kalerkantho


‘ঈদ রাজনীতি’তেও পিছিয়ে বিএনপি

এনাম আবেদীন   

১৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



‘ঈদ রাজনীতি’তেও পিছিয়ে বিএনপি

বাংলাদেশে ঈদের রাজনীতি মূলত দুই নেত্রীকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়। কারণ এই দিনে আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা ও বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে সাধারণ মানুষ ও নেতাকর্মীদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন। এতে সারা দেশের নজর থাকে দুই নেত্রীর দিকে। পাশাপাশি দুই দলের নেতাকর্মীদের মধ্যেও উৎসাহ-উদ্দীপনা সৃষ্টি হয়। অনেকের মতে, এর ফলে দুই দলেই প্রাণচাঞ্চল্য ফিরে আসে, রাজনীতি গতিশীল হয়।

কিন্তু এবারের ঈদুল আজহায় রাজনীতি দূরে থাক, বিএনপি উল্টো ঝিমিয়ে পড়েছে। কারণ চেয়ারপারসন পবিত্র হজ পালনের জন্য গত ৭ সেপ্টেম্বর সৌদি আরবে গেছেন। ফলে শুভেচ্ছা বিনিময় অনুষ্ঠান হয়নি। দেশের গণমাধ্যমেও গত কয়েক দিন বিএনপিসংক্রান্ত খবর তেমন প্রকাশিত হয়নি। বিষয়টি নিয়ে দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীদের মধ্যে আলোচনা হয়েছে। বলা হচ্ছে, নানা কারণে বিএনপি এমনিতেই কোণঠাসা।

এ অবস্থায় ঈদে একেবারেই কোনো কর্মসূচি না থাকা ভালো হয়নি। নেতাকর্মীদের মতে, খালেদা জিয়ার অনুপস্থিতিতে মনে হচ্ছে, যেন বিএনপিই নেই।

শত নাগরিক কমিটির আহ্বায়ক অধ্যাপক এমাজউদ্দীন আহমদের মতে, বিএনপি নেত্রী সৌদি আরবে গেছেন ভালো কথা। কিন্তু ঈদের কিছু কর্মসূচি থাকলে দল চাঙ্গা হতো। এ রকম নীরব থাকাটা দলের জন্য খুবই দুর্ভাগ্যজনক। গতকাল রাতে  সিঙ্গাপুরে যাওয়ার আগে কালের কণ্ঠকে তিনি বলেন, বিএনপির ভেতরেও এখন যৌথ নেতৃত্বে দল পরিচালনার আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছে। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, একাই চেয়ারপারসন দল চালাচ্ছেন। এটি ভালো নয়, যোগ করেন বিশিষ্ট এ রাষ্ট্রবিজ্ঞানী।

গণস্বাস্থ্যের প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী মনে করেন, শুধু ঈদ রাজনীতি নয়, সার্বিক রাজনীতিতেই বিএনপি ক্রমেই পিছিয়ে পড়ছে। তিনি বলেন, ‘দল না থাকলে হজ হবে না—এ কথা আমি বিএনপির সবাইকে প্রকাশ্যে বলেছি। তাও দেখছি বিএনপি নড়ে না। ’ জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতা পদক জাদুঘর থেকে সরিয়ে নেওয়ার কথা উল্লেখ করে সুধীসমাজের এই প্রতিনিধি বিএনপিকে বোধহীন ষাঁড়ের সঙ্গে তুলনা করেন। তিনি বলেন, বিএনপি এমন একটা ষাঁড় যে লাল কাপড়ের পতাকা দেখালেও নড়ে না। ওই দল একেবারে স্থবির হয়ে পড়েছে। তাঁর মতে, ঈদের সময় কর্মসূচি রাখার ব্যাপারে সিনিয়র নেতাদের খালেদা জিয়াকে জোর করা উচিত ছিল।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেন, ঈদে কর্মসূচি না থাকার কারণে দল একেবারে স্থবির হয়ে পড়েছে এ কথা বলা ঠিক হবে না। তবে কর্মসূচি থাকলে ভালো হতো, এমন মূল্যায়ন কেউ কেউ করতে পারেন। তিনি বলেন, ‘চেয়ারপারসন চলে যাওয়ার পরে দলে বিকল্প যাঁরা আছেন তাঁরা উদ্যোগ না নিলে আমার কী করার আছে? আমি তো গত তিন দিন যাবৎ কার্যালয়েই অবস্থান করছি। নেতাকর্মীদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময়ও হয়েছে। ’

