kalerkantho

শনিবার । ৩ ডিসেম্বর ২০১৬। ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ২ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


বাস-মাইক্রো সংঘর্ষে বরসহ নিহত ৮

কালের কণ্ঠ ডেস্ক   

১৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



বাস-মাইক্রো সংঘর্ষে বরসহ নিহত ৮

ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় সড়ক দুর্ঘটনায় দুমড়ে মুচড়ে যাওয়া বরযাত্রী বহন করা মাইক্রোবাস ছবি : কালের কণ্ঠ

বরের বাড়িতে মাতম। আর কনের বাড়ি স্তব্ধ।

একটি বাসের সঙ্গে সংঘর্ষে মাইক্রোবাসে থাকা বর ও তাঁর বাবাসহ আটজনের প্রাণহানি সব এলোমেলো করে দিয়েছে এই দুটি পরিবারের। সেই সঙ্গে আরো কয়েকটি পরিবারও হয়েছে স্বজনহারা। গতকাল শুক্রবার সকালে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিজয়নগরে দুর্ঘটনায় পড়ে মৌলভীবাজার থেকে ঢাকাগামী বরযাত্রীবাহী মাইক্রোবাসটি।

একই দিন গাইবান্ধায় একটি বিয়ের যাত্রীবাহী বাস দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন একজন। এ ছাড়া টাঙ্গাইলের কালিহাতীতে পোশাক শ্রমিকবাহী একটি বাস উল্টে পাঁচজন নিহত হয়েছেন। মাদারীপুরের রাজৈরে বাসের সঙ্গে মাহিন্দ্রের সংঘর্ষে মারা গেছেন তিনজন। ঢাকার সাভার ও ধামরাইয়ে এবং সুনামগঞ্জে সড়ক দুর্ঘটনায় আরো দুজন নিহত হয়েছেন। মোট সাতটি দুর্ঘটনায় আহত হয়েছেন অন্তত ৭৭ জন। বিস্তারিত আমাদের নিজস্ব প্রতিবেদক ও প্রতিনিধিদের পাঠানো খবরে :

বরসহ আটজন নিহত : গতকাল সকাল সাড়ে ৯টার দিকে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিজয়নগর উপজেলার শশই এলাকায় ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে দুর্ঘটনায় বরসহ আটজন নিহত হয়েছেন। আহত আরো অন্তত দুজনকে গুরুতর আহত অবস্থায় ঢাকায় পাঠানো হয়েছে।

নিহত ব্যক্তিরা হলেন মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার রুপসপুর গ্রামের হাদিউর রহমান ছয়ফুর (৫৫) ও তাঁর ছেলে বর আবু সুফিয়ান (২৫), হাদিউর রহমানের ছোট ভাই মুর্শিদুর রহমান (৪০) ও তাঁর ছেলে আলী হোসেন (১২), আম্বর আলীর ছেলে আব্দুল মুকিত চৌধুরী মুক্তার (৭০), আব্দুল মজিদের ছেলে সাইদুর রহমান (৪০), মফিজ মিয়ার ছেলে দরুদ মিয়া (৪৫) ও আব্দুল হামিদের ছেলে আব্দুল হান্নান (৫৫)।

নিহত বর আবু সুফিয়ান ছাত্র জমিয়তের কেন্দ্রীয় তথ্য সম্পাদক বলে জানা গেছে। আহত দুজন হলেন হাদিউর রহমানের ছেলে কামরান আহমেদ ও মাইক্রোচালক ফরহাদ হোসেন। বরযাত্রীবাহী মাইক্রোবাসটি ঢাকার মহাখালীতে যাচ্ছিল।

প্রত্যক্ষদর্শীসহ বিভিন্ন সূত্র জানায়, সিলেটগামী এনা পরিবহনের বাসের সঙ্গে মাইক্রোবাসটির সংঘর্ষ হয় এবং ছিটকে একটি গাছের সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে দুমড়েমুচড়ে যায়। এতে ঘটনাস্থলেই এক শিশুসহ সাতজন মারা যান। দুর্ঘটনার কারণে সড়কে প্রায় এক ঘণ্টা যানচলাচল বন্ধ ছিল। স্থানীয় লোকজনের পাশাপাশি পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা হতাহতদের উদ্ধার করেন। আহতদের মধ্যে আবু সুফিয়ানকে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় নিয়ে আসার পথে তাঁর মৃত্যু হয়।

