kalerkantho

শনিবার । ১০ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৯ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


জঙ্গি সবুরের জবানবন্দি

সিফাতের নেতৃত্বে দীপন হত্যা টুটুলের ওপর হামলায় শরিফুল

রেজোয়ান বিশ্বাস   

৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



সিফাতের নেতৃত্বে দীপন হত্যা টুটুলের ওপর হামলায় শরিফুল

বিজ্ঞানমনস্ক লেখক অভিজিৎ রায় ও ব্লগার প্রকাশক ফয়সল আরেফিন দীপন হত্যা এবং প্রকাশক আহমেদুর রশীদ চৌধুরী টুটুল হত্যাচেষ্টার ‘অন্যতম হোতা’ আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের (বর্তমানে আনসার আল ইসলাম) সদস্য আবদুস সবুর আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। অভিজিৎ হত্যার কথা জানলেও সে ওই অপারেশনে অংশ নেয়নি বলে তার দাবি।

এ ছাড়া পুরস্কার ঘোষিত শীর্ষ জঙ্গি সিফাতের নেতৃত্বে আলম, আকাশ, তৈয়বসহ আরো দুজন প্রকাশক দীপনকে হত্যা করে। আর শরিফুলের নেতৃত্বে শিহাব, সাব্বির, বাবর, ইয়াহিয়া, তাহসিনসহ অন্যরা টুটুলের ওপর হামলা চালায়।

গত ৩ সেপ্টেম্বর রাতে গ্রেপ্তার হয় সবুর। পরদিন রবিবার তাকে আদালতের মাধ্যমে ছয় দিনের রিমান্ডে নেয় গোয়েন্দা পুলিশ। তবে রিমান্ডের ছয় দিন শেষ না হতেই চার দিনের দিন গতকাল বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় সবুরকে আদালতে পাঠালে সে মহানগর হাকিম আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়।

আদালত সূত্র জানিয়েছে, জবানবন্দিতে অভিজিৎ ও দীপন হত্যা এবং টুটুল হত্যার পরিকল্পনা, জঙ্গিদের প্রশিক্ষণসহ বিস্তারিত বর্ণনা রয়েছে। জবানবন্দিতে সবুর জানিয়েছে, ২০১৩ সালের শেষের দিকে রাজধানীর ফরিদাবাদসংলগ্ন মসজিদে আসরের নামাজ পড়ার পর ইশতিয়াক নামের একজনের সঙ্গে তার পরিচয় হয়। দুই-তিন সপ্তাহ পর আবার তার সঙ্গে দেখা হয়। এর এক-দেড় মাস পর ইশতিয়াক ব্লুটুথের মাধ্যমে মোবাইলে জসিম উদ্দিন রাহমানীর বয়ান দেয়। কিছুদিন পর সে এসে বয়ানগুলো শুনেছে কি না এবং ইসলামের জন্য জিহাদ করবে কি না জানতে চায়। সে রাজি হলে ইশতিয়াকের সঙ্গে মাঝেমধ্যে ফোনে কথা হতো। পরে একদিন ইশতিয়াক তাকে নিয়ে মিরপুর সাড়ে ১১ নম্বরে একটি বাড়িতে যায়। সেখানে ইশতিয়াক তাকে সেলিম, সাব্বির, সাইফুলদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়। এরপর তাকে প্রটেক্টেড ডেক্সট.কম-এর একটি পিটি আইডি খুলে দেওয়া হয়। ওই আইডির মাধ্যমে সে চ্যাট করত। ২০১৪ সালের জানুয়ারিতে সাব্বির তাকে মাহমুদ হাসানের মাদ্রাসার পূর্ব পাশে রসুলপুর এলাকার চতুর্থ তলা ভবনের তৃতীয় তলায় একটি ফ্ল্যাটে নিয়ে যায়। সেখানে সে, সাব্বির, মাসফি ও আসাদ তিন মাস থাকে। সেখানে তাদের মানুষের সঙ্গে মেশা ও বাসা ভাড়া নেওয়ার কৌশল শেখানো হয়। সেলিম চাপাতি ও নাঈম এমএম পিস্তল বানানোর কৌশল প্রশিক্ষণ নেয়। দুই-তিন দিন পর পর সে ট্রেনিং দিত। পরে ফেব্রুয়ারিতে একদিন এশার নামাজের আগে সেলিম একটা কাজ হবে বলে বেরিয়ে যায়। পরে অভিজিৎ খুনের কথা জানতে পারে সবুর।

