kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ৮ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৭ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


ষোড়শ সংশোধনী : তৃতীয় বিচারপতির রায় প্রকাশ

সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল সংবিধান পরিপন্থী

নিজস্ব প্রতিবেদক   

৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল সংবিধান পরিপন্থী

বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউর রহমানকে সেনা আইন ভঙ্গকারী এবং অবৈধ দখলদার রাষ্ট্রপতি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে হাইকোর্টের এক বিচারপতির রায়ে। এ কারণে জিয়াউর রহমানের সময় করা সংবিধান সংশোধনী বাতিলযোগ্য বলেও মত দিয়েছেন ওই বিচারপতি।

সুপ্রিম কোর্টের বিচারকদের অপসারণ ক্ষমতা জাতীয় সংসদের হাতে পুনর্বহালসংক্রান্ত সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনীর বৈধতা নিয়ে জারি করা রুল খারিজ করে রায় দিয়েছিলেন হাইকোর্টের বৃহত্তর বেঞ্চের তৃতীয় বিচারপতি মো. আশরাফুল কামাল।

গতকাল বৃহস্পতিবার বিচারপতি মো. আশরাফুল কামালের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, “বেয়নেটের খোঁচায় আর্মি রুলস ভঙ্গকারী অবৈধ দখলদার রাষ্ট্রপতি মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানের একক ইচ্ছায় প্রণীত ‘সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল’-সংবলিত সংবিধানের ৯৬ অনুচ্ছেদটি সংবিধান পরিপন্থী, মাননীয় আপিল বিভাগের রায়ের পরিপন্থী এবং সর্বোপরি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে খসড়া সংবিধান প্রণয়ন কমিটির বিজ্ঞ সদস্যরা ও গণপরিষদের ৪০৩ জন সদস্যের কর্ম, আদর্শকে অবমূল্যায়ন করার শামিল; তথা সংবিধানের প্রস্তাবনার পরিপন্থী তথা সংবিধান পরিপন্থী তথা বাতিল আইন। ”

বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী, বিচারপতি কাজী রেজা-উল হক ও বিচারপতি মো. আশরাফুল কামালের সমন্বয়ে গঠিত বিশেষ বেঞ্চ সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে গত ৫ মে রায় ঘোষণা করেছিলেন। ওই তিন বিচারপতির মধ্যে প্রথম দুজন ষোড়শ সংশোধনী অবৈধ, অসাংবিধানিক ও বাতিল ঘোষণা করেন। ওই দুই বিচারপতির লেখা ১৬৫ পৃষ্ঠার রায় প্রকাশিত হয় গত ১১ আগস্ট। তবে ষোড়শ সংশোধনী বৈধ বলে অন্য বিচারপতির (বিচারপতি মো. আশরাফুল কামাল) দেওয়া অভিমত সেদিন প্রকাশিত হয়নি। গতকাল ওই বিচারপতির (বিচারপতি মো. আশরাফুল কামাল) ১২৫ পৃষ্ঠার রায় প্রকাশিত হলো।

বিচারপতি মো. আশরাফুল কামালের অভিমতে বলা হয়, ‘সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল-সংবলিত সংবিধানের ৯৬ অনুচ্ছেদটি অবৈধভাবে সংবিধান সংশোধন করে সংবিধানে সংযোজন করেছে সামরিক শৃঙ্খলা ভঙ্গকারী তথা আর্মি রুলস ভঙ্গকারী অবৈধ রাষ্ট্রপতি মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান তার বেয়নেটের খোঁচায়। অন্যদিকে সংসদ কর্তৃক বিচারক অপসারণ ব্যবস্থাসংবলিত ৯৬ অনুচ্ছেদটি মূল সংবিধানে প্রণয়ন করেছিলেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে খসড়া সংবিধান প্রণয়ন কমিটির বিজ্ঞ সদস্যরা এবং গণপরিষদের ৪০৩ জন সদস্য। সুতরাং এটা নির্দ্বিধায় বলা যায় যে সামরিক জান্তা কর্তৃক বেয়নেটের খোঁচায় প্রণীত সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল বিচার বিভাগের স্বাধীনতার পরিপন্থী। সংবিধানের প্রস্তাবনায় বর্ণিত মহান আদর্শগুলোর পরিপন্থী তথা অসাংবিধানিক এবং সংবিধানের মূল কাঠামোর পরিপন্থী। ”

