kalerkantho

সোমবার । ৫ ডিসেম্বর ২০১৬। ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৪ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


পবিত্র হজ পালিত

সন্ত্রাস পরিহারের আহ্বান

নিজস্ব প্রতিবেদক   

১২ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



সন্ত্রাস পরিহারের আহ্বান

গুনাহ মাফ ও আত্মশুদ্ধি কামনায় গতকাল আরাফাতের ময়দানে আল্লাহ্র দরবারে হাজিদের প্রার্থনা। ছবি : এএফপি

 

‘লাব্বাইক, আল্লাহুম্মা লাব্বাইক’ ধ্বনিতে গতকাল রবিবার মুখর হয়ে উঠেছে ঐতিহাসিক আরাফাত ময়দান। গুনাহ মাফ আর আত্মশুদ্ধি কামনায় সারা বিশ্বের প্রায় ১৪ লাখ ধর্মপ্রাণ মুসলমান পালন করেছেন ইসলামের অন্যতম ফরজ ইবাদত পবিত্র হজ।

আর খুতবায় আহ্বান জানানো হয়েছে সন্ত্রাস-উগ্রবাদ পরিহারের। আরবি জিলহজ মাসের ৯ তারিখ অনুষ্ঠিত হয় পবিত্র হজের মূল অনুষ্ঠান। মিনার তাঁবুতে রাত যাপন শেষে হাজিরা রবিবার ফজরের নামাজ আদায় করেই যাত্রা শুরু করেন আরাফাত ময়দানের উদ্দেশে। তাঁদের সবার মুখেই ছিল তালবিয়া—‘লাব্বাইক, আল্লাহুম্মা লাব্বাইক, লাব্বাইকা লা শারিকা লাকা লাব্বাইক, ইন্নাল হামদা, ওয়ান নিমাতা, লাকাওয়াল মুলক লা শারিকা লাক’ অর্থাৎ ‘আমি হাজির, হে আল্লাহ আমি হাজির, তোমার কোনো শরিক নেই, সমস্ত প্রশংসা ও নিয়ামত শুধু তোমারই, সব সাম্রাজ্যও তোমার। ’

হজের খুতবায় মুসলিম উম্মাহর শান্তি কামনার পাশাপাশি ধর্ম প্রচারে উগ্রতা পরিহার এবং উদ্ভূত সমস্যা সমাধানে একসঙ্গে কাজ করতে মুসলিম নেতাদের প্রতি আহ্বান জানান সৌদি আরবের গ্র্যান্ড মসজিদের ইমাম ও নবনির্বাচিত খতিব আবদুর রহমান আস সুদাইস।

হজের আনুষ্ঠানিকতা পালনের উদ্দেশ্যে শুক্রবার সন্ধ্যায় পবিত্র মক্কা নগরী থেকে মিনার তাঁবুতে গিয়ে নামাজ আদায়, ইবাদত-বন্দেগি ও জিকির-আজকার করেন হাজিরা। হজের তিনটি ফরজের মধ্যে একটি হচ্ছে আরাফাতের ময়দানে অবস্থান করা। পবিত্র মক্কা নগরী থেকে ১৪ কিলোমিটার দূরে হজরত আদম (আ.) ও মা হাওয়া (আ.)-এর পুনর্মিলনের ঐতিহাসিক স্থান এই আরাফাত। আরাফাত ময়দানের জাবালে রহমত হচ্ছে পুনর্মিলনের স্মৃতিস্তম্ভ, যেখানে হাজিরা সমবেত হন এবং মোনাজাত করেন। মুসলমানদের কাছে আরাফাত ময়দানের গুরুত্ব অপরিসীম। এই ময়দানেই ১০ হিজরি সনে জিলহজ মাসের ৯ তারিখে বিদায় হজে নিজ অনুসারীদের উদ্দেশে শেষ ভাষণ দিয়েছিলেন রাসুল হজরত মুহাম্মদ (সা.)।

