kalerkantho

শনিবার । ১০ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৯ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


দেশি ওষুধের বিশ্ব চমক

তৌফিক মারুফ   

১০ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



দেশি ওষুধের বিশ্ব চমক

ক্যান্সারের চিকিৎসায় প্রয়োজনীয় সব ধরনের ওষুধই এখন তৈরি হচ্ছে বাংলাদেশে। কেমোথেরাপির ইনজেকশন বা ওরাল ট্যাবলেট ক্যান্সারে আক্রান্ত রোগীদের নাগালে এসেছে দেশীয় প্রতিষ্ঠান বিকন ফার্মার সুবাদে।

সেই সঙ্গে ক্যান্সারের আরো কয়েকটি ওষুধ বাজারে ছেড়েছে রেনাটা, টেকনো ড্রাগ, ইনসেপ্টাসহ কয়েকটি কম্পানি। তবে সবাইকে ছাপিয়ে কেবল বিকনের রয়েছে ক্যান্সারের ৬৮ আইটেমের ওষুধ। সম্প্রতি বিকন ফুসফুসের ক্যান্সারের ওষুধ হিসেবে ‘টেগরিস’ বাজারজাত করেছে, যা দেশে প্রথম। যুক্তরাজ্যের এসট্রা জেনেকা কম্পানির ওসিমারটিনিভের ‘ট্যাগরিসো’র জেনেরিক ধরে এটা তৈরি। একই ধারায় তারা বাজারে ছেড়েছে ক্যান্সারের আরেক ওষুধ ফাইজারের ‘ক্রিজোটিনিভ’- এর জেনেরিক ধরে ‘ক্রীজোনিক্স’। পাশাপাশি হেপাটাইটিস ‘সি’ চিকিৎসায় আরেক মাইলফলক তৈরি করেছে বিকন ফার্মার ‘সোফেসভেল’ ও ‘ডারভোনি’। ডারভোনি নিয়ে রীতিমতো উচ্ছ্বাসের খবর ছাপা হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের সংবাদমাধ্যমে।

বিকন ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ এবাদুল করীম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা দেশের চিকিৎসাসেবায় আমূল একটা পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখি। ওষুধের ব্যবসার নামে মানুষের জীবনকে জিম্মি করার মানসিকতা আমরা কোনোভাবেই পোষণ করি না। এ জন্যই দেশে দুরূহ ওষুধ প্রস্তুতের দিকে আমাদের নজর বেশি। এ ছাড়া আমাদের আরো কয়েকটি আইটেম আছে, যা আবিষ্কারক কম্পানির পর আমরাই প্রথম বাজারে ছেড়েছি। ’

‘টেগরিস’, ‘ক্রীজোনিক্স’, ‘সোফেসভেল’ ও ‘ডারভোনি’ নিয়ে একই প্রতিষ্ঠানের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট মঞ্জুরুল আলম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ওই চারটি ওষুধই মূল আবিষ্কারক কম্পানির পরে আমরাই বিশ্বে প্রথম বাজারজাত করেছি, এখন যা বিভিন্ন দেশে রপ্তানিও হচ্ছে। এ ছাড়া সোফেসভেল ও ডারভোনির দাম আবিষ্কারক কম্পানির চেয়ে অনেক গুণ কম হওয়ায় খোদ আমেরিকাসহ বিভিন্ন দেশ থেকে রোগী বা তাদের স্বজনরা এখানে এসে ওষুধ নিয়ে যাচ্ছে বা বিভিন্ন মাধ্যমে সংগ্রহ করে

 নিচ্ছে। এ ক্ষেত্রে আমেরিকার গ্লিয়ার্ড ও ব্রিস্টল মায়ার স্কুইব কম্পানি দুটির আলাদা দুই ওষুধকে একত্রিত করে একটি ওষুধ হিসেবে আমরাই প্রথম বিশ্ববাজারে ছাড়ার চমক দেখিয়েছি। ’

মঞ্জুরুল আলম বলেন, ‘ডারভোনি আমরা বিক্রি করছি মাত্র ৩২ ডলারে আর এই একই জেনেরিকের মূল কম্পানির ওষুধের দাম পড়ে ৪২৫ ডলার; আবার সোফেসভেল ওষুধ আমরা বিক্রি করছি মাত্র ৩০ ডলারে, যা মূল কম্পানি বিক্রি করছে ৪০০ ডলারে। ’

