kalerkantho


বিতর্কিত মালিক লেচু মিয়া

ঝুঁকিপূর্ণ ভবন সিলিন্ডার, বয়লার মেয়াদোত্তীর্ণ

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা ও গাজীপুর   

১১ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



ঝুঁকিপূর্ণ ভবন সিলিন্ডার, বয়লার মেয়াদোত্তীর্ণ

টঙ্গীর বিসিক শিল্প নগরীর টাম্পাকো ফয়েলস লিমিটেড কারখানা ভবন ছিল পুরনো এবং ঝুঁকিপূর্ণ। সেখানে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে গ্যাস সংযোগ ও সিলিন্ডার রাখা হয়েছিল। যার পাশেই ছিল শক্তিশালী বয়লার। এই বয়লার স্থাপনে সঠিক অনুমোদন ও পরবর্তী সময়ে মেয়াদ ছিল না বলে দাবি করছে শ্রমিকরা। এসব কারণেই বিস্ফোরণ ঘটে এবং অগ্নিকাণ্ডের ভয়াবহতায় বিশাল স্থাপনা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। ঝরে যায় ২৪ প্রাণ, আহত হয় অসংখ্য। সরেজমিনে  গিয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে, বছরের পর বছর কারখানাটির পরিধি বাড়ানো হলেও এর মান উন্নয়নে কোনো উদ্যোগ নেয়নি কর্তৃপক্ষ। শ্রমিকরা বলছে, কারখানা কর্তৃপক্ষের অনিয়ম এবং সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উদাসীনতার কারণে প্রাণহানি ঘটেছে। গতকাল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান বলেছেন, কারখানাটির মালিকের বিরুদ্ধে অভিযোগ পাওয়া গেলে তাঁর বিরুদ্ধে মামলা করা হবে। এদিকে কারখানার মালিক সৈয়দ মকবুল হোসেন লেচু মিয়া রাজনীতিতেও এক প্রভাবশালী নাম। এমপি হয়েছেন দুইবার। বিএনপি, জাতীয় পার্টি করেছেন। রাজনীতি ছেড়ে দেওয়ার ঘোষণা দিলেও সাম্প্রতিক সময়ে আওয়ামী লীগের গুণগানে মত্ত থাকতে দেখা যায় তাঁকে। নানা বিতর্কিত কথা ও কাজে নিজ এলাকা সিলেটে চরমভাবে সমালোচিত তিনি।

গতকাল দুপুরে পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) এ কে এম শহীদুল হক ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে বলেন, ‘এখানে মালিকপক্ষের গাফিলতি ছিল বলে অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। কর্তৃপক্ষের গাফিলতি আছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হবে। তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এটি শিল্পনগরী এলাকা হওয়ায় কনসার্ন অথরিটি থাকার পরও কেন এ ধরনের ঘটনা ঘটল, তা তদন্ত করে দেখব আমরা। ’

তবে মালিক সৈয়দ মকবুল হোসেন মোবাইল ফোনে কালের কণ্ঠ’র কাছে দাবি করেন, ভবনের সব ধরনের বৈধ কাগজপত্র আছে। এটি ঝুঁকিপূর্ণ নয় বলেও দাবি করেন তিনি।

পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে আহত দুই শ্রমিক বলেন, কারখানাটিতে চারটি বয়লার আছে। সেগুলো বড় আকারের। সিঁড়ির পাশে বড় আকারের বয়লারটি যেখানে ছিল, সেখানে গ্যাস পাইপলাইনসহ অন্তত ১৫টি বড় গ্যাস সিলিন্ডার ছিল। সেখান থেকে পাইপের ছিদ্র দিয়ে চার দিন ধরে গ্যাস বের হচ্ছিল। শ্রমিকরা বারবার বিষয়টি জানিয়েছে। এমন পরিস্থিতিতেও উদাসীন ছিল কর্তৃপক্ষ। গত ১০ বছরে কারখানাটির আকার অনেকটা বেড়েছে। সে অনুযায়ী নিরাপত্তাব্যবস্থা বাড়ানো হয়নি।

