kalerkantho

শনিবার । ১০ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৯ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


সিন্ডিকেটের কারসাজিতে চামড়ায় মাথায় হাত

আবুল কাশেম ও এম সায়েম টিপু   

১৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



সিন্ডিকেটের কারসাজিতে চামড়ায় মাথায় হাত

চাঁপাইনবাবগঞ্জের নাচোলের মুরাদপুর গ্রামে এবার ৬২টি পশু কোরবানি হয়েছে। অথচ ঈদের দিন চামড়া কিনতে সেখানে কোনো ক্রেতাই যায়নি।

পরদিন একজন ক্রেতা গেলেও যে দাম দিতে চেয়েছেন, তাতে বিক্রির বদলে সব চামড়া মাটিতে পুঁতে ফেলাকেই যৌক্তিক ভেবেছে মুরাদপুরবাসী। তারা করেছেও তাই, বুধবার গর্ত খুঁড়ে সব চামড়া পুঁতে ফেলেছে।

ফরিদপুরের অনেক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী চামড়া বিক্রির জন্য আড়তে নিয়ে গেলেও শেষ পর্যন্ত বিক্রি করতে পারেননি। কেউ কেউ সেগুলো বাড়িতে ফেরত নিয়ে গেছেন। কেউ এলাকার মসজিদ-মাদ্রাসা ও এতিমখানায় দান করে দিয়েছেন।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌর এলাকার বালুবাগান মহল্লার আসলাম ৯ হাজার ৮০০ টাকায় একটি ছাগল কিনে কোরবানি দিয়েছেন। ছাগলের চামড়াটি রিকশা ভাড়া করে তিনি নিয়ে গিয়েছিলেন নিমতলা ফকিরপাড়া চামড়ার আড়তে। অথচ সেখানে তাঁকে ওই চামড়ার দাম দেওয়া হয়েছে মাত্র ৩০ টাকা। এ দিয়ে কোনোমতে তিনি কেবল রিকশা ভাড়াটাই দিতে পেরেছেন।

এভাবে সারা দেশে চামড়া নিয়ে বিপাকে পড়েছেন কোরবানিদাতা ও মৌসুমি ব্যবসায়ীরা। কোরবানিদাতারা পশুর চামড়া বিক্রির টাকা এলাকার এতিমখানা, লিল্লাহ বোর্ডিংসহ গরিব-দুঃখী মানুষের মধ্যে বিতরণ করেন। কেউ কেউ মসজিদ-মাদ্রাসা ও কবরস্থানের জন্যও দান করেন। এবার চামড়ার দাম কমে যাওয়ায় দুস্থ-অসহায়দের ভাগে টাকা কম পড়েছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চার বছর ধরেই কোরবানির পশুর চামড়ার দর আগের বছরের তুলনায় কমিয়ে নির্ধারণ করছেন এ খাতের ব্যবসায়ীরা। এবার ট্যানারি ব্যবসায়ীরা সিন্ডিকেট করে চামড়ার দাম কমিয়ে দিয়েছেন। ট্যানারিপল্লী স্থানান্তরে সরকারের নির্দেশনা ও উচ্চ আদালতের আরোপ করা জরিমানার অর্থ উসুল করতে চাচ্ছেন ট্যানারি মালিকরা।

নওগাঁর চামড়া বিক্রেতা আব্দুর রশিদ ক্ষোভ জানিয়ে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘চামড়া বিক্রির টাকার হকদার গরিব ও ভিক্ষুকরা। তারা এবার সামান্য টাকা পাবে। তাহলে ভিক্ষুকের প্রাপ্য টাকা যাচ্ছে কাদের পকেটে?’

জয়পুরহাটের ক্ষেতলাল উপজেলার শাখাগঞ্জ গ্রামের আব্দুস সবুর আক্ষেপ করে বলেন, ‘চামড়া ব্যবসায়ীরা সিন্ডিকেট করে দাম কমিয়ে দিয়েছে। কোরবানির চামড়া বিক্রির সব টাকা পায় গরিব ও দুস্থরা। অথচ সেই কোরবানির চামড়ার কোনো দাম নেই। ’

চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার ছত্রাজিতপুর শাহ নেয়ামতুল্লাহ শিশুসদনের সাধারণ সম্পাদক মো. আশরাফ আলী জানান, এতিমখানার শিশুদের ভরণপোষণের জন্য অনেক কোরবানিদাতা এ সদনে চামড়া দান করেন। গতবার চামড়া বেচে ১২ লাখ টাকা আয় হয়েছিল। এবার পাওয়া গেছে ছয় লাখ টাকা। এই এতিমখানা কিভাবে চালাব, সেটা ভেবে পাচ্ছি না।

রাজবাড়ীর রামকান্তপুরের বাসিন্দা আবুল হোসেন বলেন, তিনি সাড়ে ১২ হাজার টাকায় একটি খাসি কিনে কোরবানি দিয়েছেন। স্থানীয়ভাবে চামড়া বিক্রি করতে না পেরে বাজারে ফড়িয়াদের কাছে নিয়ে গিয়েছিলেন। দীর্ঘ সময় পর একজন ফড়িয়া ৩০ টাকা দাম করেন। ওই দামেই সেটি বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছেন তিনি।

নওগাঁয় ৪০ হাজার টাকা দামের একটি গরুর চামড়া বিক্রি হয়েছে ৬০০ টাকায়। কোনো কোনো স্থানে আরো কম দামে বিক্রি হয়েছে গরুর চামড়া। যেসব ব্যবসায়ী সামান্য দর বাড়িয়ে চামড়া কিনেছেন, বিপুল অঙ্কের লোকসান গুনতে হচ্ছে তাঁদের। জয়পুরহাট সদর উপজেলার গোবিন্দপুর গ্রামের মৌসুমি ব্যবসায়ী এমরান হোসেন জানান, ৩৮টি গরুর চামড়া কিনে ১৭ হাজার টাকা লোকসান দিতে হয়েছে তাঁকে।

নাটোর চামড়া ব্যবসায়ী গ্রুপের সাবেক সাধারণ সম্পাদক সায়দার খান বলেন, প্রতিবছর ঈদের দিন থেকেই জমে ওঠে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম নাটোরের চকবৈদ্যনাথের চামড়ার বাজার। কিন্তু এবার ঈদের দ্বিতীয় দিন থেকে এখন পর্যন্ত বাজারে তেমন চামড়ার উপস্থিতি নেই।

চামড়ার এত কম দর কেন—এমন প্রশ্নে রাজবাড়ীর চামড়ার ফড়িয়া আবুল কালাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ঈদের আগেই ঢাকার বড় ব্যবসায়ীরা আমাদের বলে দিয়েছেন কোনোমতেই ছাগলের পুরো চামড়ার দাম ৪০ টাকার বেশি দিয়ে না কিনতে। আর গরুর চামড়ার আয়তন যত বড়ই হোক না কেন, এক হাজার ২০০ টাকার বেশি দিয়ে কিনতে মানা করেছেন। এর চেয়ে বেশি দরে কিনলে লোকসান দিয়ে বেচতে হবে। ’ আরেক ব্যবসায়ী ফারুক হোসেন বলেন, ‘ট্যানারি ব্যবসায়ীরা সিন্ডিকেট করেছেন। ফলে আমরা বেশি দরে চামড়া কিনতে পারছি না। ’

জয়পুরহাটের স্থানীয় চামড়া ব্যবসায়ী শহিদুল ইসলাম বলেন, ‘ট্যানারি মালিকদের কাছে আমাদের আগের টাকা পাওনা রয়েছে। সে টাকা না দেওয়ায় আমরা চামড়া কিনতে পারছি না। অনেক ব্যবসায়ী এ কারণে হাত গুটিয়ে রেখেছেন। এখন যাঁরা কিনছেন, তাঁরা ভারতে পাচারের উদ্দেশ্যে কিনছেন। তাঁরা না কিনলে চামড়ার দাম আরো কমে যেত। ’ উত্তরবঙ্গের অন্য জেলাগুলোর ব্যবসায়ীদেরও আশঙ্কা, চামড়ার যে দরপতন দেখা যাচ্ছে, তাতে বাংলাদেশ থেকে বিপুল পরিমাণ চামড়া ভারতে পাচার হয়ে যেতে পারে।

