kalerkantho

বুধবার । ৭ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৬ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


‘বাঁইচা না থাকলে লাশটা দেন, আর কিছু চাই না’

ঢাকা মেডিক্যাল থেকে ২৫ জনের লাশ হস্তান্তর

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা ও গাজীপুর   

১২ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



‘বাঁইচা না থাকলে লাশটা দেন, আর কিছু চাই না’

“সব সময় আমাদের কিনা দেয়। কোনো সময় নিজের জন্য কিছু কিনে নাই।

এইবার নিজেই কইছিল, ‘আমি লুঙ্গি কিনমু। ’ সেই লুঙ্গির প্যাকেট পইরা আছে, কিন্তু মানুষটা নাই। জোর কইরা কাজে পাঠাইছিলাম। এহনো ফিরে নাই। জানি না, আর পামু কি না। ” স্বামীর খোঁজে এসে এভাবেই বিলাপ করছিলেন নার্গিস বেগম। তাঁর স্বামী রফিকুল ইসলাম (৪০) টাম্পাকো ফয়েলস লিমিটেডের ফ্লোর হেলপার হিসেবে কাজ করতেন। শনিবারের দুর্ঘটনার পর থেকেই তাঁর খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না।

রফিকুলের বাড়ি কিশোরগঞ্জের হোসেনপুরের মেছেরা গ্রামে। স্ত্রী আর তিন সন্তান নিয়ে থাকতেন টঙ্গীর মরকুন এলাকায়। গত শুক্রবার রাতে কাজে যাওয়ার জন্য বাসা থেকে বের হয়েছিলেন। গতকাল রবিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত খোঁজ মেলেনি। সন্তানদের নিয়ে স্বামীর খোঁজে টঙ্গীতে ঘুরে ফিরছেন নার্গিস।

তিন বছরের মেয়ে সামিয়াকে কোলে নিয়ে স্বামীর খোঁজে নেমেছেন গৃহবধূ রূপালী বেগম। তাঁর স্বামী মাসুম আহমেদ (৩০) টাম্পাকো কারখানার নিটিং অপারেটর। বাড়ি কুমিল্লার মুরাদনগরে। স্বামীর খোঁজ না পেয়ে দিশাহারা রূপালী বলছিলেন, ‘আমার স্বামী বাঁইচা না থাকলে লাশটা দেন। আমি আর কিছু চাই না। ’

টাম্পাকো কারখানায় বিস্ফোরণ-অগ্নিকাণ্ডে নিখোঁজ ব্যক্তিদের শনাক্ত করতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে গতকাল রবিবার টঙ্গীতে একটি নিয়ন্ত্রণ কক্ষ খোলা হয়। সেখানে নার্গিস ও রূপালীর মতো আরো ৯ নিখোঁজ শ্রমিকের স্বজনরা ভিড় করেন। তাঁদের কান্নায় ভারী হয়ে ওঠে আশপাশের পরিবেশ।

গতকাল পর্যন্ত নিহত ২৯ জনের মধ্যে ২৫ জনের ময়নাতদন্ত হয়েছে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে। পরে স্বজনদের কাছে লাশ হস্তান্তর করা হয়। গতকাল পর্যন্ত ঢাকা মেডিক্যাল, উত্তরার আধুনিক হাসপাতালসহ কয়েকটি হাসপাতালে আরো ২০ জন আহত চিকিৎসাধীন ছিলেন।  

নিয়ন্ত্রণ কক্ষের কর্মকর্তা ও গাজীপুরের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আবুল হাসেম জানান, এখন পর্যন্ত নিখোঁজ ১১ জনের নাম পাওয়া গেছে। উদ্ধারকাজ এখনো চলছে। অভিযান শেষ হলে নিখোঁজ ব্যক্তিদের ব্যাপারে করণীয় সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

