kalerkantho

শনিবার । ৩ ডিসেম্বর ২০১৬। ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ২ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


এপিজির প্রতিবেদন

মুদ্রাপাচার ও জঙ্গি অর্থায়নের ঝুঁকিমুক্ত বাংলাদেশ

নিজস্ব প্রতিবেদক   

৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



মুদ্রাপাচার ও জঙ্গি অর্থায়নের ঝুঁকিমুক্ত বাংলাদেশ

মুদ্রাপাচার ও জঙ্গি অর্থায়ন প্রতিরোধ কার্যক্রমে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত হয়েছে বলে স্বীকৃতি দিয়েছে এশিয়া প্যাসিফিক গ্রুপ অন মানি লন্ডারিং (এপিজি)। একই সঙ্গে জঙ্গিবাদ, মুদ্রাপাচারসহ অন্যান্য অপরাধ দমনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অঙ্গীকারের প্রশংসাও করেছে এপিজি।

বাংলাদেশসহ বিশ্বের ৪১টি দেশ এপিজির সদস্য। এপিজির সর্বশেষ মানদণ্ড সূচকে আন্তর্জাতিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতার প্রতি ঝুঁকিপূর্ণ দেশের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়নি বাংলাদেশ। এর ফলে এ নিয়ে যে আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল, তা থেকে বাংলাদেশ মুক্তি পেয়েছে।

গতকাল বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ ব্যাংকের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়। গত ৭ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার সান দিয়াগো শহরে এপিজির ১৯তম বার্ষিক সভায় তৃতীয় পর্বের মিউচ্যুয়াল ইভ্যালুয়েশন প্রক্রিয়ার চূড়ান্ত প্রতিবেদন অনুমোদন দেওয়া হয়। গত ৫ সেপ্টেম্বর থেকে গতকাল ৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ওই সভা চলে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, সন্ত্রাস, সন্ত্রাসে অর্থায়ন, জঙ্গিবাদ, মুদ্রাপাচারসহ অন্যান্য অপরাধ দমনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার যে অঙ্গীকার, তা এপিজির সভায় সব সদস্য রাষ্ট্র বহুলভাবে প্রশংসা করেছে। বাংলাদেশ সরকারের গৃহীত কার্যক্রম বিবেচনায় নিয়ে ‘মূল্যায়নকারী দল’ কর্তৃক প্রস্তাবিত রেটিংগুলোর মধ্যে দুটি ‘ইমিডিয়েট আউটকাম’ (আইও)-এর রেটিং উন্নীত করা হয়। এ ছাড়া কয়েকটি সদস্য দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থা কর্তৃক চারটি ইমিডিয়েট আউটকামের রেটিং কমানোর যে প্রস্তাব করা হয়েছিল তা সভায় বিবেচনায় নেওয়া হয়নি। এর ফলে চূড়ান্ত প্রতিবেদনে বাংলাদেশের রেটিং নরওয়ে ও শ্রীলঙ্কা থেকে ভালো অবস্থানে রয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে অস্ট্রেলিয়াসহ অনেক উন্নত দেশ থেকেও বাংলাদেশের অবস্থান ভালো রয়েছে বলেও বাংলাদেশ ব্যাংকের বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়।

এপিজির চূড়ান্ত প্রতিবেদনে বাংলাদেশের বিদ্যমান আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো পর্যালোচনা করে এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক মান নির্ধারণকারী আন্তর্দেশীয় সংস্থা ফিন্যানশিয়াল অ্যাকশন টাস্কফোর্সের (এফএটিএফ) ৪০টি সুপারিশের মধ্যে ছয়টিতে কমপ্লায়েন্ট, ২০টিতে লার্জলি কমপ্লায়েন্ট, ১৪টিতে পার্শিয়ালি কমপ্লায়েন্ট রেটিং দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া আইনি কাঠামো ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর কার্যকারিতা মূল্যায়নে বাংলাদেশকে ১১টি ইমিডিয়েট আউটকামের মধ্যে তিনটিতে বলিষ্ঠ (সাবস্ট্যানশিয়াল), চারটিতে মধ্যম (মডারেট) এবং চারটিতে নিম্ন (লো) লেভেলের রেটিং দেওয়া হয়েছে।