তিন দিক থেকে ঘেরা আরাফাত ময়দান। কেউ পর্বতের গায়ে কেউবা সমতল ময়দানে বসেই আল্লাহর করুণা ভিক্ষা করেন। যাঁরা অসুস্থ, তাঁরাও বিশেষ অ্যাম্বুল্যান্সে আরাফাত ময়দানে থাকার সুযোগ পান।

সৌদি সময় দুপুর সোয়া ১২টায় মসজিদে নামেরা থেকে খুতবা শুরু করেন খতিব আবদুর রহমান আস সুদাইস। পৌনে এক ঘণ্টাব্যাপী খুতবায় আবদুর রহমান আস সুদাইস ইমাম ও আলেমদের উদ্দেশে বলেন, ‘আমরা নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর উম্মত। আমাদের দায়িত্ব অনেক বেশি, ভুলে গেলে চলবে না। মানুষকে দ্বীনের পথে আনতে হবে সুন্দর হৃদয় দিয়ে। বল প্রয়োগ করে ধর্ম প্রচার করা যাবে না। উগ্রতা পরিহার করতে হবে। ইসলাম প্রচারে সব মাধ্যম ব্যবহার করতে হবে। ’

খতিব বলেন, ‘আরব-অনারবের কোনো পার্থক্য নেই। জাতি ও দেশভেদের পার্থক্য ইসলাম সমর্থন করে না। এটা নবীর শিক্ষা। নবী (সা.) এখানে দাঁড়িয়ে এটা বলেছিলেন। ’ তিনি আরো বলেন, ‘মুসলমানরা এক অঙ্গভুক্ত। একজনের থেকে আরেকজনকে আলাদা করার সুযোগ নেই। পরস্পরের প্রতি দয়া ও ভালোবাসা প্রদর্শন করতে হবে। পরস্পরের মঙ্গল কামনা করতে হবে। ’ বয়ানে তিনি নির্যাতিত ফিলিস্তিন, ইরাক ও ইয়েমেনের মুসলমানদের জন্য বিশেষভাবে দোয়া করেন।

বয়ানে বলা হয়, ‘মুসলমানরা ভাই ভাই। আমাদের সেভাবে চলতে হবে। ইসলাম মানবতার ধর্ম, সহানুভূতির ধর্ম। ইসলাম গ্রন্থিত হয়েছে ন্যায়বিচার দ্বারা, সততা দ্বারা ও ভালো ব্যবহার দ্বারা। এটা আমাদের মানতে হবে। আপনারা এটা মানবেন। আপনারা নিরাপদ ভূমিতে যেভাবে চলছেন, হজ-পরবর্তী জীবনে সেভাবেই চলবেন। সন্ত্রাসবাদ কোনো ধর্ম বা জাতি সমর্থন করে না। ’ যুবকদের জন্য খতিব বলেন, ‘ইসলামের প্রচার ঘটেছে তোমাদের মতো যুবকদের হাত ধরে। তোমাদের দায়িত্ব অনেক বেশি সেটা ভুলবে না। যৌবনে গা ভাসিয়ে চলবে না। ’

ভাষণের শেষ অংশে দোয়ায় খতিব বিশ্ব শান্তি কামনা করে মুসলমানদের ঐক্য প্রত্যাশা করেন এবং সবার আত্মশুদ্ধি কামনা করেন। মানবতার মঙ্গল কামনা করেন। এ সময় আরাফাতের ময়দান থেকে ভেসে আসে ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের কান্নার আওয়াজ।

দোয়ায় খতিব নবীর দেখানো পথে চলার শক্তি কামনা করেন। উপস্থিত হাজিদের জন্য আল্লাহর দরবারে কবুল হজ কামনা করেন। হজ ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের জন্য দোয়া করেন। সমগ্র বিশ্বের কবরবাসীর মাগফিরাত কামনা করেন।