এভাবে দেশীয় ওষুধ খাতে একের পর এক ঘটছে বিপ্লব। দেশের চাহিদার প্রায় ৯৮ শতাংশ ওষুধই উৎপাদন হয় দেশে, গত বছর পর্যন্ত বিশ্বের ১১৩টি দেশে রপ্তানি হয়েছে বাংলাদেশে তৈরি ওষুধ—এমন সাফল্যের তথ্যও এখন পেছনে পড়ে যাচ্ছে নতুন বড় অর্জনের মুখে। মাত্র কয়েক দিন আগে বাংলাদেশের কোনো ওষুধ কম্পানি হিসেবে প্রথমবারের মতো যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে ওষুধ রপ্তানি শুরু করে চমক দেখিয়েছে বেক্সিমকো ফার্মা। এর কিছু আগে ইনসেপ্টা ফার্মাসিউটিক্যালসের এক ওষুধ নিয়ে বিদেশিদের বাংলাদেশে ভিড় করার খবর ছড়িয়ে পড়ে দেশে-বিদেশে। এরই মধ্যে দেশের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব বায়োটেকনোলজির (এনআইবি) বিজ্ঞানীরা রোটা ভাইরাস নিয়ন্ত্রণে ভ্যাকসিন ও ওষুধের নতুন মডেল তৈরি করার সক্ষমতা দেখিয়ে চমকে দিয়েছে।

বিকনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলেন, ‘দেশের ওষুধশিল্প এখন অনেক সমৃদ্ধ। তবু একশ্রেণির ব্যবসায়ী ক্যান্সার চিকিৎসার নামে মানুষকে বিদেশি ওষুধের ফাঁদে ফেলে। অথচ আমরা এখন ক্যান্সারের যে ওষুধ তৈরি করছি তা কোনোভাবেই বিদেশি কোনো ওষুধের চেয়ে গুণে ও মানে খরাপ নয়। আমরা প্রতিটি ওষুধের গুণগত মানকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে ওষুধ উৎপাদন, সংরক্ষণ ও বাজারজাত করে থাকি। ওষুধের দামও সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে রেখে থাকি। ’ ওই শিল্পোদ্যোক্তা জোর দিয়ে বলেন, ‘আমরা এখন বিদেশে ওষুধ কারখানা স্থাপনেও সক্ষম। অনেক দেশ থেকেই আমাদের আহ্বান জানানো হয় সেখানে ওষুধশিল্প স্থাপনের জন্য। কিন্তু আমাদের সরকার এটা চায় না বলেই আমরা করতে পারছি না। ’

জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল ফার্মাসি অ্যান্ড ফার্মাকোলজি বিভাগের অধ্যাপক ডা. মো. মুনীরউদ্দীন আহমেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, বাংলাদেশ যেভাবে ওষুধ খাতে একের পর এক সাফল্য অর্জন করছে তা খুবই চমকপ্রদ। তবে এই অর্জনকে টিকিয়ে রাখা বড় চ্যালেঞ্জ। এ জন্য অবশ্যই জিএমপিসহ অন্যান্য সব ধরনের গুণ ও মানগত অবস্থান ধরে রাখতে হবে, যাতে করে কখনো বাংলাদেশের কোনো ওষুধ বিশ্ববাজার থেকে প্রত্যাখ্যাত না হয়। এ ছাড়া কেবল বিদেশেই নয়, দেশেও মানসম্পন্ন ওষুধ বাজারজাত করতে সরকারের নজরদারি আরো বাড়াতে হবে।