সমাজতান্ত্রিক শ্রমিক ফ্রন্টের সাধারণ সম্পাদক রাজেকুজ্জামান রতন বলেন, মালিকপক্ষ ও সরকারের গাফিলতির কারণে এত বড় দুর্ঘটনা ঘটেছে। আজ এত শ্রমিক মারা গেছে। এখানে মেয়াদোত্তীর্ণ বয়লার ছিল। ভবনটিও ঠিক ছিল না। কেউ সেদিকে খেয়ালই রাখেনি।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, একটি প্যাকেজিং কারখানা চালাতে হলে কলকারখানা পরিদর্শন পরিদপ্তর, বিস্ফোরক পরিদপ্তর, পরিবেশ অধিদপ্তরসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের অনুমোদন নিতে হয়। তবে কারখাটির এসব ধরনের অনুমোদন ছিল না বা দু-এক ক্ষেত্রে থাকলেও ত্রুটিপূর্ণ ছিল বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। কয়েকজন কর্মী বলেন, কলকারখানা পরিদর্শন বিভাগ থেকে কখনোই সেখানে কাউকে পরিদর্শনে আসতে দেখেননি তাঁরা। চারটি বয়লার থাকলেও আনুমোদন ছিল মাত্র দুটির।

পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা বলেন, একটি বয়লারের মেয়াদ থাকে পাঁচ বছর। অথচ এই ফ্যাক্টরির বয়লারের মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে চার বছর আগে। মো. শাহজাহান নামের স্থানীয় এক বাসিন্দা বলেন, কারখানাটি পাকিস্তান আমলের। এই কারখানায় অনেক পুরনো বিল্ডিং আছ। আবার আরেক পাশ নতুন। কোনো পরিকল্পনা ছাড়াই দিন দিন এটিকে বড় করে তোলা হচ্ছিল। কিন্তু পুরনো ভবন ভেঙে নতুন ভবন করতে দেখা যায়নি।

শিল্প মন্ত্রণালয়ের বয়লার পরিদর্শক শরাফত আলী বলেন, কিভাবে এখানে বিস্ফোরণ ও অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে, তা খতিয়ে দেখা হবে। পরিবেশ অধিদপ্তরের গাজীপুরের উপপরিচালক সোনিয়া সুলতানা বলেন, কারখানাটির ফয়েলস উৎপাদনের ছাড়পত্র আছে। তবে সেখানে কিভাবে উৎপাদন করা হতো বা অন্য কিছু উৎপাদন করা হতো কি না, তা তদন্ত করে দেখা হবে।

গাজীপুরের জেলা প্রশাসক এস এম আলম বলেন, ‘ভবনটি অনেক পুরনো। এটি ঝুঁকিপূর্ণ বা এর সঠিক অনুমোদন ছিল কি না, তা আমরা যাচাই করে দেখব। ’

নানা কথা আচরণ আর কাজে বরাবরই সমালোচিত : টঙ্গীর টাম্পাকো ফয়েলস কারখানার মালিক সিলেটের রাজনৈতিক অঙ্গনের নাটকীয় চরিত্র ড. সৈয়দ মকবুল হোসেন। অর্থবিলাসী এই ব্যক্তি এলাকায় লেচু মিয়া নামে পরিচিত। কিন্তু এই নামে তিনি পরিচয় দিতে চান না। ২০০১ সালে সিলেট-৬ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। স্বতন্ত্র নির্বাচন করলেও পরে বিএনপি তাঁকে দলে টেনে নেয়। কিছুদিনের মধ্যেই বিএনপির প্রভাবশালী নেতা সাবেক অর্থমন্ত্রী এম সাইফুর রহমানকে সম্রাট, তাঁর ছেলে নাসের রহমানকে যুবরাজ বলে আলোচনার ঝড় তুলেছিলেন। স্থানীয় অন্য আরো কয়েকজন সংসদ সদস্যকে নিয়ে সাইফুরের বিরুদ্ধে কথা বলায় সোচ্চার ছিলেন। নিখোঁজ বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলীসহ সিলেটের তখনকার আরো কয়েকজন সংসদ সদস্যের সঙ্গে এক হয়ে সাইফুর রহমানবিরোধী বলয় গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন।