দুর্ঘটনার খবরে বর ও কনের বাড়িতে শোকের ছায়া নেমে আসে। স্বজনরা ছুটে আসে ঘটনাস্থলে। তাঁদের মধ্যে ফয়সাল আহমেদ, হোসেন আহমেদ ও জসীম উদ্দিন জানান, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার এক পাত্রীর সঙ্গে আবু সুফিয়ানের বিয়ে হওয়ার কথা ছিল ঢাকায়। সকাল ৭টার দিকে ঢাকার উদ্দেশে বরযাত্রী নিয়ে মাইক্রোবাসটি মৌলভীবাজার থেকে রওনা হয়। মোবাইল ফোনের মাধ্যমে তাঁরা দুর্ঘটনার খবর পেয়েছেন।

আরেক আত্মীয় আব্দুল আহাদ লিটন বলেন, ‘দুর্ঘটনার খবর শুনে আমি কামরানের মোবাইল ফোনে কল করি। এ সময় স্থানীয় এক লোক আমাকে কয়েকজনের মৃত্যুর খবরটি নিশ্চিত করেন। ’ কমলগঞ্জের মুন্সিগঞ্জ ইউনিয়ন পরিষদের ৪ নং ওয়ার্ডের সদস্য আব্দুল আলী জানান, গাড়িতে চালকসহ ১০ জন ছিলেন বলে তাঁরা জানতে পেরেছেন। এর মধ্যে আটজন মারা গেছেন। দুর্ঘটনার খবরে এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। কনের বাড়ির লোকজনও বিষয়টি জেনেছে।

নিহত হাদিউর রহমানের স্বজন ওয়ার্কার্স পার্টি মৌলভীবাজার জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক আব্দুল আহাদ মিনার বলেন, ‘এখন রুপসপুর গ্রামে শুধু কান্না ছাড়া আর কিছুই নেই। ’

কনের বাবা মাওলানা হানিফ সাংবাদিকদের বলেন, মেয়ের বিয়ের সব আয়োজন সম্পন্ন করা হয়েছিল। পরে তারা দুর্ঘটনার খবর পান। এ অবস্থায় সব কিছু এলোমেলো হয়ে গেছে।

বিজয়নগর থানার ওসি মো. আলী আরশাদ ও বিশ্বরোড হাইওয়ে থানার ওসি মো. হুমায়ুন কবির দুর্ঘটনার খবর নিশ্চিত করেছেন। তাঁরা জানান, বিকেল পর্যন্ত হাইওয়ে থানায় সাতটি ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা সদর হাসপাতাল মর্গে একটি লাশ রাখা ছিল।

আহতদের মধ্যে মাধবপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা জাকির হোসেনের অবস্থার অবনতি হওয়ায় তাঁকে সিলেটের এমএজি ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের কর্তব্যরত চিকিত্সক ডা. কিশোলয় সাহা এ তথ্য জানান।

নিপুণ নামের এক স্বজন জানান, বরের ভাই কামরানকে ঢাকার পঙ্গু হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। অন্যদিকে চালক ফরহাদকে ঢাকার আরেকটি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে বলে জানা গেছে।

বিয়ের যাত্রীবাহী বাস খাদে, নিহত ১ : গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার মহিমাগঞ্জ এলাকার খোর্দ্দগোপালপুরে বিয়ের যাত্রীবাহী বাস খাদে পড়ে আনিছুর রহমান (২৫) নামের এক যুবক নিহত হয়েছেন। গতকাল বিকেল ৫টার দিকে ঘটা এই দুর্ঘটনায় আহত হয়েছে আরো অন্তত ২৫ জন।

নিহত আনিছুর ওই ইউনিয়নের পুনতইর নামাচরপাড়া গ্রামের মফিজ উদ্দিন খরকু মিয়ার ছেলে।

মহিমাগঞ্জ ইউপি চেয়ারম্যান আবদুল লতিফ প্রধান জানান, বিয়ের যাত্রীবাহী বাসটি উপজেলার কোচাশহর ইউনিয়ন থেকে মহিমাগঞ্জ যাচ্ছিল। আহতদের উদ্ধার করে গোবিন্দগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়েছে।

বাস উল্টে নিহত পাঁচ : বঙ্গবন্ধু সেতু-ঢাকা মহাসড়কে টাঙ্গাইলের কালিহাতী উপজেলার পুংলী এলাকায় ভোর সোয়া ৪টার দিকে পোশাক শ্রমিকবাহী একটি বাস উল্টে পাঁচজন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন আরো ২৫ জন। নিহত ব্যক্তিরা হলেন আসমা (৪০), আসাদুল (১৫), মমিনুর (৪১), রিপন (৩০) ও সুমন (২৫)। তাঁদের বাড়ি লালমনিরহাটের হাতীবান্ধা ও পাটগ্রাম উপজেলায়। আহতদের টাঙ্গাইল মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