সূত্র মতে, খালেদা জিয়ার অনুপস্থিতিতে বিএনপির স্থবির হয়ে পড়ার বিষয়টি সামনে রেখে দলের সিনিয়র কয়েকজন নেতা ঈদে নেতাকর্মীদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময়ের একটি কর্মসূচি রাখার প্রস্তাব করেছিলেন। তাঁরা বলেছিলেন, নয়াপল্টনের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে স্থায়ী কমিটি তথা সিনিয়র নেতাদের সমন্বয়ে ওই ধরনের একটি কর্মসূচি রাখা হোক। কিন্তু খালেদা জিয়া ‘জানাব’ বলে শেষ পর্যন্ত এতে সম্মতি দিয়ে যাননি। ফলে শেষ পর্যন্ত দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর নিজের নির্বাচনী এলাকা ঠাকুরগাঁয় চলে যান। অন্যদিকে ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ মেয়ের বিয়ের কারণে চলে গেছেন জার্মানিতে। ড. আবদুল মঈন খান ও সাদেক হোসেন খোকা দীর্ঘদিন যুক্তরাষ্ট্রে এবং নজরুল ইসলাম খান জাপানে রয়েছেন। চিকিৎসার জন্য আ স ম হান্নান শাহ রয়েছেন সিঙ্গাপুরে। স্থায়ী কমিটির নতুন সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ ভারতে এবং সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবীর রিজভী আহমেদ কারাগারে। সিনিয়র অপর নেতা ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন সারা দিন বাসায়ই বসে ছিলেন। কয়েকজন খালেদা জিয়াকে খুশি করতে আগেই চলে গেছেন সৌদি আরবে। আর ঢাকায় যাঁরা ছিলেন, তাঁরা প্রত্যেকেই পারিবারিকভাবে ঈদ উদ্যাপন করেছেন। কারো সঙ্গে কারো যোগাযোগ হয়নি। তবে আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার ঈদ শুভেচ্ছা বিনিময় অনুষ্ঠান দেখে বিএনপির প্রথম ও মধ্যম সারির নেতারা দলের স্থবিরতা ও শূন্যতার কথা অনুভব করেছেন। নিজেদের মধ্যে আলাপ-আলোচনায় তাঁরা বলছেন, কোনো কর্মসূচি থাকলে মনে হতো বিএনপি টিকে আছে। নেতাকর্মীদের সঙ্গে নিয়ে জিয়াউর রহমানের কবরে গিয়ে ফুল দেওয়ার চিন্তা মাথায় ছিল সিনিয়র দু-একজন নেতার। কিন্তু তাঁদের মতে, খালেদা জিয়া সৌদি আরবে চলে যাওয়ার পর মনে হয়েছে, বিএনপি নামক দলটির কোনো গুরুত্ব নেই। অথবা খালেদা জিয়া না থাকলে বিএনপিই থাকে না—এমন এক ধরনের বার্তা বা ধারণা জনমনে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

এমন পরিস্থিতিতে খালেদা জিয়া বা তারেক রহমানের সাজা হয়ে গেলে দল কী করে চলবে, ওই আলোচনা নতুন করে সামনে চলে আসছে। পাশাপাশি আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যকার রাজনৈতিক সংস্কৃতির তুলনামূলক বিশ্লেষণও চলছে।