জবানবন্দিতে সবুর আরো জানায়, তিন মাস ট্রেনিংয়ের পর সে ফরিদাবাদ মাদ্রাসার পাশে একটি মেসে ওঠে। অন্যরা চলে যায়। ওই মেসে দুই মাস থাকে সে। একদিন সেলিম ফোন করে দক্ষিণখান দেওয়ান বাড়িতে যেতে বলে। সবুর সেখানে গেলে শরিফুল তাকে নিয়ে দক্ষিণখান দোতলা একটি ভবনের দ্বিতীয় তলায় যায়। সেখানে সে সেলিমের সঙ্গে সপ্তাহখানেক থাকে। এরপর সবুরকে আবদুল্লাহপুর মাস্টারপাড়ার একটি বাড়ির ২য় তলায় নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে সে, সিফাত ও শরিফুল তিন মাস থাকে। মাঝে মধ্যে দক্ষিণখান সেলিমে বাসায় যেত। এরপর টঙ্গীর চেরাগ আলী এলাকার দোতলা ভবনের নিচতলায় ওঠে  সিফাত ও শরিফুল। ওই বাসার কাছেই টঙ্গীর কলেজগেট বর্ণমালা রোডের চার তলা ভবনের নিচতলায় একটি বাসায় আনসার আল ইসলামের ‘মারকাজ’ ছিল। শরিফুল সেখানে প্রশিক্ষণ দিত। সে তখন আকাশ, আলম, শিহাব, তৈয়ব, রায়হান ও রাফিদের সঙ্গে থাকতে শুরু করে। সেলিম দুই/তিন দিন পর পর আসত।

সবুর জানায়, একমাস ট্রেনিংয়ের পর তাদের দুই ভাগ করা হয়। শিফাত, আকাশ, তৈয়ব ও আলমকে মহাখালী পাঠানো হয়। এদের দায়িত্ব ছিল প্রকাশক দীপন হত্যার। আর শিহাব, সাব্বির, তাহসিন, বাবর, ইয়াহিয়াকে এক মাস ট্রেনিং দিয়ে সবুরকে ফোন করে প্রকাশক টুটুল হত্যার দায়িত্ব দেওয়া হয়। সেলিম ও ইশতিয়াক প্রকাশক টুটুলের ছবি দেখিয়ে তাকে হত্যা করার কথা বলে।

সবুর জবানবন্দিতে বলে, ‘আমার টিম নিয়ে আমি শুদ্ধস্বরের অফিস এলাকায় দুই দিন গিয়ে রেকি করি। আমি সঠিকভাবে রিপোর্ট দিতে না পারায় আমাকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে শরিফুলকে দায়িত্ব দেয়। পরে ২০১৫ সালের ৩১ অক্টোবর শরিফুল, শিহাব, সাব্বির, বাবর, ইয়াহিয়া, তাহসিনদের নিয়ে সকাল ১০টায় বের হয়ে যায়। শরিফুল অপারেশন শেষ করে টঙ্গীর বাসায় ফিরে আসে। ’

সবুরের জবানবন্দিতে বলা হয়, একই দিনে সিফাতের নেতৃত্বে আলম, আকাশ, তৈয়বসহ আরো দুইজন প্রকাশক দীপনকে হত্যা করে।

সবুর জানায়, ২০১৫ সালের ডিসেম্বরে মোহাম্মদপুরের নবোদয় হাউজিংয়ের পাঁচতলা ভবনের চতুর্থ তলায় বোমা বানানো, বহন ও বিস্ফোরণ ঘটানোর প্রশিক্ষণ নেয় সে। আলী ওরফে নোমান, আইমান ওরফে তানভীর প্রশিক্ষণ দিত। এ ছাড়া বাড্ডার সাঁতারকূল এলাকার একটি বাসার নিচতলায় অস্ত্র ও চাপাতির ট্রেনিং হতো।

সবুর দাবি করেছে, তার আসল নাম মো. আ. সবুর। সাংগঠনিক নাম আব. সামাদ ওরফে সুজন ওরফে রাজু ওরফে সাদ। বাবার নাম ইদ্রিস পাটোয়ারি। মায়ের নাম তাহেরা বেগম। গ্রামের বাড়ি কুমিল্লার নাঙ্গলকোটের জাপানন্দির (পাটোয়ারিবাড়ি) ঢালুয়ায়। সে ছোটবেলায় গ্রামের বাড়িতে আইটপাড়া আজিজিয়া কওমি মাদ্রাসার ছাত্র ছিল। পরে ওই এলাকার সিংগড়িয়া ফয়জুল উলম ইসলামিয়া মাদ্রাসায় ৩০ পারা কোরআন হেফজ করে। এরপর নারায়ণগঞ্জ দেওভোগ কওমি মাদ্রাসায় চার বছর লেখাপড়া করার পর ঢাকার গেণ্ডারিয়ার ফরিদাবাদের একটি মাদ্রাসায় লেখাপড়া করে সে। সেখানে ২০১৩-১৪ সালে মিশকাত ও দাওরা পড়া শেষ করে।


মন্তব্য