খুতবায় খতিব হাজিদের উন্নয়নে গৃহীত সৌদি সরকারের বিভিন্ন কর্মসূচির প্রশংসা করেন। সেই সঙ্গে তিনি সৌদি বাদশাহর সুস্থতা কামনা করে দোয়া করেন।

খুতবা শেষে মসজিদে নামিরায় জোহর ও আসরের নামাজ আদায় করেন হাজিরা। সূর্যাস্ত পর্যন্ত তাঁরা আরাফাত ময়দানেই অবস্থান করেন। কাফনের কাপড়ের অনুরূপ দুই খণ্ড শুভ্র বসনে ইহরাম বেঁধে লাখ লাখ মানুষ আত্মসমর্পণ করেন মহান সৃষ্টিকর্তার দরবারে। গুনাহ মার্জনা আর বিশ্ব শান্তির জন্য দোয়ায় তাঁদের কান্নার ধ্বনি, পাপমোচনের ব্যাকুলতা, একে অন্যের সঙ্গে কোলাকুলি, মোনাজাত আর পরস্পর সৌহার্দ্য বিনিময়ের এমন অভূতপূর্ব দৃশ্য আবারও স্মরণ করিয়ে দেয়—মানবতার ধর্ম ইসলাম, শান্তির ধর্ম ইসলাম, ইসলাম ধনী-গরিবের ভেদাভেদহীন এক পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান।

সূর্যাস্তের পর আরাফাত ময়দান থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার দূরে মুজদালিফায় রাত যাপন ও পাথর সংগ্রহ করেন হাজিরা। রাতে তাঁরা আবার এক আজানে মাগরিব ও এশার নামাজ আদায় করেন। মুজদালিফায় রাত যাপন শেষে আজ সোমবার ১০ জিলহজ সকালে ফজরের নামাজ আদায় করে তাঁরা ফিরে যাবেন মিনায়। সেখানে জামারাতে বড় শয়তানকে পাথর নিক্ষেপ ও পশু কোরবানির পর (পুরুষ হাজিরা) মাথা মুণ্ডন বা চুল ছেঁটে ইহরাম খুলে ফেলবেন। এরপর মক্কায় পবিত্র কাবা শরিফ তাওয়াফ তথা তাওয়াফে জিয়ারা করবেন। এর মাধ্যমে তাঁরা হজের মূল কার্যক্রম শেষ করবেন। তাওয়াফ শেষে মিনায় তাঁবুতে ফিরে হাজিরা ১১ ও ১২ জিলহজ অবস্থান করবেন এবং প্রতিদিন তিন শয়তানকে পাথর নিক্ষেপ করবেন। সর্বশেষ মক্কা ত্যাগের আগে পবিত্র কাবা শরিফে বিদায়ী তাওয়াফ করে হজের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করবেন হাজিরা।

এ বছর বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে প্রায় ১৪ লাখ ধর্মপ্রাণ মুসলমান মক্কায় হজ করতে গেছেন। এর মধ্যে বাংলাদেশ থেকে হজ করতে গেছেন এক লাখ এক হাজার ৮২৯ জন (ব্যবস্থাপনা সদস্যসহ)। এঁদের মধ্যে গত ৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৩৩ জন বাংলাদেশি হজযাত্রী সৌদি আরবেই মৃত্যুবরণ করেন।

গত বছর মিনায় পাথর নিক্ষেপের সময় পদদলিত হয়ে বহু হাজির মৃত্যু হয়। সে বিষয়টি মাথায় রেখে এবার মক্কায় কঠোর নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা হয়েছে। বিশেষ করে মিনায় শয়তানকে পাথর নিক্ষেপের সময় যেন কোনো দুর্ঘটনা না ঘটে সে জন্য হাজিদের ভাগ ভাগ করে সেখানে পাঠানোর ব্যবস্থা করেছে সৌদি হজ কর্তৃপক্ষ।

 


মন্তব্য