kalerkantho

শুক্রবার । ৯ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৮ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


ঝলসে গেল ঈদের খুশি

সরোয়ার আলম, এস এম আজাদ ও শরীফ আহেমদ শামীম   

১১ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



ঝলসে গেল ঈদের খুশি

আগুন ও ভবনধসে স্বজন হারানোদের আহাজারি। ছবি : কালের কণ্ঠ

ঈদযাত্রার প্রস্তুতি প্রায় চূড়ান্ত। সকালে মিলবে বোনাস, হবে ছুটি।

স্বজনের জন্য কেনাকাটা শেষেই বাড়ি যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সব শেষ এক বিস্ফোরণে। জীবন থেকে চিরতরে ছুটি মিলেছে আল মামুন দুলাল (৪০) নামের অপারেটরের। স্ত্রী খাদেজা বেগম গতকাল শনিবার বিলাপ করে বলছিলেন, ‘ভোরবেলা কাজে আসছে। বলছে, বোনাস পাইব। ছেলেমেয়ের জন্য কিছু কিনব। আমার আর বোনাস লাগবে না। তারে আইনা দেন...। ’

টঙ্গীর টাম্পাকো ফয়েলস লিমিটেডের কারখানার বিস্ফোরণে এভাবেই বিলীন হয়ে গেছে অনেক পরিবারের ঈদ আনন্দ। শোকার্ত স্বজন এখন পাগলপারা হয়ে ছুটছে ঘটনাস্থল, হাসপাতাল ও মর্গে। আগুনে পোড়া লাশ শনাক্ত করতেও হিমশিম স্বজনরা।

পিরোজপুর মঠবাড়িয়ার মাছুয়া গ্রামের ছেলে আল মামুন দুলাল টাম্পাকো ফয়েলস কারখানায় অপারেটর হিসেবে কর্মরত ছিলেন। স্ত্রী আর তিন সন্তান নিয়ে থাকতেন টঙ্গীর পূর্ব আরিচপুরে। স্ত্রী খাদেজা জানান, মেয়ে দোলনা এবার দ্বাদশ শ্রেণিতে, আর ছেলে খালিদ পড়ে দ্বিতীয় শ্রেণিতে। সবচেয়ে ছোট রাব্বির বয়স চার বছর। দুলাল বেতন পেয়েছেন ৩ সেপ্টেম্বর, শনিবার ছিল বোনাস দেওয়ার দিন। আর তা দিয়ে সন্তানদের জন্য নতুন কাপড় কিনতে চেয়েছিলেন।

কোরবানির ঈদের তিন দিন আগে মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় নিহত ও আহত শ্রমিকদের পরিবারে নেমে এসেছে একরাশ বিষাদ। গতকাল হাসপাতাল ও ঘটনাস্থলে স্বজনদের আহাজারি আপ্লুত করেছে সবাইকে। টঙ্গী ৫০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতাল গেটে গতকাল দিনভর দেখা যায় অসংখ্য মানুষের উপস্থিতি। একটি লাশ পৌঁছা মাত্র সবাই হুমড়ি খেয়ে পড়ছে। খুঁজছে প্রিয়জনের মুখ। কিন্তু আগুনে ঝলসানো লাশ শনাক্ত করাটাও কঠিন তাদের জন্য। হাসপাতালে মুমূর্ষু অবস্থায় কেউ স্বজনের সন্ধান পেলে সেটিও হচ্ছে সান্ত্বনার মতো। এক হূদয়বিদারক দৃশ্য এখন কারখানার বিস্ফোরণ ঘিরে।

ভোলার দৌলতখানের তোফাজ্জল হোসেনের ছেলে মাইনুদ্দিন (৩৫) ছিলেন কারখানাটির একজন অপারেটর। ছোট ভাই আব্দুল আজিজ জানান, বড় সংসারের দায়িত্ব নিয়েছিলেন মাইনুদ্দিন। এখন পরিবারের কী হবে, বুঝছে না কেউ।

ঢাকার আবুল বাশার পাটোয়ারী টঙ্গীতে গিয়ে খুঁজছিলেন বড় ভাই নাসির পাটোয়ারীকে (৫০)। নাসির এ কারখানার মেশিন অপারেটর। শুক্রবার রাত ১০টার দিকে তিনি কারখানায় যান। সকালে আগুন লাগার পর থেকে তাঁর মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া গেছে। সন্ধ্যা পর্যন্ত তাঁর অবস্থান সম্পর্কে পরিবারের সদস্যরা নিশ্চিত হতে পারেনি। নাসিরের এক ছেলে ও তিন মেয়ে। তাঁদের গ্রামের বাড়ি চাঁদপুরের কচুয়ার টেগুরিয়ায়।

এ কারখানায় কাজ করতেন সোলায়মান। গতকাল বিকেলে তাঁর লাশ শনাক্ত করা হয়েছে। সকালে স্বামীকে না পেয়ে কারখানার সামনে বিলাপ করছিলেন স্ত্রী রেহেনা আক্তার। তিনি জানান, কারখানাটিতে রবিবার ছুটি হওয়ার কথা ছিল। শুক্রবার রাতে সোলায়মান রাতের ডিউটির জন্য ঘর থেকে বের হন। এরপর আর যোগাযোগ হয়নি। ঘটনার পর থেকে মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া গেছে।

১৯ বছর বয়সী মুরাদ কারখানাটিতে মেশিন হেলপার হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তাঁর খোঁজ না পেয়ে হাসপাতালে খুঁজছেন তাঁর ভাবি সুমি। কান্নাজড়িত কণ্ঠে ছবি দেখিয়ে সবাইকে তিনি বলছেন, ‘মুরাদকে কেউ দেখেছেন?’

শ্রমিক রফিকুল ইসলামের স্ত্রী নার্গিস আক্তার জানান, শুক্রবার রাত ১০টার মধ্যেই কাজে যোগ দিয়েছেন রফিকুল। আগুন লাগার পর সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে না তাঁর। তাঁর মোবাইল ফোনটিও বন্ধ পাওয়া যাচ্ছে। দুই সন্তান নিয়ে হাসপাতাল ও ঘটনাস্থলে ছোটাছুটি করছিলেন নার্গিস।

মাসুদ আলম (৩৭) টঙ্গীর এ কারখানায় কাজ করতেন আড়াই বছর ধরে। গতকাল ভোরে কারখানায়ই ছিলেন তিনি। দুর্ঘটনার পর থেকে তাঁর খোঁজ পাচ্ছেন না বলে জানান ভাগ্নি নার্গিস সুলতানা।   তিনি বলেন, ‘ভোর ৬টার দিকে যখন বয়লার বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে তখন আমার মামা কারখানায়ই ছিলেন। কিন্তু দুর্ঘটনার পর থেকে তাঁর খোঁজ পাচ্ছি না। হাসপাতালেও খুঁজেছি, কিন্তু পাইনি। কী ঘটেছে তাঁর ভাগ্যে, আমরা জানি না। ’

এ ঘটনায় নিখোঁজ রয়েছেন ক্লিনার রাজেশ। তাঁর সন্ধানে বিভিন্ন জায়গায় খোঁজাখুঁজি করে শেষে হাসপাতাল মর্গে গেছে স্বজনরা। তাঁর বাবার নাম দীলিপ ডোম, মা মৃণা রাণী। রাজেশের বাড়ি টঙ্গীর আমতলা। রাজেশের বাবা দীলিপ কেঁদে বলেন, সকাল ৬টা থেকে তাঁর ছেলের ডিউটি ছিল। কিন্তু অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা জানার পর আর তাঁকে পাওয়া যায়নি।


মন্তব্য