এলেঙ্গা হাইওয়ে পুলিশ ফাঁড়ির দায়িত্বপ্রাপ্ত সার্জেন্ট জাহাঙ্গীর আলম জানান, লালমনিরহাট থেকে গাজীপুরের সফিপুরগামী প্রভাতী-বনশ্রী পরিবহনের বাসটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে উল্টে যায়।

টাঙ্গাইলের জেলা প্রশাসক মো. মাহবুব হোসেন নিহতদের লাশ পরিবহন ও দাফনের জন্য প্রতি পরিবারকে ২০ হাজার টাকা করে দিয়েছেন। এ ছাড়া আহতদের চিকিত্সার জন্য ১০ হাজার টাকা করে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন।

বাস-মাহিন্দ্র মুখোমুখি সংঘর্ষে নিহত তিন : ঢাকা-বরিশাল মহাসড়কে মাদারীপুরের রাজৈর উপজেলার বড় ব্রিজ এলাকায় দুপুরে যাত্রীবাহী বাসের সঙ্গে অটোরিকশার (মাহিন্দ্র ব্র্যান্ডের) সামনাসামনি সংঘর্ষ হয়। এতে ঘটনাস্থলে দুজন এবং চিকিত্সাধীন অবস্থায় আরো একজন মারা যায়। এ ছাড়া আরো অন্তত ১০ জন আহত হয়েছে।

নিহত ব্যক্তিরা হলেন অটোরিকশাচালক রাজৈরের শ্রীনদী গ্রামের মো. বিল্লাল হোসেন (৩৫) ও যাত্রী একই উপজেলার সানেরপাড় গ্রামের বেলাল শেখ (৫০) ও সদর উপজেলার শিরখাড়া গ্রামের সালাউদ্দিন কাজী (৩৫)।

আহতদের মধ্যে মেরিনা আক্তার (২৭) নামের একজনকে ফরিদপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। অন্যদের পাঠানো হয়েছে রাজৈর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে।

রাজৈর থানার উপপরিদর্শক (এসআই) রমজান হোসেন ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন।

আরো তিনটি দুর্ঘটনায় নিহত ২ : ঢাকার সাভার ও ধামরাইয়ে পৃথক সড়ক দুর্ঘটনায় একজন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছে অন্তত ১৫ জন। বৃহস্পতিবার গভীর রাতে ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের সাভারের রাজফুলবাড়িয়া বাসস্ট্যান্ডে এবং গতকাল সকালে ধামরাইয়ের বাথুলী এলাকায় এ দুটি দুর্ঘটনা ঘটে। রাজফুলবাড়িয়া বাসস্ট্যান্ড এলাকায় রাস্তা পার হওয়ার সময় প্রাইভেট কারচাপায় নিহত হন আবু বক্কর সিদ্দিক (৩০) নামের একজন। বরিশালের আগৈলঝাড়া উপজেলার রত্নপুর গ্রামের জয়নাল মোল্লার ছেলে আবু বক্কর পেশায় ছিলেন মুরগি ব্যবসায়ী। তিনি সাভারের গেণ্ডা এলাকায় থাকতেন।

এদিকে ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের ধামরাইয়ের বাথুলী এলাকায় যাত্রীবাহী একটি পিকআপ ভ্যান নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে গাছের সঙ্গে ধাক্কা খায়। এতে আহত হয়েছে শিশুসহ অন্তত ১৫ জন যাত্রী। আহতদের উদ্ধার করে সাভারের এনাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। দুর্ঘটনার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন ধামরাই থানার ওসি রিজাউল হক।

সুনামগঞ্জ-সিলেট সড়কের পাগলাবাজার এলাকায় নুরি মিয়া (৬০) নামের এক ব্যক্তি বাসের ধাক্কায় নিহত হয়েছেন। তিনি দক্ষিণ সুনামগঞ্জ উপজেলার পশ্চিম পাগলা ইউনিয়নের শত্রুমর্দন গ্রামের মৃত কলমদর আলীর ছেলে।

নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ উপজেলার ভৈরবেরটেক এলাকায় রক্সি পেইন্ট কারখানার সামনে গতকাল সন্ধ্যায় মাইক্রোবাস ও অটোরিকশার সংঘর্ষে শরীফ হোসেন (২৩) নামের এক যুবক নিহত হন। সোনারগাঁ থানার এসআই নারায়ণ চন্দ্র দাস জানান, সংঘর্ষে অটোরিকশাটি দুমড়েমুচড়ে যায়। এতে ঘটনাস্থলেই অটোরিকশার যাত্রী শরীফ হোসেন নিহত হন। তিনি উপজেলার সাদিপুর ইউনিয়নের বেইলর গ্রামের ইউসুফ মিয়ার ছেলে। পুলিশ মাইক্রোবাসটি আটক করেছে। চালক পলাতক।


মন্তব্য