

প্রসঙ্গত, গত শনিবার রাজধানীর উপকণ্ঠ টঙ্গীর বিসিক শিল্পনগরীর টাম্পাকো ফয়েলস লিমিটেড কারখানায় বিস্ফোরণ ও অগ্নিকাণ্ডের পর ভবন ধসে পড়ে পুরো কারখানা এলকাটি ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। গতকাল পর্যন্ত এ ঘটনায় মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩৪-এ। আহত হয়েছে অর্ধশতাধিক। এখনো নিখোঁজ আছে ১১ শ্রমিক।


মন্তব্য