ট্যানারি মালিকদের সিন্ডিকেটের কারণে চট্টগ্রামের আড়তদারদের এবার ২০ কোটি টাকা লোকসান হওয়ার আশঙ্কার কথা জানিয়েছেন চট্টগ্রাম কাঁচা চামড়া আড়তদার ব্যবসায়ী সমবায় সমিতি লিমিটেডের সাবেক সভাপতি মুসলিমউদ্দিন। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ট্যানারি মালিকরা ৯ সেপ্টেম্বর যে দাম নির্ধারণ করেছেন, এর চেয়ে বেশি দরে চামড়া কিনেছেন তাঁরা। কারণ, ঈদের কয়েক দিন আগেও প্রতি বর্গফুট গরুর চামড়া ট্যানারি মালিকরা ৫৫ থেকে ৬০ টাকায় কিনেছেন। আর ওই চামড়াগুলো ছিল নিম্নমানের। কোরবানির পশুর চামড়া আরো উন্নত হওয়ায় দামও বেশি হওয়ার কথা।

মুসলিমউদ্দিন বলেন, ‘আমি নিজে চার হাজার ৮০০টি গরুর চামড়া কিনেছি। তাতে লবণ দেওয়াসহ বর্গফুটপ্রতি খরচ পড়েছে ৬০-৬৫ টাকা। চট্টগ্রামে কোনো ট্যানারি না থাকায় আমরা ঢাকার ট্যানারি মালিকদের দিকে তাকিয়ে আছি। ’

বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি শাহিন আহমেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, অন্যবারের তুলনায় এবার ট্যানারি মালিকদের সমস্যা বেশি। আন্তর্জাতিক বাজারে প্রক্রিয়াজাত ও চামড়াজাত পণ্যের দরও কমতির দিকে। চামড়া সংরক্ষণে লবণের দামও বেশি। ট্যানারি স্থানান্তরে মালিকদের বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় হচ্ছে। এসব কারণে বাণিজ্যমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা করেই দর নির্ধারণ করা হয়েছে। নির্ধারিত দরের চেয়ে বেশি দরে চামড়া কেনা সম্ভব নয়।

বাংলাদেশ ফিনিশড লেদার, লেদার গুডস অ্যান্ড ফুটওয়্যার এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মহিউদ্দিন আহমেদ মাহিন বলেন, ‘কোনো মৌসুমি ব্যবসায়ী নির্ধারিত দরের চেয়ে বেশি দরে চামড়া কিনে আমাদের মতো দীর্ঘদিনের ব্যবসায়ীদের কৌশলে লোকসানে ফেলার চেষ্টা করলে তা আমাদের পক্ষে মেনে নেওয়া সম্ভব নয়। ’

এ বছর কোরবানির পশুর চামড়ার যে দর নির্ধারণ করা হয়েছে, তাতে গরিব মানুষকে ঠকানো হচ্ছে কি না—এমন প্রশ্নের সরাসরি কোনো উত্তর দেননি বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের নেতা ও সালমা ট্যানারির মালিক মো. সাখাওয়াত উল্লাহ। তিনি বলেন, বিভিন্ন সংগঠন ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয় বৈঠক করেই এ দর নির্ধারণ করেছে। দর নির্ধারণের আগে আন্তর্জাতিক বাজার পরিস্থিতি যাচাই-বাছাই করেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ভারতে কাঁচা চামড়ার দর বাংলাদেশের নির্ধারিত দরের চেয়ে বেশি, এমন তথ্যও অস্বীকার করেন তিনি।

তবে দেশের ভেতরে চামড়া বিক্রেতাদের যত করুণ অবস্থা, আন্তর্জাতিক বাজার পরিস্থিতি ততটা করুণ নয়। গতবারের এই সময়ের তুলনায় এখন আন্তর্জাতিক বাজারে চামড়ার দর কম হলেও গত ফেব্রুয়ারি থেকে বিদেশে চামড়ার দরে কোনো হেরফের হয়নি। তা ছাড়া বাংলাদেশের পশুর চামড়ার মান বিশ্বে এক নম্বরে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারের গড় দরের তুলনায় বিদেশে বাংলাদেশের চামড়ার দরও বেশ চড়া হয়। গত ফেব্রুয়ারি থেকে প্রতি পাউন্ড চামড়ার আন্তর্জাতিক দর ৭০ সেন্ট। আর ভারতের নিম্নমানের পশুর চামড়ার দর দেশটির বাজারে প্রতি বর্গফুট ৮০ থেকে ৯০ টাকা। পাকিস্তানেও চামড়ার দাম বাংলাদেশের নির্ধারিত দরের চেয়ে বেশি।