ওষুধ বিশেষজ্ঞরা জানান, কিছু হাইটেক প্রোডাক্ট যেমন ব্লাড প্রোডাক্ট, বায়োসিমিলার প্রোডাক্ট, অ্যান্টিক্যান্সার ড্রাগ, ভ্যাকসিন ইত্যাদি ছাড়া বাংলাদেশে এখন সব ধরনের ওষুধই তৈরি হয়। বলা যায়, বাংলাদেশ এরই মধ্যে ওষুধ আমদানিকারক দেশের পরিবর্তে বড় রপ্তানিকারক দেশে পরিণত হয়েছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, ওষুধ খাতে এসব অর্জনের পেছনে সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগ কার্যকর ভূমিকা রাখছে। এর সুবাদে এখন দেশের ২৭৮টি অ্যালোপ্যাথিক ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান বছরে প্রায় ১৫ হাজার ৬১৯ কোটি টাকার ওষুধ ও ওষুধের কাঁচামাল তৈরি করে। এ ছাড়া দেশের ২৬৬টি ইউনানি, ২০৫টি আয়ূুর্বেদিক, ৭৯টি হোমিওপ্যাথিক ও ৩২টি হারবাল ওষুধ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান প্রায় ৮৫০ কোটি টাকার ওষুধ উৎপাদন করে থাকে। কাঁচামাল উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের লক্ষ্যে এরই মধ্যে পদক্ষেপ নিয়েছে সরকার। কাঁচামাল উৎপাদনের জন্য অ্যাক্টিভ ফার্মাসিউটিক্যাল ইনগ্রেডিয়েন্টকে (এপিআই) পার্ক স্থাপনের জন্য মুন্সীগঞ্জ জেলার গজারিয়ায় জমি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এ পার্কের নির্মাণকাজ এগিয়ে চলছে। ২০১৮ সাল নাগাদ সেখানে এপিআই উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো কারখানা গড়ার কাজ শুরু করতে পারবে বলে আশা করা হচ্ছে।

স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে দেশের পুরো ওষুধশিল্পের প্রতি সাধুবাদ জানিয়ে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রে ওষুধ রপ্তানির সুযোগ পাওয়া বাংলাদেশের জন্য অনেক বড় অর্জন।

একই অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের ওষুধ খাতের প্রশংসা করেন ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মার্শা স্টিফেন্স ব্লুম বার্নিকাটও। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (এফডিএ) থেকে অনুমতি পাওয়া সময়সাপেক্ষ ও দুরূহ প্রক্রিয়া। এফডিএর কাজ হলো আমেরিকান ভোক্তাদের সুরক্ষার জন্য সর্বোচ্চ মান বজায় রাখা।

বড় অর্জন বেক্সিমকোর : যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে প্রথমবারের মতো ওষুধ রপ্তানি শুরু করার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের ওষুধশিল্প নতুন এক উচ্চতায় উঠে গেল। আর এ গৌরব এনে দিয়েছে দেশের প্রথম সারির ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেড (বিপিএল)। প্রতিষ্ঠানটি ‘কার্ভোডিলল’ নামে তাদের তৈরি হাইপারটেনশনের একটি ওষুধ রপ্তানি শুরু করেছে যুক্তরাষ্ট্রে। হাইপারটেনশনের ওষুধ ‘কার্ভোডিলল’ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে প্রথমবারের মতো প্রবেশ করেছে দেশের প্রথম সারির ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেড (বিপিএল)। এর আগে ২০১৫ সালের নভেম্বরে ইউএসএফডিএর কাছ থেকে ওষুধটির মানগত অনুমোদন লাভ করে বেক্সিমকো ফার্মা। নতুন এই মাইলফলক অর্জন উপলক্ষে গত ৪ আগস্ট রাজধানীর এক হোটেলে অনাড়ম্বর এক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।

ওই অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বলেন, ইউএসএফডিএর মতো একটি প্রতিষ্ঠানের কঠিন সব শর্ত ও নিয়মনীতিতে পরীক্ষিত হয়ে বাংলাদেশের ওষুধ আমেরিকার বাজারে প্রবেশ করার মধ্য দিয়ে দেশের জন্য এক বিরল ও দুর্লভ অর্জন বয়ে আনা হয়েছে। এটি বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালসসহ বাংলাদেশের পুরো ওষুধশিল্পের বড় কৃতিত্ব। অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম ও মার্কিন রাষ্ট্রদূত মার্শা স্টিফেন্স ব্লুম বার্নিকাট। বার্নিকাট বলেন, এফডিএর অনুমতিপ্রাপ্ত ওষুধ যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি করার বিষয়টি বেক্সিমকোর কঠোর পরিশ্রম ও তাদের পণ্যের গুণগত মানের প্রমাণ।