রায়ে অভিমতে বলা হয়, “সুপ্রিম কোর্টের আইনগত দায়িত্ব একজন আর্মি রুলস ভঙ্গকারী অবৈধ দখলদার রাষ্ট্রপতি মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান কর্তৃক তার খেয়ালখুশি মোতাবেক সংবিধান সংশোধন করে ‘সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল’ কর্তৃক বিচারক অপসারণ প্রক্রিয়া সংবিধানের ৯৬ অনুচ্ছেদে অন্তর্ভুক্তকরণসংক্রান্ত সামরিক ফরমান উপড়ে ফেলা তথা অবৈধ এবং অসাংবিধানিক মর্মে ঘোষণা করে বাতিল করা, যা আমাদের তৎকালীন সুপ্রিম কোর্ট করতে ব্যর্থ হয়েছেন। আমাদের সুপ্রিম কোর্টকে সেই লজ্জা থেকে তথা কলঙ্ক থেকে মুক্ত করেছেন বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হক তাঁর পঞ্চম সংশোধনী মামলার রায়ের মাধ্যমে ২০০৫ সালে। পরবর্তী সময়ে প্রধান বিচারপতি মো. তাফাজ্জাল ইসলামের নেতৃত্বে আমাদের আপিল বিভাগ ২০১১ সালের ২৯ মার্চ তারিখে (সিভিল রিভিউ দরখাস্ত নং-১৭-১৮/২০১১) এর রায়ে কফিনের শেষ পেরেকটি ঠুকে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল-সংবলিত ৯৬ অনুচ্ছেদটি কবরস্থ করেন। সুতরাং এটা স্পষ্ট যে আমাদের মহান জাতীয় সংসদ সংবিধান (ষোড়শ সংশোধনী) আইন, ২০১৪ প্রণয়ন করে আমাদের সংবিধানকে কলঙ্কমুক্ত করেন, বিচার বিভাগের সত্যিকার স্বাধীনতা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেন। ৩০ লাখ বাঙালির আত্মত্যাগের বিনিময়ে এবং দুই লাখ মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে আমাদের অর্জিত সংবিধানকে আমরা ফেরত পেলাম। সে কারণে আমি বর্তমান মহান জাতীয় সংসদকে বিচার বিভাগের পক্ষ থেকে সশ্রদ্ধ কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। ”

রায়ে সুপ্রিম কোর্টের বিচারকদের অবসরের বয়সসীমা ৬৭ বছর থেকে বাড়িয়ে ৭৫ বছর করার প্রস্তাব দিয়ে বলা হয়েছে, ‘যেহেতু অভিজ্ঞ বিচারকের সংকট দিন দিন প্রকট আকার ধারণ করছে, সেহেতু সুপ্রিম কোর্টের বিচারকের বয়স ৭৫ বছরে উন্নীত করা একান্ত প্রয়োজন এবং অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। সেই লক্ষ্যে মহান জাতীয় সংসদের নিকট ৯৬ অনুচ্ছেদের (১) উপ-ধারা সংশোধনপূর্বক বিচারকের বয়স ৬৭-এর স্থলে ৭৫ করার প্রস্তাব করছি। ’

এর আগে সংখ্যাগরিষ্ঠ দুই বিচারপতির রায়ে বলা হয়, ‘বিচার বিভাগের স্বাধীনতা সংবিধানের অন্যতম মৌলিক কাঠামো। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা সংবিধানের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। আর বিচারকদের মেয়াদকালের নিরাপত্তা বিচার বিভাগের স্বাধীনতার একটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য। এই মৌলিক কাঠামো সংশোধনযোগ্য নয়। ’ এ রায়ে বলা হয়, সংবিধানের ১৬তম সংশোধনী সংবিধানের ৭খ অনুচ্ছেদকে আঘাত করে।


মন্তব্য