চামড়ার সঙ্গে সম্পৃক্ত সব ব্যবসায়ী সমিতির নেতারা জোটবদ্ধভাবে যেদিন দাম ঘোষণা করলেন, সেদিনই বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা রসিকতা করে বলেছিলেন, ‘দেশের ট্যানারি শিল্পকে এতিমখানার মর্যাদা দিয়ে কোরবানির পশুর চামড়া বিনা পয়সায় ওদের দান করে দেওয়া উচিত। আর চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রপ্তানির বিপরীতে সরকার বছরে যে পরিমাণ নগদ সহায়তা দেয়, তা এতিম-দুস্থদের মাঝে বিতরণ করলে বেশি পয়সা পাবে তারা। ’

নিজের বক্তব্যের যৌক্তিকতা তুলে ধরে ওই কর্মকর্তা বলেন, কোরবানির ঈদের সময় প্রায় এক কোটি পশুর চামড়া পাওয়া যায়। ট্যানারি মালিকরা এক হাজার ২০০ কোটি থেকে এক হাজার ৫০০ কোটি টাকায় ওই চামড়া কেনে। আর সারা বছর আরো এক হাজার কোটি টাকার চামড়া কেনে। অর্থাৎ সব মিলিয়ে বড়জোর আড়াই হাজার কোটি টাকার চামড়া কেনে ট্যানারি মালিক ও রপ্তানিকারকরা। অথচ তারা বছরে রপ্তানি করে ৯ হাজার কোটি টাকার চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য। রপ্তানির বিপরীতে ১৫ শতাংশ হারে রপ্তানিকারকদের বছরে এক হাজার ৩৫০ কোটি টাকা নগদ সহায়তা দেয় সরকার। এর বাইরে দেশের ভেতরেও যেসব চামড়াজাত পণ্য বিক্রি হয়, সেই চামড়াও বিক্রি করে ট্যানারি মালিকরা। তবুও কোরবানির ঈদ আসার আগে থেকেই আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমার আওয়াজ তুলে গরিবের হক কেড়ে নিচ্ছে তারা।

চার বছর ধরেই কোরবানির পশুর চামড়ার দর আগের বছরের তুলনায় কমিয়ে নির্ধারণ করছে এ খাতের ব্যবসায়ীরা। ২০১৩ সালে প্রতি বর্গফুট গরুর কাঁচা চামড়ার দর নির্ধারণ করা হয়েছিল ৮৫-৯০ টাকা। পরের বছর তা কমিয়ে ধরা হয় ৭০-৭৫ টাকা। ২০১৫ সালে প্রতি বর্গফুট গরুর চামড়ার দর আরো কমিয়ে ৫০-৫৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়। আর এ বছর গত ৯ সেপ্টেম্বর ব্যবসায়ীরা ঘোষণা করেছিল ঢাকায় কোরবানির গরুর লবণযুক্ত চামড়ার দাম ধরা হয়েছে বর্গফুটে সর্বোচ্চ ৫০ টাকা, ঢাকার বাইরে তারা ৪০ টাকা দরে কিনবে। আর সারা দেশে লবণযুক্ত খাসির চামড়া প্রতি বর্গফুট ২০ টাকা এবং বকরির চামড়া ১৫ টাকায় কিনবে তারা। তবে বাস্তবে তারা দাম হাঁকছে আরো অনেক কম। ফলে কোরবানিদাতার কাছ থেকে ক্ষুদ্র ও মৌসুমি ব্যবসায়ীরা এবার বেশ কম দামে চামড়া কিনেছে। ঈদের দিন বিকেল থেকে সেই চামড়া নিয়ে আড়তদারদের কাছে গিয়ে হতাশ হয়েছে সারা দেশের লাখো ক্ষুদ্র ও মৌসুমি ব্যবসায়ী। কারণ মুনাফা দূরের কথা, যে দরে চামড়া কিনেছে তারা, তার থেকেও অনেক কম দাম না হলে কিনছে না আড়তদাররা। দেশের কোনো কোনো স্থানে মৌসুমি ব্যবসায়ীরা চামড়া বিক্রি করে রিকশা-ভ্যানের ভাড়া জোগাড় করতে পেরেছে মাত্র।