গতকাল উদ্ধারকাজ শুরুর পর কারখানার ভেতর থেকে চারজনের মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়। ফায়ার সার্ভিসের একজন কর্মী বলেন, তিনি অগ্নিনির্বাপণ কাজের সময় ধসে পড়া তিন তলা ভবনের মধ্যে তিন-চারজন এবং পাঁচ তলার মধ্যে আরো চার-পাঁচজনের মৃতদেহ দেখেছেন। এসব লাশ পুড়ে খণ্ডিত ও বিকৃত হয়ে আছে। লাশগুলো বের করে আনা যায়নি।

প্রশাসনের তালিকা অনুযায়ী, রফিকুল ও মাসুম ছাড়া নিখোঁজ অন্য ব্যক্তিরা হলেন—কারখানার সহকারী অপারেটর মাগুরা সদরের জনপুর ইগরন গ্রামের কাজিম উদ্দিন (৩৬), সহকারী অপারেটর টাঙ্গাইলের মির্জাপুরের উকুল গ্রামের জহিরুল ইসলাম (৩৭), পরিচ্ছন্নতাকর্মী টঙ্গীর আমতলী বস্তির রাজেস দাস (২২), হেলপার লক্ষ্মীপুরের রামগঞ্জের শিবপুর গ্রামের রিয়াদ হোসেন মুরাদ, প্রিন্টিং অপারেটর সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরের ঝিগারবাড়িয়া গ্রামের ইসমাইল হোসেন (৪৫), একই গ্রামের অপারেটর আনিসুর রহমান (৩০), সিনিয়র অপারেটর চাঁদপুরের কচুয়ার তেঘরিয়া লালখান গ্রামের নাসির উদ্দিন পাটোয়ারী এবং হেলপার ফরিদপুরের বোয়ালমারীর বিমনগরের চুন্নু মোল্লা।

গতকাল ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল মর্গ থেকে নিখোঁজ কর্মী মামুনের (২৯) লাশ ভেবে জুয়েল (২৫) নামে আরেক কর্মীর লাশ নিয়ে রওনা হয় তাঁর স্বজনরা। পরে বিষয়টি ধরা পড়লে ফিরে আসে মামুনের স্বজনরা। নিখোঁজ হেলপার মামুনের বাড়ি চট্টগ্রামের সন্দ্বীপ উপজেলায়। মামুনের ভাই শহীদুল ইসলাম বলেন, ‘পোড়া লাশ বুঝতে পারি নাই। এখনো তো আমার ভাইরে পাইলাম না। জানি না কী হইছে?’

নিখোঁজ রফিকুল ইসলামের স্ত্রী নার্গিস আক্তার বলেন, শুক্রবার রাত ৯টায় কাজে যাওয়ার কথা ছিল রফিকুলের। কিন্তু শরীর খারাপ লাগে, কাজে যাবেন না বলে শুয়ে ছিলেন রফিকুল। তিনিই (নার্গিস) ছুটির আগে শেষ দিনের কাজে যোগ দিতে জোর করে পাঠান তাঁকে।

নার্গিস বলেন, ঈদ উপলক্ষে শনিবারই তাঁদের গ্রামের বাড়ি কিশোরগঞ্জে যাওয়ার কথা ছিল। এর আগে রফিকুল নিজের জন্য লুঙ্গি কেনেন। শনিবার ছেলেদের জন্য কাপড় কেনার কথা ছিল। তাঁদের বড় মেয়ে সাবিনার বিয়ে দিয়েছেন গত রমজান মাসে। বড় ছেলে রাকিবুল এবার এসএসসি পরীক্ষার্থী। ছোট ছেলে শাকিল চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ে। স্বামীকে খুঁজে না পেয়ে এখন দুচোখে অন্ধকার দেখছেন।

গতকাল কারখানাটির সামনে এলাকাবাসীর সঙ্গে ভিড় করেন কয়েকজন শ্রমিকও। তাঁদের একজন শফিকুল ইসলাম টাম্পাকোর প্রিন্টিং অপারেটর। তিনি বলেন, ‘চোখের সামনে আমার রুটি-রুজি শেষ হয়ে গেল। বাঁইচা গেছি ঠিকই, কিন্তু ভবিষ্যৎ কী হইব? এই চিন্তায় আছি আমরা। ঈদের পরে আর কাজ পামু না!’

 


মন্তব্য