সখ্য গড়ে উঠলেও ইলিয়াস আলীকে চাঁদাবাজ বলে মন্তব্য করেছিলেন ২০১১ সালের অক্টোবরে। এর ছয় মাসের মধ্যেই ইলিয়াস আলী নিখোঁজ হন। মকবুল ২০১৪ সালের ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহে হঠাৎ করে রাজনীতি ও নির্বাচন থেকে অবসর নেওয়ার ঘোষণা দেন। সাম্প্রতিক সময়ে বর্তমান সরকারের গুণগান গেয়েও বক্তব্য দেওয়া শুরু করেছেন। স্থানীয় পর্যবেক্ষকদের অনেকে বলছেন, নিজ জীবনের প্রিয় অনুষঙ্গ ‘রাজনীতি ও নির্বাচন’ ছেড়ে দিয়েছেন—এ কথা তাঁরা বিশ্বাস করতে পারছেন না। এটি তাঁর নতুন কূটচাল। প্রতিপক্ষকে বুঝতে না দেওয়া ও হয়রানি থেকে রক্ষা পেতেই গোপনে নির্বাচনের প্রস্তুতি নিয়ে আবার তিনি রাজনীতিতে আসতে পারেন।

এমন কঠিন ও রহস্যময় ব্যক্তির মালিকানাধীন কারখানাটিতে আগুন লেগে প্রাণ গেছে ২৪ জনের। গতকাল আলাপকালে কালের কণ্ঠকে তিনি বলেন, ১৯৭৭ সালে ছোট পরিসরে তিনি ওই কারখানা গড়ে তুলেছিলেন। ৩৯ বছর ধরে এটি উৎপাদনে ছিল। তিনি ঋণখেলাপি নন বলেও দাবি করেন। তিনি তাঁর এলাকায় নিজের টাকায় পাঁচটি বড় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন বলেও জানান। সেসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মেধাবীরা এ কারখানায় কাজ করার সুযোগ পেত। তিনি বলেন, ‘আমি এ দুর্ঘটনায় মর্মাহত। তবে অ্যাক্সিডেন্ট ইজ অ্যাক্সিডেন্ট। ’ নিজে কি ঘটনাস্থলে গিয়েছিলেন—জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমার বয়স হয়েছে। আমি আগের মতো চলতে পারি না। তবে আমার অসংখ্য লোকজন সেখানে আছে। আমি খোঁজ-খবর রাখছি। ’

সিলেট-৬ সংসদীয় আসন (গোলাপগঞ্জ-বিয়ানীবাজার) থেকে দুইবার সংসদ সদস্য নির্বাচনে জয়ী হয়েছিলেন মকবুল। ১৯৮৬ সালের নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে এমপি হন। পরে জাতীয় পার্টিতে যোগ দেন। তখন চোরাচালানের অভিযোগে বিমানবন্দর থেকে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল।

আওয়ামী লীগ সরকারের গত মেয়াদে ২০১১ সালের ১১ অক্টোবর মকবুল বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার উপস্থিতিতে সিলেটের আলিয়া মাদ্রাসা মাঠের জনসভায় মঞ্চে ওঠেন। তখন অভিযোগ ওঠে ইলিয়াস আলীকে তিনি ২০ লাখ টাকা দিয়েছিলেন সভামঞ্চে জায়গা পেতে ও বক্তব্য দেওয়ার শর্তে। পরে সভামঞ্চে বসতে দেওয়া হলেও তাঁকে বক্তব্য দিতে দেওয়া হয়নি। তখন মকবুল প্রকাশ্যে ইলিয়াস আলীর বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগ করেন। অথচ চারদলীয় জোট সরকারের সময় ইলিয়াস আলীর সঙ্গে তাঁর সখ্য ছিল সাইফুর রহমানকে ঠেকাতে।

২০১৪ সালের ডিসেম্বরে রাজনীতি থেকে সরে যাওয়ার ঘোষণা কেন দিয়েছেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমার বয়স হয়েছে। আমি পরিবার ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানে সময় দিতে চাই। ’


মন্তব্য