এবার ময়মনসিংহ শহরের নওমহল এলাকায় প্রতিটি ছাগলের চামড়া বিক্রি হয়েছে ১৫ থেকে ১৭ টাকায়। সেখানে সর্বোচ্চ ১০০ টাকায় বিক্রি হয়েছে ৩২ কেজি মাংস হওয়া একটি ছাগলের চামড়া। আর কোনো কোনো স্থানে বড় একটি গরুর চামড়াও বিক্রি হয়েছে ২০০ টাকায়। যেসব মৌসুমি ব্যবসায়ী ৮০০ থেকে এক হাজার টাকা বা তারও বেশি দরে বড় গরুর চামড়া কিনেছে, তারা এখন আর কেনা দামেও তা বিক্রি করতে পারছে না।

গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর পোস্তা এবং হাজারীবাগে মৌসুমি ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তারা যে দামে রাজধানী ও সারা দেশ থেকে চামড়া কিনেছে, পোস্তার আড়তদাররা তার চেয়ে অনেক কম দাম বলছে। ফলে অনেককেই লোকসান দিতে হচ্ছে। এমনকি ঈদের কয়েক দিন আগেও পোস্তার ব্যবসায়ী ও ট্যানারি মালিকরা যে দরে কাঁচা চামড়া কিনেছে, এখন তার চেয়েও কম দাম বলছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছে, হাজারীবাগ ও পোস্তা থেকে সাভারে ট্যানারি পল্লী স্থানান্তরে সরকারের নির্দেশনা ও উচ্চ আদালতের আরোপ করা জরিমানার অর্থ উসুল করতে চাচ্ছে ট্যানারি মালিকরা। রাজধানীর পোস্তা কাঁচা চামড়ার বাজারে গিয়ে দেখা যায়, মৌসুমি ব্যবসায়ীরা রিকশা-ভ্যানে করে চামড়া নিয়ে এলেই দৌড়ে যাচ্ছে আড়তদাররা। তবে তারা যে দাম বলছে, তাতে মুষড়ে পড়ছে মৌসুমি ব্যবসায়ীরা। একটু ভালো দর পেতে তারা এদিক-সেদিক ঘুরে বেড়াচ্ছে।

ঈদের দিন বিকেল থেকে গত বুধবার পর্যন্ত পোস্তায় চামড়া বিক্রি করতে আসা ফড়িয়ারা লোকসানের মুখে পড়ায় সারা দেশ থেকে পোস্তায় গতকাল চামড়া আসা আশঙ্কাজনক হারে কমে গেছে। লোকসানের আশঙ্কায় ফড়িয়ারা আর পোস্তায় চামড়া আনছে না বলে ব্যবসায়ীরা বলছে। এসব চামড়ার কিছু অংশ ফড়িয়ারা নিজেরাই সংরক্ষণ করছে। আর বাকি চামড়ার কিছু অংশ পচে যাওয়া ও ভারতে পাচার হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

দাম কম হওয়ায় মৌসুমি ব্যবসায়ী, এতিমখানা ও মাদ্রাসার চামড়া প্রথম দিন বিক্রি হয়নি। অনেক চামড়া পরের দিন সকালে বিক্রি করা হয়েছে। আর তাতে লবণ না দেওয়ায় পচন ধরায় দাম আরো কমেছে। এক হাজার ২০০ থেকে এক হাজার ৪০০ টাকায় কেনা চামড়া শেষ পর্যন্ত ২০০-৩০০ টাকায় বিক্রি করতে হয়েছে। পোস্তায় চামড়া বিক্রি করতে আসা  নারায়ণগঞ্জের মৌসুমি ব্যবসায়ী রফিক মিয়া কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আড়তদাররা দাম কম বলায় প্রথম দিন আমরা চামড়া বিক্রি করতে পারিনি। পরের দিন সকালে আগের দিনের চেয়েও অর্ধেক দামে বিক্রি করতে হয়েছে। ’ 