জানা গেছে, বাংলাদেশের ওপর প্রথম ২০০২ সালের অক্টোবর মাসে বিশ্বব্যাংক এবং আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) এ ধরনের মূল্যায়ন শুরু করে। যা ফিন্যানশিয়াল সেক্টর অ্যাসেসমেন্ট প্রোগ্রাম  (এফএসএপি) নামে পরিচিত। ওই সময়ে মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ বিষয়ে কার্যক্রম কেবল শুরু হওয়ায় বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই বাংলাদেশ নন-কমপ্ল্যায়েন্ট হিসেবে বিবেচিত হয়। পরবর্তী পর্যায়ে ২০০৮ সালে দ্বিতীয় মূল্যায়ন প্রক্রিয়া এপিজি কর্তৃক সম্পন্ন করা হয়। ওই মিউচ্যুয়াল ইভ্যালুয়েশন প্রতিবেদনেও বাংলাদেশের ফলাফল ভালো না হওয়ায় ২০১০ সালে বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতার প্রতি ঝুঁকিপূর্ণ দেশ হিসেবে এফএটিএফ আইসিআরজি প্রক্রিয়ায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ওই অবস্থা থেকে উত্তরণের লক্ষ্যে এশিয়া প্যাসিফিক রিজিওনাল রিভিউ গ্রুপের (এপি-আরআরজি) সঙ্গে আলোচনা করে বাংলাদেশ একটি সময়-আবদ্ধ কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করে এবং বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত রাজনৈতিক অঙ্গীকার নির্দেশক একটি পত্র এফএটিএফের প্রেসিডেন্টকে পাঠান। ওই কর্মপরিকল্পনা অনুযায়ী ২০১০ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত সময়ে বাংলাদেশ মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, সন্ত্রাসবিরোধী আইন, অপরাধ সম্পর্কিত বিষয়ে পারস্পরিক সহায়তা আইনসহ বিভিন্ন বিধিবিধান, প্রজ্ঞাপন, গাইডলাইন প্রণয়ন করে এবং প্রাতিষ্ঠানিক বিভিন্ন সংস্কার সাধন করে, যার ফলে ২০১৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশ আইসিআরজি প্রক্রিয়া থেকে বেরিয়ে আসতে সক্ষম হয়।

এপিজির তৃতীয় পর্বের মিউচ্যুয়াল ইভ্যালুয়েশন প্রক্রিয়াটি ২০১৪ সালে শুরু হয়, যা প্রধানত দুটি ভাগে বিভক্ত ছিল। প্রথমটি টেকনিক্যাল কমপ্ল্যায়েন্স (টিসি), যেখানে এফএটিএফের সুপারিশমালার আলোকে কোনো দেশের আইনগত ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সক্ষমতা ও পদ্ধতি মূল্যায়ন করা হয়েছে। দ্বিতীয়টি হচ্ছে ইফেকটিভনেস, যেখানে এফএটিএফের সুপারিশমালার বাস্তবায়ন পর্যাপ্ততা মূল্যায়ন করা হয়েছে, অর্থাৎ বাংলাদেশের আইনগত ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর কার্যকারিতার মূল্যায়ন করা হয়েছে।

মিউচ্যুয়াল ইভ্যালুয়েশন প্রক্রিয়ার গুরুত্ব বা তাৎপর্য বিবেচনায় অর্থমন্ত্রী এই কাজগুলোকে জাতীয় অগ্রাধিকার প্রদানের নির্দেশনা দিয়েছিলেন। সেই পরিপ্রেক্ষিতে অর্থ মন্ত্রণালয়ের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ এবং বাংলাদেশ ফিন্যানশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) মিউচ্যুয়াল ইভ্যালুয়েশনকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করে দায়িত্বটি সম্পন্ন করে।

বাংলাদেশের পাঠানো প্রতিবেদন বিবেচনায় নিয়ে এপিজি সচিবালয়ের নেতৃত্বে ভারত, ইন্দোনেশিয়া, চীন, ব্রুনেই দারুস সালাম, নিউজিল্যান্ড ও কম্বোডিয়ার কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে আট সদস্যের একটি মূল্যায়নকারী দল গত বছরের ১১ থেকে ২২ অক্টোবর মেয়াদে বাংলাদেশ সফর করে। পরবর্তী সময়ে গত ১ থেকে ৫ মে মেয়াদে দলটি আবারও বাংলাদেশ সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও সংস্থার সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে মানি লন্ডারিং ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধ কার্যক্রমের বিদ্যমান ব্যবস্থা সম্পর্কিত তথ্য সংগ্রহ করে।


মন্তব্য