kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ৮ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৭ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


রায় ফাঁসের মামলায় সাকার স্ত্রী-পুত্র খালাস

আইনজীবীসহ ৫ জনের কারাদণ্ড

নিজস্ব ও আদালত প্রতিবেদক   

১৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



আইনজীবীসহ ৫ জনের কারাদণ্ড

ফখরুল ইসলাম

প্রায় তিন বছর আগে সালাহউদ্দিন কাদের (সাকা) চৌধুরীর বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের রায় ফাঁসের ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলায় তাঁর স্ত্রী ফারহাত কাদের চৌধুরী ও ছেলে হুম্মাম কাদের চৌধুরীকে খালাস দিয়েছেন বাংলাদেশ সাইবার ট্রাইব্যুনাল। তবে সাকার আইনজীবী ব্যারিস্টার ফখরুল ইসলামসহ পাঁচজনকে কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত।

ব্যারিস্টার ফখরুল ইসলামকে ১০ বছরের কারাদণ্ড, ১০ লাখ টাকা জরিমানা অনাদায়ে আরো ছয় মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে সাকা চৌধুরীর ম্যানেজার মাহবুবুল আহসান, ফখরুলের সহকারী মেহেদী হাসান, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের পরিচ্ছন্নতাকর্মী নয়ন আলী ও সাঁটলিপিকার ফারুক হোসেনকে সাত বছর করে জেল দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি তাঁদের প্রত্যেককে ১০ হাজার টাকা করে জরিমানা অনাদায়ে আরো এক মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশ সাইবার ট্রাইব্যুনালের বিচারক কে এম শামসুল আলম গতকাল বৃহস্পতিবার এ রায় দেন। রায় ঘোষণার পর কারাগারে থাকা আসামিদের আবার সেখানেই পাঠিয়ে দেওয়া হয়। এ মামলায় এরই মধ্যে তাঁদের হাজতবাস সাজার মেয়াদ থেকে বাদ যাবে বলে রায়ে বলা হয়। এ ছাড়া পলাতক মেহেদী হাসান গ্রেপ্তার হলে বা আত্মসমর্পণ করলে তখন থেকে তাঁর সাজা কার্যকর হবে।

গতকাল রায় ঘোষণার সময় সাকা চৌধুরীর স্ত্রী ফারহাত কাদের চৌধুরী আদালতে উপস্থিত ছিলেন। তবে তাঁর ছেলে হুম্মাম কাদের চৌধুরী এবং মেহেদী হাসানকে পলাতক দেখিয়ে আদালত রায় দেন। যদিও সাকা পরিবারের দাবি, গত ৪ আগস্ট আদালত এলাকা থেকে হুম্মাম কাদের চৌধুরীকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তুলে নিয়ে গেছে। এ ছাড়া কারাগারে থাকা ব্যারিস্টার ফখরুল ইসলামসহ চার আসামিকে আদালতে হাজির করা হয়।

রায়ে সাকা চৌধুরীর স্ত্রী-ছেলের আইনজীবী আমিনুল গণী টিটো সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। তবে সাজাপ্রাপ্তদের আইনজীবী এ বি এম খায়রুল ইসলাম লিটন ও জাহিদুল ইসলাম বলেন, এ রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করা হবে।

রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী বিশেষ পিপি নজরুল ইসলাম শামীম জানান, ফারহাত কাদের চৌধুরী ও হুম্মাম কাদের চৌধুরীর বিষয়ে আপিল করা হবে কি না সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে রায়ের পূর্ণাঙ্গ কপি পাওয়ার পর।

মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ২০১৩ সালের ১ অক্টোবর সাকা চৌধুরীকে মৃত্যুদণ্ড দিয়ে রায় ঘোষণা করেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। তবে এর আগেই সকালে রায়ের একটি খসড়া কপি ট্রাইব্যুনালে নিয়ে হাজির হন তাঁর স্ত্রী, পরিবারের সদস্য ও আইনজীবী। রায় ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে তাঁরা ওই খসড়া কপি গণমাধ্যমকে দেখান। রায় ফাঁসের অভিযোগ তুলে তাঁরা সেদিন বলেন, বেলজিয়াম থেকে এ রায় লিখে আনা হয়েছে। এ ঘটনায় পরের দিন ট্রাইব্যুনালের তত্কালীন নিবন্ধক (রেজিস্ট্রার) এ কে এম নাসির উদ্দিন মাহমুদ বাদী হয়ে শাহবাগ থানায় তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনে একটি জিডি করেন। এ জিডির ওপর তদন্ত শেষে ওই বছরের ৪ অক্টোবর ডিবি পুলিশের পরিদর্শক ফজলুর রহমান শাহবাগ থানায় মামলা করেন। ২০১৪ সালের ২৮ আগস্ট ডিবির পরিদর্শক মো. শাহজাহান অভিযোগপত্র দাখিল করেন। এ মামলায় গ্রেপ্তারকৃত ট্রাইব্যুনালের কর্মচারী নয়ন ও ফারুক আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। ২০১৪ সালের নভেম্বরে ব্যারিস্টার ফখরুল ইসলামকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। গত ১৫ ফেব্রুয়ারি সাইবার ট্রাইব্যুনালে সাত আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের মধ্য দিয়ে মামলার বিচার শুরু হয়। আর সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয় ২৮ মার্চ। এ মামলায় উভয় পক্ষের যুক্তি উপস্থাপন সম্পন্ন হয় গত ৪ আগস্ট।

আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগে বলা হয়, ব্যারিস্টার ফখরুল ইসলামের সহকারী মেহেদী হাসান মোটা অঙ্কের অর্থের প্রলোভন দেখিয়ে ট্রাইব্যুনালের দুই কর্মচারীর মাধ্যমে রায়ের খসড়ার অংশবিশেষ ফাঁস করেন। ওই অংশটিই রায়ের দিন আদালতে সাংবাদিকদের দেখানো হয়।

সাকা চৌধুরীকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের দেওয়া ফাঁসির রায় বহাল রাখেন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ। এরপর তাঁর রিভিউ আবেদনও আপিল বিভাগে খারিজ হয়। সব আইনি প্রক্রিয়া শেষে গত বছর ২১ নভেম্বর প্রথম প্রহরে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে সাকা চৌধুরীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।

এই রায় খারাপ দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে : এই রায়ে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে গতকাল রাতে গণজাগরণ মঞ্চের মুখাপত্র ইমরান এইচ সরকার বলেন, সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর স্ত্রী ও ছেলের খালাসের রায় ‘খারাপ দৃষ্টান্ত’ হয়ে থাকবে। তিনি বলেন, এটা খুবই অসম্পূর্ণ একটা রায়। কেননা যাঁরা প্রধান আসামি তাঁদেরই খালাস দেওয়া হয়েছে। যে আইনজীবীদের দ্বারা রায় ফাঁস করানো হয়েছে তাঁদের কোনো ব্যক্তিগত স্বার্থ নেই। তাঁরা শুধু অর্থের বিনিময়ে কাজটা সম্পূর্ণ করেছেন।

ইমরান বলেন, ‘যুদ্ধাপরাধীদের অর্থ-সম্পদ বাজেয়াপ্ত করার যে কথা আমরা বারবার বলে আসছি, সেটার গুরুত্ব এই রায়ের মধ্য দিয়ে প্রমাণিত হচ্ছে। কেননা এই যুদ্ধাপরাধী পরিবারের যে অঢেল সম্পত্তি, তা তারা এখন নানাভাবে নানা কাজে ব্যবহার করছে। রায় ফাঁসের কাজে ব্যবহার করেছে এবং এখনো ব্যবহার করেই যাচ্ছে। তার প্রভাব এই রায়ে বিদ্যমান। এই রায় আমাদের প্রত্যাশা পূরণ করেনি; জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করেনি। এটা খারাপ দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে বলে আমি মনে করি। ’


মন্তব্য