অনুষ্ঠানে বেক্সিমকো ফার্মার ব্যবস্থাপনা পরিচালক নাজমুল হাসান এমপি বলেন, ‘আমাদের পরিকল্পিত উদ্যোগ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আমাদের বাজার তৈরিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করেছে। যুক্তরাষ্ট্রে ওষুধের বাজার বিশ্বে সর্ববৃহৎ। দেশের নেতৃস্থানীয় ওষুধ রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান হিসেবে আমরা সব সময়ই বিশ্বের বিভিন্ন বাজারে ওষুধ রপ্তানির সুযোগ তৈরিতে কাজ করে গেছি। বেক্সিমকো ফার্মা এখন দেশের ওষুধ খাতের সবচেয়ে বড় রপ্তানিকারক কম্পানি। বর্তমানে ৫০টিরও বেশি দেশে বেক্সিমকো ফার্মার ওষুধ রপ্তানি হচ্ছে। ’

বিদেশিরাও আসছে ওষুধ নিতে : প্রতিদিনই বাংলাদেশ থেকে চিকিৎসার জন্য কিছুসংখ্যক মানুষ বিদেশে যায়। সবচেয়ে বেশি যায় পাশের দেশ ভারতে। এরপরই থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, আমেরিকা, ব্রিটেনসহ ইউরোপের অন্যান্য দেশে, যা নিয়ে বাংলাদেশে দীর্ঘদিনের হা-হুতাশ ও সমালোচনা চলছেই। দেশে চিকিৎসাব্যবস্থার উন্নতি এবং ওষুধের উন্নতি সত্ত্বেও কেন এসব মানুষ বিদেশে যায়, তা নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে অনেক যুক্তিতর্কও আছে বিভিন্ন মহলে। তা সত্ত্বেও এত দিন বাংলাদেশের অনেক চিকিৎসককে গুরুত্বের সঙ্গে ডেকে নিয়ে চাকরি দিচ্ছে অনেক উন্নত দেশের সরকারি-বেসরকারি হাসপাতাল। আর বাংলাদেশে তৈরি বিভিন্ন কম্পানির ওষুধ তো বিশ্বব্যাপী রপ্তানি করা হচ্ছে বহুদিন ধরেই। এবার এর সঙ্গে বাংলাদেশ আরেক ধাপ এগিয়ে এলো বিদেশি রোগীদের দেশে টেনে আনার ক্ষেত্রে। তাও আবার দুটি কম্পানির ওষুধকে ঘিরেই বিদেশিদের এমন ছুটে আসা।

৮১ হাজার টাকার ওষুধ ৮০০ টাকায় দিচ্ছে ইনসেপ্টা : হেপাটাইটিস সি রোগের চিকিৎসায় বিশ্বে এ পর্যন্ত সবচেয়ে কার্যকর ওষুধ যুক্তরাষ্ট্রের জুলিয়াট সায়েন্স কম্পানির। ওষুধের ৮৪ ডোজের একটি কোর্স সম্পন্ন করতে হয় রোগীকে। কিন্তু এক ডোজ ওষুধের দামই আন্তর্জাতিক বাজারে এক হাজার মার্কিন ডলার বা ৮১ হাজার টাকা। ফলে মোট ৮৪টি ওষুধের দাম পড়ে ৮৪ হাজার ডলার (৬৮ লাখ চার হাজার টাকা)। বাংলাদেশের অন্যতম ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান ইনসেপ্টা ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেড যুক্তরাষ্ট্রের জুলিয়াট সায়েন্স কম্পানির লেডিপাসভির ৯০ মিলিগ্রাম ও সোফোসবুভির ৪০০ মিলিগ্রাম জেনেরিকের সমন্বয়ে ‘টুইনভির’ নামে হেপাটাইটিস সি-বিরোধী ওষুধ দেশেই প্রস্তুত করে, যার প্রতিটির বাজারমূল্য মাত্র ৮০০ টাকা। নির্দিষ্ট কিছু বড় ফার্মেসি ও হাসপাতালে এ ওষুধ চাহিদা অনুসারে সরবরাহ করছে ইনসেপ্টা। বিভিন্ন মাধ্যমে বিভিন্ন দেশে এ ওষুধের কথা প্রচার পায়। দাম এত কম হওয়ায় একপর্যায়ে বিভিন্ন দেশ থেকে হেপাটাইটিস সি রোগে আক্রান্ত রোগী বা তাদের স্বজনরা ছুটে আসতে শুরু করে বাংলাদেশে। তারা সরাসরি ইনসেপ্টার সঙ্গে যোগাযোগ করে ডাক্তারের পরামর্শপত্র দেখিয়ে চাহিদা অনুসারে ওষুধ কিনে নিজ দেশে ফিরে যায়।