চামড়ার মৌসুমি ব্যবসায়ী ও বাংলাদেশ মাংস ব্যবসায়ী সমিতির মহাসচিব রবিউল আলম কালের কণ্ঠকে বলেন, ট্যানারি মালিক ও আড়তদারদের সিন্ডিকেটের ফলে এ বছর ২৫ শতাংশ চামড়ার অর্ধেকই পচে যাবে। আর ১০ শতাংশ চামড়া পুরোপুরি নষ্ট হবে। এ ছাড়া নির্ধারিত দামে (৪০-৫০ টাকা বর্গফুট হিসাবে) চামড়া বিক্রি হলে উত্তরবঙ্গের কোনো চামড়াই ঢাকায় আসবে না। দাম কম হওয়ার ফলে ওই সব চামড়া নষ্ট হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ইতিমধ্যে উত্তরবঙ্গ থেকে ঢাকার পোস্তায় চামড়া আসা কমে গেছে।

দাম কমার কারণ সম্পর্কে রবিউল আলম আরো বলেন, ট্যানারি স্থানান্তরের শর্ত থাকায় এবার মালিকরা যেনতেন দরে চামড়া কিনতে চাচ্ছে। তাই সরকারের উচিত ২০০ আড়তদার আর ৫০টি ট্যানারি মালিকের স্বার্থ না দেখে লাখ লাখ ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর ন্যায্য পাওনা নিশ্চিত করতে উদ্যোগ নেওয়া।

বাংলাদেশ হাইড অ্যান্ড স্কিন রিটেইল ডিলার মার্চেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক লোকমান মৃধা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা নির্ধারিত দরেই চামড়া কিনছি। কোনো মৌসুমি ব্যবসায়ী বা ফড়িয়া বেশি দরে চামড়া কিনলে তাকে তো লোকসান দিতেই হবে। এ বছর লবণের দাম বেশি হওয়ায় চামড়া সংরক্ষণে দাম একটু বেশি পড়বে।

মৌসুমি ব্যবসায়ীদের পাওনা পরিশোধ না করার কারণ জানতে চাইলে লোকমান মৃধা আরো বলেন,  ‘আমরাই ট্যানারির মালিকদের কাছ থেকে পুরো টাকা পাই না। গত বছরের ঈদের প্রায় ৬৫ শতাংশ টাকাই ট্যানারি মালিকরা আমাদের পরিশোধ করেনি। এ পর্যন্ত মালিকদের কাছে প্রায় ৩০০ কোটি টাকা বকেয়া রয়েছে। এ ছাড়া গত বছরে শুধু পোস্তার ব্যবসায়ীদের ট্যানারি মালিকদের কাছে প্রায় ১০০ কোটি টাকা বকেয়া রয়েছে। ’

পোস্তার আড়তদারদের সংগঠন বাংলাদেশ হাইড অ্যান্ড স্কিন মার্চেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি দেলোয়ার হোসেন বলেন, মৌসুমি ব্যবসায়ীরা যেন ক্ষতির মুখে না পড়ে সে জন্য কোরবানির ঈদের এক সপ্তাহ আগে ট্যানারি মালিকদের দুই সমিতি ও চামড়া ব্যবসায়ী সমিতি দাম নির্ধারণ করে দিয়েছে। এখন ক্ষতি হলে তাদের (মৌসুমি ব্যবসায়ী) দায় নিতে হবে। তারা যেভাবে চামড়া সরবরাহ করেছে, এতে মনে হয়েছে তাদের লাভও বেশি হয়নি, আবার ক্ষতিও হয়নি।

ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, বছরে বাংলাদেশ থেকে ২২ কোটি বর্গফুট চামড়া পাওয়া যায়। এর মধ্যে ৬৪.৮৩ শতাংশ গরুর চামড়া, ৩১.৮২ শতাংশ ছাগলের, ২.২৫ শতাংশ মহিষের এবং ১.২ শতাংশ ভেড়ার চামড়া। জোগানের শতকরা ৬০ ভাগ চামড়া আসে কোরবানির ঈদের সময়। গত বছর কোরবানির ঈদে ৫০ থেকে ৫২ লাখ গরুর চামড়া সংগ্রহ করা হয়। এবার লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৫৫ লাখ। গতবার ৩০ লাখ ছাগল, ভেড়া ও মহিষের চামড়া সংগ্রহের বিপরীতে এবার লক্ষ্য ৩৫ লাখ।

(প্রতিবেদনে তথ্য দিয়েছেন চট্টগ্রাম, বগুড়া ও ফরিদপুরের নিজস্ব প্রতিবেদক এবং নীলফামারী, নওগাঁ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নাটোর, জয়পুরহাট, রাজবাড়ী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের আঞ্চলিক প্রতিনিধি)


মন্তব্য