কারণ গঠনতন্ত্র অনুযায়ী আওয়ামী লীগের সভাপতি বিদেশে গেলে পরবর্তী সিনিয়র নেতাকে সাধারণত ভারপ্রাপ্ত সভাপতির দায়িত্ব দেওয়া হয়। গত প্রায় তিন দশকে শেখ হাসিনার অনুপস্থিতিতে সৈয়দা জোহরা তাজউদ্দীন, আমির হোসেন আমু, প্রয়াত আবদুস সামাদ আজাদ ও জিল্লুর রহমান ওই দায়িত্ব পালন করেছেন। বর্তমানে ওই দায়িত্ব পালন করছেন সংসদ উপনেতা সাজেদা চৌধুরী। একইভাবে গঠনতন্ত্র অনুযায়ী সাধারণ সম্পাদকসহ আওয়ামী লীগের প্রতিটি অঙ্গসংগঠনের ক্ষেত্রেও একই নিয়ম প্রযোজ্য। সভাপতি বা সাধারণ সম্পাদক দেশের বাইরে গেলে পরবর্তী সিনিয়র নেতাকে ‘ভারপ্রাপ্ত’ রাখতে হয়। ফলে নেতৃত্বের জানান দিতে ভারপ্রাপ্ত ওই নেতারা নিজেরাই বৈঠক ডেকে দলকে সচল রাখার উদ্যোগ নেন।

অথচ বিএনপির গঠনতন্ত্রে চেয়ারম্যান বা মহাসচিবসহ কোনো ক্ষেত্রেই এ ধরনের বিধান রাখা হয়নি। আবার প্রয়োজন বা তাগিদ অনুভব করা সত্ত্বেও দায়িত্ব নিতে কেউ এগিয়ে আসেন না। কারণ পরস্পরবিরোধী ও বৈরী মনোভাবাপন্ন নেতারা আবার এ নিয়ে দলের মধ্যে রাজনীতি করেন। ‘ওমুক নেতা দলের নিয়ন্ত্রণ নিতে চান’, এমন কথা বলে তাঁরা খালেদা জিয়ার ‘কান ভারী’ করেন। ফলে খালেদা জিয়া বিদেশে গেলে বিএনপিতে এক ধরনের শূন্যতা তৈরি হয়। অথচ চেয়ারপারসনের অনুপস্থিতিতে সিনিয়র নেতাদের যৌথ নেতৃত্বে দল পরিচালনার চর্চা থাকলে বিএনপিই লাভবান হতো বলে দলটির নেতাদের মূল্যায়ন। তাঁদের মতে, যৌথ নেতৃত্বে দল পরিচালিত হলে খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানকে সাজা দিলে বিএনপি ধ্বংস হয়ে যাবে—এমন ধারণা সরকারের ভেতর থেকে দূর হয়ে যেত। পাশাপাশি খালেদা জিয়ার প্রতি সিনিয়র নেতাদের আনুগত্যও বাড়ত।

জানা যায়, এক-এগারোর পর মান্নান ভূঁইয়ার নেতৃত্বে সংস্কারপন্থীদের উত্থানের কথা স্মরণ করে খালেদা জিয়া আগের চেয়ে এখন আরো বেশি শঙ্কায় আছেন। যে কারণে সিনিয়র নেতাদের তিনি দূরে রেখেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। তিনি চান না, সিনিয়র কোনো নেতা লাইমলাইটে আসুন। সন্দেহ ও অবিশ্বাসের এ কারণ থেকেই জিয়া পরিবারের রাজনীতি নিশ্চিত করতে গত মার্চের কাউন্সিলে পুত্র তারেক রহমানকে তিনি স্থায়ী কমিটিতে দুই নম্বর সদস্য করেছেন। তার পরও তিনি স্বস্তিতে নেই।       


মন্তব্য