ইনসেপ্টা ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেডের মহাব্যবস্থাপক ডা. ই এইচ আরেফিন আহমেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের মোট জনগোষ্ঠীর প্রায় ১ শতাংশ মানুষ হেপাটাইটিস সি ভাইরাসে আক্রান্ত। আর বিশ্বে এ ভাইরাসে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা ১৭০ মিলিয়নের বেশি। ওষুধের বেশি দামের কারণে এত দিন এ ভাইরাস থেকে রক্ষা পাওয়া দুরূহ ছিল। কিন্তু আমরা আমেরিকার ওই কম্পানির জেনেরিক ফর্মুলায় একই ওষুধ প্রায় ৯০ শতাংশ কম দামে বাজারে ছেড়েছি। তাই এখন সারা বিশ্ব থেকে মানুষ এ ওষুধের জন্য বাংলাদেশে আসতে শুরু করেছে, যা আমাদের দেশের জন্য একেবারেই বিরল ঘটনা। ’

ভ্যাকসিন ও ওষুধের নতুন মডেল : রোটাভাইরাসের ভ্যাকসিন ও ওষুধ উদ্ভাবন করে নতুন এক দিগন্ত উন্মোচন করলেন বাংলাদেশের একদল বিজ্ঞানী। দেশেই তাঁরা তৈরি করতে সক্ষম হয়েছেন পাঁচটি ভ্যাকসিন ও ওষুধের মডেল, যার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে চিকিৎসাবিজ্ঞানে নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা হতে চলেছে। এই বিরল উদ্ভাবন করেছেন বাংলাদেশের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব বায়োটেকনোলজির (এনআইবি) বিজ্ঞানীরা। রোটা নিয়ন্ত্রণে বাস্তবভিত্তিক প্রয়োগের লক্ষ্য নিয়ে তাঁরা ওই ভ্যাকসিন ও ওষুধের মডেল তৈরি করেছেন। সম্ভাবনাময় এই এসইউ ভ্যাকসিন (SU1-SU5) তৈরি করা হয়েছে ১৪টি দেশের ২৪টি রোটাভাইরাস জাতের অপরিবর্তনশীল জিন নকশার ওপর ভিত্তি করে।

গবেষকদলের প্রধান এনআইবির মহাপরিচালক ড. মো. সলিমুল্লাহ কালের কণ্ঠকে বলেন, “গত বছরের ২৮ মার্চ কালের কণ্ঠে ‘নিয়ন্ত্রণহীন রোটাভাইরাস’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন পড়ি। এরপর আমি ও আমার দলের ভেতর হঠাৎ করেই যেন অদ্ভুত এক প্রেরণা অনুভব করি। কালের কণ্ঠ’র ওই প্রতিবেদন সামনে নিয়েই আমরা এ ভাইরাসের প্রিথেরাপি হিসেবে ভ্যাকসিন এবং পোস্টথেরাপি হিসেবে ওষুধের মডেল তৈরির সিদ্ধান্ত নিই। আমরা ভাইরাসের VP4 প্রোটিনের অপরিবর্তনশীল অংশের পেপটাইডকে টার্গেট করে মানবদেহের রোগ প্রতিরোধী কোষের (TIB-cell) সংযোগের ওপর ভিত্তি করে পাঁচটি পেপটাইড ভ্যাকসিনের মডেল তৈরি করি। আমাদের নকশা করা এই ভ্যাকসিন ট্র্যাডিশনাল ভ্যাকসিনের চেয়ে অনাক্রম্য হতে বেশি সাহায্য করবে বলে আমরা আশাবাদী। কারণ এটি তৈরির ক্ষেত্রে অপরিবর্তনশীল অংশ এবং নির্দিষ্ট টার্গেটকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে, যা ট্র্যাডিশনাল ভ্যাকসিনে অনুপস্থিত। ” ওই বিজ্ঞানী বলেন, ‘আমরা পোস্টথেরাপি হিসেবে ওষুধের নকশাও তৈরি করতে সক্ষম হয়েছি, যা রোটা নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। কারণ বাংলাদেশে প্রতিবছর প্রায় ২৪ লাখ শিশু রোটাভাইরাসের কবলে পড়ে ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হচ্ছে। ’


মন্তব্য